সংবাদভাষ্য

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু, এ দায় সবার

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান দিনদিন ভারীই হচ্ছে৷ তবে শুধু আইনি কঠোরতা নয়, সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে না পারলে পালটাবে না এই চিত্র৷ ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে, এর দায় এড়াতে পারে না গণমাধ্যমও৷

default

সাংবাদিকদের সবসময় বলা হয়ে থাকে পরিসংখ্যান যতটা পারা যায় এড়িয়ে চলার জন্য৷ গণিত ও সংখ্যায় হাবুডুবু না খেয়ে পাঠকরা যাতে মূল বক্তব্য বুঝতে পারেন, সেটাই এই বলার উদ্দেশ্য৷

কিন্তু তারপরও এই লেখাটা একটা পরিসংখ্যান দিয়েই শুরু করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি৷ ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসের কথা বলছি৷ ধর্ষণ ২৪৪, গণধর্ষণ ৪২, শারীরিকভাবে অক্ষমকে ধর্ষণ ২০, ধর্ষণচেষ্টা ২২, ইভ টিজিং ২১, যৌন নির্যাতন ৩৯, ধর্ষণের পর হত্যা ৩, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা ৩৷ এই সময়ে ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে ১৪টি৷

হ্যাঁ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এই পরিসংখ্যানটি শিশুদের নিয়েই৷ ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৪৪৬ জন শিশু৷ এমন অনেক ঘটনাই প্রকাশিত হয় না৷ কিন্তু তারপরও এ বছর এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কল্পনা করে নেয়াই যায়৷

হঠাৎ করেই এই আলোচনা পত্রিকার পাতায় ছোট্ট একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে৷ ‘মেয়েকে ধর্ষণ করলেন সৎ-বাবা'৷ সেই সৎ বাবাটি আবার চাকরিচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যমে৷

গণমাধ্যমকর্মীরা অর্থ-বিত্তের দিক দিয়ে না হলেও চিন্তাভাবনায় অনেকের চেয়ে এগিয়ে আছেন বলে অনেকে ধরে নেন৷ কিন্তু এই অপরাধে যে কেউই পিছিয়ে নেই সে প্রমাণ আমরা আগেও পেয়েছি৷ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, পুলিশ সদস্য এমনকি ধর্মীয় নেতারাও নানা সময়ে দেখিয়েছেন, কারও হাত থেকেই নিরাপদ নয় শিশুরা৷ ফলে কারও সামাজিক অবস্থানের কারণে এই পরিসংখ্যানে খুব একটা হেরফের না হওয়ারই কথা৷

একটা সময় ছিল, যখন নারী শব্দটি উচ্চারণ করার সময় এমনিতেই মুখে চলে আসতো ‘অবলা' শব্দটি৷ নারীর শারীরিক গঠনকে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে তার বল বা শক্তি কম ধরে নিয়েই তাই ‘অবলা নারী' শব্দগুচ্ছকে যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে বারবার৷

‘অবলা নারী' যে এ জন্য খুব সুবিধা পেয়েছেন তা কিন্তু না৷ এমন না যে, নারীকে অবলা বলায় তাদের পৃথিবীর সব কঠিন কাজ থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেন৷ বরং সন্তান লালন-পালন, ঘরের কাজ সামলানোর বাইরেও পুরুষদের সমান তালে কাজ করে যেতে হয়৷ উলটো এই ‘অবলা' ধারণাটিকে বারবারই কাজে লাগিয়েছেন সমাজের পুরুষরা৷ নারী নির্যাতনও বেড়েছে এই ধারণার সমান তালে৷

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগ

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, একসময় নারীরাই ছিলেন পরিবার, গোত্র এবং সমাজের ক্ষমতাশালী অংশ৷ সে অবস্থার পরিবর্তন হলো কীভাবে? অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, নারীর জীবনের একটা বড় অংশ যেহেতু গর্ভধারণ এবং সন্তানলালন পালনেই ব্যয় হয়, সেই অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়েই ঘটেছে এই ‘অভ্যুত্থান'৷

তবে অবলা শব্দটির সঠিক ব্যবহার বোধ করি শিশুদের ক্ষেত্রেই করা যায়৷ জন্মের পর থেকে শিশু তার প্রতিটা কাজের জন্য নির্ভর করে কোনো না কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর৷ শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ে এই নির্ভরতা কমতে থাকলেও, এর প্রয়োজনীয়তা কখনই একেবারে ফুরোয় না৷

ফলে সব কিছুতেই বড়দের বিশ্বাস করার প্রবণতা শিশুদের মধ্যেই থাকে৷ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর কারণে অনেকক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বাইরেও অন্যদের ওপরও নির্ভর করতে হয় শিশুকে৷ আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান সুযোগসন্ধানীরা৷

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ প্রতিবাদী ফাউন্ডেশন ও সুইডেন এবং ডেনমার্কের ‘সেভ দ্য চিল্ডরেন' একটি যৌথ সমীক্ষা চালায়৷ সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ৫০ শতাংশ শিশু, অর্থাৎ প্রতি দু'জনের একজন কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার৷ তবে সবচেয়ে মন খারাপ করা বিষয় হলো, এর ৯১ শতাংশ যৌন নির্যাতন পরিবারের আত্মীয়দের দ্বারা সংগঠিত হওয়ার তথ্য দেয়া হয়েছে সমীক্ষায়৷

নানা সময়ে নিজের যৌন লালসা পূরণ করার জন্য ধর্ষকামীরা বেছে নিচ্ছেন সবচেয়ে সহজ শিকার শিশুদের৷ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার কারণে এই বিষয়ে একটা ট্যাবু তৈরি হয়েই আছে৷ ফলে পরিবারের কারও কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হলে, পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সেটা শেয়ার করা শিশুদের পক্ষেও সবক্ষেত্রে সম্ভব হয় না৷

প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই দেখা যায় দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হয়ে আসলেও, কোনোক্ষেত্রে ‘পরিবারের সম্ভ্রম', কখনও ‘ভবিষ্যত হয়রানির' কথা চিন্তা করে অনেকদিন পর্যন্ত বিষয়গুলো ধাপাচাপা দিয়ে রাখা হয়৷

অথচ, হওয়ার কথা ছিল ঠিক উলটোটা৷ মুখ লুকিয়ে থাকার কথা ধর্ষক ও নির্যাতনকারীদের৷ সামাজিকভাবে হেয় এবং আইনের দৃষ্টিতে সাজা হওয়ার কথা ধর্ষকদের৷ সুতরাং এই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এই ট্যাবুটা ভাঙতে না পারলে এই সমস্যা বাড়বে বই কমবে না৷

‘বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও' এজন্য দায়ী করেন কেউ কেউ৷ নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা, পুলিশের তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়াকেও অনেকক্ষেত্রে অনেক ভিকটিম ‘দ্বিতীয় ধর্ষণ' বলে উল্লেখ করেছেন৷ নির্যাতন এবং মামলার হারের তুলনায় রায় ও শাস্তি কার্যকরের হার খুবই কম৷

অসংখ্য ঘটনার মধ্যে আমরা যদি চাঞ্চল্যকর দু'টি ঘটনার উদাহরণ দেই, তাহলে বিচারব্যবস্থার চিত্রটা মোটামুটি উঠে আসবে বলে আশা করছি৷ দিনাজপুরের পার্বতীপুরে গতবছর পাঁচ বছরের শিশু পূজা ধর্ষিত হয়৷ এ ঘটনায় এক আসামি গ্রেপ্তার করলেও তদন্তের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ৷ কুমিল্লার তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা তো চাপাই পড়ে গেল অন্য সব নতুন ইস্যুর তলায়৷

তবে গণমাধ্যমের বোধ করি এই সব ক্ষেত্রে দায় আরও বেশি৷ পত্রিকার এক কোণে বা টেলিভিশনের ৩০ সেকেন্ডে না রেখে, যদি ব্যাপক আকারে জনমত গড়ে তোলা যায়, তাহলে তার প্রভাব সবক্ষেত্রেই পড়তে বাধ্য৷ মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে অ্যাসিড সন্ত্রাস এবং ইভ টিজিং কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে গণমাধ্যম৷

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সেই ঐতিহাসিক বিতর্ক তো আছেই৷ একজন সাংবাদিক ঘটনার সাথে থাকবে, সেটা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তুলে ধরবে, নাকি ঘটনাকে প্রভাবিতও করবে?

আমার অবস্থান মাঝামাঝি৷ একটি সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ উপায়ে তুলে ধরা যেমন একজন সাংবাদিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, পাশাপাশি সমাজে এর কী প্রভাব পড়ছে, সে চিন্তা থেকেও একজন সাংবাদিক নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না৷ ফলে রাজনীতি, গণতন্ত্র, অর্থনীতির মতো কাঙ্খিত সমাজ গড়ের তোলার ভূমিকা সাংবাদিক হিসেবে তিনিও অস্বীকার করতে পারেন না৷

শিশুর যৌন নির্যাতন রোধে আপনি কি ভূমিকা রাখতে পারেন? মন্তব্য লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو