ভারত

লোকগান বেঁচে আছে শিল্পীদের চিরায়ত জীবনচর্যায়

লোকগানের ধারা, শব্দপ্রয়োগ ও যন্ত্রানুষঙ্গে এখন অনেকটাই আধুনিক৷ প্রচলিত কথা ও সুরে তৈরি হওয়া লোকগান গাওয়া হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে৷ এ পরিস্থিতিতে  পশ্চিমবঙ্গে লোকগীতির অবস্থা জানিয়েছেন সেখানকার সংগীতকার, গবেষক ও সংগঠক৷

Bengalische Volkslieder (DW/P. Samanta)

লোক সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক শুভেন্দু মাইতি এটা মানছেন, পণ্যায়নের সংস্কৃতি লোকগানের শুদ্ধতাকে নষ্ট করেছে৷ কয়েক দশক ধরে বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ঘর করা এই মানুষটি শিল্পীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘কী জন্য গানটা গাওয়া হচ্ছে সেটাই বড় ব্যাপার৷ যদি কেউ বাণিজ্যিক কারণে গান, তাহলে বাড়তি কিছু সংযোজন করতে হয় ব্যবসায়িক স্বার্থে৷ গ্রামে যে শিল্পী গাইছেন, তাঁর এই সমস্যা নেই৷ সুতরাং সংকট কিছু থাকলে সেটা শহরে রয়েছে৷'' তাহলে কি এই বাড়তি সংযোজনে লোকগানের শুদ্ধতা নষ্ট হচ্ছে না? শুভেন্দু মাইতি বলেন, ‘‘লোকসংগীতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে৷ লোকসংগীত অনেকটা আটপৌরে মা৷ সেই আটপৌরে মা-কে বাজারে বেচবার জন্য যদি জিনস-টপ পরিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তার শুদ্ধতা তো নষ্ট হবেই৷''

গানের শুদ্ধতা যে নষ্ট হচ্ছে, একথা মেনে নিয়েছেন ‘দোহার'-এর প্রাক্তন সদস্য মানব ঘোষ৷ তাঁর মতে, ‘‘আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গ লোকগানে মিশিয়ে দেওয়ার ভালো ও খারাপ দুটি দিকই আছে৷ অনেকের কাছে গানটা পৌঁছে যাচ্ছে, শ্রোতারা মূল গানটি খুঁজতে আগ্রহী হচ্ছেন, এতে বিক্রি বাড়ছে৷ তাতে গান বিকৃতও হচ্ছে৷ রাধাকৃষ্ণের প্রেমগীতির সঙ্গে ড্রাম বা গিটার বাজানো হচ্ছে, যা কাম্য নয়৷''

তবে এই সমস্যা অতিক্রম করা অনেকটাই সম্ভব বলে মানব ঘোষ মনে করেন৷ কীভাবে? তাঁর বক্তব্য, ‘‘লোকগান গুরুমুখী বিদ্যার অধীন৷ এটা ঠিকঠাক করে শেখা দরকার৷ যদিও কন্ঠস্বরের আঙ্গিক নকল করা সম্ভব নয়৷ তাই কোনও ভূমিপুত্র ভাওয়াইয়া বা ঝুমুর গাইলে যেমন শোনাবে, আমরা সেটা পারব না৷ তবে আমাদের সেটা যতটা সম্ভব শিখে গাইতে হবে৷''

অডিও শুনুন 06:47

‘আমাদের সমাজ একটা বৃক্ষের মতো, যার মাটির উপরিভাগের অংশ নাগরিক সংস্কৃতি’

লোক সঙ্গীত জগতে বাণিজ্যের প্রবল তাড়নার কথা স্বীকার করেছেন শিল্পী মানব ঘোষ৷ মেনে নিয়েছেন, সে কারণেই এ রাজ্যে ওপার বাংলার রথীন্দ্রনাথ রায়ের তুলনায় আনুশেহদের ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা বেশি৷ তরুণ প্রজন্মের কাছে আধুনিক লোকগান পৌঁছে যাচ্ছে মার্কেটিং আর প্রচারের জোরে৷ আবার অতীতে নির্মলেন্দু চৌধুরী, অভিজিৎ বসু, তপন রায়ের লোকগানও মানুষকে কাছে টেনেছে স্রেফ গায়কী আর মেঠোসুরের দৌলতে৷ পরের দিকে কালিকাপ্রসাদ শহুরে সমাজের সঙ্গে হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিমের মাটির গানকে জুড়েছেন৷ কালিকাপ্রসাদ এভাবে লোকগানকে মুখে মুখে ছড়িয়ে তাকে রক্ষা করতেও সফল হয়েছেন যথেষ্ট৷

একসময় স্বপন বসু জিনস পরে ব্যাঞ্জো হাতে লোকগান গাইছেন, এটা তরুণদের বেশি আকৃষ্ট করেছিল৷ সেই সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি৷ এই প্রজন্মের তরুণ সৌমেন্দু দাস নিজে লোকসংগীতের পাশে দোতারার মতো লোকবাদ্য চর্চা করেন৷ শহুরে আবহাওয়ায় গড়ে ওঠা ‘কনফিউশন' ফোক ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত সৌমেন্দু জানালেন, ‘‘নিঃসন্দেহে অনবরতভাবে বাঙালি শিল্পীরা বিশ্বের দরবারে লোকগানকে পৌঁছে দিচ্ছেন৷ তবে ফোকব্যান্ডে রিয়েলিটি শো বা সিনেমার কিছু জনপ্রিয় গানকেই বারবার পরিবেশিত করা হয়ে থাকে৷ এতে গানগুলির নিজস্বতা চলে যাচ্ছে৷ অন্যদিকে দোতারা, বাঁশি, ঢোল ইত্যাদি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গ্রামবাংলার লোকগীতির দলগুলি বহু নতুন গান সংগ্রহ করে সুর তাল লয়ের ছোঁয়ায় সেগুলির রূপ দিচ্ছেন৷''

  তবে শুদ্ধতা যদি নষ্ট হয়, সেক্ষেত্রে লোকসংগীত সংকটে পড়তে পারে৷ গবেষক শুভেন্দু মাইতির মতে, অনেকদিন আগেই সেই সংকটের পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘হাইব্রিড ফসল উৎপাদনের ফলে ৩৫০টি প্রজাতির ধান বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে৷ একইভাবে গানের বীজও লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে৷ এখন আর ধানের বীজ মাটিতে ফেললে গাছ হয় না৷ আলাদা করে চারাবীজ কিনতে হয়৷ গান লুপ্ত হলে কিনব কোথা থেকে?''

গত কয়েক দশকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে লোকগানকে বাঁচানোর জন্য তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি৷ এ জন্য আক্ষেপ করে এই শিল্পী ও গবেষক বলেন, ‘‘বাম সরকারের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে হতাশাজনক৷ লোকশিল্পীদের জন্য কিছু করার তাগিদ থাকা উচিত ছিল কমিউনিস্ট পার্টির৷ কিন্তু তাঁরা এত বছর ধরে শিল্পীদের শুধু ভোটার ভেবেছেন৷''

পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন লোকশিল্পীদের নাম নথিভুক্ত করে তাঁদের পরিচয়পত্র দিচ্ছে৷ তাঁদের জন্য মাসিক ভাতারও ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ এতে কি কিছুটা সুরাহা হবে? শুভেন্দু মাইতি বলেন, ‘‘এতে শিল্পীদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে৷ কিন্তু তাতে লোকগানের কোনও উপকার হচ্ছে না৷ তাছাড়া সরকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে তাতে বিপদ বাড়বে৷''

লোকগানের অন্যতম জনপ্রিয় রূপ ‘গম্ভীরা' কতটা সংকটে পড়েছে, তা ডয়চে ভেলে জানতে চেয়েছিল গম্ভীরা শিল্পী অমর মণ্ডলের কাছে৷ মালদহের ইংরেজবাজারের একটি গম্ভীরা দলের প্রধান এই শিল্পী জানান, ‘‘এই গানের শিল্পীরা যথাযথ মর্যাদা পাননি৷ প্রত্যেকেই আলাদা পেশার সঙ্গে জড়িত৷ তার পাশাপাশি গম্ভীরায় অভিনয় করেন, কেউ গান করেন বা বাজনা বাজান৷'' তবে বিশিষ্ট এই লোকশিল্পী স্বীকার করেছেন, রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তায় উপকার হয়েছে৷ এখন কলকাতার মঞ্চে অনেক বেশি গান গাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে৷ যদিও অন্যান্য লোকগানের মতো গম্ভীরার আধুনিকীকরণ না হওয়ায়, তার মূল রূপটি অক্ষুন্ন রয়েছে৷ স্বস্তিতে রয়েছেন পালাকার ও মূল গায়েন অমর মণ্ডল৷ তবে সব লোকশিল্পীই এমন স্বস্তিতে নেই বলে জানালেন কবি জয়দেবের স্মৃতিজড়িত কেন্দুলির ‘মনের মানুষ বাউল ফকির কালচারাল সোসাইটি'র তন্ময় বাউল৷ বিশিষ্ট এই বাউল জানালেন, ‘‘লোকগীতি, লোকবাদ্য ও লোকনৃত্যের সমন্বিত রূপই লোকসংগীত৷ গীত, বাদ্য ও নৃত্য সহযোগে পরিবেশিত হয় বলে বাউল লোকসংগীতের সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ৷ তাই মানুষ চিরকালই সাধকদের বাউলগান পছন্দ করেন৷''

এ যুগের মানুষের কাছে বাউল গানের আবেদন কেমন? তন্ময় বাউল এ প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, ‘‘বাউল গানের চর্চা নিঃসন্দেহে বেড়েছে৷ তাল-বাদ্য ও সুরের সবটাই যে সবাই বুঝতে পারেন, তা নয়৷ আবার বাউলগানের অন্তর্নিহিত অর্থও যে সবাই বুঝতে পারেন, এমনও না৷ কিন্তু কখনও সুর, তো কখনও গৌণ অর্থ ধরেই ৮০ শতাংশ মানুষ বাউলগানের শ্রোতা৷ ইদানীংকার শহুরে সংস্কৃতিতে যেভাবে বাউলগানকে পরিবেশিত করা হয়, তাতে বাউলগানের অপভ্রংশ হচ্ছে যেমন, পাশাপাশি জনপ্রিয়তাও বাড়ছে৷''

লালন, রবীন্দ্রনাথের পরে পূর্ণদাস বাউল, পবনদাস বাউল নিঃসন্দেহে বাউলগানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন৷ আবার বিশ্বের দরবারে রঙচঙে পোশাক পরে একতারা, দোতারা, খঞ্জনির মতো বাদ্য ছেড়ে গিটার ধরে অনেকে আবার বাউল গান গাইছেন৷ এসব নিয়ে ‘মনের মানুষ' আখড়ার তন্ময় বাউল জানালেন, ‘‘সাধনদেব বৈরাগী আমাদের গুরু৷ এটা আমরা মোটেও সমর্থন করি না৷ বাউলের মতো গভীর বোধের গানকে এভাবে পয়সার জন্য বেচতে আমরা পারব না৷ নিজেদের বোধ এবং সংস্কৃতি থেকেই আমরা বাউলগানের যেমন চর্চা করি, তেমনই করে যাব৷ আধুনিকতার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করব না৷''

অডিও শুনুন 03:50

‘ ফোকব্যান্ডে কিছু জনপ্রিয় গানকেই বারবার পরিবেশিত হয়, এতে গানগুলির নিজস্বতা চলে যাচ্ছে’

 একদিন মুখে মুখে প্রচলিত কথাতেই বাঁধা হয়েছিল বাংলার লোকগান৷ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলার গ্রামীণ জনতা তাঁদের বিভিন্ন লোকাচার ও উৎসবের সঙ্গে এই স্বয়ম্ভু সংগীতের ধারাকে জুড়ে রেখেছেন৷ এমনই কোনও মানুষের খোঁজে ডয়চে ভেলে পৌঁছে গিয়েছিল নদিয়ার কুর্শি গ্রামে৷ খুঁজে পাওয়া গেল সুশীল সর্দারকে৷ তথাকথিত সভ্য সমাজ তাঁকে শিল্পী না বলুক, আদতে গানই তাঁর জীবন৷ আদিবাসী সম্প্রদায়ের যে কোনও উৎসবে নৃত্য-গীতের আয়োজন থাকে, সেখানে সুশীলই মূল গায়েন৷ গান গাইতে গাইতে বিভোর হয়ে যান মধ্যবয়স্ক মানুষটি৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গান আমাদের শিখতে হয় না৷ ছেলেবেলা থেকে শুনে শুনে গান শিখে যাই৷ আমাদের সব পরবেই তো গান থাকে৷'' সুশীলের মতো মানুষ, যাঁর ঠোঁটে হাজারও অজানা লিরিক ও সুর খেলা করে, যাঁকে কোনও ক্যাসেট কোম্পানি শিল্পীর মর্যাদা দেয়নি, তাঁর মতো মানুষ আজও সভ্যতার শিকড়ে লোকগান ও সংস্কৃতিকে পুষ্টি জোগান দেন৷

শুভেন্দু মাইতি এই সুশীলদেরই ‘শিকড়' বলে চিহ্নিত করেছেন৷ তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের সমাজ একটা বৃক্ষের মতো, যার মাটির উপরিভাগের অংশ হচ্ছে আমাদের নাগরিক সংস্কৃতি৷ মাটির উপরে যতটুকু অংশ থাকে, ততটাই অংশ থাকে মাটির তলায়৷ এই শিকড়ের অংশটুকুই আমাদের লোকসংস্কৃতি৷ সেটি দৃশ্যমান না হলেও গাছকে বাঁচিয়ে রাখে৷ এই শিকড় শুকিয়ে গেলে গাছের পাতা আর সজীব থাকবে না, হলুদ হয়ে যাবে৷ তাই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব৷''

আবার সেই দায়িত্ব থেকেই শহরের বুকে নির্মলেন্দু চৌধুরীর ৯৫তম জন্মশতবর্ষে লোকশিল্পী অভিজিৎ আচার্য জানালেন, ‘‘শিল্পীর সমস্ত গান তেমনভাবে এতদিন সংগ্রহ করা হয়নি৷ এবার আরও ৫ বছর ধরে সেই গান সংগ্রহ করে শতবর্ষ পালন করতে চলেছি আমরা৷ একইসঙ্গে নির্মলেন্দু চৌধুরী ফোক অ্যাকাডেমি করার ভাবনাও আছে৷'' কাজেই বলতে পারা যায়, আধুনিকতার আগ্রাসনেও দিব্যি বেঁচে আছে লোকগানের পরম্পরা৷ শুধু গ্রামীণ মানুষের উৎসব ও জীবনচর্যায় নয়, লোকগান বেঁচে আছে লোকশিল্পীদেরও চিরায়ত জীবনচর্যায়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو