ব্লগ

শ্রমের সুরক্ষা কোথায়?

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্য একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে৷ তা হলো, শ্রম, মজুরি ও শ্রমের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলা দরকার৷ বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে একটা কাঠামো দাঁড় করানোর বিষয়ে ভাববার সময় এসেছে৷

default

জার্মানির শ্রম আইনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত আছে৷ এ বছর জানুয়ারিতে সেখানে কিছুটা পরিবর্তনও এসেছে৷ যেমন, ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টাপ্রতি ৮.৫০ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ৮.৮৪ ইউরো করা হয়েছে৷

এছাড়া অস্থায়ী কর্মচারীদের সুরক্ষাও বাড়ানো হয়েছে৷ ১৮ মাসের বেশি কাউকে অস্থায়ী রাখা যাবে না৷ স্থায়ী করতে হবে৷ আর ন'মাস পরই অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ীদের মতো সুযোগ সুবিধা দিতে হবে৷

এসব ব্যবস্থা রাখার কারণ হলো, কেউ যেন অস্থায়ী কর্মচারীদের শ্রমের অপব্যবহার করতে না পারেন৷

বাংলাদেশের আইনে এতসব সুরক্ষা নেই৷ যা-ও আছে তা ঠিকমত মানা হয় না৷ মজুরির প্রশ্নে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো থাকলেও বেসরকারি খাতে যেন এক অরাজকতা চলছে৷

সরকারি না বেসরকারি, কারা বেশি বেতন পান এই বিতর্ক আজীবনের৷ এ লেখায় সেই বিতর্ক অর্থহীন৷ বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সম্প্রতি বর্তমান সরকার অনেকটাই বদলেছে৷ এখন সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ স্কেলের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা৷ এই বেতন ২০টি গ্রেডে বিভক্ত৷

এ কাঠামোতে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে যোগ দেওয়া একজন চাকরিজীবীর মূল বেতন হবে মাসে ২২ হাজার টাকা, যা ঠিক আগের কাঠামোতে ১১ হাজার টাকা ছিল৷ এর সঙ্গে যুক্ত হবে এলাকা অনুযায়ী বাড়িভাড়া এবং গ্রেড অনুযায়ী চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা৷ এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়৷

কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়টি কি একেবারেই আড়ালে থেকে যাবে? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পোশাক শিল্প ছাড়া আর কোথাও ওয়েজবোর্ড নেই৷ প্রশ্ন হলো, কেন নেই? তিনি যেসব উত্তর দিয়েছেন, তা বেসরকারি খাতের বড় কর্তাদের ক্ষেত্রে খাটে৷ কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য একেবারেই অসাড়৷

জার্মানির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক ফারাক৷ তাই তুলনা অনেক ক্ষেত্রেই খাটে না৷ কিন্তু তারপরও কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাটিই হলো জনগণকে সুরক্ষা দেয়া৷ যে রাষ্ট্র যে অবস্থানে থাকবে, সে রাষ্ট্র তার সাধ্য অনুযায়ী জনগণের সুরক্ষা দেবে৷ সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখা বেসরকারি চাকরিজীবীরা নিশ্চয় সেই সুরক্ষার আওতা থেকে বাদ যাবেন না৷

অর্থনীতির প্রয়োজনেই সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে থাকে৷ ব্যবসায়ীরা এতে লাভবানও হন৷ উদাহরণস্বরূপ, পোশাক শিল্পের কথাই ধরা যাক৷ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই বাণিজ্যিক খাতে ব্যবসায়ীরা নানা সুযোগ-সুবিধা পান৷

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, স্বল্প মূল্যের শ্রমই এই খাতকে এত বড় করার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে৷ কিন্তু যুগ যুগ ধরে এই খাতে শ্রমজীবীদের স্বার্থ অনেক মালিকের দ্বারাই লঙ্ঘিত হয়েছে৷ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এই শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরিও বাড়ানো হয়েছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে৷

কিন্তু ব্যক্তি খাতের অন্যান্য জায়গাগুলোতে অনেক নৈরাজ্য চলছে৷ বিশেষ করে ‘ইনফর্মাল' শ্রমের ক্ষেত্রে৷ বাড়ির বুয়া বা দারোয়ান বা একজন কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই৷

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত করে বাজার ব্যবস্থা৷ অর্থাৎ চাহিদা, যোগান ও প্রতিযোগিতাই নির্ধারণ করে শ্রমের মূল্য৷ এটিই পুঁজিবাদী সমাজের নিয়ম৷ কিন্তু কল্যাণ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, শ্রমদাতাদের সুরক্ষার বিষয়টি, যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত৷

মালিকদের মর্জির ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু৷ এর একটি বড় কারণ, শ্রমের বাড়তি জোগান৷ প্রতি বছর দেশের বাজারে যুক্ত হন ২৬ থেকে ২৭ লাখ নতুন শ্রম৷ যোগানের আধিক্য একদিকে যেমন শ্রমের মূল্য কমায়, তেমনি কমায় শ্রমের মান৷ আর মালিকরা এই সুযোগে কম পয়সায় বেশি মুনাফার সুযোগ খোঁজেন৷ আর এখানেই দরকার সরকারের হস্তক্ষেপ৷

Zobaer Ahmed (Zobaer Ahmed)

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

শুধু বাজারই শ্রমের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন ধারণা পোষণ করলে তা দেশের অর্থনীতির ক্ষতিই করবে৷ লাভ কিছু হবে না৷ তাই ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির বাংলাদেশেও সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে, সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে৷

জার্মানি বা উন্নত দেশগুলোতে আট ঘন্টার বেশি কাজ করানো হলে, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে৷ কিন্তু বাংলাদেশের ব্যক্তিখাতে শুধু শ্রমই কেনা হয় না, প্রতিষ্ঠানগুলো যেন শ্রমিককেই কিনে নেয়৷

এ অবস্থার উত্তরণ দরকার৷ হয়ত একদিনেই হবে না৷ কিন্তু এর উপায় বের করতে হবে৷

‘ফর্মাল' খাতগুলোতে একটা সিস্টেম এরই মধ্যে আছে৷ ইন্ডাস্ট্রি বিশেষে অন্তত ন্যূনতম মজুরি ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা সম্ভব৷ সেই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ইউনিয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে৷ সেই ইউনিয়ন মালিকদের সঙ্গে আঁতাত রক্ষার ইউনিয়ন নয়, সত্যিকারের শ্রমের স্বার্থরক্ষার ইউনিয়ন হতে হবে৷ আর ‘ইনফর্মাল' খাতগুলোতেও সমিতি বা ইউনিয়নের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে৷

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, শ্রমিক বাঁচলেই শ্রম বাঁচবে৷ আর শ্রম বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, বাঁচবে অর্থনীতি, বাঁচবে রাষ্ট্র৷ তাই রাষ্ট্র হোক সবার জন্য কল্যাণকর৷

এই বিষয়ে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو