ভারত

রামমন্দির-বাবরি মসজিদ বিবাদের কলঙ্ক মোছার চূড়ান্ত পর্ব

রামমন্দির-বাবরি মসজিদ বিবাদের ফয়সালা করতে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হয়েছে৷ জমির মলিকানা স্বত্ব নিয়ে ৪টি দেওয়ানি মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের পরও ১৩টি আবেদন জমা পড়ে আদালতে৷ পরবর্তী শুনানি ৮ই ফেব্রুয়ারি৷

default

বিতর্কিত মসজিদ ভাঙার ২৫ বছর পূর্ণ হবার ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ মঙ্গলবার, ভারতের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের এক বিশেষ বেঞ্চে অযোধ্যার রামমন্দির-বাবরি মসজিদ বিবাদের রাজনৈতিক বিতর্কের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার শুনানি শুরু হয়৷ ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ছাড়াও এই বেঞ্চে আছেন বিচারপতি অশোক ভূষণ ও বিচারপতি এস. আবদুল নাজির৷

সুন্নি ওয়কফ বোর্ডের তরফে আইনজীবী কপিল সিব্বাল আদালতে বলেন, প্রথমত প্রয়োজনীয় সাড়ে ১৯ হাজার দলিল-দস্তাবেজের সব পেশ করা হয়নি, যার মধ্যে পুরাতাত্ত্বিক রিপোর্টও আছে৷ দ্বিতীয়ত অযোধ্যার এই মামলা নিয়ে যখনই শুনানি হয়, আদালতের বাইরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমস্যা হয়৷ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ তাই মামলার তথ্য-প্রমাণ পেশ সম্পূর্ণ হলে ২০১৯ সালের ১৫ই জুলাইয়ের পরই যেন শুরু করা হয় শুনানি৷ তিনি ছাড়াও, প্রবীণ আইনজীবী রাজীব ধওয়ান বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চের কাছে পাঠানোর আর্জি জানান৷

অন্যদিকে রাম জন্মভূমির পক্ষে আইনজীবী হরিশ সালভে বৃহত্তর বেঞ্চে এই মামলা পাঠানোর বিরোধিতা করে সওয়াল করেন যে, আদালতের বাইরের রাজনীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মাথা ঘামানোর কারণ নেই৷ সুন্নি বোর্ডের আর্জি খারিজ করে পরবর্তী শুনানি আগামী বছরের ৮ই ফেব্রুয়ারি ধার্য করে শীর্ষ আদালত৷ উত্তর প্রদেশ সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, আরবি ও ফার্সিতে লেখা মূল নথিপত্র ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় অনুবাদসহ দাখিল করা হয়েছে৷ আর তাতে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে দেখানো হয় যে, ১৫২৮ সালে মুঘল সুলতান বাবরের শাসনকালে বাবরি মসজিদ তৈরির আগে ঐ জায়গায় একটি হিন্দু মন্দির ছিল৷

২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট অযোধ্যার বিবাদিত ২ দশমিক ৭৭ একর জমি সংশ্লিষ্ট তিন পক্ষের  প্রত্যেককে এক-তৃতীয়াংশ করে ভাগ করে দেয়৷ লাগোয়া বাকি ৬৭ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকার নিজের হাতে রাখে৷ সংশ্লিষ্ট এই তিনটি পক্ষ হলো – সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহি আখড়া এবং রামলালা (বালক রামের বিগ্রহ)৷ কিন্তু এই রায়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় চারটি দেওয়ানি মামলার ১৩টি আবেদন জমা পড়ে সুপ্রিম কোর্টে৷ এর মধ্যেই মুসলিম সম্প্রদায়ের শিয়া-সুন্নি বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে৷ উত্তর প্রদেশের শিয়া মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড এক সমাধানসূত্র দাখিল করে জানায় যে, অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকা থেকে একটা যুক্তিসম্মত দূরত্বে মুসলিম প্রধান এলাকায় মসজিদ বানানো যেতে পারে৷ উল্লেখ্য, শিয়া বোর্ড এই মামলার একেবারে গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ছিল না৷

তাই শিয়া বোর্ডের এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে সুন্নি বোর্ড৷ তাদের মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের দু'পক্ষের মধ্যে মীমাংসা হয়ে গেছে সেই ১৯৪৬ সালে৷ এতে বাবরি মসজিদের ওপর সুন্নিদের অধিকার মেনে নেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর সেই মসজিদই গুঁড়িয়ে দেয় হিন্দু্বাদী সংঘ-পরিবারের কর সেবকরা৷ শিয়া বোর্ডের সওয়ালকে চ্যালেঞ্জ করে উত্তর প্রদেশের সুন্নি বোর্ডের বক্তব্য: এই ধরনের সংবেদনশীল মামলায় দলিল-দস্তাবেজের তথ্য-প্রমাণের তুলনায় বড় হচ্ছে ধর্মবিশ্বাস৷ সেটাই হওয়া উচিত রায়ের ভিত্তি৷ অন্যথায় সংবিধানের ২৫-২৬ ধারা লংঘিত হবে, যেখানে সব ধর্ম বিশ্বাসীদের অধিকার সমান৷

এই আর্জিকে সমর্থন করেছে অন্যতম মামলাকারী মুসলিম পার্সোনাল আইন বোর্ড৷ সম্প্রতি নাগরিক অধিকারবাদী সংগঠন অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ বিবাদে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়ে বলেছে, এই বিবাদ শুধু জমিজমার বিবাদ নয়৷ এর সঙ্গে জড়িয়ে আরও নানা বিষয়, যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির ওপর৷

মঙ্গলবারের শুনানির প্রেক্ষিতে এই বছরের মার্চ মাসে আদালতের বাইরে এই বিবাদের আপোষ মীমাংসা করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট৷ কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই তাতে সাড়া দেয়নি: উলটে হিন্দুত্ববাদী সংঘ-পরিবার হুঙ্কার দেয় যে, অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে শুধু রামমন্দিরই হবে এবং সেখানকার পাথর দিয়েই৷ অন্য কোনো কাঠামো নয়৷ এই আবহে নতুন করে আসরে নেমেছেন বিজেপি সাংসদ সুব্রামনিয়াম স্বামী, ধর্মগুরু শ্রী শ্রী রবিসংকর এবং শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের ওয়াসিম রিজভি৷

প্রশ্ন হলো – অযোধ্যার সাধারণ মানুষ কী বলছে? বলছে, এটাই রামমন্দির নির্মাণের সুবর্ণ সুযোগ৷ উত্তর প্রদেশে আছে যোগী আদিত্য নাথের বিজেপি সরকার, অন্যদিকে কেন্দ্রে আছে মোদীর বিজেপি সরকার৷ পাশাপাশি সর্বত্র চোখে পড়ছে সংঘ-পরিবারের বাড়বাড়ন্ত৷

অডিও শুনুন 01:33

‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারের ওপর আমি আস্থাশীল’

এর নিরিখে বাবরি মসজিদ ভাঙার ২৫ বছর পর যদি মন্দির নির্মাণ না হয়, তাহলে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ছবির কলঙ্কদাগ মুছে ফেলা যাবে না এবং পরবর্তীতে বিজেপির মাথা তোলা মুশকিল হবে৷ কাজেই এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে মন্দির নির্মাণের আশা কম৷ ওদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন করে সরকার জমির মালিকানা স্বত্ত্বের একতরফা মীমাংসা করতে পারে না৷

মন্দির-মসজিদ জমির বিতর্কিত মালিকানা সংক্রান্ত ইস্যুর চূড়ান্ত রায় অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি রাখাটা কি দেশের বৃহত্তর স্বার্থের পক্ষে বাঞ্ছনীয় নয়? প্রশ্নটা ডয়চে ভেলে রেখেছিল কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক প্রবীর দে-র কাছে৷ উত্তরে উনি বললেন, ‘‘এটা একটা সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ইস্যু৷ তাছাড়া ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের দেশের মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা৷ তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি সংবিধান এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে এর আশু নিষ্পত্তি হওয়া দরকার বলে মনে করি৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের দেশের বেশিরভাগই তো ভোট-ভিত্তিক রাজনীতি৷ সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের স্বার্থ বুঝে বিভিন্ন ইস্যুকে ব্যবহার করে৷ দ্বিতীয়ত যে কোনো মৌলবাদ, তা সে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু যাই হোক, সব সময়ই তা দেশের পক্ষে বিপজ্জনক৷ সুস্থ এবং শুভবিচার বুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে সব মৌলবাদকেই পরিহার করা উচিত৷ যেহেতু আমরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারের ওপর আস্থাশীল, তাই মনে হয় সুপ্রিম কোর্টের রায় দেশকে এক ইতিবাচক বার্তা দেবে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو