ভোটাররা ভোট দেয়ার স্বাধীনতা ফিরে পাবে কবে?

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টি আবারো সামনে নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ গতমাসে এক সভায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সাংসদদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি৷ সেই নির্বাচন কখন হবে তাও জানিয়েছেন তিনি৷ তবে কিন্তু থেকে যায়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

গত ২৬ জুলাই জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু'বছর পরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে সেজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলীয় সাংসদদের৷ সেই বৈঠকে অংশ নেয়াদের বরাতে খবরটি প্রকাশ করেছে দৈনিক প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা৷

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ কয়েকটি দল অংশ না নেয়ায় কার্যত ‘ফাঁকা মাঠে গোল' দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ৷ মাঠ এতই ফাঁকা ছিল যে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে ভোট গ্রহণের প্রয়োজনই পড়েনি৷ ফলে দেশে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সেই নির্বাচন তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি৷

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ সে সময় ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়৷ আর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ছিল ১৫টি৷ ঐ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ৭ এপ্রিল, তেজগাঁওয়ে অবস্থিত তখনকার জাতীয় সংসদ ভবনে৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয়লাভ করে৷ বঙ্গবন্ধু সে সময় ঢাকা-১২ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন৷

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন, প্রথম নারী সাংসদ

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হয়৷ সেবার সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ছিল ৩০টি৷ তবে ঐ সংসদেই প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে একজন নারী সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন৷ খুলনা-১৪ থেকে নির্বাচিত হন সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ৷ প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২ এপ্রিল৷ নির্বাচনে মাত্র মাস ছয়েক আগে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ২০৭টি আর আওয়ামী লীগ ৫৪টি আসন পেয়েছিল৷

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন

ভোটগ্রহণ হয় ১৯৮৬ সালের ৭ মে৷ জাতীয় পার্টি ১৫৩টি, আওয়ামী লীগ ৭৬টি আর জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসন পায়৷ বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেছিল৷

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি সহ বেশ কয়েকটি দল এই নির্বাচন বর্জন করেছিল৷ জাতীয় পার্টি আসন পেয়েছিল ২৫১টি৷ সংরক্ষিত মহিলা আসন সংক্রান্ত আইনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই সংসদে মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩০০টি৷

পঞ্চম সংসদ নির্বাচন

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি আর জাতীয় পার্টি ৩৫টিতে জয়লাভ করে৷ এছাড়া নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ৩০ জন মহিলাকে সাংসদ নির্বাচিত করা হয়৷ অবশ্য তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সংবিধানের অংশ ছিল না৷ পরের সংসদে সেই বিল পাস হয়েছিল৷

ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন

অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি৷ আওয়ামী লীগ সহ অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল৷ ফলে মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১ শতাংশ৷ ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২৭৮টিতে জয়লাভ করেছিল৷ মাত্র চার কার্যদিবসে সংসদ বসার পর তা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়৷ এই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়৷

সপ্তম সংসদ নির্বাচন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬, বিএনপি ১১৬ ও জাতীয় পার্টি ৩২টি আসনে জয়লাভ করে৷ পরে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ৷

অষ্টম সংসদ নির্বাচন

ভোটগ্রহণ হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর৷ অষ্টম সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০০টি৷ কারণ সংরক্ষিত মহিলা আসন সংক্রান্ত আইনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় শুরুতে কোনো মহিলা আসন ছিল না৷ পরে আইন করে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ এ উন্নীত করা হয়৷ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আর আওয়ামী লীগ ৬২টি আসনে জয়ী হয়েছিল৷

নবম সংসদ নির্বাচন

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত সবশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পেয়েছিল ২৬৩টি আসন৷ আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৩৩টি আসন৷

দশম সংসদ নির্বাচন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি৷ ফলে ১৫৩ জন সাংসদ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সাংসদ নির্বাচিত হন৷

বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি সেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় কেউ কেউ দলটির সমালোচনা করেছেন৷ যদিও দলটি কেন নির্বাচনে অংশ নেয়নি সেটা সুস্পষ্টভাবেই জানিয়েছিল৷ বাংলাদেশে একসময় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থায় নির্বাচন হতো৷ আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন করে ১৯৯৬ সালে এই ব্যবস্থা চালু করতে তখন ক্ষমতায় থাকা বিএনপিকে বাধ্য করেছিল৷ আর ২০০৮ সালেও সেই ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ৷ এরপর দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের উদ্যোগ নেয় এবং সফল হয়৷

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়টি মেনে নেয়নি৷ বাংলাদেশের বাস্তবতায়, যেখানে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা এখন পর্যন্ত কার্যত অসম্ভব, সেখানে দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়৷ এই বাস্তবতা জেনেই দলীয় সরকারে অধীনে নির্বাচনের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানায় বিএনপি৷ তাসত্ত্বেও দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে একপর্যায়ে আগ্রহী হয় বিএনপি, কিন্তু তখন নানা বাহানায় আওয়ামী লীগ আরেকটি নির্বাচনের প্রতিশ্রুত দিয়ে ‘নিয়ম রক্ষার' নামে বিএনপিকে বাদ দিয়েই দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পথে এগিয়ে যায়৷ বলাবাহুল্য, আওয়ামী লীগ আলোচনার মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচনের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি

অন্যদিকে, বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলেও ২০১৫ সালে মেয়র নির্বাচনে অংশ নেয় দলীয় সরকারের অধীনে৷ ঢাকায় মেয়র নির্বাচনের শুরুটা কিছুটা শান্তিপূর্ণ হলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের সমর্থকরা প্রশাসনের সহায়তায় একের পর এক কেন্দ্র দখল করতে শুরু করলে সেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় দলটি৷ তাসত্ত্বেও চূড়ান্ত ভোট গণনায় দেয়া যায় ঢাকায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা অনেক ভোট পেয়েছিলেন৷ নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হলে পরিস্থিতি কেমন হতো সেটা সহজেই অনুমেয় সেই ফলাফল থেকে৷

পরবর্তীতে চলতি বছর দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নেয় বিএনপি৷ সেই নির্বাচনে কার্যত বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয় বলে যে দাবি জানিয়ে আসছিল, তার সত্যতা মিলেছে৷ অধিকাংশ নির্বাচনি এলাকাতে বিএনপি প্রার্থীরা এবং তাদের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রের আশেপাশেও যেতে পারেননি সরকার দলের সমর্থকদের দাপটের কারণে৷ নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসন সেসব দেখেও দেখেনি৷ ফলে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন যে কতটা অসম্ভব, সেটা আবারো পরিষ্কার হয়েছে৷ এখানে লক্ষ্যণীয় হচ্ছে, এবারই প্রথম দলগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ আর সেই নির্বাচনে একশ'র বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, যা এক রেকর্ড

Arafatul Islam Kommentarbild App

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

বিএনপিকে বর্তমানে পুরোপুরি কোণঠাসা করে দেয়া হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের নামে অসংখ্য মামলা দিয়ে৷ ২০০৬ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা অনেক মামলা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রত্যাহার হলেও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার হয়নি৷ বরং নতুন নতুন মামলায় জড়িয়ে মোটামুটি রাজপথ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বিএনপি৷ অন্যদিকে, জঙ্গিবাদ ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সরকারের উদাসীনতায়৷ যার ফল হচ্ছে গুলশানে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশি নিহতের ঘটনা৷ এখন সরকার এবং প্রশাসন জঙ্গিবাদ রোধে কিছুটা তৎপরতা দেখালেও তা কতটা কার্যকর হচ্ছে বুঝতে সময় লাগবে৷

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ নাজুক৷ কার্যত বিরোধী দলহীন একটি সংসদে ক্ষমতাসীন দল যা খুশি তাই করে যাচ্ছে৷ জনগণের কাছ থেকে সরকারের দূরত্বটাও বেশ পরিষ্কার৷ ফলে সরকার ভালো কিছু করলেও সেটার প্রশংসা যেমন পাচ্ছে না, তেমনি তাদের কোনো কাজের সমালোচনা সাধারণ জনগণ করলেও তা তাদের কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না৷ এ রকম পরিস্থিতির নিরসনে তাই ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ আর অংশগ্রহণমূলক' একটি জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য জরুরি৷ সাধারণ জনগণকে ভোট দেয়ার স্বাধীনতা পুরোপুরি ফিরিয়ে দিয়ে সেটা সম্ভব৷

বন্ধু, আপনি কি আরাফাতুল ইসলামের সঙ্গে একমত? জানান নীচের ঘরে৷

গত ২৬ জুলাই জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু'বছর পরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে সেজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলীয় সাংসদদের৷ সেই বৈঠকে অংশ নেয়াদের বরাতে খবরটি প্রকাশ করেছে দৈনিক প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা৷