ভারত

সিনেমা থেকে বাস্তব, কতটা এগোলো স্বচ্ছ ভারত অভিযান?

প্রেমিকের বাড়িতে এসে থ হয়ে গিয়েছিল জয়া৷ এত ভালবাসে যে মানুষটা, সে শৌচাগারের ব্যবস্থা করেনি৷ প্রকৃতির ডাকে যেতে হবে মাঠে-ঘাটে৷ তাই শ্বশুরবাড়িতে এসেই স্বামীকে ছেড়ে চম্পট দেয় জয়া৷ মোদীর ভারতের এটাই কি বাস্তব চিত্র?

Indien | Clean India Mission in Schulen (P. Samanta)

গত ১১ আগস্ট মুক্তি পাওয়া অক্ষয় কুমারের নতুন ছবি ‘টয়লেট এক প্রেম কথা'য় এই গল্পই দেখানো হয়েছে৷বার্তাটা খুব সহজ– প্রেম যতই নিবিড় হোক না কেন, তা ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে যদি বাড়িতে শৌচাগার না থাকে!

কেন্দ্রীয় সরকারের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই ছবিটি৷ সেখানে জয়া যে সমস্যার কথা তুলে ধরেছে, বাস্তবে তা পরখ করতে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জে্ সফর করেছে ডয়চে ভেলে৷ মূলত কলকাতা থেকে দূরবর্তী গ্রাম বা মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এনডিএ সরকারের প্রকল্প, সেটাই খতিয়ে দেখার চেষ্টা সরেজমিনে৷ 

ডয়েচে ভেলের প্রথম গন্তব্য নদিয়া জেলার হরধামের পারনিয়ামতপুর গ্রাম৷ শিয়ালদহ রানাঘাট শাখায় পায়রাডাঙ্গা স্টেশন থেকে এই গ্রামের দূরত্ব ৬-৭ কিলোমিটার৷ এই গ্রামে প্রাথমিক স্কুলটি ছয় দশকেরও বেশি পুরোনো৷ স্কুলের মাঠের একধারে তৈরি হয়েছে দু'টি শৌচাগার৷ এগুলি বেশ পরিচ্ছন্ন৷ পড়ুয়ারা নিয়মিত সেটা ব্যবহার করে৷ পাড়ার রাস্তাতেই দেখা হলো পারনিয়ামতপুরের বাসিন্দা ক্ষুদিরাম ঘোষের সঙ্গে৷ এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার মতো তিনিও কৃষিজীবী৷ তাঁর সন্তানও এই প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া৷ ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সূচনা করেছিলেন, তার সুফল মিলেছে বলে জানালেন ক্ষুদিরাম৷

অডিও শুনুন 00:39

‘ছাত্র-ছাত্রীরা এখন অনেকটাই সচেতন’

শুধু কেন্দ্রীয় প্রকল্প নয়, রাজ্য সরকারের উদ্যোগেও নির্মল বাংলা প্রকল্পেও সাফসুতরো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল৷ ক্ষুদিরাম বলেন, ‘‘আগে যেখানে-সেখানে লোকজন রাস্তাঘাট নোংরা করে রাখত৷ মাঠ-ময়দানে যাওয়া যেতো না৷ এখন সে সব দেখতেই পাবেন না৷''

চার দশক আগে ক্ষুদিরাম যখন এই স্কুলে পড়তেন, তখন কোনও শৌচাগার ছিল না৷ পারনিয়ামতপুরের স্কুলে ১৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করা মিঠু মণ্ডল এই পরিবর্তনটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন৷ শুধু সরকারি প্রকল্পের ঢক্কানিনাদ নয়, এই অভিযান একটা সামাজিক আন্দোলনেরও জন্ম দিয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ছাত্র-ছাত্রীরা এখন অনেকটাই সচেতন৷ এখন আর ওদের শৌচাগার ব্যবহারের কথা বলে দিতে হয় না৷ এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনও সক্রিয়৷''

শিক্ষিকা মিঠু মণ্ডল আরো বলেন, ‘‘পঞ্চায়েত আমাদের কাছ থেকে পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়মিত নেয়৷ কোথাও কোনও ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করার চেষ্টা করে৷ কোনও পড়ুয়ার বাড়িতে শৌচাগার না থাকলে আমরা পঞ্চায়েতকে জানিয়ে তা নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিই৷''

পারনিয়ামতপুরের মতো গ্রামে অভিযানের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর নজরদারি চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ মিঠু বলেন, ‘‘কেন্দ্রের একটি্ দল স্কুল পরিদর্শনে এসেছিল৷ তারা মূলত পরিচ্ছ্ন্নতার দিকটি খুঁটিয়ে দেখেছে৷ এ নিয়ে কোনও সমস্যা আছে কিনা জানতে চেয়েছে৷'' 

তিন বছর আগে শুরু হওয়া স্বচ্ছ ভারত অভিযান মোদী সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ' প্রকল্প৷ ৪০৪১টি গ্রাম-শহরকে ২০১৯-এর ২ অক্টোবরের মধ্যে পরিচ্ছন্ন করে তোলাই এই অভিযানের লক্ষ্য৷ মূলত খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাস বদলে ফেলার উদ্দেশ্যে সচেতনতার প্রসার ও পরিকাঠামো নির্মাণ চলছে৷ এই অভিযানে যুক্ত রয়েছেন ৩০ লক্ষ সরকারি আধিকারিক৷ ২০১৬-র হিসেব অনুযায়ী, গ্রামে ১ কোটি ৬০ লক্ষ শৌচালয় তৈরি হয়েছে৷ ২০১৯-এর মধ্যে গ্রাম-শহর মিলিয়ে ১২ কোটি শৌচালয় তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে৷

অডিও শুনুন 08:16

‘কেন্দ্রের একটি্ দল স্কুল পরিদর্শনে এসেছিল’

পারনিয়ামতপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে এই অভিযানের সাফল্য লক্ষ্য করা গেলেও সব জায়গায় ছবিটা একরকম নয়৷ যেমন পশ্চিম মেদিনীপুরের মহকুমা শহর ঘাটালের বসন্তকুমারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়৷ এই স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী অয়ন্তিকা মিশ্র জানিয়েছে, তাদের স্কুলের শৌচাগার ততটা সাফসুতরো নয়৷ অনেক সময়ই পরিচ্ছন্নতার অভাবে দুর্গন্ধ ছড়ায়৷ অয়ন্তিকা অবশ্য এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি দায়ী করতে চায়নি৷ তার ভাষায়, ‘‘আমার সহপাঠীদের মধ্যেই সচেতনতার অভাব৷ অনেকেই টয়লেটে গিয়ে জল দেয় না৷ পিরিয়ড চলাকালীন টয়লেট ব্যবহারের পর ঠিকভাবে পরিষ্কার করে না৷ অনেকে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলেও সবাই নয়৷''

অথচ বসন্তকুমারীর প্রধান শিক্ষিকা বীণা মান্না জানান, প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসে সাতদিন ধরে রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা সপ্তাহ পালিত হয়৷ সেখানে ছাত্রীদের পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হয়৷ কিন্তু তাতেও শৌচাগার সবসময় পরিষ্কার রাখা সম্ভব হচ্ছে না৷ প্রধান শিক্ষিকা জানালেন, ‘‘শুধু গ্রাম থেকে আসা মেয়েরা নয়, শহরের সম্ভ্রান্ত-শিক্ষিত পরিবারের মেয়েদের মধ্যেও বদভ্যাস দেখতে পাই৷ স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া ও তা ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার ব্যবস্থাও আছে৷ পর্যাপ্ত জল থেকে ঝাড়ুদার সবেরই জোগান আছে৷ কিন্তু, সব ছাত্রী সেটা মেনে চলে না৷ বাড়িতে সেই সচেতনতা গড়ে না তুলতে না পারলে এর থেকে মুক্তি নেই৷''

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, কলকাতার প্রথম সারির একটি হাসপাতালের চিকিৎসক সৈয়দ মোনাজাতুর রহমান ছাত্রীদের মধ্যে এই সচেতনতা গড়ে তোলার উপর জোর দেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে বড় কারণ সংক্রমণ৷ মহিলারা পরিচ্ছন্ন না থাকলে এই সংক্রমণের হার বেড়ে যায়৷ বন্ধ্যাত্ব না হোক, মূত্রনালীর সংক্রমণ আকছার দেখা যায় একই কারণে৷ আমরা সবসময় বলি, সংক্রমণ এড়াতে সাফসুতরো থাকতে হবে এবং কাপড়ের বদলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হবে৷'' ডা. রহমান আরো বলেন, ‘‘আমাদের দেশে স্বচ্ছ ভারতের মতো একটা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দরকার ছিল৷ বিশেষত মহিলাদের জন্য৷ কিন্তু, এই বিষয়টি এতদিন তেমন গুরুত্ব পায়নি৷ অভিযান সফল হবে আশা করি৷'' 

অডিও শুনুন 01:34

‘অনেকে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলেও সবাই নয়'

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মাঠে-ঘাটে শৌচকর্ম করার অভ্যাস একেবারে বদলে গিয়েছে, এ কথা বলা যাবে না৷ তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত৷ শালবনির ধাঁচাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃণালকান্তি মাহাতো বলেন, ‘‘ছাত্রদের নিয়মিত বিষয়টি বোঝানো হয়৷ কিন্তু সবার বাড়িতে যতদিন না শৌচালয় হচ্ছে, ততদিন শুধু স্কুলে শেখালে এতদিনের অভ্যাসে বদল হবে না৷''

রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের রুক্ষ এলাকায় অন্য সমস্যাও রয়েছে৷ জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে জলের অভাব স্বচ্ছ ভারত গড়ার পথে অন্তরায়৷ এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের শিক্ষক মৃণালকান্তি৷ তিনি বললেন, ‘‘জলের সরবরাহ এখানে ভালো নয়৷ তাই ইচ্ছে থাকলেও, ছাত্রছাত্রীদের শেখালেও আমরা প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো জোগাতে পারিনি৷ অধিকাংশ স্কুলেই শৌচাগার রয়েছে৷ কিন্তু নিয়মিত জলের জোগান না পেলে সবসময় শৌচাগার ব্যবহার করা কি সম্ভব?''

‘টয়লেট এক প্রেম কথা' ছবিতে অবশ্য জয়াকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে হয়নি৷ কেশব তার স্ত্রী-র জন্য শৌচালয় তৈরি করে দিয়েছিল, সেখানে জলের জোগানও ছিল৷ হয়তো বি্দ্যা বালান ও প্রিয়াঙ্কা ভারতীর গণমাধ্যমে প্রচারও বহু মানুষকে টয়লেট সচেতনতা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে৷ কিন্তু সেলুলয়েডের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক যতটা, স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে দূরত্ব হয়তো ততটাই৷ এই দূরত্ব আগামী দু বছরের মধ্যে ঘুচিয়ে ফেলাই চ্যালেঞ্জ নরেন্দ্র মোদীর৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو