সংবাদভাষ্য

হায় বিমান বাংলাদেশ!

আপনার যদি উড়োজাহাজে ভ্রমণের সামান্যতম অভিজ্ঞতা থাকে, তবুও বুঝতে পারবেন৷ ঢাকা অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট যাওয়ার কথা সিলেটে৷ ছাড়ল সিলেটের উদ্দেশ্যে, কিন্তু চলে গেল কলকাতায়!

Bangledesch GMG Airlines (dapd)

এটা কোনোভাবেই ভুল করে বা পথ হারিয়ে হতে পারে না৷ প্রথমত, সিলেট যে দিকে, কলকাতা প্রায় তার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে৷ ম্যাপের দিকে তাকিয়ে দেখেন, পরিষ্কার বুঝতে পারবেন৷

দ্বিতীয়ত, ঢাকা থেকে ফ্লাইট ছাড়ার সময় সিলেট জানত যে একটি ফ্লাইট আসছে৷ আকাশে ওড়ার পর সিলেট বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের কথা হওয়ার কথা৷

তৃতীয়ত, যখন পাইলটের সঙ্গে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কথা হয়, তখন উভয়েই তাদের সম্পর্কে বলে৷ সিলেট বিমানবন্দর নিজের পরিচয় জানিয়েই কথা বলবে৷ পাইলট ফ্লাইট নম্বরসহ পরিচয় দিয়েই কথা বলবেন৷ সিলেট বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বলা হবে না যে, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বিমানবন্দর থেকে বলছি৷ পাইলটও যখন ফ্লাইট নাম্বার বলবেন, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বুঝতে পারবে যে, এটা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট৷

চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট নম্বর আর আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট নম্বর আলাদা৷ পাইলট যদি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট নম্বর বলতেন, কলকাতা বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বুঝে যেত যে, কিছু একটা ঝামেলা আছে, এই ফ্লাইটের তো এখন আসার কথা নয়৷ আকাশেই তা জানা যাওয়ার কথা৷

পঞ্চমত, একজন পাইলটের না বোঝার কোনো কারণ নেই যে, ভুল করে সিলেট নয় কলকাতায় চলে এসেছে৷ আকাশে থাকতেই তিনি বুঝতে পারবেন৷

ষষ্ঠত, পাইলট নিশ্চয়ই কলকাতা বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে ভুল ফ্লাইট নম্বর বলেছিলেন, ‘ভুল' তিনি ভুল করে করেননি, করেছেন সচেতনভাবে৷ চোরাচালান বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তিনি সিলেটে না গিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন, অবতরণ করেছেন৷ কিছুক্ষণ পর আবার সিলেটে এসেছেন৷ কেন পাইলট কলকাতায় গেলেন, যাত্রীদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি পাইলট৷ বিমান বাংলাদেশের এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও জানায়নি, এই প্রশ্নের উত্তর৷

২.
স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ বিমান কেমন চলছে, উপরের ঘটনাটি তার ছোট্ট একটি উদাহরণ৷ মাঝি ছাড়া নৌকার যে অবস্থা হয়! আপনি নৌকা যেদিকে নিতে চাইবেন, সেদিকে যাবে না – যদি না মাঝি হাল ঠিকমতো ধরেন৷

জন্মের পর থেকে বিমান সোজা হয়ে কখনো দাঁড়াতে পারেনি৷ অনিয়ম-দুর্নীতি-চুরির খনি হিসেবে পরিচিত পেয়েছে বাংলাদেশ বিমান৷ সুনামের সঙ্গে কখনো যাত্রী বহন করতে পারেনি, বহন করেছে দুর্নাম৷ বিভিন্ন সময়ে উড়োজাহাজ লিজ নেয়াকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷

পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ নাইজেরিয়া থেকে বিমানের কর্তারা কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে বারবার লিজে নিম্নমানের বহু পুরনো উড়োজাহাজ এনেছেন৷ বিমানে যত রকমের কেনাকাটা হয়, সব কিছুতেই পুকুর বা সাগর চুরির ঘটনা ঘটে৷ দৃশ্যমান দুর্নীতির অভিযোগেরও তদন্ত হয় না৷ যখন যারা ক্ষমতায় থেকেছে, বাংলাদেশ বিমানকে নিজেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে৷ এরশাদের সময়ে বিমানের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয় সবচেয়ে বড়ভাবে আলোচনায় এসেছে৷

২০০৪ সালে এসে বাংলাদেশ বিমান তার ৪০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিতে চায়৷ তখন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের ইচ্ছেয় চলত বিমান৷ দেশি-বিদেশি কোনো উদ্যোক্তা বিমানের শেয়ার কিনতে আগ্রহী হয় না৷ শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব প্রস্তুত করার জন্য ব্যয় করা হয় ১.৬ মিলিয়ন ডলার! এটা দুর্নীতি-অনিয়মের ছোট্ট একটি উদাহরণ৷

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বিমানে উড়োজাহাজের সংখ্যা ছিল আট-নয়টি৷ ব্যবস্থাপনায় কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৫,২৫৩ জন!

ইতিহাসের বিরল দৃষ্টান্ত

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ৪০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আয়োজন করে বাংলাদেশ বিমান৷ এই সময় প্রায় ১,৯০০ কর্মী কমানো হয়৷

২০০৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টাইমস ম্যাগাজিন একটি প্রতিবেদনে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিমান সেবা হিসেবে বাংলাদেশ বিমানের নাম উল্লেখ করে৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে বিমানের প্রতিটি ফ্লাইট গড়ে ৩ ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছায়৷

২০০৮ সালে জাতিসংঘ তার কর্মীদের উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সময়সূচি না মানার কারণে বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে৷

প্রতিবছর কয়েক'শ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে, চুরি-চোরাচালানিদের স্বর্গ হিসেবে চলছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স৷

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মাহবুব জামিল যখন উপদেষ্টা, তখন বিমান একটা দিক নির্দেশনা পায়৷ মাহবুব জামিল উদ্যোগী হয়ে বোয়িং কোম্পানি থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেন৷ পুরনো উড়োজাহাজ কেনা বা লিজে আনার অনিয়ম-দুর্নীতির ধারা থেকে বিমানকে বের করে আনার চেষ্টা করেন৷ বোয়িংয়ের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিশাল অঙ্কের চুক্তিটি হয় প্রায় নীরবে এবং কোনোরকম দুর্নীতি-অনিয়ম বা কমিশনের অভিযোগ ছাড়া৷ এর মধ্য দিয়ে মাহবুব জামিলের অসাধারণ যোগ্যতা, দক্ষতার বিষয়টি আরও একবার প্রমাণিত হয়৷ সেই চুক্তির ফসল হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে চার-পাঁচটি উড়োজাহাজ পেয়েছে৷ ২০১৯ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি উড়োজাহাজ বিমান বহরে যুক্ত হবে৷

প্রধানমন্ত্রীকে বহন করছিল এরকমই একটি নতুন উড়োজাহাজ

প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা উড়োজাহাজের নাট ঢিলা হয়ে যাওয়া তুঘলকি কাণ্ডের প্রথম তদন্তে কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে৷ দ্বিতীয় তদন্তে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে৷ যদিও বিমান চলছে সম্পূর্ণ পুরনো রীতিতে৷

কুর্মিটোলা থেকে জিয়া, এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই পৃথিবীর একমাত্র বিমানবন্দর, যেখানে যাত্রীদের লাগেজ পাওয়ার জন্যে দেড় থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়৷ যেভাবে লাগেজ ছুড়ে ফেলে ক্ষতি করা হয়, তাও পৃথিবীর অন্য কোনো বিমানবন্দরে দেখা যায় না৷ আসলে ছয়-সাত হাজার কর্মকর্তার কাজ যে কী, তা জানা এবং ব্যবস্থা নেয়া জরুরি৷

গোলাম মোর্তোজা

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

প্রধানমন্ত্রী যেদিন গেছেন সেদিনই কলকাতাগামী একটি ফ্লাইটে উড়ার আগে দুইবার ত্রুটি ধরা পড়েছে৷ উড়ার পর আবার ত্রুটি ধরা পড়ায় যশোর থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছে৷ এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটে, আলোচনায় আসে না৷ প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ত্রুটির কারণে সুযোগ এসেছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার৷

বাংলাদেশ বিমান পরিচালনার জন্যে সবসময় বিমানবাহিনী থেকে একজনকে নিয়ে আসা হয়৷ কেন এই কর্ম করা হয়, তার উত্তর নেই৷ বিদেশি সিইও আনা হলেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে, নানা বাধা প্রতিকূলতা তৈরি করা হয়৷ অলাভজনক জানা সত্ত্বেও এমন কিছু রুটে কেন ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়, অনুসন্ধান করা প্রয়োজন৷

ছয়-সাত হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও কেন নিরাপত্তার দায়িত্ব ব্রিটিশ কোম্পানিকে দিতে হয়? নেপথ্যের কারণ বা অযোগ্যতাটা কোথায়? বাংলাদেশের কেউ লাগেজ স্ক্যান করতে পারবে না ঠিকমতো, এই অপবাদ মেনে নেয়া যায় না৷

ইমিগ্রেশন পুলিশের কাজের গতি এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেয়া দরকার৷ শামুক গতির ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা দিয়ে বিমানবন্দর চলতে পারে না৷

সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং কলকাতা থেকে আসা যাত্রীদের সঙ্গে (চোরাচালানিদের কথা বলছি না) কাস্টমসের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে৷ চোরাচালানিদের থেকে অর্থ নিয়ে, সাধারণ যাত্রীদের হয়রানি করে কাজ দেখানোর মানসিকতা পরিহার করার উদ্যোগ নেয়া দরকার৷

স্বর্ণ চোরাচালানের ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশ বিমান এবং বিমানবন্দর যাতে ব্যবহৃত হতে না পারে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি৷

৩.
ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যা সক্ষমতা, ব্যবহার হয় তার মাত্র ৩৫ শতাংশের মতো৷ কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে৷ তবুও আমরা নতুন বিমানবন্দর বানানোর পরিকল্পনা করছি৷ বিমানবন্দরের জায়গা অন্যদের লিজ দিয়ে, অন্যত্র নতুন বিমানবন্দরের নেপথ্যে আর যাই হোক সৎ কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না৷

আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ-র একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে লেখা শেষ করি৷ ১৯৭৩ সালে টরেন্টোতে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু৷ গিয়েছিলেন লি কুয়ান ইউ-ও৷ লি কুয়ান ইউ টরেন্টো বিমানবন্দরে দেখেন ‘বাংলাদেশ বিমান' লেখা একটি উড়োজাহাজ দাঁড়িয়ে আছে৷ সাত দিন পর তিনি যখন ফিরছিলেন সেদিনও দেখলেন উড়োজাহাজটি দাঁড়িয়েই আছে৷ তিনি অবাক হলেন, একটি উড়োজাহাজ ব্যবহার না করে এভাবে সাত দিন বসিয়ে রাখা হয়েছে৷

এই বিস্মিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি এবং সক্ষমতার প্রমাণ মেলে৷ এত বছর পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শত শত কোটি টাকা লোকসান দেয়া চরম অরাজকতাপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান৷ আর সিঙ্গাপুর পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো এয়ারলাইন্সগুলোর একটি, এবং বিপুল লাভজনক প্রতিষ্ঠান৷

গোলাম মোর্তোজা

আপনি কি লেখকের সঙ্গে একমত? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو