সংবাদভাষ্য

শততম টেস্ট কি শুধুই একটি সংখ্যা?

অবিশ্বাস্য লাগে, যখন ২০০০ সালের ১০ নভেম্বরে ফিরে যাই৷ এই তো সেদিন সৌরভ গাঙ্গুলি, নাঈমুর রহমান টস করতে নামলেন, হাবিবুল বাশার স্ট্রোকের ঝুলি মেলে ধরছেন, আমিনুলের ব্যাটে অবিশ্বাস্য স্থৈর্য৷ ১ থেকে ১০০ – এত তাড়াতাড়ি হয়ে যায়!

২০০৫ সালে বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবোয়ের খেলা

আবার অন্য এক হিসাবে অবাক হয়েই ভাবতে হয়, ১০০টি টেস্ট খেলতে ১৭ বছর লাগল! গড়ে প্রতিবছর ছয়টিরও কম টেস্ট৷ ১৭ বছর পরও যে টেস্টে মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাদের শৈশবই কাটেনি, তার কারণও মিলে যায় এই তথ্যে৷ বছরে গড়ে মাত্র ছয়টি টেস্ট খেললে, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির হাওয়ায় মজে গিয়ে টেস্টকে দূরে সরিয়ে রাখলে যা হওয়ার তা-ই তো হচ্ছে!

আবার অতীতে ফিরি৷ ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস যখন দেওয়া হয়, তখন বাংলাদেশ যোগ্য কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছিল৷ যৌক্তিক প্রশ্ন, সত্যি বললে তখনকার পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের চেয়ে কেনিয়াই এগিয়ে ছিল অনেকের কাছে৷ তবু তাদের টপকে যে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেল, সেটা এক অর্থে বাংলাদেশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব৷ কারো কারো কাছে দীর্ঘদিনের শিষ্য আশরাফুল হককে জগমোহন ডালমিয়ার উপহার৷ কথাটায় কিছু সত্যতা আছে, কিন্তু ডালমিয়া বা ক্রিকেট দুনিয়ার কাছে সেটা বাংলাদেশপ্রীতি ছিল না৷ ছিল নিজেদের স্বার্থ৷ নতুন ধরনের বাণিজ্যিক হাওয়া তৈরি হয়েছে টেলিভিশন সূত্রে, এখন এই টাকা ধরার জন্যই খেলার বিস্তার দরকার৷ আর সেখানে পাওয়া গেল বাংলাদেশের মতো উর্বর ক্ষেত্রকে, যারা ক্রিকেটের জন্য সব সঁপে দিতে তৈরি৷ কেনিয়া-আয়ারল্যান্ড-স্কটল্যান্ডে ওসব নেই৷ তাই ওরা বাদ৷

যে কোনো কিছু পাওয়ার যোগ্য না হলেও পেতে ভালো লাগে৷ টেস্ট স্ট্যাটাসটা পেয়ে পুরো দেশ উদ্বেল ছিল৷ আবার পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠার আগে কিছু পেলে সেটা সামাল দিতে কষ্ট হয়৷ সেই কষ্টটাও হতে শুরু করল কিছু দিন পরই৷ আর তাতে হৈ-চৈও উঠল৷ বাংলাদেশের একেকটা ব্যর্থতাতেই বিদেশি মিডিয়ার গেল গেল রব৷ আমরা আগেই বলেছিলাম না...। সেটা যে সামাল দেওয়া গেছে তারও কারণ দেশের মানুষ৷ সেই সূত্রে বাজার আর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা৷ আফসোস এটাই যে এই মানুষ, বাজার, সম্ভাবনা৷এসবের শক্তি দিয়ে ক্রিকেটের নাক উঁচু অংশকে সামাল দেওয়ার কাজেই ব্যবহার করেছি শুধু৷ এই উর্বর ক্ষেত্রে টেস্টটাকে একটু পরিচর্যা করলে ৯৯তম টেস্টে শোচনীয় হারের লজ্জা নিয়ে শততম টেস্টে নামতে হয় না৷ মাহমুদ উল্লাহদের নিয়ে অত নাটক হয় না৷

বাংলাদেশ সরকারের তখনকার এক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রীড়া কর্তা টেস্ট ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না৷ তবে রাজনীতিক যেহেতু, এবং রাজনীতিকরা না বোঝা বিষয় নিয়েই বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, তাই টেস্টের প্রসঙ্গ উঠলেই বলতেন, ‘‘টেস্ট মানে হচ্ছে সাগর৷ বিশাল সাগর৷''

প্রায় প্রতি বক্তৃতাই শেষ হতো টেস্ট নামের সাগরে গিয়ে৷ এবং সাংবাদিকদের হাসাহাসিতে৷ তা হাসাহাসি বাদ দিয়ে সাংবাদিকরা একদিন তাঁকে বাজিয়ে দেখতে জানতে চাইলেন, ‘‘আপনি টেস্টকে সব সময় সাগর বলেন কেন?''

‘‘আরে টেস্ট তো সাগরই৷ বিশাল সাগর৷''

‘‘আর ওয়ানডে?''

রাজনীতিক তো৷ ঝটপট জবাব, ‘‘নদী৷ নদীর মতো৷''

‘‘তাহলে ক্রিকেটের পুকুর কোনটা?''

তখন তো আর টি-টোয়েন্টি ছিল না, থাকলে উত্তর দিতে সমস্যা হতো না৷ তাঁর খুব সমস্যা হলো৷ আমতা-আমতা শুরু করলেন৷

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

গল্পটা বললাম এ জন্য যে, তখন আমাদের ক্রিকেট-সংস্কৃতিতে আসলে টেস্ট সম্পর্কে ‘সাগর', ‘সমুদ্র' – এই জাতীয় অস্বচ্ছ ধারণার বেশি কিছু ছিল না৷ তুলনায় ওয়ানডে অনেক পরিচিত৷ তার ধরনের সঙ্গে অনেক বেশি সখ্য৷ আর সত্যি বললে এটাই ছিল সমস্যা৷

ওয়ানডেকেন্দ্রিক কাঠামো দিয়ে টেস্ট খেলতে গিয়ে আর টেস্টের দল হয়ে ওঠা হয়নি৷ জাতীয় লিগ নামে চার দিনের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলো৷ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও ছিল৷ কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, খেলোয়াড়দের মধ্যেও দেখেছি বড় দৈর্ঘ্যের খেলাটাকে খুব সিরিয়াসলি না নিতে৷ বরং শেষ দিনে যে ওয়ানডে হতো, তার দিকেই বেশি মনোযোগ, কারণ, এই দিন মানুষ বেশি আসে৷ হাততালি বেশি পাওয়া যায়৷ আর তাতে বিভ্রান্ত হয়ে নির্বাচনি বিবেচনাতেও বিস্তর ভুল৷ প্রাক টেস্ট যুগে জাভেদ ওমরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ‘টেস্ট ব্যাটসম্যান'-এর লেবেল৷ অথচ যখন সত্যিকারের টেস্ট, তখন দলে নেই তিনি৷ তিন ওপেনারকে খেলানো হলো, কিন্তু তাঁদের কারো নামই জাভেদ নয়৷ সাবেক ক্রিকেটাররা সব দেশে ক্রিকেট-সংস্কৃতির অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন৷ কিন্তু এখানেও সমস্যা৷ আমাদের সাবেকরা যেহেতু শুধুই ওয়ানডে খেলেছেন, তাই তাঁদের অভিভাবকত্বেও থাকল গোলমাল৷ আর সবশেষ টি-টোয়েন্টি এসে এমন একটা ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিল যে, তারপর বাংলাদেশের মতো হুজুগে দেশে যে টেস্ট টিকে আছে সেটাই একটা বিরাট ব্যাপার৷ এবং অবশ্যই বিরাট ব্যাপার সেই দেশের শততম টেস্ট খেলতে যাওয়া৷

শ্রীলঙ্কা, শততম টেস্টের ভেন্যু পি সারা মাঠে টেস্ট কভারের অভিজ্ঞতা আছে৷ ২০০২ সালে৷ যত দূর মনে পড়ে, তখনকার রীতি অনুযায়ী ইনিংস হারই হয়েছিল৷ তখন আসলে সবখানে এটাই নিয়ম ছিল যে বিপক্ষ বিশাল একটা রানের পাহাড় গড়বে, বাংলাদেশ তাতে গড়াগড়ি খাবে৷ তিন বা সাড়ে তিন দিনে খেলা শেষ হবে অনিবার্য নিয়তি নিয়ে৷ আর সেই চোখে দেখলে উন্নতি কিন্তু মন্দ হয়নি৷ এখন যত যা-ই ঘটুক, বাংলাদেশের টেস্ট মানেই তিন দিনের মামলা নয়৷ বিপক্ষ বিরাট রান করে যে এক ইনিংসেই খেলা শেষ করে দেবে এমনও নয়৷ এই নিউজিল্যান্ডেই সাকিব-মুশফিকের ব্যাটে লিড নেওয়া গেছে৷ ভারতেও বাংলাদেশ রানচাপা না পড়ে পাল্টা গর্জন করেছে মুশফিকের অনন্য সেঞ্চুরিতে৷

এর আগে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তো আরেকটু হলে সিরিজটা ২-০-তেই জেতা যেত৷ আর এসবই হয়েছে সঠিক কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই৷ সত্যি বললে, ওয়ানডে ক্রিকেটে সাফল্যের সূত্রে যে বিশ্বাস এসেছে, সেটাই বাংলাদেশ টেনে নিয়ে গেছে টেস্টে৷ তা ছাড়া টি-টোয়েন্টি আর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট সূত্রে অন্য দেশেও টেস্ট ক্রিকেটের মান নামছে, রাহুল দ্রাবিড় কিংবা সাঙ্গাকারারা আর তৈরি হচ্ছেন না৷ আর এভাবে নিজেদের বিশ্বাসজনিত অগ্রগতি, অন্যদের নেমে আসা মিলিয়ে মাঝেমধ্যে টেস্টেও হয়ে যাচ্ছে৷

কিন্তু এই এক-আধটু বাতাসে স্বস্তি মেলে না যখন দেখি টেস্ট পর্যায়ে একেবারে হাস্যকর রকম ভুলে আউট হন ব্যাটসম্যান৷ টেস্ট শুধু ফলের বিষয় নয়, এই খেলার ধরনও একটা পরিণতবোধ দাবি করে৷ হয়ত বাংলাদেশ অনেক রান করছে কখনো কখনো, হয়ত জিতছেও, কিন্তু আমাদের শীর্ষ ব্যাটসম্যানরা যখন পরিস্থিতির সঙ্গে বেমানান শট নেন, তখন ক্রিকেট বিশ্ব এ জন্য হাসে যে এরা আসলে টেস্টের মানেটাই ঠিক বোঝে না! শততম টেস্টের সময় আসলে হার-জিত, পারা-না পারা নয়, টেস্টবোধের সামগ্রিক ঘাটতিটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের৷

এবং যতই ১০০ টেস্ট খেলি, এই কষ্ট খুব সম্ভব অদূর ভবিষ্যতে দূর হওয়ার নয়৷ কারণ, এখনো ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি হলে আমরা যতটা ঝাঁপিয়ে পড়ি, টেস্ট এলে ততটাই নিরাসক্ত৷ এখনো সামান্য অজুহাত পেলেই টেস্টের জায়গায় তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার চেষ্টা করি৷ টেস্ট খারাপ করার পর বড় দৈর্ঘ্যরে ম্যাচ খেলা, প্রথম শ্রেণির কাঠামো ইত্যাদি নিয়ে যেসব কথা হয় সেগুলো আসলে স্রেফ পিঠ বাঁচানোর স্বার্থেই৷

আর এ সব দেখে দেখে ভারাক্রান্ত মনে মনে হয়, শততম টেস্ট আসলে স্রেফ একটা সংখ্যা৷ এর বেশি কিছু নয়৷ বাহারি আয়োজনের আবহ সংগীতটার মধ্যেও চাপা দুঃখের সুর৷ টেস্টকে তো আমরা ভালোই বাসিনি!

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

বন্ধু, মোস্তফা মামুনের এই লেখাটা কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو