স্পেনে প্রাচীন বাড়ির নতুন রূপ

মাটির নীচে প্রাচীন জলাধার, তার উপরেই বাড়ি৷ দুই অংশ মিলিয়ে অসাধারণ এক বাসস্থান গড়ে তুলেছেন এক জার্মান-স্প্যানিশ দম্পতি৷ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও স্থানীয় চরিত্র বজায় রেখে এমন এক উদ্যোগ পর্যটকদের আকর্ষণ হয়ে উঠেছে৷
জার্মানি ইউরোপ | 13.11.2013

অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের উপর স্পেনের লান্সারোটে দ্বীপপুঞ্জের নাম করলেই চোখের সামনে আগ্নেয়গিরির পাহাড় ও সাদা বাড়ির দৃশ্য ভেসে ওঠে৷ উপকূল থেকে দূরে লোস ভাইয়েস নামের ছোট্ট গ্রামে ইয়াইয়ো ও ওডা ফন্টেস ডে লেয়ন-এর বাড়ি৷

প্রায় ৩০ বছর আগে এই দ্বীপেই জার্মানির ওডা ও স্পেনের ইয়াইয়ো-র আলাপ হয়েছিল৷ আজ তাঁরা দারুণ সব বাড়ি ভাড়া দেন৷ তার বৈশিষ্ট্য হলো, বাড়ির সিংহভাগই মাটির নীচে অবস্থিত৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন, ‘‘একে বলা হয় আলখিবে – প্রাচীন জলাধার৷ আমরা সেটিকে বাসস্থানে রূপান্তরিত করেছি৷''

হবিট হাউজ

‘হবিট’ নাম শুনলেই মনে পড়ে জে. আর. আর. টলকিনের অনন্য সৃষ্টি ‘দ্য হবিট’-এর কথা৷ ছবির এই বাড়িটিও যেন রূপকথার রাজ্য থেকেই নেমে এসেছে৷ পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে জায়গা তৈরি, সেই জায়গায় পাশের বন থেকে খড়কুটো, গাছের ডাল ইত্যাদি জোগাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে দারুণ এক শান্তির নীড়৷ বাড়ির মেঝে বা দেয়ালেও ইট-শুড়কির চিহ্নমাত্র নেই, সবই খাঁটি মাটির তৈরি৷

নৌকাঘর

জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের ছন্দ অনেকের চোখেই ঘুম নিয়ে আসে৷ সেই শব্দের কাছে থাকতে চাইলে নদীতেই ঘর বানাতে পারেন৷ এমন ঘর অনেক আছে ইউরোপে৷ ছোট ছোট ঘরগুলো যেন নদীর জলে নৌকার মতো ভাসছে৷

সার্কাস গাড়ি

দালান কোঠা বানানোয় ঝামেলা অনেক, খরচও প্রচুর৷ কার্বন নিঃসরণ কমানোয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহীরা তাই নানা উপায়ে সেই ঝামেলা এড়িয়ে কম খরচেই বানাচ্ছেন বাড়ি৷ সার্কাসের দল যে ধরণের ওয়াগন নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতো, আজকাল সেইগুলোতেও গড়া হচ্ছে বাড়ি৷ পূর্ণাঙ্গ বাড়ির সব সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এসব বাড়ি যখন যেখানে খুশি নিয়েও যাওয়া যায়৷

অন্যরকম গ্রাম

বার্লিনে তখন পর্যটক এবং ছাত্ররা সবে দলে দলে আসতে শুরু করেছে৷ সেই তুলনায় বাড়ি-ঘর বেশ কম৷ স্থানীয় এক আবাসন বিশেষজ্ঞের মাথায় কম খরচে অভিনব বাড়ি বানানোর একটা বুদ্ধি এলো৷ পুরোনো কন্টেইনার জড়ো করলেন সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা একটা জায়গায়৷ কয়েকদিনের মধ্যেই সেই কন্টেইনারগুলোই হয়ে গেল আলাদা আলাদা বাড়ি৷ সব বাড়ি মিলিয়ে গড়ে উঠল অন্যরকম এক গ্রাম৷ অভিনব এই গ্রামের সব অধিবাসীই শিক্ষার্থী৷

বাক্সবাড়ি

বাক্স না বলে, এগুলোকে জাহাজের কন্টেইনারের মতো বলাই বোধহয় ভালো৷ পার্থক্য হলো, জাহাজের কন্টেইনার আড়াআড়ি হলেও এই ধরণের বাক্সবাড়ি দাঁড়ায় খাড়াখাড়ি৷ সব মিলিয়ে তিন তলা৷ ছোট ছোট তিনটি কামরায় কম চাহিদার আধুনিক জীবনের জন্য দরকারি সবকিছুই আছে৷

গাছবাড়ি

ইউরোপের বনে বনে ছড়িয়ে পড়ছে এ ধরণের বাড়ি৷ অনেকটাই ধাতব পদার্থের তৈরি হলেও ‘পরিবেশবান্ধব ছোট ঘর’এর ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি এসব বাড়ি৷ প্রকৃতির বুকে থাকার লোভনীয় অভিজ্ঞতার আকর্ষণে আজকাল এমন বাড়ি তৈরির দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই৷

অপরূপ কাচঘর

এক জার্মান ডিজাইনারের অপরূপ সৃষ্টি এটি৷ ঘরের ছাদ, সাগর তীর, খেলার মাঠ- মোট কথা যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা, সেখানেই এই বাড়ি বসিয়ে শুরু করতে পারেন বসবাস৷ চারপাশ কাচের বলে সারাদিন আলোকিত থাকে এই ঘর৷ ‘লফটকিউব’ দেখতেও দারুণ, তাইনা?

বাগানবাড়ি

জার্মানির প্রায় সব শহরেই দেখা যায় এ ধরণের বাড়ি৷ এটাও পরিবেশবান্ধব৷ ছোট্ট একটু জায়গার ওপর এই বাড়ি তৈরির সময় আশপাশে বাগান করার জায়গাও রাখা হয়৷ সেখানে কেউ ফুলের বাগান করেন, কেউ বা সযত্নে করেন শাকসবজির ক্ষেত৷

কয়েক'শ বছর ধরে আগ্নেয়গিরির লাভার পাথরের নীচে গোটা গ্রামের জন্য বৃষ্টির জল সঞ্চয় করা হতো৷ এখন সেটা বাসস্থান হয়ে উঠেছে৷ এই দম্পতি কাকতালীয়ভাবে নিজেদের বাড়ির পাশেই এই আধারটি আবিষ্কার করেন৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘আমরা জানতাম না আধারটা কত বড়৷ একটি গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি জায়গাটা জলে ভরা৷ স্ত্রীকে বললাম, সুন্দর জায়গা – এখানে একটা বাড়ি তৈরি করলে কেমন হয়? ব্যস, যেমন কথা তেমন কাজ৷''

এখন থাকার জায়গা দুই ভাগে বিভক্ত – নীচে বসার জায়গা, উপরে শোবার জায়গা৷ পরে জানালা লাগানো হয়েছে৷ বাকিটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা হয়েছে৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘আমরা বলেছিলাম, না না – দেওয়াল যেমন আছে সে রকম থাক, কিছুই করার দরকার নেই৷ শুধু সিল করে দিয়েছিলাম, অন্য কিছু করিনি৷ ফলে জায়গাটা এখন ভালো শিল্পীর আঁকা ছবির মতো দেখাচ্ছে৷''

এখানে যে শিল্পকীর্তি দেখা যাচ্ছে, সেগুলিও দ্বীপের নিজস্ব সৃষ্টি৷ ইয়াইয়ো জন্ম থেকেই সেখানে বসবাস করছেন৷ সেই আবেগই তিনি তুলে ধরতে চান৷ যেমন খাবিয়ের ইবানেস নামের স্থানীয় শিল্পীর তৈরি ড্র্যাগন ভাস্কর্য৷

হোটেলের প্রত্যেকটি ঘর যেন শিল্পকলা

কোনো ঘরে শয্যা বলতে একটি কফিন৷ কোনো ঘরে আসবাবপত্র ঝুলছে ছাদ থেকে৷একটি ঘরের চতুর্দিকে আয়না লাগানো – একেবারে শিশমহল! বার্লিনের এই হোটেলটির নাম ‘প্রপেলার আইল্যান্ড’৷ এর ডিজাইন করেছেন শিল্পী লার্স স্ট্রশেন৷ এমনকি তিনি প্রতিটি ঘরের জন্য আলাদা মিউজিক কমপোজ করতেও ভোলেননি...৷

রেলগাড়ি ঝমাঝম

বার্লিন থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়্যুটারবোগ৷ সেখানে অতিথিরা ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের আস্বাদ পেতে পারেন৷ স্লিপার কোচ হোটেলটিতে ২৫ জন অতিথির থাকার জায়গা আছে৷ প্রত্যেক কম্পার্টমেন্টে একটি করে ডাবল বেড, সেই সঙ্গে বসার জায়গা ও একটি বাথরুম৷

বাক্সের মধ্যে ঘুমনো

জার্মানির পূর্বাঞ্চলে কেমনিৎস-এর কাছে লুনৎসেনাউ শহরের ‘কফটেল’ বা বাক্সো হোটেলটিকে বিশ্বের খুদেতম হোটেল বললেও সম্ভবত দোষ হবে না৷ ২০০৪ সালে সৃষ্ট হোটেলটির প্রতিটি ঘর একটি সুটকেসের আকারে৷ ঘর বলতে দেড় মিটার চওড়া, তিন মিটার লম্বা আর দু’মিটার উঁচু৷ বিছানা নিজেকেই নিয়ে আসতে হয়৷ রাত কাটানোর খরচ: ১৫ ইউরো৷ বছরে শ’পাঁচেক অতিথি এই বাক্সো হোটেলে রাত কাটান৷

হবিটরা যেখানে থাকে

টলকিয়েন-এর ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর কল্যাণে হবিটদের আর কে না চেনে? তবে হবিটদের ওয়াইল্ডারল্যান্ড দেখার জন্য নিউজিল্যান্ডের ফিল্মসেটে যেতে হবে না৷ হবিটরা যেভাবে বাস করত, জার্মানির টুরিঙ্গিয়া প্রদেশের জঙ্গলেও তা করা সম্ভব – এই হোটেলটির কল্যাণে৷

‘ড্যান্সেস উইথ উল্ভস’

সন্ধ্যা নামছে, আঁধার ঘনাচ্ছে, কোথাও কোনো মানুষের সাড়া নেই৷ এই হলো উত্তর জার্মানির ব্রেমেন শহরের কাছে ‘ট্রি ইন’ বা বৃক্ষ হোটেলের পরিবেশ৷ ড্যোরফার্ডেন-এ বাচ্চা নেকড়েদের রাখার জন্য যে ‘এনক্লোজার’ আছে, তার ঠিক মাঝখানে এই ট্রিহাউস হোটেল৷ পাঁচ মিটার উঁচুতে কাচে ঘেরা কামরা থেকে পরম আরামে নেকড়ে দেখা যায় – কেননা এখানে মিনি-বার থেকে হুইর্লপুল, কোনো আধুনিক বিলাসিতার অভাব নেই৷

জলের পাইপে বাস

জার্মানির রুর শিল্পাঞ্চলের বট্রপ শহরের পার্ক হোটেল-এ রাস্তায় বসানোর জলের পাইপগুলোকে কামরায় পরিণত করা হয়েছে৷ রাত কাটানোর কোনো বাঁধা ভাড়া নেই, যে যা পারেন, তা-ই দেন৷ জলের পাইপগুলোর ব্যাস প্রায় আড়াই মিটার; এক একটা সেকশনের ওজন সাড়ে ১১ টন৷ ভিতরে বিছানা আর একটা সাইড টেবল ঠিকই ধরে যায়৷

লৌহকপাট

আগে এখানে জেলের আসামিরা বন্দি থাকতেন৷ আজ সেখানে ক্রাইম থ্রিলার-এর ফ্যানরা রাত কাটান৷ জার্মানির কাইজার্সলাউটার্ন শহরের আল্কাত্রাজ হোটেলে মোট ৫৬টি কামরা ও সুইট আছে৷ আজও এখানে সর্বত্র গারদ ও লোহার শিক – এমনকি হোটেলের পানশালাটিতেও৷ তবে অতিথিরা মর্জিমতো আসতে-যেতে পারেন৷

মদের পিপেতে শয্যা

এককালে যেখানে ওয়াইন মজুদ রাখা হতো, সেখানে আজ রাত কাটানো যায়৷ রাইন নদের ধারে রুডেসহাইম শহরের লিন্ডেনভির্ট হোটেলটিতে ছ’টি অতিকায় কাঠের পিপে আছে৷ পিপেগুলোয় মোট ছ’হাজার লিটার সুরা ধরতো৷ আজ তার বদলে দু’জন অতিথির শোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে৷ তবে বসবার ঘরটা পিপের বাইরে৷

মধ্যযুগের নাইটদের মতো

দক্ষিণ জার্মানির লেক কন্সটান্স-এর কাছে আর্টুস হোটেলে ঢুকলে মনে হবে, যেন মধ্যযুগে প্রবেশ করেছেন৷ কামরাগুলো যেন মধ্যযুগের কোনো সরাইখানার অনুকরণে সাজানো, খাবারদাবার নাইটদের আমলের ভুরিভোজ...৷

শীতকাতুরেদের জন্য নয়

নাম ইগলু লজ৷ ইগলু বলতে উত্তরমেরু অঞ্চলের এস্কিমোদের বরফের ঘর৷ ওবার্স্টডর্ফ-এ নেবেলহর্ন পাহাড়ের উপর এই বরফের হোটেলটি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস অবধি খোলা থাকে৷ ৪০ জন অতিথি এখানে দু’জন কিংবা চারজনের ইগলুতে রাত কাটাতে পারেন৷ সেই সঙ্গে রয়েছে – ভোর হলে – দু’হাজার মিটার উচ্চতা থেকে আল্পস পর্বতমালার অনুপম দৃশ্য৷

জার্মানির পূর্বাঞ্চলে কেমনিৎস-এর কাছে লুনৎসেনাউ শহরের ‘কফটেল’ বা বাক্সো হোটেলটিকে বিশ্বের খুদেতম হোটেল বললেও সম্ভবত দোষ হবে না৷ ২০০৪ সালে সৃষ্ট হোটেলটির প্রতিটি ঘর একটি সুটকেসের আকারে৷ ঘর বলতে দেড় মিটার চওড়া, তিন মিটার লম্বা আর দু’মিটার উঁচু৷ বিছানা নিজেকেই নিয়ে আসতে হয়৷ রাত কাটানোর খরচ: ১৫ ইউরো৷ বছরে শ’পাঁচেক অতিথি এই বাক্সো হোটেলে রাত কাটান৷

সমাজ সংস্কৃতি | 21.10.2015

অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের উপর স্পেনের লান্সারোটে দ্বীপপুঞ্জের নাম করলেই চোখের সামনে আগ্নেয়গিরির পাহাড় ও সাদা বাড়ির দৃশ্য ভেসে ওঠে৷ উপকূল থেকে দূরে লোস ভাইয়েস নামের ছোট্ট গ্রামে ইয়াইয়ো ও ওডা ফন্টেস ডে লেয়ন-এর বাড়ি৷

প্রায় ৩০ বছর আগে এই দ্বীপেই জার্মানির ওডা ও স্পেনের ইয়াইয়ো-র আলাপ হয়েছিল৷ আজ তাঁরা দারুণ সব বাড়ি ভাড়া দেন৷ তার বৈশিষ্ট্য হলো, বাড়ির সিংহভাগই মাটির নীচে অবস্থিত৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন, ‘‘একে বলা হয় আলখিবে – প্রাচীন জলাধার৷ আমরা সেটিকে বাসস্থানে রূপান্তরিত করেছি৷''

হবিট হাউজ

‘হবিট’ নাম শুনলেই মনে পড়ে জে. আর. আর. টলকিনের অনন্য সৃষ্টি ‘দ্য হবিট’-এর কথা৷ ছবির এই বাড়িটিও যেন রূপকথার রাজ্য থেকেই নেমে এসেছে৷ পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে জায়গা তৈরি, সেই জায়গায় পাশের বন থেকে খড়কুটো, গাছের ডাল ইত্যাদি জোগাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে দারুণ এক শান্তির নীড়৷ বাড়ির মেঝে বা দেয়ালেও ইট-শুড়কির চিহ্নমাত্র নেই, সবই খাঁটি মাটির তৈরি৷

নৌকাঘর

জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের ছন্দ অনেকের চোখেই ঘুম নিয়ে আসে৷ সেই শব্দের কাছে থাকতে চাইলে নদীতেই ঘর বানাতে পারেন৷ এমন ঘর অনেক আছে ইউরোপে৷ ছোট ছোট ঘরগুলো যেন নদীর জলে নৌকার মতো ভাসছে৷

সার্কাস গাড়ি

দালান কোঠা বানানোয় ঝামেলা অনেক, খরচও প্রচুর৷ কার্বন নিঃসরণ কমানোয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহীরা তাই নানা উপায়ে সেই ঝামেলা এড়িয়ে কম খরচেই বানাচ্ছেন বাড়ি৷ সার্কাসের দল যে ধরণের ওয়াগন নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতো, আজকাল সেইগুলোতেও গড়া হচ্ছে বাড়ি৷ পূর্ণাঙ্গ বাড়ির সব সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এসব বাড়ি যখন যেখানে খুশি নিয়েও যাওয়া যায়৷

অন্যরকম গ্রাম

বার্লিনে তখন পর্যটক এবং ছাত্ররা সবে দলে দলে আসতে শুরু করেছে৷ সেই তুলনায় বাড়ি-ঘর বেশ কম৷ স্থানীয় এক আবাসন বিশেষজ্ঞের মাথায় কম খরচে অভিনব বাড়ি বানানোর একটা বুদ্ধি এলো৷ পুরোনো কন্টেইনার জড়ো করলেন সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা একটা জায়গায়৷ কয়েকদিনের মধ্যেই সেই কন্টেইনারগুলোই হয়ে গেল আলাদা আলাদা বাড়ি৷ সব বাড়ি মিলিয়ে গড়ে উঠল অন্যরকম এক গ্রাম৷ অভিনব এই গ্রামের সব অধিবাসীই শিক্ষার্থী৷

বাক্সবাড়ি

বাক্স না বলে, এগুলোকে জাহাজের কন্টেইনারের মতো বলাই বোধহয় ভালো৷ পার্থক্য হলো, জাহাজের কন্টেইনার আড়াআড়ি হলেও এই ধরণের বাক্সবাড়ি দাঁড়ায় খাড়াখাড়ি৷ সব মিলিয়ে তিন তলা৷ ছোট ছোট তিনটি কামরায় কম চাহিদার আধুনিক জীবনের জন্য দরকারি সবকিছুই আছে৷

গাছবাড়ি

ইউরোপের বনে বনে ছড়িয়ে পড়ছে এ ধরণের বাড়ি৷ অনেকটাই ধাতব পদার্থের তৈরি হলেও ‘পরিবেশবান্ধব ছোট ঘর’এর ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি এসব বাড়ি৷ প্রকৃতির বুকে থাকার লোভনীয় অভিজ্ঞতার আকর্ষণে আজকাল এমন বাড়ি তৈরির দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই৷

অপরূপ কাচঘর

এক জার্মান ডিজাইনারের অপরূপ সৃষ্টি এটি৷ ঘরের ছাদ, সাগর তীর, খেলার মাঠ- মোট কথা যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা, সেখানেই এই বাড়ি বসিয়ে শুরু করতে পারেন বসবাস৷ চারপাশ কাচের বলে সারাদিন আলোকিত থাকে এই ঘর৷ ‘লফটকিউব’ দেখতেও দারুণ, তাইনা?

বাগানবাড়ি

জার্মানির প্রায় সব শহরেই দেখা যায় এ ধরণের বাড়ি৷ এটাও পরিবেশবান্ধব৷ ছোট্ট একটু জায়গার ওপর এই বাড়ি তৈরির সময় আশপাশে বাগান করার জায়গাও রাখা হয়৷ সেখানে কেউ ফুলের বাগান করেন, কেউ বা সযত্নে করেন শাকসবজির ক্ষেত৷

কয়েক'শ বছর ধরে আগ্নেয়গিরির লাভার পাথরের নীচে গোটা গ্রামের জন্য বৃষ্টির জল সঞ্চয় করা হতো৷ এখন সেটা বাসস্থান হয়ে উঠেছে৷ এই দম্পতি কাকতালীয়ভাবে নিজেদের বাড়ির পাশেই এই আধারটি আবিষ্কার করেন৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘আমরা জানতাম না আধারটা কত বড়৷ একটি গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি জায়গাটা জলে ভরা৷ স্ত্রীকে বললাম, সুন্দর জায়গা – এখানে একটা বাড়ি তৈরি করলে কেমন হয়? ব্যস, যেমন কথা তেমন কাজ৷''

এখন থাকার জায়গা দুই ভাগে বিভক্ত – নীচে বসার জায়গা, উপরে শোবার জায়গা৷ পরে জানালা লাগানো হয়েছে৷ বাকিটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা হয়েছে৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘আমরা বলেছিলাম, না না – দেওয়াল যেমন আছে সে রকম থাক, কিছুই করার দরকার নেই৷ শুধু সিল করে দিয়েছিলাম, অন্য কিছু করিনি৷ ফলে জায়গাটা এখন ভালো শিল্পীর আঁকা ছবির মতো দেখাচ্ছে৷''

এখানে যে শিল্পকীর্তি দেখা যাচ্ছে, সেগুলিও দ্বীপের নিজস্ব সৃষ্টি৷ ইয়াইয়ো জন্ম থেকেই সেখানে বসবাস করছেন৷ সেই আবেগই তিনি তুলে ধরতে চান৷ যেমন খাবিয়ের ইবানেস নামের স্থানীয় শিল্পীর তৈরি ড্র্যাগন ভাস্কর্য৷

হোটেলের প্রত্যেকটি ঘর যেন শিল্পকলা

কোনো ঘরে শয্যা বলতে একটি কফিন৷ কোনো ঘরে আসবাবপত্র ঝুলছে ছাদ থেকে৷একটি ঘরের চতুর্দিকে আয়না লাগানো – একেবারে শিশমহল! বার্লিনের এই হোটেলটির নাম ‘প্রপেলার আইল্যান্ড’৷ এর ডিজাইন করেছেন শিল্পী লার্স স্ট্রশেন৷ এমনকি তিনি প্রতিটি ঘরের জন্য আলাদা মিউজিক কমপোজ করতেও ভোলেননি...৷

রেলগাড়ি ঝমাঝম

বার্লিন থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়্যুটারবোগ৷ সেখানে অতিথিরা ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের আস্বাদ পেতে পারেন৷ স্লিপার কোচ হোটেলটিতে ২৫ জন অতিথির থাকার জায়গা আছে৷ প্রত্যেক কম্পার্টমেন্টে একটি করে ডাবল বেড, সেই সঙ্গে বসার জায়গা ও একটি বাথরুম৷

বাক্সের মধ্যে ঘুমনো

জার্মানির পূর্বাঞ্চলে কেমনিৎস-এর কাছে লুনৎসেনাউ শহরের ‘কফটেল’ বা বাক্সো হোটেলটিকে বিশ্বের খুদেতম হোটেল বললেও সম্ভবত দোষ হবে না৷ ২০০৪ সালে সৃষ্ট হোটেলটির প্রতিটি ঘর একটি সুটকেসের আকারে৷ ঘর বলতে দেড় মিটার চওড়া, তিন মিটার লম্বা আর দু’মিটার উঁচু৷ বিছানা নিজেকেই নিয়ে আসতে হয়৷ রাত কাটানোর খরচ: ১৫ ইউরো৷ বছরে শ’পাঁচেক অতিথি এই বাক্সো হোটেলে রাত কাটান৷

হবিটরা যেখানে থাকে

টলকিয়েন-এর ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর কল্যাণে হবিটদের আর কে না চেনে? তবে হবিটদের ওয়াইল্ডারল্যান্ড দেখার জন্য নিউজিল্যান্ডের ফিল্মসেটে যেতে হবে না৷ হবিটরা যেভাবে বাস করত, জার্মানির টুরিঙ্গিয়া প্রদেশের জঙ্গলেও তা করা সম্ভব – এই হোটেলটির কল্যাণে৷

‘ড্যান্সেস উইথ উল্ভস’

সন্ধ্যা নামছে, আঁধার ঘনাচ্ছে, কোথাও কোনো মানুষের সাড়া নেই৷ এই হলো উত্তর জার্মানির ব্রেমেন শহরের কাছে ‘ট্রি ইন’ বা বৃক্ষ হোটেলের পরিবেশ৷ ড্যোরফার্ডেন-এ বাচ্চা নেকড়েদের রাখার জন্য যে ‘এনক্লোজার’ আছে, তার ঠিক মাঝখানে এই ট্রিহাউস হোটেল৷ পাঁচ মিটার উঁচুতে কাচে ঘেরা কামরা থেকে পরম আরামে নেকড়ে দেখা যায় – কেননা এখানে মিনি-বার থেকে হুইর্লপুল, কোনো আধুনিক বিলাসিতার অভাব নেই৷

জলের পাইপে বাস

জার্মানির রুর শিল্পাঞ্চলের বট্রপ শহরের পার্ক হোটেল-এ রাস্তায় বসানোর জলের পাইপগুলোকে কামরায় পরিণত করা হয়েছে৷ রাত কাটানোর কোনো বাঁধা ভাড়া নেই, যে যা পারেন, তা-ই দেন৷ জলের পাইপগুলোর ব্যাস প্রায় আড়াই মিটার; এক একটা সেকশনের ওজন সাড়ে ১১ টন৷ ভিতরে বিছানা আর একটা সাইড টেবল ঠিকই ধরে যায়৷

লৌহকপাট

আগে এখানে জেলের আসামিরা বন্দি থাকতেন৷ আজ সেখানে ক্রাইম থ্রিলার-এর ফ্যানরা রাত কাটান৷ জার্মানির কাইজার্সলাউটার্ন শহরের আল্কাত্রাজ হোটেলে মোট ৫৬টি কামরা ও সুইট আছে৷ আজও এখানে সর্বত্র গারদ ও লোহার শিক – এমনকি হোটেলের পানশালাটিতেও৷ তবে অতিথিরা মর্জিমতো আসতে-যেতে পারেন৷

মদের পিপেতে শয্যা

এককালে যেখানে ওয়াইন মজুদ রাখা হতো, সেখানে আজ রাত কাটানো যায়৷ রাইন নদের ধারে রুডেসহাইম শহরের লিন্ডেনভির্ট হোটেলটিতে ছ’টি অতিকায় কাঠের পিপে আছে৷ পিপেগুলোয় মোট ছ’হাজার লিটার সুরা ধরতো৷ আজ তার বদলে দু’জন অতিথির শোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে৷ তবে বসবার ঘরটা পিপের বাইরে৷

মধ্যযুগের নাইটদের মতো

দক্ষিণ জার্মানির লেক কন্সটান্স-এর কাছে আর্টুস হোটেলে ঢুকলে মনে হবে, যেন মধ্যযুগে প্রবেশ করেছেন৷ কামরাগুলো যেন মধ্যযুগের কোনো সরাইখানার অনুকরণে সাজানো, খাবারদাবার নাইটদের আমলের ভুরিভোজ...৷

শীতকাতুরেদের জন্য নয়

নাম ইগলু লজ৷ ইগলু বলতে উত্তরমেরু অঞ্চলের এস্কিমোদের বরফের ঘর৷ ওবার্স্টডর্ফ-এ নেবেলহর্ন পাহাড়ের উপর এই বরফের হোটেলটি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস অবধি খোলা থাকে৷ ৪০ জন অতিথি এখানে দু’জন কিংবা চারজনের ইগলুতে রাত কাটাতে পারেন৷ সেই সঙ্গে রয়েছে – ভোর হলে – দু’হাজার মিটার উচ্চতা থেকে আল্পস পর্বতমালার অনুপম দৃশ্য৷

জমির উপরের অংশে বাথরুম ও রান্নাঘর রয়েছে৷ বাড়ির এই সম্প্রসারিত অংশ নির্মাণের সময় এই দম্পতি নীচের অংশের শৈলি বদলাতে চান নি৷ অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে গ্রাম্য এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে৷ আলো-বাতাসের অভাব নেই৷ ওডা ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘যেহেতু জলাধারের ভেতরে খুবই অন্ধকার, তাই আমরা দুই অংশের মধ্যে পার্থক্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম৷ নীচের মতোই অন্ধকার না রেখে চারিদিকে কাচের জানালা দিয়ে ঘরগুলি আলোকিত করে তুলেছি৷''

বাইরে ছোট্ট বাগানে আরও আলো-বাতাস পাওয়া যায়৷ মাঝে এক তাল গাছ৷ বেশ কয়েক দশক ধরে এই জমির উপর রয়েছে এটি৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন তাঁর স্থপতি বন্ধু সেসার মানরিকে-র সঙ্গে ষাটের দশকে এই গাছ দেখেই জায়গাটি আবিষ্কার করেন৷ ইয়াইয়ো ফন্টেস ডে লেয়ন বলেন, ‘‘সে সময়ে যে সব বাড়ির ছবি তুলেছিলাম, এটিও তার মধ্যে ছিল৷ এখানে লোস ভাইয়েস গ্রামের বাড়ির ছবি দেখতে পাচ্ছেন৷ একটি ছবিতে তালগাছে বাঁধা একটি উট দেখা যাচ্ছে৷ পাশেই জলাধার৷ এখনো সেই শিকলটি রয়ে গেছে৷''

বর্তমানে ইয়াইয়ো ও ওডা ফন্টেস ডে লেয়ন লোস ভাইয়েস গ্রামের এই জলাধারটি ভাড়া দেন৷ এভাবে দেশ-বিদেশের মানুষ লান্সারোটে দ্বীপের এই বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উপভোগ করতে পারেন৷

অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের উপর স্পেনের লান্সারোটে দ্বীপপুঞ্জের নাম করলেই চোখের সামনে আগ্নেয়গিরির পাহাড় ও সাদা বাড়ির দৃশ্য ভেসে ওঠে৷ উপকূল থেকে দূরে লোস ভাইয়েস নামের ছোট্ট গ্রামে ইয়াইয়ো ও ওডা ফন্টেস ডে লেয়ন-এর বাড়ি৷