বাংলাদেশ

‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা যথেষ্ট নয়’

দেরিতে হলেও বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ কিন্তু তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বিশ্লেষকরা৷

Bangladesch Rohingya Flüchtlinge im Flüchtlingslager Kutupalang (picture-alliance/dpa/N. Islam)

কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচ বছর ধরে আছেন রোহিঙ্গা শরাণার্থী আমির হোসেন৷ তিনি এবার রাখাইনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহতায় বিস্মিত৷ তাঁর মতে, ‘‘এবার মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূল অভিযানে নেমেছে৷''

তিনি জানান, ‘‘গত কয়েকদিনে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিতরা পালিয়ে এসেছেন৷ তাঁদের যেভাবে পেরেছি ঠাঁই দিয়েছি৷ অনেককে খোলা আকাশের নীচে রেখেছি৷ এখানে দু'টি স্কুল আছে৷ সেগুলো বন্ধ করে থাকতে দিয়েছি৷ কিন্তু কতজনকে ঠাঁই দেব? প্রতি রাতেই তাঁরা আসছেন৷ তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি৷''

আমির হোসেন বলেন, ‘‘যাঁরা পালিয়ে আসছেন তাঁরা ভয়াবহ নির্যাতনের কথা বলছেন৷ বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ হত্যা করা হচ্ছে৷ এই নির্যাতনের কোনো শেষ নেই৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘যতই কড়াকড়ি হোক রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে আসছেন৷ বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও মানবিক আচরণ করা হচ্ছে৷ কিন্তু আর কত! সব কিছুরই তো একটা শেষ আছে৷ আমরা বাংলাদেশে থাকতে চাই না৷ আমরা নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার পেলে আমাদের দেশ মিয়ানমারেই ফিরে যেতে চাই৷ এক্ষেত্রে বাংলাদেশই আমাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারে৷''

তাঁর মতে, ‘‘আমাদের ওপর নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশও সমস্যায় আছে৷ আর কত আশ্রয় দেবে? তাই আমরা চাই বাংলাদেশ যেন জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি তুলে ধরে৷ জাতিসংঘের কাছে, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কাছে৷ রাখাইনে নির্যাতন বন্ধ এবং আমাদের সেখানে ফিরে যেতে বাংলাদেশ শক্ত আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করলে আমরা হয়ত নিজ দেশে ফিরতে পারব৷''

অডিও শুনুন 03:15

‘প্রতি রাতেই তাঁরা আসছেন, তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি’

বুধবার কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর কার্যালয়ে কর্মকর্তা সংযুক্তা সাহানী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ‘গত এক সপ্তাহে কমপক্ষে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে৷' তিনি জানান, ‘‘যাঁরা প্রবেশ করেছে তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু৷ এঁদের খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা করা হচ্ছে৷ এছাড়া যাঁরা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে তাঁদেরকেও খাবার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে৷ তবে নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঠিক কতজন অবস্থান করছে, তা বলা সম্ভব নয়৷''

রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমতও বাড়ছে৷ জাতিসংঘের মহাসচিব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভ্যাটিকান ও পোপ, অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি), জাতিসংঘ হাই কমিশন ফর রিফিউজিসহ অন্যান্য অনেক সংস্থা ও ব্যক্তি রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবরে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক রিপোর্টে বলেছে, স্যাটেলাইট ডাটা অনুসারে রাখাইনে অত্যন্ত ১০টি অঞ্চলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে৷

এদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে ব্যাপক হতাহতের বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠক ডাকতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাজ্য৷ জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলোকে ঢুকতে দেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন৷ গুতেরেসের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলার সময় বেসামরিক নিহত হওয়ার খবর নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন৷'

অডিও শুনুন 03:40

‘বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা যতটা হওয়া প্রয়োজন ততটা হচ্ছে না’

বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়টি আরো জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো দাবি করছে৷ এরইমধ্যে বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে এক সপ্তাহের মধ্যে দু'বার ডেকে পাঠানো হয়েছে৷ শেষবার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী টহলের প্রস্তাব দিয়েছে৷ এটা নিয়ে অবশ্য সমালোচনাও হচ্ছে৷ রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বিজিবি কড়াকড়ি আরোপ করলেও, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন৷

কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কূটনৈতিক তৎপরতা নেই, তা নয়৷ কিন্তু যতটা হওয়া প্রয়োজন ততটা হচ্ছে না৷ বাংলাদেশে পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আরো জোরালো প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নেয়া উচিত৷ আর সেই শক্ত অবস্থান নেয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে৷ কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার মুখে পড়ছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ শুরু থেকেই দ্বিপাক্ষিকভাবে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করেছে৷ বিবেচনা করেছে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য৷ ফলে আর্ন্তজাতিকভাবে এর সমাধানের দিকে যায়নি বাংলাদেশ৷ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে৷ তবে তা ততটা শক্তিশালী নয়৷''

তাঁর মতে, ‘‘বাংলাদেশ, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি – এ সব দেশ এবং ফোরামকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারে৷ কিন্তু বাংলাদেশ মিয়ামারের সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা স্পর্শকাতর বিবেচনা করে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ এছাড়া আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি  পুলিশ চেকপোস্টে হামলার দায় স্বীকার করায় বাংলাদেশ একটু জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে৷''

এদিকে সরকারের একটি সূত্র জানায়, ‘বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চাইছে৷ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের নীতি হচ্ছে মানবিক আচরণ করা৷ কোনো সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থিরা যেন বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে, তা-ও দেখা৷'

ওই সূত্র আরো জানায়, ‘বাংলাদেশ চাইছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই ইস্যুটি নিয়ে উদ্যোগ নিক এবং বাংলাদেশ সেই উদ্যোগের সঙ্গে পূর্ণ সমর্থন নিয়ে থাকবে৷ বাংলাদেশ ইস্যুটি নিয়ে নেতৃত্ব দিতে চায় না৷'

২৪ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গারা' ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করে মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো সরকার৷ পরে হামলার দায় স্বীকার করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরওসএ)৷ তাদের দাবি, আত্মরক্ষার্থে এ হামলা চালানো হয়েছে৷ পুলিশ পোস্টে হামলার পর রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক অভিযান শুরু করে সরকারি বাহিনী৷ চলতি বছরে রাখাইনে এটা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় দফা অভিযান৷ বছরের শুরুতেই তারা আরো একবার অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালায়৷

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এখন প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাস৷ এর মধ্যে নিবন্ধিত শরণার্থী মাত্র ২৪ হাজার৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو