যুদ্ধপরবর্তী জার্মানির সফলতম রাজনৈতিক দল সিডিইউ

ফেডারাল জার্মান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৯, ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ এবং ২০০৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত একক দল বা জোট সরকারের বড় তরফ হিসেবে ক্ষমতায় থেকেছে খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল সিডিইউ ও তাদের বাভেরীয় সহযোগী সিএসইউ৷

নাৎসি জার্মানির পতনের পর জার্মানিতে যখন একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন নাৎসি-পূর্ব ভাইমার প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন রাজনীতিক মিলে জার্মান রাজনীতির পুনর্বিন্যাসের জন্য সচেষ্ট হন৷ বিভিন্ন শহরে বিক্ষিপ্ত আলাপ-আলোচনা থেকে জন্ম নেয় একটি ঐক্যবদ্ধ ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন বা খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী সংঘ৷ তারিখটা ছিল ১৯৪৫ সালের ২৬শে জুন৷ মনে রাখতে হবে, সরকারিভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে তখনও মাস দু'য়েক বাকি৷

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের আমলে গণতান্ত্রিক দলগুলির মধ্যে অনৈক্যের ফলেই নাৎসিরা ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল, এই ধারণা থেকেই ‘ইউনিয়ন' – অর্থাৎ সিডিইউ-সিএসইউ দলগুলির জন্ম৷ বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে বিরোধ থেকে আডল্ফ হিটলারের উত্থান সম্ভব হয়েছে, বলে ইউনিয়ন দলগুলির নেতৃবর্গের ধারণা ছিল৷ সেই বিভেদ অতিক্রম করার জন্য উভয় সম্প্রদায়ের খ্রিষ্টানদের নিয়ে ও ‘সংঘ' নাম দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টির প্রচেষ্টা করা হয়৷ সেই সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিচারে একটি উদারপন্থি-রক্ষণশীল ধারা৷ কনরাড আডেনাউয়ার ছিলেন এই সামগ্রিক মনোভাবের ধারক ও বাহক৷ ১৯৫০ সালের ২১শে অক্টোবর তারিখে সিডিইউ দলের প্রথম দলীয় সম্মেলনে তিনি দলের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন৷

রাজনীতি

জার্মানির বড় নির্বাচনের বছর

জার্মানিতে চলতি বছর আয়োজন করা হচ্ছে একের পর এক নির্বাচন৷ একদিকে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল চতুর্থবারের মতো চ্যান্সেলর পদে লড়ছেন, অন্যদিকে পপুলিস্ট পার্টি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) অভিবাসীবিরোধী অবস্থানের কারণে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে৷ বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এটা নিশ্চিত যে, ২০১৭ সালের শেষে জার্মানির রাজনৈতিক অবস্থা এখনকার মতো থাকবে না৷

রাজনীতি

জুন ১৯: দলের মনোনয়ন জমা দেয়ার দিন ছিল

জার্মানির সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য আবেদনের শেষ দিন ছিল জুন ১৯৷ সেদিন সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে আগ্রহী দলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আবেদন জানাতে হয়েছে৷

রাজনীতি

জুলাই ৭: কোন কোন দল লড়ছে?

সংসদ নির্বাচনে কোন কোন দল অংশ নিতে পারবে তা ঘোষণা করা হবে এই দিনে৷ যদি কোন দল নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয় তাহলে পরবর্তী চারদিনের মধ্যে জার্মানির সাংবিধানিক আদালতে নালিশ করতে পারবে৷

রাজনীতি

জুলাই ১৭: কারা কারা থাকছেন?

চলতি বছরের ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কোন কোন প্রার্থী কোন কোন এলাকায় লড়বেন, তা চূড়ান্ত করতে হবে৷ জার্মানিতে একসঙ্গে দু’টি ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে৷ প্রথমটি প্রার্থীকে, দ্বিতীয়টি দলকে৷

রাজনীতি

জুলাই ২৭: ব্যালটে নাম উঠানোর লড়াই

যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে সাংবিধানিক আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে, তাদের বিষয়ে রায় ঘোষণা করা হবে এই দিনে৷ ২০১৩ সালে এই পন্থা চালু করা হয়েছিল৷ সেবছর এগারোটি দল আদালতের স্মরণাপন্ন হলেও কেউই মামলা জেতেনি৷

রাজনীতি

আগস্ট ১৩: আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা

জার্মানিতে নির্বাচন শুরুর ছয় সপ্তাহ আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক প্রচারণার পোস্টার বা টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে না৷ চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর তারিখ ১৩ আগস্ট৷ এই দিন থেকে দলগুলো তাদের প্রচারণায় কোনো ঘাটতি রাখবে না৷

রাজনীতি

আগস্ট ২০: কে ভোট দিতে পারবেন?

নির্বাচনের মাসখানেক আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তালিকা চূড়ান্ত হবে৷ ভোটার লিস্ট ঘোষণা করবে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ৷ জার্মানিতে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি যে কোনো জার্মান নাগরিক ভোট দিতে পারবেন৷ সে হিসেবে চলতি বছর ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ৬১ মিলিয়ন৷

রাজনীতি

সেপ্টেম্বর ৩: তিন সপ্তাহ বাকি

এই সময়ের মধ্যে সকল ভোটার পোস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে ভোট দেয়ার সার্টিফিকেট পাবেন৷ যারা তখন অবধি ভোটার লিস্টে নিজেদের নাম পাননি, তারা রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ পাবেন৷ আর যারা পোস্টের মাধ্যমে ভোট দিতে চান, তারা ব্যালট পেপার চাইতে পারেন৷

রাজনীতি

সেপ্টেম্বর ২৪: নির্বাচনের দিন

অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষণ৷ জার্মানির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৪ সেপ্টেম্বর৷ সেদিন সকাল আটটায় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হবে, চলবে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত৷ ভোটগণনা সেদিনই শেষ হবে এবং নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ রাতে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করবে৷

রাজনীতি

সেপ্টেম্বর ২৫: বিজয়ী এবং বিজিত

সকল প্রতিনিধি এবং দলগত ভোট গণনা শেষে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা দেয়া হবে ২৫ সেপ্টেম্বর৷ যদি কোনো প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় জিততে ব্যর্থ হন, তা সত্ত্বেও দলগত জয়ের কারণে তিনি সংসদে একটি আসন পেতে পারেন৷

রাজনীতি

অক্টোবর ২৪: নতুন সাংসদরা সংসদে

নির্বাচন শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে নতুন সাংসদদের সংসদে মিলিত হওয়ার নিয়ম রয়েছে৷ এ বছর সেই দিনটি হচ্ছে অক্টোবর ২৪৷ সেদিন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে জার্মানির পরবর্তী চ্যান্সেলর নির্বাচিত হবেন৷

রাজনীতি

নভেম্বর ২৪: সবকিছু কি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হয়েছে?

যদি কেউ জাতীয় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান, তাহলে তার হাতে সময় থাকে নির্বাচন পরবর্তী দুই মাস৷ ভোটাররাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যে কেউ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রাখেন এই সময়ের মধ্যে৷

জার্মানির পূর্বাংশ সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ফলে গোড়ার দিকে সিডিইউ দলের কিছু সদস্য সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার দিকে ঝুঁকলেও, ১৯৫০ সালে প্রথম দলীয় সম্মেলনের আগেই খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রীরা বহুলাংশে এ বিষয়ে একমত হন যে, ‘‘সামাজিক খোলাবাজারের অর্থনীতি'' জার্মানির পক্ষে সেরা পন্থা – অর্থাৎ খোলাবাজারের পুঁজিবাদের সঙ্গে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও কল্যাণরাষ্ট্রের সংমিশ্রণই দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক হবে৷

সিডিইউ দল ও তাদের বাভেরীয় ‘সহোদরা' ক্রিস্টিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় সামাজিক সঙ্ঘ বা সিএসইউ দল ১৯৪৯ সালের নির্বাচন ও পঞ্চাশের দশকের নির্বাচনগুলিতে বিপুল সাফল্য লাভ করে প্রধানত দু'টি কারণে: প্রথমত, দলের প্রথম দুই নেতা, কনরাড আডেনাউয়ার ও তাঁর উত্তরসুরি লুডভিশ এর্হার্ড; দ্বিতীয়ত, সিডিইউ দলের প্রতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিদের, এক্ষেত্রে মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারের পরোক্ষ সমর্থন৷

চল্লিশের দশকের শেষেই পশ্চিমি শক্তিদের চোখে সামাজিক গণতন্ত্রী এসপিডি দল সিডিইউ দলের চেয়ে বেশি জাতীয়তাবাদী ও জার্মান পুনর্মিলনের পক্ষপাতী বলে বিবেচিত হতে শুরু করেছিল – প্রয়োজনে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুযোগসুবিধা দিতেও এসপিডি দ্বিধা করবে না, বলে মিত্রশক্তিদের ধারণা ছিল৷ অপরদিকে সিডিইউ দলের অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আরো একটি শক্তি হিসেবে দলটি পশ্চিমি শক্তিদের সমর্থন পাচ্ছিল৷

রাজনীতি

প্রাণী সুরক্ষা দল

জার্মানিতে প্রাণী অধিকার বিষয়ক অ্যাক্টিভিস্টরা সুযোগ পেলে পুরো হাইওয়ে বন্ধ করে দেন যাতে ব্যাঙেরা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে৷ এমন দেশে তাই ‘অ্যানিমেল প্রোটেকশন পার্টি’ বা প্রাণী সুরক্ষা দল থাকবে না, তা কি হতে পারে? তবে গ্রিন পার্টির কারণে এ দলের পালে হাওয়া কম থাকে৷ ২০১৩ সালে সাক্যুল্যে ১৪০,০০০ ভোট পেয়েছিল দলটি, যেখানে জার্মানিতে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬২ মিলিয়ন৷

রাজনীতি

দ্য রিপাবলিকানস

ব্যাপারটা কিছুটা বিভ্রান্তিকর৷ জার্মানির রয়েছে নিজস্ব রিপাবলিকান পার্টি, নাম আরইপি৷ তবে এই দলের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সম্পর্ক নেই৷ জার্মান রিপাবলিকনরা হচ্ছেন ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী, যারা নিজেদের ‘রক্ষণশীল দেশপ্রেমিক’ এবং দেশের ‘সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়’ রক্ষায় লড়াইরত বলে মনে করেন৷

রাজনীতি

দ্য পার্টি

হ্যাঁ, এই দলের নাম ‘দ্য পার্টি’৷ জার্মানির স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘টাইটানিক’ এর সম্পাদকরা ২০০৪ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ দলটির প্রধান হচ্ছেন মার্টিন স্যোনেবর্ন (ছবিতে)৷ ২০১৪ সালে তিনি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে দলটির জন্য একটি আসন নিশ্চিত করেন৷ ভবিষ্যতে দলটির অবস্থা আরো ভালো হতে পারে৷ গত নির্বাচনে তাদের জুটেছিল সাক্যুলে ৭৯,০০০ ভোট৷

রাজনীতি

গণভোট দল

জার্মানির রেফারেন্ডাম পার্টি বা গণভোট দলের কাছে সুইজারল্যান্ড এক বিশাল অনুপ্রেরণা৷ দলটি চায় দেশের সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গনভোটের মাধ্যমে জনগণ নেবে৷ সুইজারল্যান্ডে ২০১৬ সালে তেরোটি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল৷

রাজনীতি

মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট পার্টি

জার্মানির এমএলপিডি একটি ছোট দল, যদিও দেশটির অর্ধেক মানুষ এক সময় কমিউনিস্ট ছিলেন৷ মানে ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৯ সাল অবধি যখন জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল৷ তৎকালীন পূর্ব জার্মানি তখন শাসন করেছিল সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টি৷ বর্তমানে উগ্র বামপন্থি এমএলপিডি’র জার্মান রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা নেই৷ গত নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র ২৪,০০০ ভোট৷

রাজনীতি

ক্রিশ্চিয়ানস ফর জার্মানি

‘অ্যালায়েন্স সি - ক্রিশ্চিয়ানস ফর জার্মানি’ একটি ক্রিশ্চিয়ান পার্টি, যেটির যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে৷ খ্রিষ্টান-মৌলবাদীদের একটি দল এবং শ্রমিক, পরিবেশ এবং পরিবারভিত্তিক একটি দল একত্র হয়ে এই দল গড়ে৷ বাইবেলের মান রক্ষা করে দেশ পরিচালনা করতে চায় এই দল৷

রাজনীতি

দ্য পেনশনারস

এই দলকে ২০১৭ সালের নির্বাচনের ব্যালট পেপারে আর দেখা যাবে না, কেননা, দলটি অবসর ঘোষণা করেছে৷ দ্য পেনশনারস দলটি ২০১৩ সালের নির্বাচনে ২৫,০০০ ভোট পেয়েছিল৷ গত বছর দলের কর্মকর্তারা দলটি ভেঙ্গে দেন৷

আডেনাউয়ারের আমল

যুদ্ধপরবর্তী জার্মানিকে ধ্বংস থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া ও জার্মানিকে ইউরোপীয় তথা পশ্চিমি দেশগুলির কাছে পুনরায় গ্রহণযোগ্য করে তোলার পিছনে কনরাড আডেনাউয়ার-এর অবদান জার্মানি তথা বিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত৷ ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৩ সাল অবধি চ্যান্সেলর ছিলেন আডেনাউয়ার – তথাকথিত ‘জার্মান অর্থনৈতিক আশ্চর্যের' সূচনা তাঁরই কর্মকালে৷ ১৯৫২ সালে ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সমিতি গঠনে সংশ্লিষ্ট ছিলেন আডেনাউয়ার – যা কিনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক পূর্বসুরি বলে গণ্য করা যায়৷ ১৯৫৫ সালে ‘বুন্ডেসভের' নাম দিয়ে নতুন জার্মানি সেনাবাহিনি সৃষ্টিও তাঁর কাজ৷ আডেনাউয়ারের পর চ্যান্সেলর হন লুডভিশ এরহার্ড, যাঁকে ‘জার্মান অর্থনৈতিক আশ্চর্যের' জনক বলা হয়ে থাকে এবং যিনি চ্যান্সেলর হবার আগে আডেনাউয়ারের মন্ত্রীসভায় অর্থমন্ত্রী ছিলেন৷ এরহার্ড চ্যান্সেলর ছিলেন ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৬ সাল অবধি৷ তাঁর পরে চ্যান্সেলর হিসেবে আসেন কুর্ট গেয়র্গ কিসিংগার, যিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল অবধি ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন৷ অতঃপর সিডিইউ দলকে পুনরায় চ্যান্সেলর পদাভিষিক্ত হবার জন্য দীর্ঘ ১৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়৷

হেলমুট কোল-এর আমল

তবে সে প্রতীক্ষা স্বার্থক হয়, বলা চলে৷ সদ্য প্রয়াত হেলমুট কোলকে দুই জার্মানির পুনর্মিলনের জনক বলা হয়ে থাকে৷ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তিনি প্রথমে পশ্চিম জার্মানি, অতঃপর পুনরেকীকৃত জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন৷ অপরদিকে আডেনাউয়ারের ‘পৌত্র' প্রজন্মের রাজনীতিক হেলমুট কোল ছিলেন ‘পিতামহের' মতোই ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণার ধারক ও বাহক – স্ট্রাসবুর্গের পার্লামেন্টে প্রথম ইউরোপীয় রাজনীতিক হিসেবে তাঁর জন্য বিশেষ শোকানুষ্ঠান যার প্রমাণ৷

বার্লিনে চুক্তি সম্পন্ন

অনেক বিষয়ে মতানৈক্য থাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা চললেও জোট সরকার গঠনের প্রয়াস সাফল্যের মুখ দেখছিল না৷ বার্লিনে ১৮ ঘণ্টার বৈঠক শেষে বুধবার সকালে সে অপেক্ষার অবসান হয়েছে৷ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানির সবচেয়ে বড় দুটি দল খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী (সিডিইউ) ও সামাজিক গণতন্ত্রী (এসপিডি) দল৷ দলের প্রতিনিধিরা সরকার গঠনে ঐকমত্যে পৌঁছেছে৷ মন্ত্রণালয় বণ্টনের ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি৷

সমঝোতার পথ

সেপ্টেম্বরে নির্বাচনের পর জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল-এর খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী পেয়েছিল অন্তত ৪২ ভাগ ভোট৷ অনেকেই সিগমার গাব্রিয়েলের নেতৃত্বাধীন সামাজিক গণতন্ত্রী দলকে ম্যার্কেলের দলের ভবিষ্যৎ অংশীদার হিসেবে দেখেছিলেন৷ যদিও দু দলের মধ্যে অনেক বিষয়েই মতপার্থক্য ছিল৷

ন্যূনতম মজুরি : নীতির লড়াই

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি – এই একটি ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে নীতিগত ব্যবধান অনেক বেশি৷ চূড়ান্ত চুক্তিতে প্রতি ঘণ্টার ন্যূনতম মজুরি সাড়ে আট ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে, যেমনটা এসপিডি দাবি করেছিল৷ কিন্তু ২০১৫ সালের আগে এটি কার্যকর হবে না৷ সিডিইউ-র আশঙ্কা এই সিদ্ধান্তের ফলে অনেক মানুষ চাকরি হারাবেন৷

মহাসড়কে টোলের প্রস্তাব

জার্মানির মহাসড়কগুলোতে টোল দেয়ার বিষয়টিতে দুই দলই রাজি নয়৷ কিন্তু সিডিইউ’র বাভারিয়ান সহযোগী সিএসইউ’র প্রধান হর্স্ট জেহোফার তাঁর ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মহাসড়কে গাড়ি চলাচলের উপর টোল আরোপ করলেই কেবল তিনি কোনো জোটে যাবেন৷

কে বেশি পেনশন পাবে?

এসপিডি’র দাবি, যেসব কর্মী ৪৫ বছর ধরে চাকরি করছেন, তাদের পূর্ণ পেনশন দিতে হবে, যদি তাদের বয়স ৬৩ বছরও হয়৷ এমনকি ১৯৯২ সালের আগে যাদের সন্তান আছে সেসব মায়েদের পেনশন বোনাস দেয়ার পক্ষে সিডিইউ৷ চূড়ান্ত চুক্তিতে দুটি দাবিকে একসাথে করা হয়েছে, যার ফলে জার্মানির কয়েকশ’ কোটি ইউরো খরচ হবে৷

শীর্ষ চাকরিগুলোতে বেশি নারী

বিএমডাব্লিউ’র বোর্ড সদস্যদের মধ্যে মাত্র ১২.৫ ভাগ নারী৷ দুই দলই বলেছে, এটা যথেষ্ট নয়৷ তারা দেখতে চায়, পাবলিক কোম্পানিগুলোর শীর্ষ পদে নারীদের নিযুক্ত করা হচ্ছে৷ তারা শীর্ষ পদগুলোতে নারীদের নিয়োগ ৩০ ভাগ বাড়ানোর পক্ষে একমত হয়েছে, যা বর্তমানের চেয়ে তিনগুন বেশি৷

স্বাস্থ্যসেবা

স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে খুব দ্রুতই সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই দল৷ বিমার পরিমাণ বাড়ানো হবে এবং জনস্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়াম শেষ করা হবে৷

পররাষ্ট্রনীতি

আশা করা হচ্ছে, সামাজিক গণতন্ত্রী দলের ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারেন৷ ফলে জার্মান পররাষ্ট্রনীতিতে অনেকটা পরিবর্তন আসতে পারে, বলে ধারণা করছেন অনেকে৷ তবে, সিডিইউ এর কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে অর্থমন্ত্রী বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷

জ্বালানি নীতিতে সমঝোতা

দুই দলই দেশের চাহিদা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ৫৫ থেকে ৬০ ভাগ বাড়ানোর পরিকল্পনায় একমত হয়েছে৷ এসপিডি নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎখাতে ৭৫ ভাগ ব্যবহারের পক্ষে, অন্যদিকে সিডিইউ বলেছে, ৫০ থেকে ৫৫ ভাগই যথেষ্ট৷

তৃণমূল কর্মীদের অধিকার

জার্মানির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দলের সদস্যরা জোট সমর্থনের অধিকার পেয়েছে৷ ফলে এসপিডি তার তৃণমূল সমর্থকদের জিজ্ঞেস করবে তারা এই জোটে যাবে কিনা৷

কোল ও তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া মিতেরঁ-র মধ্যে সখ্যতা যে শুধু জার্মান পুনর্মিলনের পথ খুলে দিয়েছিল, শুধু তাই নয়; অতঃপর ইউরো মুদ্রার প্রচলন থেকে শুরু করে শেঙেন চুক্তি বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ – এক কথায় ইইউ বলতে মানুষ আজ যা কিছু বোঝে, তার সব কিছুর পিছনেই কাজ করেছে ঐ ফরাসি-জার্মান মৈত্রী, যা এমন একটি ধারা, যা হালের ম্যার্কেল-ম্যাক্রোঁ সম্পর্কেও অটুট আছে৷

আঙ্গেলা ম্যার্কেলের আমল

হেলমুট কোল ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ সাল অবধি জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন৷ সাবেক পূর্ব জার্মানির যে সিডিইউ রাজনীতিককে তিনি তাঁর উত্তরসুরী হিসেবে অজান্তেই গড়ে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল, যিনি ২০০৫ সাল থেকে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত – এবং জরিপ বলছে যে, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনে তাঁর একটি চতুর্থ কর্মকাল প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম নয়৷ অপরদিকে যাকে একদিন কিছুটা তাচ্ছিল্য করে ‘কোল-এর খুকি' বলা হত, তিনি আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাস্তবিক নেতা, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নারী ও স্বাধীন বিশ্বের নেত্রী হিসেবে বর্ণিত ও বিবেচিত হচ্ছেন৷ 

রক্ষণশীল কিন্তু বাস্তববাদী

খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী ইউনিয়ন বা সিডিইউ একটি রক্ষণশীল দল – রাজনৈতিক বিচারে তারা নিজেদের ‘মধ্যম-ডান' বলে থাকে৷ একটি ‘ফল্কসপার্টাই' বা গণদল হিসেবে দলের জনসমর্থনের প্রশস্ত ভিত্তি বজায় রাখাই হল দলের সর্বোচ্চ লক্ষ্য৷ নয়তো অপরাধীদের দণ্ডদানের মাত্রা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদের ঘটনায় সেনাবাহিনীকে নিয়োগ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রসঙ্গে দলের রক্ষণশীল মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়৷ অপরদিকে বিপুল সংখ্যায় উদ্বাস্তু আগমন সত্ত্বেও আঙ্গেলা ম্যার্কেল দলের খ্রিষ্টীয় কর্তব্যের দোহাই দিয়েছেন ও কোনো সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে অস্বীকার করে এসেছেন৷ সিডিইউ দল চায় যে, বহিরাগতরা জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হোন ও জার্মান সমাজের অঙ্গ হয়ে উঠুন৷ বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সিডিইউ দল ইউরোপীয় সংহতির সমর্থক – অপরদিকে সিডিইউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বিশ্বাস করে৷ সিডিইউ দল বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্য হওয়ার বিরোধী৷