বাংলাদেশ

শিশুর বিনোদন, শিশুর পৃথিবী

শিশুর বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ কি আছে বাংলাদেশে? টেলিভিশনে কী দেখে শিশুরা? অবসর সময় কাটানোর জন্য কী কী পায় তারা অন্যান্য মাধ্যমে? কী কী নিয়ে গড়ে উঠছে আমাদের শিশুদের পৃথিবী?

ঢাকার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে বি পড়ছে এক শিশু

‘শিশু একটা খেলনা ছুড়ে ফেললো; ছুড়ে ফেললো মানে সে অবহেলা করলো, তা নয়৷ এর মানে হলো, খেলনাটা কত দূরে পড়ে, কীভাবে পড়ে, কীভাবে শব্দ হয় – এই জিনিসগুলো শিশুর মধ্যে নাড়া দেয়৷ খেলা মানে শুধু দৌড়-ঝাঁপ নয়, সে একটা খেলনা দিয়ে খেলতে পারে, একটি পুতুল দিয়ে খেলতে পারে, একটি পাতার দিকে তাকিয়ে খেলতে পারে, নাটকে অভিনয় করতে পারে – এ সবই হচ্ছে একটি শিশুর জন্য খেলা৷ আর খেলাই হলো শিশুর বিনোদন৷'' শিশু শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ফারহানা মান্নান শিশু বিনোদনের এই ব্যখ্যা দিয়ে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শিশুর সঠিক বিনোদনই তার পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করে৷ আর এই বিনোদন ঘরে-বাইরে-স্কুলে সবখানেই তাকে দিতে হবে৷''

ঢাকার শুক্রাবাদে ইউনিক্যাফে নামে একটি ফাস্টফুড সেন্টারে আছে শিশুদের জন্য প্লে-জোন৷ আর এই প্লে-জোনে আছে শিশুদের জন্য নানা ধরণের ভার্চুয়াল গেম৷ গাড়ি চালানো, বিমানে চড়া, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা অথবা সাফারি পার্কে প্রাণীদের জগতে ঘুরে বেড়ানো – সবই আছে সেখানে৷ তবে সবই ভার্চুয়াল৷ শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে এই প্লে-জোনে গিয়ে বেশ ভালো অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই খেলায় বুঁদ হয়ে থাকে৷ আর তখন বাবা-মা থাকেন মেবাইল ফোনে অথবা নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত৷ শিশুদের প্লে-জোনে ছেড়ে দিয়ে তাঁরা নিজেদের বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷ শিশুরা ঠিক কী করে সেদিকে তাঁদের খেয়াল থাকে না৷ আর ওই খেলনাগুলো তাদের শিশুদের বয়স উপযোগী কিনা তা তাদের বিবেচনায় নেই৷

অডিও শুনুন 06:08

‘শিশুদের বিনোদনের জায়গা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে’

এ রকম প্লে-জোন এখন ঢাকার ধানমন্ডি, কলাবাগান, গুলশান,বারিধারাসহ বিভিন্ন এলকায় গড়ে উঠেছে৷ কোথাও প্লে-জোনে শিশুদের ঢোকার শর্ত ফাস্টফুড কেনা৷ দামের ওপরে হিসেব করে গেম কয়েন দেয়া হয়৷ আবার কোথাও আলাদা টাকা দিয়ে গেম কয়েন কিনতে হয়৷ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক আর সাদ-মুসা সিটি-র প্লে-জোনে অভিভাবকরা বিরক্ত হলেও উপায় নেই, কারণ, ওখানে নেয়া ছাড়া শিশুদের আর কোথায় নিয়ে যাবেন তা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না৷ একজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, শিশুদের কিছু খেলা আছে অনেকটা জুয়ার মতো৷ এক ধাপের পর আরেক ধাপে যেতে পারলে ডিসকাউন্ট৷ কিন্তু সেখানকার সার্ভিসম্যানদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ৷ তাঁরা জানেন না কোন বয়সের শিশুদের জন্য কোন গেম৷ তাদের কাজ হলো কোনো বিবেচনাবোধ ছাড়াই যে কোনো বয়সের শিশুদের যে কোনো গেমস খেলতে উদ্বুদ্ধ করা৷ অভিভাবকরাও অনেক সময় কোন শিশুর জন্য কোন ধরণের গেম উপযোগী সে বিষয়ে সচেতন নন আর ঐ সব গেম আদৌ শিশুদের খেলার উপযোগী কিনা৷''

ফারাহানা মান্নান বলেন, ‘‘শিশুদের বিনোদনের দু'টি দিক৷ এক. মানসিক বিকাশ এবং দুই. শারীরিক বিকাশ৷ তাই শিশুদের বিনোদনের জায়গা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে৷ বিষয়গুলো হতে হবে ইন্টারঅ্যাকটিভ৷'' তিনি বলেন, ‘‘শিশু যেমন তার নানা বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটাবে খেলা বা বিনোদনের মধ্য দিয়ে, তেমনি বাইরে খেলার মধ্য দিয়ে তার সামাজিকতা বৃদ্ধি পাবে, শরীর গঠন হবে৷''

বাংলাদেশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ‘সুলতান সুলেমান' নামের একটি ধারাবাহিক এখন বেশ দর্শকপ্রিয়৷ তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের কথিত ইতিহাস ভিত্তিক এই ধারাবাহিকটি তুরস্কেই নিষিদ্ধ৷ ডাবিং করা এই ধারাকাহিকটির মধ্যে এমন সব দৃশ্য রয়েছে যা শুধু প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যই উপযোগী হতে পারে৷ কিন্তু বাংলাদেশের শিশুরা এই ধারাবাহিকের দর্শক৷ অনুসন্ধানে জানা যায়, রাতে মা-বাবা শিশুদের আলাদাভাবে সময় না দিয়ে শিশুদের তাদের পাশে বসিয়েই ঐ সিরিয়াল দেখতে বসে যান৷ ফলে শিশুরাও সিরিয়ালটির দর্শক হয়ে উঠেছে৷ জানতে চাইলে ধানমন্ডির কলাবাগান এলাকার এক পরিবারের কর্তা বলেন, ‘‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দু'জনই সারাদিন ব্যস্ত থাকি, তাই শিশুদের আলাদা করে বিনোদনের  জন্য সময় দেয়া যায় না তেমন৷ আর রাতে যেটুকু সময় পাওয়া যায় সে সময় ঐ সিরিয়াল দেখি, শিশুরাও দেখে৷''

একই কারণে ঢাকার অনেক শিশু এখন বাংলা বলতে পারার আগেই হিন্দি শিখে যায়৷ হিন্দি সিরিয়াল দেখতে  বসে যান বাবা-মা৷ আর শিশুরাও তাদের পাশে বসে হিন্দি সিরিালে অভ্যস্ত হয়ে যায়৷ ঢাকার হৃদরোগ ইন্সটিউটের শিশু চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘অনেক বাবা-মা-ই শিশুদের বিনোদনের নামে টিভি সেটের সামনে বসিয়ে দেন৷ আর শিশু এমন কিছু দেখে যা সে বোঝেনা বা যার সঙ্গে সে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে পারে না৷ এর ফলে শিশুর মধ্যে শূন্যতা কাজ করে৷ তার কাছে টিভির মনিটর ব্ল্যাংক ছাড়া আর কিছুই নয়৷''

অডিও শুনুন 04:34

‘ঢাকার স্কুলগুলোর একঘেঁয়ে পড়াশুনাও শিশুদের সুস্থ বিনোদনের অন্তরায়’

তিনি বলেন, ‘‘আর কথিত প্লে-জোনের ভার্চুয়াল গেম অনেক সময়ই শিশুকে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ সে একা একা এক বিচ্ছিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়ে ওঠে৷''

একইভাবে মোবাইল, ভিডিও ও কম্পিউটার গেমও বিনোদনের নামে তাকে আসক্ত করে৷ সে একা হয়ে যায়৷ সামাজিকতার বাইরে চলে যায় সে৷ আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘শিশুরা একসঙ্গে খেলবে, ঝগড়া এমনকি মারামারিও করতে পারে৷ এটাই স্বাভাবিক৷ ঘরের কোণে বসে সারাক্ষণ ভার্চুয়াল গেমে ব্যস্ত থাকা স্বাভাবিক নয়৷ এটা শিশুর জন্য ক্ষতিকর বিনোদন৷ তাকে সামাজিক জীব হিসেবে বেড়ে উঠতে দিতে হলে খেলার মাঠে যেতে দিতে হবে৷ অন্যান্য শিশুর সঙ্গে মিশতে দিতে হবে৷ কবিতা, গান, বিতর্কসহ নানা সহশিক্ষামূলক বিনোদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে৷'' তবে প্রশ্ন হলো শিশুর এই স্বাভাবিক বিনোদনের সুযোগ কোথায়?

কোনো জরিপ না থাকলেও সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবদনে জানা যায়, ঢাকার ৯৫ ভাগ স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই৷ কাগজে কলমে রাজধানীতে সিটি কর্পোরেশনের মোট ৫৪টি পার্ক ও ২৫টি খেলার মাঠ রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে এগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন৷

‘ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট'-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না, বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নাই, ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নাই, ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না এবং ৪৭ শতাংশ শিশু দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটায়৷

অডিও শুনুন 05:10

‘পরবর্তী জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না’

২০১৩ সালে তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনে এক জরিপে ৪,২০০ শিশুর কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা জানতে চাওয়া হয়৷ জরিপে অংশ নেয়া ৮৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় একটি খেলার মাঠ তৈরি করে দেয়া হোক৷ ৭৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠুক৷ ৭৬ শতাংশ শিশু বলেছে, এলাকায় শিশুপার্ক গড়ে তোলা হোক, ৬৭ শতাংশ শরীরচর্চা কেন্দ্র, ৩ শতাংশ পাঠাগার ও ২ শতাংশ চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার কথা বলেছে৷

শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের চিকিৎসক ডা. মেখলা সরকার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শিশুদের বিনোদনের মধ্যে প্রধান হলো স্কুলে, খেলার মাঠে বা খোলা জায়গায় সহপাঠী এবং বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলা করা৷ এর মাধ্যমে শিশুরা যেমন বিস্তৃত পরিবেশে নিজেকে প্রকাশ করে এবং খাপ খাইয়ে নেয়, তেমনি খেলাধুলার নানা শৃঙ্খলা ও নিয়ম তাকে শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় শেখায়৷ কোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের পথও সে জানতে পারে খেলাধুলার মাধ্যমে৷''

তিনি বলেন, ‘‘শিশুদের যদি ঘরে আবদ্ধ রেখে শুধু টিভি, অনলাইন বা কম্পিউটার বিনোদনের মধ্যে রাখা হয়  তাহলে সে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে৷ পরবর্তী জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘শিশুদের মধ্যে এক ধরনের পুলক থাকে৷ খেলাধুলা ও দৌড়াদৌড়ির মাধ্যমে তারা তার প্রকাশ ঘটাতে চায়৷ তার সুযোগ না দিয়ে তাদের ভার্চুয়াল বিনোদনে অভ্যস্ত করলে তার কিছুক্ষণ আনন্দে থাকে আবার বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে৷ আর পরবর্তী জীবনে তারা নানা শারিরীক ও মানসিক রোগে ভোগে৷'' 

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও গ্যাজেট ভিত্তিক শিশু বিনোদনের ভয়াবহ পরিনতির চিত্র পাওয়া গেছে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন'-এর এক জরিপে৷ তাদের এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে৷ ঢাকার ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য প্রকাশ  করে তারা৷ আর শিশুরা এই পর্নোগ্রাফি দেখে প্রধানত মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে৷

ফারহানা মান্নান বলেন, দুই বছর বয়সের আগে শিশুদের টেলিভিশন সেটের সামনে নেয়াই ঠিক নয়৷ শিশুকে মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে বা টেলিভিশন সেটের সামনে বসিয়ে রাখার চেয়ে তার হাতে বয়স উপযোগী যে কোনো একটা খেলনা দেয়া অনেক ভালো৷ এতে সে রং চিনবে৷ ইন্টারঅ্যাকট করবে৷ নিজে সক্রিয় হবে৷''

আর ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘ঢাকার স্কুলগুলোর একঘেঁয়ে পড়াশুনাও শিশুদের সুস্থ বিনোদনের অন্তরায়৷ তাদের খেলাধুলার  জন্য যেমন মাঠ নেই তেমনি তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমও তেমন দেখা যায় না৷''

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার আরো বলেন, ‘‘শিশুদের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণও তাদের জন্য বড় একটি বিনোদন৷ স্কুল বা অভিভাকদের উচিত তাদের কোনো সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত করা৷ কোনো ভালো বা সহযোগিতামূলক কাজে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করা৷ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, গাছ লাগানো, শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণ ইত্যাদি এর উদাহরণ হতে পারে৷ এর মধ্য দিয়ে শিশুর মানবিক এবং সামাজিক দিক বিকশিত হবে৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو