ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি

বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম একটি বড় ‘ফ্যাক্টর'৷ তবে সংখ্যালঘুদের ভোট পেতেও ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে৷ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো জোটের অন্তর্ভূক্ত হয়ে সংসদে যায়, এমনকি মন্ত্রীত্বও পায়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বেআইনি৷ কিন্তু এরপরও ধর্মের ভিত্তিতে দল আছে এখানে৷ বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে৷ সেক্যুলার এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মভিত্তিক অঙ্গ সংগঠন৷

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি, যারা নির্বাচনের আগে ইসলাম রক্ষার কথা বলে ভোট চেয়েছে৷ তাদের প্রচারণা অনুযায়ী, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে ইসলাম থাকবে না'৷ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভোটের রাজনীতিকে ‘টার্গেট' করেই সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম' সংযোজন করেন৷ এর পর সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন ভোটের রাজনীতিকে ‘টার্গেট' করেই৷

পিয়ান মুগ্ধ নবীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী পিয়ান মুগ্ধ নবীর কাছে ধর্ম বিষয়টা পুরোপুরি ব্যক্তিগত হলেও রাজনীতি ব্যক্তিগত বিষয় নয়৷ তবে ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে তিনি কখনোই সমর্থন করেন না৷

শিবরাজ চৌধুরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী শিবরাজ চৌধুরী৷ তার মতে, ধর্ম এবং রাজনীতি কখনোই এক হতে পারে না৷ ধর্মের মূল বিষয় মনুষত্ব বা মানুষের মধ্যকার শুভবোধ৷ তবে ধর্মের নামে যদি কখনো মৌলবাদ কিংবা চরমপন্থা চলে আসে, সেটা কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়৷

শিহাব সরকার

ঢাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শিহাব সরকার৷ তার মতে, ধর্ম ধর্মের জায়গায় আর রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়৷ বলা বাহুল্য, ধর্মের নামে রাজনীতি তিনিও সমর্থন করেন না৷

আসিফ হামিদী

আসিফ হামিদীও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন৷ তিনিও মনে করেন ধর্ম এবং রাজনীতি কখনোই এক হতে পারে না৷ তাই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী তিনি৷

মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর

ঢাকার একটি মাদ্রাসা থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর৷ তাঁর মতেও রাজনীতি ধর্মভিত্তিক হতে পারে না৷ তবে আল্লাহ এবং রাসুলের কিংবা ইসলামের উপর কোনোরকম আঘাত আসলে তার বিরোধীতা করা সব মুসলমানের নৈতিক দ্বায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি৷

সাদমান আহমেদ সুজাত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান আহমেদ সুজাত৷ তাঁরও ঐ এক কথা৷ ‘‘ধর্ম এবং রাজনীতি কখনো এক হতে পারে না৷’’ তিনি জানান, ‘‘ধর্ম আমরা সাধারণত জন্মগতভাবে পাই, কিন্তু রাজনীতিকে আমরা অনুসরণ করি৷’’

সাজ্জাদ হোসেন শিশির

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন শিশির৷ তাঁর মতে, রাজনীতি সবসময়ই ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া উচিত৷ তাঁর বিশ্বাস, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়ে ফেললে তার ফল কখনো ভালো হয় না৷

দাউদুজ্জামান তারেক

ঢাকার আরেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দাউদুজ্জামান তারেক মনে করেন, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের কখনো মিল হতে পারে না৷ কারণ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসরণও করতে পারেন৷

এদিকে ভোটের আগে আওয়ামী লীগের বহুল ব্যবহৃত স্লোগান – ‘লা ই লাহা ইল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ'৷ দলটি এ-ও প্রচারণা চালায় যে, তারা নির্বাচিত হতে না পরলে সংখ্যালঘুরা দেশে থাকতে পারবে না৷ এছাড়া প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচনের আগে হজ বা ওমরাহ করেন, যান মাজারে৷ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ তো কয়েকজন ধর্মীয় পীরকে গুরুর আসনে বসান৷ বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন, যান৷

বাংলাদেশের প্রধান দু'টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ইসলামিক ‘উইং' আছে৷ আওয়ামী ওলামা লীগ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন আর জাতীয়তাবাদী ওলামা দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন৷

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধের বিচারের কারণে চাপে থাকলেও, তাদের নিয়ে ভোটের হিসাব-নিকাশ হয়েছে৷ এই দলটির মোট পাঁচ থেকে ছয় ভাগ ভোট রয়েছে৷ আর তাতেই তারা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ, ভোটের যে হিসাব, তাতে যদি তারা কোনো বড় দলের সঙ্গে জোট করে, তাহলে উভয়ই সুবিধা পায়৷

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত প্রথম ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১০টি আসন পায়৷ এরপর তারা বিএনপির শরিক দল হিসেবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়৷ ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী যেখানে ১০টি আসন পেয়েছিল সেখানে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করে ১৮টি আসন পায়৷ সেবার তাদের দু'জন নেতা মন্ত্রীও হন৷

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সামান্তরাল আন্দোলনে অংশ নেয় জামায়াত৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী পায় মাত্র তিনটি আসন৷ সেই সময় বিএনপির সঙ্গে জোট না করায় ভোটে ভরাডুবি হয় তাদের৷ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আবারো বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত হয়ে ১৭টি আসন পায় জামায়াত৷

অডিও শুনুন 07:19
এখন লাইভ
07:19 মিনিট
বিষয় | 13.07.2016

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুসারে সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ হলে রাজনৈতিক দল হিসাবে জাময়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়৷ বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল৷ ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বিধির আওতায় জামায়াত এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায়৷

বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মহাজোটে বেশ কিছু ইসলামী দল আছে৷ আর বিএনপির ২০ দলীয় জোটেও জামায়াতসহ ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রাধান্য দৃশ্যমান৷

এর বাইরে ইসলাম ভিত্তিক কিছু সংগঠন বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে বড় ‘ফ্যাক্টর' হিসেবে কাজ করে৷ তার মধ্যে প্রধান হলো, হেফাজতে ইসলাম৷ এই সংগঠনটিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই সমীহ করে চলে৷ হেফাজতের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি৷ তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল৷ কিন্তু এখন সরকারই আবার হেফাজতকে কাছে টেনে নিয়েছে৷ হেফাজতের বিরোধিতার কারণেই সরকার নারী নীতি বাস্তবায়ন করছে না৷ ব্লগার ও মুক্তমনাদের সুরক্ষা না দিয়ে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়৷

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ইসলামিক রাজনৈতিক দল আছে ১০টি৷ এগুলো হলো: বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও খেলাফত মজলিস৷ জামায়াতে ইসলামির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে আদালতের নির্দেশে৷

এর বাইরে বাংলাদেশে আরো অর্ধশত ইসলামিক রাজনৈতিক দল আছে৷ তারাও ভোটের আগে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভিড়ে যায় অথবা বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সঙ্গে নেয়৷

অডিও শুনুন 05:34
এখন লাইভ
05:34 মিনিট
বিষয় | 13.07.2016

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আহমেদ আযম খান

বাংলাদেশে কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আবার জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগও আছে৷ তাছাড়া ভোটের রাজনীতির হিসেবের কারণে মৌলবাদ বা ধর্মীয় প্রচারণা তেমন বিরোধিতার মুখে পড়ে না৷ সবাই চায় তাদের ‘গুডবুকে' রেখে ভোট বাড়াতে৷

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘‘ঐতিহাসিকভাবে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আছে৷ ১৯৪৭ সালে দেশভাগই হয় ধর্মের ভিত্তিতে৷ তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়৷ কিন্তু সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান আবার বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুযোগ করে দেন৷''

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগও তো এখন ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করছে?

নূহ উল আলম লেনিন বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ চায় ধর্ম রাজনীতি থেকে দূরে থাকুক৷ ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকুক৷ কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, তা অল্প সময়ে দূল করা যাবে না৷ তাই আওয়ামী লীগকে কৌশলে কাজ করতে হচ্ছে৷''

অন্যদিকে বিএনপি নেতা এবং চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আহমেদ আযম খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আছে৷ এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই৷''

তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি ধর্মনিরপেক্ষ নয়, ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী৷ আর বিএনপি ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করে না৷ তবে ভোটের সময় সব দলই ধর্মকে ব্যবহার করে ভোটের বাক্সে সুবিধা করতে চায়৷ আওয়ামী লীগও চায়৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বেআইনি৷ কিন্তু এরপরও ধর্মের ভিত্তিতে দল আছে এখানে৷ বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে৷ সেক্যুলার এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মভিত্তিক অঙ্গ সংগঠন৷