ভারত

যেমন আছে, যেভাবে চলছে খারিজি মাদ্রাসা

পশ্চিমবঙ্গে তিন ধরনের মাদ্রাসার মধ্যে খারিজি মাদ্রাসার সংখ্যা ৫-৬ হাজারের মতো৷ সরকারি অনুমোদনহীন এসব মাদ্রাসা চলে মূলত দানের টাকায়৷ বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার মতো পশ্চিমবঙ্গের এ ধরনের মাদ্রাসা নিয়েও আছে বিতর্ক৷

default

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সংখ্যালঘু গরিব মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করে চলেছে এই মাদ্রাসা৷ তবে খারিজি মাদ্রাসার হাল-হকিকত তুলে ধরার আগে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ছবিটা হাজির করা দরকার৷

এই রাজ্যে মূলত তিন ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে৷ এক, সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক অনুদান প্রাপ্ত৷ দুই, সরকারের স্বীকৃতি পেলেও অনুদান থেকে বঞ্চিত এবং তিন, সরকারি অনুমোদন নেই ও অনুদান পায় না এমন মাদ্রাসা৷ তৃতীয় ধারাটিই খারিজি বা নিজামিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত৷

পশ্চিমবঙ্গে প্রথম শ্রেণির মাদ্রাসাগুলি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারই অংশ৷ সরকারি অনুমোদন ও অনুদান দুই-ই পায় এমন মাদ্রাসার সংখ্যা ৬১৪৷ এর মধ্যে ‘হাই মাদ্রাসা' ৫১২টি, সিনিয়র মাদ্রাসা ১০২টি৷ আবার হাই মাদ্রাসার মধ্যে ৪০০টি হাই মাদ্রাসা আর ১২টি জুনিয়র হাই মাদ্রাসা৷ এ সব হাই মাদ্রাসা পরিচালনা করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড৷ অন্যান্য মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বাড়তি ইসলাম ধর্ম ও আরবি ভাষা শিক্ষার সুযোগ এখানে আছে৷ তবে হাই মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইসলামিক শিক্ষার সুযোগ নেই, কারণ, এই পর্যায়টি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ পরিচালনা করে৷ ২১০টি হাই মাদ্রাসা উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়েছে৷

সিনিয়র মাদ্রাসায় মাধ্যমিক (আলিম) ও উচ্চমাধ্যমিক (ফাজিল) স্তরে ইসলামিক শিক্ষার পরিসর বেশি৷ ৬৬টি সিনিয়র মাদ্রাসাকে ফাজিল স্তরে উন্নীত করা হয়েছে৷ এই দ্বিতীয় প্রকার মাদ্রাসার সংখ্যা ২৩৫টি৷ এগুলি মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের অধীন, সরকারি অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু শিক্ষকরা সরকারি স্কুলের মতো বেতন পান না,অর্থাৎ, সামান্য বেতনে তাঁদের পড়াতে হয়৷ এছাড়া, মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীন রয়েছে শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ও মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্র৷

পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের হিসেব অনুযায়ী, অনুমোদিত ৬১৪টি মাদ্রাসার মধ্যে ৫৫৪টি কো-এড, অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে একসঙ্গেই পড়ে সেখানে৷ ৫৭টি শুধু মেয়েদের জন্য, তিনটি ছেলেদের জন্য৷ ১৭টি মাদ্রাসা উর্দু মাধ্যমের৷ অনুমোদিত মাদ্রাসার মধ্যে ১৮৩টিতে বৃত্তিমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়৷

কলকাতায় সরকার স্বীকৃত ও অনুদান প্রাপ্ত মাদ্রাসা ৯টি৷ এর মধ্যে ৮টি হাই মাদ্রাসা, একটি সিনিয়র মাদ্রাসা৷

এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের খারিজি মাদ্রাসা৷ এইমাদ্রাসাগুলি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক হয়েছে, সরগরম হয়েছে রাজনীতি৷ কিন্তু রাজ্যের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের আর তাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে এই মাদ্রাসাগুলির উপযোগিতা অনস্বীকার্য৷

খারিজি মাদ্রাসা প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার একটা মডেল৷ পশ্চিমবঙ্গে এই মাদ্রাসা অসংগঠিত, একটির সঙ্গে অপরটির যোগসূত্র নেই৷ এগুলি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়৷ সরকারি অনুদান যেহেতু নেই, সেই কারণে এগুলির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও নেই৷ তাই রাজ্যে খারিজি মাদ্রাসার মোট সংখ্যা কত, সেটাও নির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল৷ মোটের উপর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আনুমানিক ৫-৬ হাজার খারিজি মাদ্রাসা রয়েছে৷ কেন্দ্রীয় বোর্ড বা পরিচালন পর্ষদ না থাকায় মাদ্রাসা বা শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না৷

বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের সভাপতি ইসারুল মণ্ডল জানান, এই মাদ্রাসাগুলি সম্পর্কে সরকারের কাছেও নির্দিষ্ট তথ্য নেই৷ মুসলিমদের জাকাত বা দানের টাকায় এই প্রতিষ্ঠানগুলি চলে৷ এখানে মূলত ধর্মীয় শিক্ষাই দেওয়া হয়৷ এই বিদ্যালয়গুলির উপর নির্ভর করে দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলি৷ এই অভিভাবকদের কাছে বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার শ্রেণিবিভাজন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই৷ মসজিদ লাগোয়া ছোট ঘরে যে পঠনপাঠন চলে, তার উপরই ভরসা রাখে গরিব মুসলিম পরিবার৷

অডিও শুনুন 02:19

‘পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষার ঐতিহ্য আজও অম্লান’

কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি, সেখানে ধর্মাশ্রিত এই ব্যবস্থার আজও কোনো বিকল্প নেই৷ তার উপর বড় সুবিধা অন্নসংস্থানের৷ যে গরিব অভিভাবক অতি কষ্টে দু'মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করেন, তাঁর ছেলে-মেয়ে আবাসিক খারিজি মাদ্রাসায় গিয়ে পড়াশোনার সঙ্গে পেট ভরে খেতে পেলে সেটা বাড়তি প্রাপ্তি৷ অনেক অভিভাবক প্রজন্ম পরম্পরায় এই শিক্ষাব্যবস্থার শরিক৷ তাই নতুন প্রজন্মকেও পূর্বসূরিরা খারিজি মাদ্রাসায় পাঠাতে পছন্দ করেন৷ আবার অনেকে সচেতনভাবেই চান, তাঁর সন্তান হাফেজ, মৌলানা, ইমাম বা মোয়াজ্জেম হয়ে উঠুক; পরম্পরায় বহমান ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে জড়িত থাকুক৷

এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সংখ্যালঘু-মানসে সমষ্টি চেতনা৷ সব দেশেই সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এটা সত্যি৷ তাই ধর্মাশ্রিত শিক্ষার প্রতি ঝোঁক ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান৷

কী ধরনের পড়াশোনা হয় খারিজি মাদ্রাসায়? মুর্শিদাবাদের ফারাক্কার খারেজি মাদ্রাসা আল জামিয়াতুত তাবলিমিয়া নাজমুল হুদা আমতলা মাদ্রাসার নাজেম তথা ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান জানান, কোরান-হাদিসের ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আরবি ভাষার পাঠ দেওয়া হয়৷ আরবি সাহিত্য পড়ানো হয় এই আবাসিক মাদ্রাসায়৷ এক দশক আগেও শুধু ধর্মশাস্ত্র পাঠের উপর জোর দেওয়া হতো৷ এখন পরিস্থিতি বদলেছে, বর্তমানে এসব মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি, গণিতও শেখানো হয়৷ এখানকার সব পড়ুয়া যেহেতু বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়ে, তাই তাদের মাতৃভাষার পাঠ দেওয়া জরুরি৷ এছাড়া বিশ্বায়নের পর ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে৷ যাতে খারিজি মাদ্রাসার পড়ুয়ারা অন্যান্য মাদ্রাসা বা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে ভবিষ্যতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য তাদের ইংরেজি শেখানো হয়৷ এর সঙ্গে উর্দু শেখারও ব্যবস্থা আছে৷

আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘বছরে দু'বার পরীক্ষা নেওয়া হয়৷ অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা৷ প্রথমটি রবিউলে, পরেরটি শাওয়াল মাসে৷ ১০০ নম্বর করে প্রতি বিষয়ে মোট ৭০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়৷ ৬০০-র বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে আমতলা মাদ্রাসায়৷ ১৫ জন শিক্ষক ও চারজন শিক্ষিকা রয়েছেন৷ এ মাদ্রাসায় ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না৷ উর্দুতে প্রার্থনা সংগীত হয়৷''

এখান থেকে পাশ করার পর ছাত্ররা ইসলামি ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের সম্পৃক্ত করে নেয়৷ হাফেজ, ইমাম, মোয়াজ্জেম, মৌলানা, ক্কারি প্রভৃতি পরিচয় বা স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এগুলির কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই৷ উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সিংহভাগ ক্ষেত্রে খারেজি মাদ্রাসার ডিগ্রির মূল্য নেই৷ তাই ভারতের মাদ্রাসানির্ভর মুসলিম সমাজের নিজস্ব শিক্ষা পরিকাঠামোর সঙ্গে এখানকার পড়ুয়ারা ভবিষ্যতে অঙ্গীভূত হয়ে যায়, সেটাই তাদের জীবিকা হয়ে ওঠে৷

অবশ্য সরকার যা-ই করুক, ভারতীয় সংবিধান সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র চালানোর অধিকার দিয়েছে৷ তাই খারিজি মাদ্রাসা কোনো সরকার দ্বারা স্বীকৃত না হলেও তার বৈধতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন তোলা দুরূহ৷

আব্দুল মান্নান জানান, খারিজি মাদ্রাসা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দানেই চলে৷ সরকারি অর্থসাহায্য মেলে না৷ এখানকার ছেলে-মেয়েরা সরকারি প্রকল্প মিড-ডে মিলও পায় না৷ পশ্চিমবঙ্গের খারিজি বা কওমি মাদ্রাসা সরকার অনুমোদিত বা অনুদানপ্রাপ্ত নয়, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সেই দান গ্রহণে ইচ্ছুক নয়৷ সেক্ষেত্রে সরকার মাদ্রাসাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, যেমন হাই মাদ্রাসার ক্ষেত্রে হয়েছে৷

উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে দেওবন্দ মাদ্রাসা দেশের অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ তারাও সরকারি সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছে৷ মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবিসহ কয়েকজন মুসলিম বিদ্বজ্জন ১৮৬৬ সালে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন৷ এই দেওবন্দ বা ফুরফুরা, আহলে হাদিসের অধীনে যে খারিজি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়, সেগুলির শিক্ষার পরিবেশ কিছুটা ভালো হলেও পরিকাঠামোয় অনেকটা পিছিয়ে৷

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য, খারিজি মাদ্রাসার পড়ুয়ারা মসজিদ লাগোয়া ঘরে ইসলামিক শিক্ষা নিয়ে আবার প্রাথমিক স্কুলেও পড়তে যায়৷ সেখানে সে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানও পড়ে৷ তাঁর দাবি, এ রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই আধুনিক৷ তাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা পরিদর্শনে এসেছিলেন৷ তাঁরা এখানকার পরিকাঠামোর প্রশংসাও করেছেন৷ সাত্তার বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এতই উন্নত যে রাজ্যের এমন অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে মুসলিমদের তুলনায় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পড়ুয়া বেশি৷''

খারিজি মাদ্রাসা বারবার দেশবিরোধী কাজকর্মের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে৷ বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সূত্রে সামনে এসেছে শিমুলিয়া মাদ্রাসার কাজকর্ম৷ অধ্যাপক ও প্রাক্তন মন্ত্রী সাত্তার এই অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলেন, ‘‘ওটা আদৌ মাদ্রাসা ছিল কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে৷ কবে থেকে চালু হলো, ওখানে কারা পড়ত, এসব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে৷ আমার মনে হয়, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে মাদ্রাসার নামে ওটা খোলা হয়েছিল৷ এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষার ঐতিহ্য আজও অম্লান৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو