সাক্ষাৎকার

সব স্কুলে ‘স্যানিটারি প্যাড সার্ভিস’ চালুর স্বপ্ন প্রভার

তাঁর নাম মারজিয়া প্রভা৷ তিনি একটি উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত যেটি স্কুল ছাত্রীদের মধ্যে মাসিক নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে৷ গরিব ছাত্রীদের বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাডও দিয়ে থাকেন তাঁরা৷

মারজিয়া প্রভা

মারজিয়া প্রভা

উদ্যোগটির নাম ‘ডোনেট এ প্যাড ফর হাইজিন বাংলাদেশ’৷ প্রভা তার প্রধান সমন্বয়কারী৷ ডয়চে ভেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা জানান৷

ডয়চে ভেলে: মেয়েদের ঋতুস্রাব নিয়ে আপনারা একটা সচেতনতার কাজ শুরু করেছেন৷ কীভাবে এটা শুরু করেছিলেন?

মার্জিয়া প্রভা: ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতে ‘হ্যাপি টু ব্লিড’ নামে একটা আন্দোলন শুরু হয়৷ ওদের মূল ক্যাম্পেইনটা ছিল মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের ঢোকা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে৷ ঐ মন্দিরের পুরোহিত বলেছিলেন, একজন মেয়ে যে ঋতুমতী নন এবং তিনি যে মিথ্যে বলে মন্দিরে ঢুকে দেবতা ও মন্দিরকে অপবিত্র করছেন না, তার নিশ্চয়তা কী? তাই এই নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি৷ তার মানে হল মেয়েরা ঋতুমতী হলে অচ্ছুত হয়ে যায়৷ এটার প্রতিবাদে সারা ভারতে মেয়েরা ঐ আন্দোলন শুরু করে৷ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে নিজেদের প্রথম মাসিকের বর্ণনা দেওয়া শুরু করে মেয়েরা৷ প্রোফাইল ছবি বদল করে নিজেদেরকে আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত করেন অনেক মেয়ে৷ বাংলাদেশে আমিও এটা নিয়ে লেখালেখি করি৷ এর ফলে প্রচণ্ড গালিগালাজের সম্মুখীন হই৷

এই পরিস্থিতির মধ্যে গত বছর বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে হুট করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়াতে একটা ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনে উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণ পাই৷ আমাকে এমনি বেড়াতে যাওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল৷ আমার দুই বন্ধু মাটি ভাই ও তারেক ভাই আমাকে ওখানে নিয়ে যায়৷ তখন আমি কিছু প্যাড সেখানে নিয়ে যাই৷ বিভিন্নজন আমাকে প্যাড ডোনেট করে৷ প্রায় ৬/৭শ’ প্যাড সেখানে নিয়ে যাই৷ কিন্তু ওখানে গিয়ে মাথায় হাত৷ এরা নোংরা কাপড়, পাতা, কাপড়ের মধ্যে বালি ভরে ব্যবহার করে৷ অনেকে কিছুই ব্যবহার করে না৷ রক্ত পেটিকোটে পড়লে নদীতে গিয়ে অনেকক্ষণ ডুব দিয়ে আসে৷ এভাবেই মাসিকের তিন দিন যায় তাদের৷ আমি শুনছিলাম আর হতভম্ব হচ্ছিলাম৷ কাপড় ব্যবহার করে কড়া রোদে শুকালেও কথা ছিল! লজ্জায় তারা বাইরেও নেড়ে দেয় না৷ নোংরা ভেজা সেই কাপড় পরেই কাজ করে৷ আর তাতেই শরীরে ইনফেকশন বাসা বাঁধে৷

অডিও শুনুন 14:23

‘৪০ ভাগ নারী প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে জানেই না’

এই কাজ করতে গিয়ে আপনি কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন?

শুরু থেকেই প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছিল৷ লেখালেখি যখন করতাম তখন তো অনেকেই গালিগালাজ করেছে৷ শুধু এই কারণে বড় দু'টি গ্রুপ থেকে আমাকে ‘ব্যান’ করে দেয়৷ আমি কেন এটা করি সেটা নিয়ে তারা অনেক কথা বলেছে৷ অনেকে তখন বলেছে, আপনি কনডমও বিতরণ শুরু করেন৷ আমি তখন বলেছি, হ্যাঁ প্রয়োজনে কনডমও বিতরণ করব৷ অনেকে তখন আমাকে নষ্টা বলেও গালি দিয়েছে৷ ব, খ, ম, চ এই চার বর্ণ দিয়ে শুরু গালি আমাকে শুনতে হয়েছে৷ সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, মেয়েরাও আমাকে গালিগালাজ করেছে৷ এখন অনেকটাই গালিগালাজ কমে গেছে৷ তবে রুট লেভেলে কাজ করতে গিয়ে আমি কোনো বাধার মুখে পড়িনি৷ কেন হয়নি আমি জানি না৷ মানুষগুলো অসচেতন হোক, খুবই ধর্মান্ধ হোক, কেন যেন তারা আমাকে বাধা দেয়নি৷

আপনি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করেছিলেন নোয়াখালীর একটি গ্রামে৷ সেই প্রজেক্টের অবস্থা কী?

সেই প্রজেক্টটা চলছে৷ আমাদের অনেকগুলো ডোনার আছে, ফ্যাশন হাউজ আছে৷ তারা আমাদের টাকা দেয়, প্যাড দেয়৷ প্যাড তো আছেই, আর টাকা দিয়ে প্যাড কিনে সেগুলো আমরা তাদের কাছে পৌঁছে দেই৷ আরেকটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আছে যারা প্যাড বানায়৷ তারা আমাদের খুবই অল্প দামে সেগুলো দেয়৷ এরপর আমরা ওগুলো গরিব মেয়েদের ফ্রি দেই৷ যারা স্বচ্ছল তাদের কাছে আমরা তিন টাকা দরে বিক্রি করি৷ যেটা বাজারের দামের চেয়ে খুবই কম৷ নোয়াখালীর গ্রাম তো, সেখানে আসলে সবাই অসচ্ছল৷ ফলে সবাইকে আমাদের এটা ফ্রি দিতে হয়৷ প্রথম তিন মাস আমরা সবাইকে ফ্রি দিয়েছি৷ এখন ব্যবহার করতে করতে অনেকে ইউজড টু হয়ে গেছে৷ তারা এখন পরিবারের সাপোর্ট পাচ্ছে৷ অনেকেই আমাদের বলে তারা এখন কিনে নেবে৷

আপনারা যাদের কাছে পৌঁছেছেন তারা তো সারাদেশের নারীদের সামান্য একটা অংশ৷ যাদের প্যাড কেনার সামর্থ্য নেই তারা কী করবে?

বাজারে যে প্যাডগুলো পাওয়া যায় তার দাম তো অন্তত একশ টাকা৷ কিন্তু আমরা যেটা দিচ্ছি সেটার ১০ পিসের দাম ৩০ টাকা৷ এবার সামর্থ্যের কথা বলি৷ নোয়াখালীর গ্রামে খুবই গরিব একজন মহিলা আমাকে বলল, আপা এটা কেনার সামর্থ্য তো আমাদের নেই৷ আমরা কী করব? তখন আমি তাকে বললাম আপনার স্বামী চা-সিগারেট খায়? সে বলল খায়৷ কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খায়৷ সে বলল গোল্ডলিফ খায়৷ তাহলে তো তার প্রতিদিন ৫০-৬০ টাকা সিগারেটের পেছনেই চলে যায়৷ তাহলে মাসে সে কেন আপনাকে ৫০ টাকা দিতে পারবে না? তখন সে বলল, দেয় না তো৷ না দিলে আমি কী করব? তখন আমি বুঝলাম রুট লেভেলে টাকা একটা সমস্যা কিন্তু আসলে ইচ্ছে করলে এটা দিতে পারে৷ সস্তায় দিলেও অনেকে কিনবে না৷ কারণ তাদের আসলে ইচ্ছেটাই নেই৷

আপনি বলছিলেন, গ্রামের অধিকাংশ মানুষকে আপনি পুরনো কাপড় ব্যবহার করতে দেখেছেন? এই পুরনো কাপড় ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকটা কি?

পুরনো কাপড় কিন্তু ক্ষতিকর না৷ কিন্তু সেটা হাইজেনিক করে নিতে হবে৷ আমি আমার মায়ের কাছে শুনেছি, তারা যখন পুরনো কাপড় ব্যবহার করত, তখন ঐ কাপড়টা ঘরের সবচেয়ে কোনার মধ্যে রেখে দিত৷ তাদের মধ্যে কুসংস্কার ছিল- রক্তমাখা কাপড় দেখলে নাকি পুরুষ লোক অন্ধ হয়ে যায়৷ কোথা থেকে এটা এসেছে আমি জানি না৷ কিন্তু এই কুসংস্কারটা এখনো আছে৷ পুরনো কাপড়টা যে সে ব্যবহার করছে সে তো ওটা পুরোপুরি ধুয়ে রক্ত পরিষ্কার করে নিতে পারছে না৷ আবার শুকাতে দিচ্ছে ঘরের কোনে৷ ফলে ওটাতে তো জীবাণু জমে যাচ্ছে৷ এরপর সে আবার সেটা ব্যবহার করছে৷ এর ফলে তার ইনফেকশন হচ্ছে৷ এতে তার জরায়ুর মুখে ক্যানসার হতে পারে, যেটা নোংরা কাপড় থেকে হয়৷ আমি এ পর্যন্ত কারো কাছেই শুনিনি সে পুরনো কাপড়টা ৯০ ভাগও জীবাণুমুক্ত করতে পেরেছে৷

প্যাড ব্যবহারের কোনো ক্ষতিকর দিক আছে কিনা?

জেল প্যাড ব্যবহারে ক্ষতি আছে৷ সারা বিশ্বেই কটন প্যাড ব্যবহারের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে৷ এটা নিয়ে এক ধরনের আন্দোলনও হচ্ছে৷ এই প্যাডটা সবচেয়ে আরামদায়ক, সবচেয়ে ভালো৷ জেল প্যাড ব্যবহার করা ক্ষতিকর৷ ওখানে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়৷

প্যাড ব্যবহারে কি ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ আছে?

এই ধরনের কোনো কথা আমি কখনও শুনিনি৷

বাংলাদেশে কত শতাংশ নারী প্যাড ব্যবহার করে?

আমি যে স্কুলে সার্ভে করেছিলাম তাতে দেখেছিলাম ৬৮ ভাগ নারী প্যাড ব্যবহার করত না৷ সেনোরার একটা সমীক্ষায় আমি পেয়েছি, ৮৭ ভাগ নারীই প্যাড ব্যবহার করে না৷ আমার গবেষণায় আমি দেখেছি ৪০ ভাগ নারী প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে জানেই না৷ আর সেনোরা বলছে, এই সংখ্যা ৭১ ভাগ৷

গ্রামের স্কুলের কিশোরীদের যে লজ্জাবোধ, এটা থেকে বের হওয়ার পথ কী?

আমরা তো প্রথমে সেমিনার করি৷ তারপর প্যাড পাঠানো শুরু করি৷ প্রথম দিন হয়কি কেউ কোনো কথা বলতে চায় না৷ পরে ছেলেদের রুম থেকে বের করে দিয়ে তাদের সঙ্গে আস্তে আস্তে কথা বলি৷ এরপর তারা মুখ খুলতে শুরু করে৷ আমাদের সঙ্গে ডাক্তার ছিল৷ বারবার বলার পর তারা স্বাভাবিক হতে শুরু করে৷ প্রথম সেশনে তো সবাই হাসাহাসি করে৷ শেষে গিয়ে তারা প্যাড উঁচু করে বলে আপা আমরা প্যাড ব্যবহার করি৷

আপনি যে সচেতনতার কাজ শুরু করেছেন, এটা নিয়ে আপনি কতদূর যেতে চান?

আমার মূল কাজ হচ্ছে প্যাডের দাম কমানো৷ এটা নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি৷ আমি যাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি তারা আমাদের কম দামে দিচ্ছে, কিন্তু এভাবে তো এগুবে না৷ আমি চাই প্রতিটি স্কুলে প্যাড সার্ভিস থাকবে৷ আমি ঢাকার একটি স্কুলে পড়েছি৷ সেখানেও আমাদের প্যাড সার্ভিস ছিল না৷ আমি চাই, কোনো মেয়েকে দোকানে যেতে হবে না, সে স্কুল থেকেই এটা নিতে পারবে৷ এই সার্ভিস আমি সব স্কুলেই করতে চাচ্ছি৷ আমার স্বপ্ন এটা সারাদেশে এটা ছড়িয়ে দেয়া৷ জানি না কীভাবে হবে, তবে এটা আমার স্বপ্ন৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو