সংবাদভাষ্য

রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীনতা ও মিয়ানমারের গণমাধ্যমের রাজনীতি

গত বছরের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন চেকপোস্টে হামলা করে নয় পুলিশ সদস্যকে মেরে ফেলে রোহিঙ্গারা৷ এরপর পুলিশ ও সেদেশের সেনাসদস্যদের ভয়ংকর সব অভিযান শুরু হয়৷

Bangladesch Morde in Rohingya-Flüchtlingslagern (Reuters/M. Ponir Hossain)

পত্রপত্রিকায় রোহিঙ্গা সদস্যদের হত্যা, নির্মমভাবে মার খাওয়া এবং আরো অন্যান্য নির্যাতনের খবর আসে৷ দেশটির অভ্যন্তরে এই সংকট সবচেয়ে বিপদে ফেলে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে৷ হাজারো রোহিঙ্গা অধিবাসী অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসেন এ দেশের দক্ষিণ পূর্ব সীমান্তে৷ কিন্তু এই সংকট একদিনের নয়৷

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৯৯ সালের রিপোর্ট বলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার শুরু হয় ১৯৭৮ সালে৷ সংকটের শুরু অবশ্য ১৯৬২ সালে, যখন দেশটিতে মিলিটারি শাসন শুরু হয়৷ তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন তাঁরা৷

এ সব অত্যাচার সইতে না পেরে সে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে তাঁরা বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় শরণার্থী হন৷ বাংলাদেশ সীমান্ত অনেক কাছাকাছি হওয়ায় এখানেই তাঁদের স্রোত সবচেয়ে বেশি৷

২০১৬ সালের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টে দেখা যায়, ৩ থেকে ৫ লাখ নিবন্ধনহীন রোহিঙ্গা আছেন বাংলাদেশে৷ কিছু কিছু পত্রিকার হিসেবে সংখ্যাটি ৮ লাখও হতে পারে৷ 

রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সত্তরের দশক থেকেই এখানে দলে দলে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করেন৷ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ২০১৫ সালের হিসেব বলছে, কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে ৩১,৭৫৯ জন নিবন্ধিত শরণার্থী আছেন৷ এর বাইরে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, যাঁদের কিছু অংশ লেদা ও কুতুপালং মেকশিফট ক্যাম্পে থাকেন৷ বাকিরা আশেপাশের গ্রাম বা শহরে বাঙালিদের সঙ্গে মিশে গেছেন৷ ১৯৯২ সালের পর যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁদের আর শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ৷ তাই এরপর যাঁরা এসেছেন বাংলাদেশে তাঁরা অবৈধ৷

এ সব অবৈধ মিয়ানমার নাগরিক শুধু মিয়ানমারেই নন, বাংলাদেশেও খুব সহজেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন৷ তাঁদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন অনেকেই৷

রোহিঙ্গা নারীরা যৌন নিপীড়নেরও শিকার হন৷ নারী পুরুষ উভয়েই জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতের সঙ্গে৷ বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গেই শুধু জড়িত হন না, তাঁরা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংকট তৈরিতেও ব্যবহৃত হন৷

মিয়ানমারের বিভিন্ন সম্প্রদায়

২০০৭ সালে প্রকাশিত বই ‘পলিটিকাল অথরিটি ইন বার্মাস এথনিক মাইনরিটি স্টেটস'-এ লেখক ও গবেষক মেরি পি ক্যালাহান লিখেছেন, মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে যে সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট আছে, তা পরিবর্তনশীল ও জটিল৷ তাঁর মতে, একেক রাজ্যের একেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে৷ তিনি মূলত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের তিনটি প্যাটার্ন দেখতে পেয়েছেন৷ প্রথম প্যাটার্নে তিনি দেখেছেন, কোনো কোনো রাজ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করেন৷ দ্বিতীয় প্যাটার্নে দেখা যাচ্ছে, তাতমাদাও বা বার্মিজ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য স্টেট এজেন্সিগুলো রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন৷ রোহিঙ্গা ও রাখাইন অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যও এই প্যাটার্নে পড়ছে৷

তৃতীয় প্যাটার্নে দেখা যায়, এ সব রাজ্যে বিভিন্ন কৌশলগত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে৷ যেমন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, এনজিও এবং সরকারি কর্মকর্তারা এ সব রাজ্যে আধিপত্য বজায় রেখেছেন৷

ক্যালাহানের ভাষায়, ‘‘সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁদেরই হাতে, যাঁরা নৈরাজ্য তৈরি করতে সক্ষম, যেমন তাতমাদাও, সরকারবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপ, অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রকরা এবং প্যারামিলিটারিরা৷''

মিয়ানমারে ১৩৫টি বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে, যাঁরা মূলত আটটি জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত৷ এঁরা হলেন কোচিন, কায়াহ, কায়িন, চিন, বামার, মোন, রাখাইন ও শান৷ এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি আছে৷

ভৌগলিভাবে মিয়ানমার সাতটি অঞ্চল ও সাতটি রাজ্যে বিভক্ত৷ অঞ্চলগুলোতে প্রধানত থাকেন বামার বা বার্মানরা৷ আর সাতটি রাজ্য বাকি সাতটি মূল গোষ্ঠীর নামে নামকরণ করা হয়েছে৷ বামার বা বার্মানরা মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ৷ তাঁরাই মিলিটারি ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করেন৷

বাকি এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই থাকেন সম্পদের আধার সীমান্ত এলাকাগুলোতে৷ যুগ যুগ ধরে এ সব অঞ্চলগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প ও সম্পদ উত্তোলনের নামে এ সমস্ত জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাঁদের এলাকাগুলো থেকে৷ তাঁরা সরে গেছেন দেশেরই অন্যান্য অঞ্চলে অথবা আশেপাশের দেশে৷

১৩৫টি জনগোষ্ঠীকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে তা জোটেনি৷ তাই নিজ দেশে কিংবা আশ্রিত দেশে, রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন, ঘরহীন৷ 

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের একটি বড় অংশ মনে করেন, রোহিঙ্গারা কখনোই তাঁদের দেশের নন৷ তাঁরা কয়েক যুগ আগে বাংলাদেশ থেকে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা' উপদ্রপকারী৷ এই তকমা যতটা না ঐতিহাসিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক৷

ব্যাপারটি হলো, সেনানিয়ন্ত্রিত এ অঞ্চলটি সবসময়ই স্বাধীনতাকামী৷ এ রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ বৌদ্ধ রাখাইনরা৷ এই রাখাইনরা যেমন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে থাকেন, তেমনি এই দ্বন্দ্ব কেন্দ্রের সরকার বা সেনাদের জন্যও অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ সহজ করে দেয়৷

তার ওপর অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, সীমান্তের দুই পাড়ে একটি অবৈধ ব্যবসা চক্র গড়ে উঠেছে, যা চালাতে গেলে এ অঞ্চলটি অস্থিতিশীল থাকা দরকার৷ আরো কিছু ‘ফ্যাক্টর' পরবর্তীতে যোগ হয়েছে, যা কিনা এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাধা দিচ্ছে৷ তবে রোহিঙ্গারা কয়েক যুগ আগে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে গেছেন, সেখানকার জনগোষ্ঠীর এই দাবি একটি ঐতিহাসিক ভুল৷

রোহিঙ্গা নামটি নিজেরাই নিজেদের দিয়েছিলেন দেশটির সবচেয়ে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী৷ পঞ্চাশের দশকের দিকে এই নামটি বেশ চালু হয়ে যায়৷ তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, এই নামের উৎস কয়েকশ' বছর আগেকার৷

২০১৪ সালের এশিয়া রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘রোহাঙ' শব্দটির বুৎপত্তি ‘আরাকান' শব্দটি থেকে এবং ‘গা' বা ‘গিয়া' অর্থ ‘থেকে'৷ অর্থাৎ রোহাঙ্গা বা রাখাঙ্গা অর্থ আরাকান অঞ্চলের মানুষ৷

রাখাইন ইতিহাস বিশ্লেষক জ্যাকুয়েস পি লাইডার তাঁর গবেষণাধর্মী লেখা ‘রোহিঙ্গা: দ্য নেইম, দ্য মুভমেন্ট, দ্য কোয়েস্ট ফর আইডেনটিটি'-তে লিখেছেন যে, ‘রোহিঙ্গা' নামটি রাখাইনের ভারতীয় সংস্করণ, ‘রাখাঙ্গা' থেকেই এসেছে৷

ইন্দো-আর্য ভাষার ঐতিহাসিক ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, এটি রাখাঙ্গার ফোনোলজিকাল বিকৃতি৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘শব্দটির মানে স্থানীয় মুসলিম ভাষাভাষীদের কাছে রাখাইনই ছিল৷''

আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের আগমন পনেরশ' শতকে৷ সংখ্যায় ছিলেন প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ৷ ঐতিহাসিকভাবেই রাখাইনরা শত বছর ধরে স্বাধীন ছিলেন৷

আরাকানের সবশেষ স্বাধীন শাসক ম্রক-উ পরাজিত হন ১৭৮৪ সালে৷ তাঁর সেনাবহরে মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ জাতির সদস্য ছিলেন৷ গবেষণায় দেখা যায়, তাঁর পরাজয়ের পর ২০ হাজারেরও বেশি রাখাইনবাসী চট্টগ্রামের দিকে সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেন এবং আবারো আরাকান রাজ্য জয়ের চেষ্টা করতে থাকেন৷ যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে এবং আস্তে আস্তে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় রাখাইনরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পায়৷

এই সীমান্ত এলাকাটিতে সবসময়ই বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মিশ্র জনগোষ্ঠী ছিল৷ তবে এখানে সাম্প্রদায়িক সংকট শুরু হয়, যখন ১৯২০ সালের দিকে ভারতবর্ষ থেকে (মূলত চট্টগ্রাম থেকে) অনেক মুসলিম সেটলারকে নিয়ে যায় ব্রিটিশরা৷ লাইডার মনে করেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তখন এ অঞ্চলে তাঁদের কর্তৃত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েন৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিয়ানমারের জাতীয়বাদী নেতা অং সানের বার্মা ইন্ডিডেন্ডেন্স আর্মি ৫ লাখেরও বেশি ভারতীয় সেটেলারকে তাড়িয়ে দেয়৷ ব্রিটিশরা চলে যাবার পর রাখাইন বৌদ্ধ বা মুসলিম গোষ্ঠীদের কেউই অস্ত্র জমা দেয়নি৷ বরং রাখাইন অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে ও রাখাইন রাজ্যের স্বাধীনতার জন্য কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়৷ 

তাঁরা সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ হওয়ার জন্য আন্দোলন করেন৷ ১৯৭৪ এর সংবিধানে অবশেষে আরাকানকে রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং রাজ্যের নাম রাখা হয় ‘রাখাইন'৷

পরবর্তীকালে, বার্মিজ মিলিটারি তাতমাদাও একের পর এক মিলিটারি অপারেশন চালায় রাখাইন রাজ্যে৷ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৯৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের জুলাই মাস নাগাদ, ২ লাখ ৬০ হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যান৷

২০১৬ সালের ‘অক্টোবর অ্যাটাক'

ভোরের আলো ফোটার আগেই গেল ৯ অক্টোবর কয়েকশ' মানুষ বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা পুলিশ চৌকিতে আক্রমণ করেন৷ এতে ন'জন পুলিশ সদস্য মারা যান৷ জঙ্গি সংগঠন হরকাত আল-ইয়াকিন এই আক্রমণের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়৷

আততায়ীদের ধরতে সরকার সেখানে সেনাসদস্য মোতায়েন করে৷ তারা সেখানে অভিযানও শুরু করে৷ অঞ্চলটি সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়৷

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এ সব এলাকায় আগুনের শিখা দেখা যায়৷ অনেক রোহিঙ্গাকে মেরে ফেলা হয়৷ অনেক নারী ধর্ষিতা হন৷ অনেক যুবক নির্যাতনের শিকার হন৷ হাজারো রোহিঙ্গা অধিবাসী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে টেকনাফ ও কক্সবাজারে গিয়ে আশ্রয় নেন৷ কয়েকমাস ধরে এমন অবস্থা বিরাজ করে৷ সীমান্ত পাড়ি দেয়া অনেক রোহিঙ্গার মুখে সাধারণ মানুষের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র শোনা যায়৷

সদ্য ‘গণতন্ত্র' ফেরত পাওয়া মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেতা অং সান কন্যা সুচি দাবি করেন, রাখাইন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি৷ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো পরিস্থিতি দেখার জন্য এ অঞ্চলে যেতে চাইলেও যেতে দেয়া হয়নি৷ গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা ঘরছাড়া হয়েছেন৷

গণমাধ্যমের ভুমিকা

মিয়ানমারের প্রায় সব গণমাধ্যমই সরকার বা সেনা নিয়ন্ত্রিত৷ ২০১১ সাল পর্যন্ত সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলো সবই সরকার কঠিন নিয়মে আবদ্ধ ছিল৷

যুবায়ের আহমেদ

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

কোনো পত্রিকায় কোনো প্রতিবেদন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না৷ ২০১১ সালের জুনে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়৷ গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও নিবন্ধন বিভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে ৩১টি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমোদন পায়, যার মধ্যে ২৪টি স্থানীয় ভাষায়৷ 

তবে ২০১১ সালের পরও অনেক সাংবাদিককেই জেল জরিমানা গুনতে হয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য৷ অক্টোবরের ঘটনার পর একটি গবেষণায় দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের দু'টি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করা হয়৷ এর একটি হলো গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার, যেটি দেশটির সবচেয়ে পুরোনো পত্রিকা নিউ লাইট অফ মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সংস্করণ এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত৷

অন্যটি মিয়ানমার টাইমস৷ এটি ব্যক্তিখাতের এবং একমাত্র বিদেশি মালিকানার পত্রিকা৷ এই ঘটনায় এই পত্রিকার রিপোর্ট ব্যাপক আলোচিত হয়েছে৷

গবেষণাটি ছিল, অক্টোবরের ঘটনার পর রোহিঙ্গাদের কিভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে৷ এছাড়া চিত্রায়িত করার সময় কাদের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ যদিও রোহিঙ্গাদের চিত্রায়নের জন্য ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, মোটা দাগে ‘ভিক্টিম'  বা ‘অপরাধী' – এই দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷

দেখা গেছে, গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার পত্রিকায় যতবার রোহিঙ্গাদের বিষয়টি এসেছে, ততবারই তাঁদের অপরাধী হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে৷ আবার, মিয়ানমার টাইমসে প্রায় ৬০ ভাগ সময় ভিক্টিম হিসেবেই চিত্রায়িত হয়েছেন রোহিঙ্গারা৷

গ্লোবাল নিউ লাইটে এমনও খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, দুষ্কৃতিকারীরা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে চলে গেছে৷ তবে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পত্রিকাটির যে সব রিপোর্ট গবেষণার আওতায় ছিল, তার কোথাও ‘রোহিঙ্গা' শব্দটি ছিল না৷ এঁদের ‘বাঙালি সেটলার' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ এই ‘রাজনীতি' পরিষ্কার৷

বোঝাই যায়, এটা গণমাধ্যমের নীতি নয়, সরকারি নীতি৷ কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ রিপোর্টেই তারা ইরাবতী বা অন্যান্য সরকারি নিউজ এজেন্সির খবর হুবুহু ছাপিয়ে দিচ্ছে৷

অন্যদিকে, মিয়ানমার টাইমস আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ব্যাপক আলোড়ন জাগায় আন্তর্জাতিক মহলে৷  

তবে মিয়ানমারের ভেতরে এই পত্রিকাটি তেমন কেউ পড়ে না৷ এর কারণ পত্রিকাটি তুলনামূলক নতুন৷ তাই সরকারি ভাষ্যগুলোই অন্যান্য এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছায়৷ গবেষণায় এ-ও দেখা যায়, গ্লোবাল নিউ লাইট প্রায় ৯১ শতাংশ বক্তব্য প্রকাশ করেছে সরকার ও রোহিঙ্গা বিরোধী গোষ্ঠীর৷ অন্যদিকে, মিয়ানমার টাইমসের বেলায় সেটি ছিল ৫৮ শতাংশ৷

গবেষণার সীমাবদ্ধতার জায়গায় গবেষক লিখেছেন যে, বার্মিজ ভাষায় দক্ষতা না থাকায়, সে ভাষার কোনো পত্রিকা বিশ্লেষণ করা যায়নি৷

সরকারি পত্রিকায় যেভাবে ঢালাওভাবে ঘটনাটি প্রকাশ করেছে তা একটি গণতান্ত্রিক দেশে নিতান্তই গণতন্ত্রহীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হয়৷ সব মিলিয়ে রাষ্ট্রহীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্রই বোধ হয় রোহিঙ্গাদের৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو