1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

সমুদ্রের উষ্ণতা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ চলছে

৫ নভেম্বর ২০১০

সমুদ্রপৃষ্ঠ ও সমুদ্রের গভীরে তাপমাত্রার পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে আর দেরি নেই৷ সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের এই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে ইউরোপে৷

https://p.dw.com/p/PzKz
ছবি: AP

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করতে রাজনৈতিক মহলে সাধারণত বড় বড় কথা শোনা গেলেও কার্যক্ষেত্রে তেমন ফলাফল দেখা যায় না৷ কিন্তু বাজারের চাহিদা এমন এক শক্তি, যা উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই সরকার বা প্রশাসনের৷ বিশেষ করে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও জ্বালানির মূল্য ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলায় মুক্ত বাজার অর্থনীতির স্বার্থেই বিকল্প জ্বালানির চাহিদা ও ব্যবহার বেড়ে চলেছে৷ বাজারের শক্তির উপর ভর করে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করতে পারলে মন্দ কী?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, যে জ্বালানির জন্য বিকল্প শক্তির ব্যবহারের ভাবনা নতুন নয়৷ কাগজে কলমে কেউ না কেউ তা আগেই ভেবে রেখেছে, শুধু নানা কারণে তা বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় নি৷ জার্মানির মত দেশে বিদ্যুতের মূল্য যেভাবে বেড়ে চলেছে, তার ফলে এই সব বিকল্প পথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগ্রহ বাড়ছে৷ যেমন সমুদ্রের উত্তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবা হচ্ছে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা সাধারণত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার থেকে বেশি৷ অন্যদিকে ১,০০০ মিটার গভীরে তাপমাত্রা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ অর্থাৎ এই দুই স্তরের মধ্যে তাপমাত্রার ফারাক ২০ ডিগ্রিরও বেশি৷ ঠিক এই পার্থক্যকে কাজে লাগিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব৷

Klima Meeresspiegel Anstieg
ছবি: picture-alliance/ dpa

সমুদ্রশক্তির ব্যবহার

এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে যারা কাজ করছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের আধা সরকারি জাহাজ নির্মাণ সংস্থা ডিসিএনএস৷ বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওশান থার্মাল এনার্জি কনভার্শন' বা ‘ওটেক'৷ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতিও বেশ সহজ৷ প্রথমে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের গভীরের ঠাণ্ডা জল সমুদ্রপৃষ্ঠে পাম্প করা হয়৷ এই ঠাণ্ডা জল এক বিশেষ ধরণের গ্যাসকে তরল পদার্থে পরিণত করে৷ সব শেষে এই তরল গ্যাস সমুদ্রপৃষ্ঠের গরম জলের সংস্পর্শে এসে ফুটতে থাকে৷ এই প্রক্রিয়া চালু রাখলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার টার্বাইন বা বিশাল চাকা ঘোরানো সম্ভব৷ কয়লার সাহায্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেও প্রায় একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়৷

তবে ‘ওটেক'এর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা অনেক কম থাকে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনোরকম কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন ঘটে না৷ ফলে এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব৷ ডিসিএনএস'এর প্রতিনিধি এমানুয়েল ব্রশার এসম্পর্কে আরও জানালেন, ‘‘বায়ুশক্তি বা সৌরশক্তির ক্ষেত্রে সবসময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়৷ কখন বাতাস বইবে বা কখন রোদ উঠবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়৷ অথচ সমুদ্রের এই শক্তি কাজে লাগিয়ে একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়৷ এটা একটা বিশাল সুবিধা৷''

বাস্তবে প্রয়োগ

গত শতাব্দীর আশির দশকেই সমুদ্রশক্তি চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল৷ বেশ কিছু প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক যন্ত্রও তৈরি হয়েছিল৷ কিন্তু সেসময়ে তেলের দাম কম থাকায় খরচে পোষায় নি৷ এখন তেলের দাম বেড়ে চলায় ও পরিবেশের ক্ষতির কারণে ‘ওটেক' পদ্ধতি আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে৷ এমানুয়েল ব্রশার বেশ কিছু বড় আকারের প্রকল্পের কথা জানালেন৷ তিনি বললেন, ‘‘আমরা প্রাথমিক স্তরে এক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি, যা ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে৷ ইতিমধ্যে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে এক রিপোর্টও তৈরি হয়ে গেছে৷ এই মডেল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল আমাদের এই প্রযুক্তির জন্য বিনিয়োগকারীদের মন জয় করা৷ ২০১৫ সালে আমাদের কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে বলে আমাদের মনে আশা রয়েছে৷''

এই মডেল প্রকল্প আসলে ২০ থেকে ৩০ মিটার ব্যাসের এক কৃত্রিম দ্বীপের মতো৷ তাতে রয়েছে এক লম্বা পাইপ, যা সমুদ্রের নিচে প্রায় ১,০০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত৷ রয়েছে এক বাস্পচালিত টার্বাইন যন্ত্রও৷ শুনতে সহজ মনে হলেও গোটা কাঠামোটি কিন্তু অত্যন্ত জটিল, যেমনটা বুঝিয়ে বললেন এমানুয়েল ব্রশার৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘এমন এক উৎপাদন কেন্দ্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে৷ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, এমন এক প্ল্যাটফর্ম ঠিক কোথায় বসানো হচ্ছে, সেই অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মের আকার ও আয়তন স্থির করতে হয়৷ যেমন ভারত মহাসাগরে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা ক্যারিবিয় সাগরের তুলনায় অনেক বেশি৷ ভাসমান এক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সেই ধাক্কা সামলাতে হবে৷ তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল পাইপ নিয়ে, যা দিয়ে সমুদ্রের গভীরের ঠাণ্ডা জল তোলা হবে৷ এই পাইপ হতে হবে স্থিতিশীল, অথচ এর মূল্য বেশি হলে চলবে না৷''

সমুদ্রশক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সেই এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের উপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে৷ বিচ্ছিন্ন যেসব দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন, তাদের জন্য এমন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷

প্রতিবেদন: সঞ্জীব বর্মন

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল ফারূক