সোনার থেকেও দামি সাপের বিষ

মাদকাসক্তি যাঁদের চরমে পৌঁছেছে, হেরোইন, মারিজুয়ানা বা কোকেনেও নেশাটা ঠিক জমছে না, তাঁদের মাদকে এখন মেশানো হচ্ছে সাপের বিষ৷ তাই দিনকে দিন চাহিদা বাড়ছে সাপের বিষের৷ ফেঁপে উঠছে এই বিষের অবৈধ ব্যবসাও৷

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও কথাটা সত্যি৷ হ্যাঁ, সোনার চেয়েও সাপের বিষের দাম বেশি এখন বাজারে৷ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও মাদকাসক্ত লোকের অভাব নেই৷ এদের মধ্যে কিছু লোকের মাদকাসক্তি এমন স্তরে পৌঁছেছে, যে কোকেন, হেরোইন, মারিজুয়ানা, আফিমেও নেশাটা ঠিক জমছে না৷ তাঁদের আরও কড়া নেশা দরকার৷ তাই তাঁদের মাদকে এখন মেশানো হচ্ছে সাপের বিষ৷ ফলে সাপের বিষের চাহিদা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে৷ ফুলে ফেঁপে উঠছে ড্রাগ সিন্ডিকেটের অবৈধ ব্যবসা৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বলা বাহুলয, সাপের বিষের ব্যবসা অসম্ভব লাভজনক৷ কোটি কোটি টাকার সাপের বিষ পাচার হচ্ছে দেশের বাইরেও৷ এ মুহূর্তে এক লিটার সাপের বিষের বাজার দাম প্রায় চার কোটি টাকা৷ ভারতে বিষ নিষ্কাশনের জন্য ধরা হয় প্রধানত চার প্রজাতির সাপ – গোখরো, রাসেল ভাইপার, পিট ভাইপার এবং শাখামুটে৷ বিষ নিষ্কাশনের পর সেই বিষ চালান করা হয় দেশে এবং বিদেশে৷ দেশে চোরা চালানকারীদের নারকটিক সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক ব্যাপক৷ সরকারি নজরদার এজেন্সিও নাকের ডগায়৷ কিন্তু তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না৷

বিষ থেকে হৃদরোগের ওষুধ

অস্ট্রেলিয়ার এই সাপটি সবচেয়ে বিষধর সাপ বলে ধারণা করা হয়৷ অথচ এই সাপের বিষ হৃদরোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়৷

বিছা বেশ কাজের

কাকড়া বিছার বিষ ভয়াবহ এবং এই বিষে মানুষের মৃত্যু হতে পারে৷ কিন্তু এর বিষ ব্যথা কমানোর ওষুধে এবং হৃদরোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়৷

মাকড়সা থেকে ওষুধ

এই বিষধর মাকড়সার দেখা মেলে চিলিতে৷ আর হৃদরোগ উপশমে ব্যবহার করা হয় এটিকে৷ বিশেষজ্ঞদের ধারণা এটির বিষ বন্ধ্যাত্ব দূর করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷

বাতের ব্যথা সারায় মৌমাছির হুল

বাতের ব্যথা কমাতে ‘মৌমাছির হুল’ চিকিৎসা করা হয়৷ দেহের যে স্থানে ব্যথা থাকে সেখানে হুল ফোটানো হয়৷ চিকিৎসার এই ধরন প্রায় তিন হাজার বছরের পুরানো৷

আলজাইমারের চিকিৎসা

বিজ্ঞানীরা বলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় হলুদ রংয়ের এই সাপের বিষ স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে৷ অর্থাৎ আলজাইমারের ক্ষেত্রে এই সাপের বিষ অত্যন্ত ভালো ওষুধ৷

বেদনানাশক শামুক

শামুকের মুখ থেকে এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ বের হয়৷ এটি বেদনানাশক ওষুধে ব্যবহৃত হয়৷

কোবরার বিষ

গলায় কালো রংয়ের এই কোবরা বা কেউটে সাপের বৈশিষ্ট্য হল, এরা ফনা তুলে বাতাসে বিষ ছোড়ে৷ এর বিষ অত্যন্ত মারাত্মক৷ কিন্তু এই বিষই অনেক রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়৷

বহুমূত্র রোগের চিকিৎসা

এই প্রজাতির টিকটিকির বিষ ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগের ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়৷ এর লালায় বিশেষ ধরনের একটি রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে৷

তবে একেবারে ধরাও যে পড়ছে না, তা নয়৷ বিষের চোরা চালানকারীরা প্রায়ই ধরা পড়ছে বন বিভাগের জালে৷ কিন্তু তাতে চোরা ব্যবসায় ইতরবিশেষ কিছু হয়নি৷ গত মাসে বন্যজীবন অপরধ দমন ব্যুরো এবং গুজরাটের বন বিভাগ আমির খান নামে একজন চোরা চালানকারীকে গ্রেপ্তার করে৷ তার কাছে পাওয়া যায় ৮০ মিলি লিটার সাপের বিষ, যার বাজার দাম সাত-আট লাখ টাকা৷ বিহারের পুর্ণিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় আরো দু'জনকে৷ তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এক বোতল সাপের বিষ৷ এতে ছিল ৯০০ গ্রাম গোখরো সাপের বিষ, যার বাজার দাম তিন কোটি টাকা৷ বোতলের গায়ে লেবেলে লেখা ছিল মেড ইন ফ্রান্স৷ জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে বিহারে ঢোকে সেই বিষ

দিল্লির রাজধানী এলাকায় সম্প্রতি ধরা পড়ে সাপের বিষের আরো কিছু চোরা চালানকারী৷ উত্তর প্রদেশ রোডওয়েজের বাসে তারা যাচ্ছিল মিরাটের দিকে৷ গোপনসূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে৷ তাদের কাছে ছিল সফটড্রিঙ্কের বোতলে ৫০০ মিলি লিটার সাপের বিষ৷ শুধু তাই নয়, তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দু-দু'টো জ্যান্ত সাপও, যা রাখা ছিল থার্মোকলের বাক্সে৷ বিষের বোতল ও বাক্সটা যে ট্রাভেল ব্যাগে ছিল, তাতে ঝুলছিল বিমান সংস্থার ট্যাগ৷ অর্থাৎ সেসব এসেছিল দেশের বাইরে থেকে৷ মিরাট হয়ে সম্ভবত তা যাচ্ছিল নেপালে৷

সি ওয়্যাসপ্স

এরা জেলিফিশের একটি প্রজাতি৷ কয়েক স্তরের কর্ষিকা এবং লক্ষ লক্ষ স্নিডোসাইট রয়েছে এদের৷ কেউ যদি এটা স্পর্শ করে তাহলে এই কর্ষিকার মাধ্যমে কয়েক লাখ সূক্ষ্ম বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে দেয় দেহে৷ যেখানে হুল ফোটানো হয় সেখানে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়৷ তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না নিলে ৩ মিনিটের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে ঐ ব্যক্তি৷ সি ওয়্যাসপ্স-এর লেজে এ পরিমাণ বিষ থাকে যে তাতে ২৫০ জন মানুষ মারা যেতে পারে৷

বিষাক্ত ব্যাং

এই উজ্জ্বল হলুদ রংয়ের প্রাণীটি বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত ব্যাং৷ এরা দক্ষিণ ও মধ্য অ্যামেরিকায় পাওয়া যায়৷ এরা একবারে দশজন মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে৷

রিফ ফিশ

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে সাগরের তলদেশে পাথরের মধ্যে এদের দেখতে পাওয়া যায়৷ এখানে এরা পাথরের সাথে এমনভাবে মিশে থাকে চেনাই যায় না৷ এই মাছটি যখন কাউকে আক্রমণ করে তখন কাঁটা ফুটিয়ে দেয়, এর বিষের কারণে রক্তে নিম্নচাপ, ভেনট্রিকুলার ফাইব্রিলেশন এবং পক্ষাঘাত হয়, যা পরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে৷

ইনল্যান্ড তাইপান

এই সাপের বিষ ভারতের গোখরো সাপের বিষের চেয়ে ৫০ গুন বেশি শক্তিশালী৷ এ কারণে অস্ট্রেলিয়ার ল্যান্ড স্নেক সবচেয়ে বিষধর হিসেবে পরিচিত৷ ইনল্যান্ড তাইপান ২৩০ বয়স্ক ব্যক্তিকে ধরাশায়ী করতে পারে৷ তবে স্বস্তির কথা হলো এই সাপের আবাস প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে মানুষের চলাচল কম৷

সি স্নেকস ডুবোয়া

সামুদ্রিক সাপের মধ্যে এটি সবচেয়ে বিষাক্ত৷ এরা ছোবল দিলে কোথায় ছোবল দিয়েছে এবং কখন দিয়েছে সেটা টেরই পাওয়া যায়না৷ কেবল আধঘণ্টা পরে সাপের দংশের শিকার ঐ ব্যক্তির গলা শুকিয়ে যায়, এরপর সে তার হাত পা নাড়াতে পারে না৷ ধীরে ধীরে পুরো শরীর অচল হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়৷

সামুদ্রিক শামুক কোন

সামুদ্রিক শামুকের খোলের বর্ণ বৈচিত্রের কারণে ব্যাপক চাহিদা৷ কিন্তু এই যে শামুকটিকে দেখছেন এর সৌন্দর্য্যের পেছনে আছে মারাত্মক বিষ ভাণ্ডার৷ সেই বিষের এক ফোঁটায় ২০ জন মানুষ প্রাণ হারাতে পারে৷

ব্লু রিং অক্টোপাস

সাধারণ পরিবেশে এটি হালকা বাদামী রংয়ের৷ কিন্তু যখন আগ্রাসী হয়ে ওঠে তখন এর গায়ে উজ্জ্বল নীল রংয়ের রিঙ দেখা যায়৷ যখন একটি কামড়ায় তখন এর বিষাক্ত লালা স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে৷ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষটি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে৷

লাবা সিডনি

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে এই মাকড়সাদের পাওয়া যায়৷ এ ধরনের মাকড়সার বিষ মাংসপেশী ও শাসতন্ত্রকে অচল করে দেয়৷ আর বিষ যদি হৃদযন্ত্রে ঢুকে পড়ে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু৷

প্রটোপ্যালিথোয়া

এটি এক ধরনের সামুদ্রিক ফুল, যা দেখতে অনেকটা শামুকের খোলের মত৷ এই ফুল থেকে নিঃসৃত ০.০২ মিলিগ্রাম বিষ ৭০ কেজি ওজনের মানুষকে মেরে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট৷ হাওয়াই-এর আদিবাসীরা এই বিষ শিকারের জন্য বল্লমের মাথায় লাগায়৷

ডেথস্টকার কাকড়া বিছা

সবধরনের কাকড়া বিছা মানুষের জন্য হানিকর নয়৷ তুরস্ক, আরব উপত্যকা এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এদের বসবাস৷ পটাসিয়াম সায়ানাইডের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি শক্তিশালী এই কাকড়া বিছা’র বিষ৷

তবে শুধু নেপাল নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে এ সব চালান হয়ে থাকে ইউরোপীয় দেশগুলিতেও, বলেন ‘পিপলস ফর অ্যানিমেলস' নামে এক এনজিওর কর্মকর্তা সৌরভ গুপ্ত৷ সাপের বিষ দিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলি তৈরি করে অ্যান্টি-ভেনাম সিরাম৷ এটা সাপে কাটা মানুষের জীবনদায়ী ওষুধ৷ তাই সাপের বিষের এই অবৈধ ব্যবসার ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলি পড়েছে নানা ধরনের সমস্যার মুখে৷ সাতপুরা ফাউন্ডেশনের এক পরিবেশবিদ বলেন, অ্যান্টি-ভেনাম ওষুধ তৈরি চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ফারাক বাড়ছে৷ একমাত্র সরকারি হফকিন ইনস্টিটিউটই সাপের বিষ নিষ্কাশনের বৈধ সংস্থা৷ তাই এই পরিবেশবিদের মতে, এই ধরনের আরো বৈধ সংস্থা থাকা দরকার৷

ওষুধের পাশাপাশি গবেষণার কাজেও ব্যবহার করা হয় সাপের বিষ, বলেন ভারতের বন্য জীবন মনিটারিং নেটওয়ার্ক সংক্ষেপে ট্রাফিক ইন্ডিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শাখার অধিকর্তা৷ এই চার প্রজাতির সাপ ধরার পর দু-তিনবার বিষ বের করে আবার সাপগুলো জঙ্গলে ছেড়ে দেয়া হয়৷ বছর দুই আগে মহারাষ্ট্র সরকার সাপের বিষের ব্যবসাকে বৈধ করতে চেয়েছিল৷ বৈধ সাপুড়েদের সাপ ধরার অনুমতি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা৷ বিষধর সাপ হামেশাই বসত অঞ্চলে ঢুকে পড়ে৷ তাই ভাবা হয়েছিল, সেইসব সাপ ধরে সাপুড়েরা বিষ বের করে বনে জঙ্গলে ছেড়ে দেবে৷ ঠিক হয়েছিল, বছরে আট হাজারের বেশি সাপের বিষ বের করা যাবে না৷ কিন্তু এই সিদ্ধান্তে খাপ্পা হন পরিবেশবিদরা৷ তাঁদের আশংকা, এতে সাপের বিষের চোরাচালান বাড়বে বই কমবে না৷ তাছাড়া সাপের বিষ ছাড়াও বাড়বে সাপের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চোরা ব্যবসা৷

কীভাবে মাদকে মেশানো হয় সাপের বিষ? সাপের বিষ নিষ্কাশনের পর প্রথমে তা রাখা হয় খুব কম তাপমাত্রার আধারে৷ কিছুদিন পর তরল বিষ শুকিয়ে দানা বেঁধে গেলে তা গুঁড়ো করা হয়৷ তারপর তা মেশানো হয় মদ বা অন্যসব মাদকে৷ সাধারণত ১০০ লিটার মদে ১০ গ্রাম সাপের বিষের গুঁড়ো মেশানো হয়৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 09.11.2010

বন্ধু, কেমন লাগলো প্রতিবেদনটি? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷