1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

ছাত্রকে গুলি করে অবৈধ অস্ত্রধারী শিক্ষক কারাগারে

হারুন উর রশীদ স্বপন
৬ মার্চ ২০২৪

সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের শিক্ষক রায়হান শরীফ এক ছাত্রকে গুলি করার পর সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) হয়েছেন। তার আগে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ আটক করে পুলিশ৷ তিনি এখন কারাগারে৷

https://p.dw.com/p/4dEhz
পিস্তল
(প্রতীকী ছবি)ছবি: picture-alliance/dpa/K. Gabbert

সোমবার বিকেলে তার গুলিতে গুরুতর আহত হওয়া আরাফাত আমিন তমাল এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ মঙ্গলবার শিক্ষক রায়হান শরীফকে দুটি বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ৮১ রাউন্ড গুলি, ১০টি নানা ধরনের চাকু, দুইটি ছুরিসহ আটক করে। সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, "আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি সবই অবৈধ। তাকে রিমান্ডে আনার প্রক্রিয়া চলছে। সে কোনো অস্ত্র চোরচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে আমরা ধারণা করছি। আর সে সন্ত্রাসী মানসিকতার। সাইকো।”

ওই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী এবং আহত ছাত্র তমালের  বন্ধু আল মারুফ বলেন, "তমালকে গুলি করার আগেও সে আরো কয়েকজনতে গুলি করার হুমকি দিয়েছিল। আমরা লিখিতভাবে অভিযোগ না করলেও মৌখিকভাবে জানিয়েছি। তিনি এক বছরে অনেক অঘটন ঘটিয়েছেন। আগে ব্যবস্থা নিলে তমালের এই অবস্থা হতো না। ”

তবে ওই মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. আব্দুল্লাহিল কাফি  বলেন, "তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও কলেজ প্রশাসন তাকে দুইবার শোকজ করলেও তিনি জবাব দেননি। তৃতীয়বার শোকজের পর তিনি জবাব না দিলে ব্যবস্থা নেয়া হতো। তবে তার আগেই তিনি অঘটন ঘটিয়ে ফেলেন। তাকে  সাসপেন্ড করা হয়েছে।”

এক প্রশ্নের  জবাবে তিনি বলেন, "প্রিন্সিপাল সাহেব আগে তাকে অস্ত্রের ব্যাপরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি তার আগ্নেয়াস্ত্র বৈধ বলে দাবি করেছিলেন। এখন দেখছি সবই অবৈধ।”

ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মনি লাল আইচ লিটু মনে করেন," ওই শিক্ষক শিক্ষক নামের কলঙ্ক। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

আর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)-র উপ পুলিশ কমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন," তার কাছে যে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি পাওয়া গেছে তা ভারতীয়। এতে আমার মনে হয়েছে ভারতীয় অস্ত্র চোরাচালান গ্রুপের সাথে তার সম্পর্ক আছে।''

সাম্প্রতিক কালের কিছু ঘটনা

ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় অস্ত্রের মহড়া হয়। ১৩ জনকে চিহ্নিত করা হলেও কাউকেই আটক করা হয়নি।

তার আগে ৭ জানুয়ারি  জাতীয় নির্বাচনের দিন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিয়ে আলোচনায় আসে শামীম আজাদ, ওরফে ব্ল্যাক শামীম নামে এক যুবক। পরে র‌্যাব তাকে আটক করে।

গত বছরের ২৩ নভেম্বর ঢাকার শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মোশাররফ হোসেন শাহবাগ এলাকায় বিলাস রেষ্টুরেন্টের সামনে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি ছোঁড়েন। পরে পুলিশ তার পিস্তল জব্দ করে।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিনে গ্রামবাসী দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফ তার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে ২৫ জনকে গুলি করে আহত করেন বলে অভিযোগ। তাকে পুলিশ তখন গ্রেপ্তার করে।

রাজনৈতিক সংঘর্ষে বৈধ এবং অবৈধ উভয় ধরনের অস্ত্রেরই ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ২৩১টি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ২০ জন । আহত হয়েছেন এক হাজার ৯৭২ জন।

আর ২০২৩ সালে  মোট সাত হাজার ২২১টি রাজনৈতি সংঘর্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন।

দেশে কত বৈধ ও অবৈধ অস্ত্র?

ফায়ার আর্মস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের গত ২০ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ৫০ হাজার ৩১০টি। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে লাইসেন্সই বেশি। ব্যক্তিগত বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ৪৫ হাজার ২২৬টি। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের হাতে রয়েছে ১০ হাজারের বেশি অস্ত্র। বাকি অস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬' অনুযায়ী, কেবল আত্মরক্ষার জন্য ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এমনকি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ‘টেস্ট ফায়ার'ও করা যাবে না।

একই ধারার অনুচ্ছেদ ২৫ (ক) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার বৈধ অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। তবে, অন্যের মনে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এরূপভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেয়।

বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের সাম্প্রতিক কোনো তথ্য নেই। র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে ২০২৩ সালে সাত হাজার ৪১৭টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২২ সালে সারা দেশে আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাঁচ হাজার ৮৭৯টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

বিশেষ শাখার (এসবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি- এই দুই মাসে দেশে গুলির ঘটনা ১৫০টি ছাড়িয়ে যায়।এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে পাঁচজনেরও বেশি। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে  মে পর্যন্ত ১৬৫টি গুলির ঘটনা ঘটেছে।

গেয়োন্দা কর্মকর্তা যা বললেন

ডিবির উপ পুলিশ কমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, "বৈধ অস্ত্রও আত্মরক্ষা ছাড়া প্রদর্শনের নিয়ম নেই। আর সেটা হতে হবে অস্ত্র ব্যবহারের মতো থ্রেট থাকলে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালীদের বৈধ অস্ত্রেও অবৈধ ব্যবহারে প্রবণতা আছে। ঢাকার গুলশান, ভাটারা, বাড্ডা এলাকায় এই প্রবণতা বেশি। এছাড়া রাজনৈতিক কাজে বৈধ অস্ত্র ব্যবহার হয় যা বেআইনি। এমনকি নিজের বৈধ অস্ত্র সন্তান বহন করে এমন ঘটনাও ঘটেছে।”

তিনি জানান, এবার নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেশি না হলেও নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র এসেছে। সেইসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে আছে। নানা অপরাধে ওইসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও প্রদর্শনী কিছুটা হলেও বেড়েছে।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, "বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের মূল উৎস ভারত। ভারতের পশ্চিমঙ্গ, উত্তর প্রদেশ ও মেঘালয়ে চোরাচালান গ্রুপ এই অস্ত্র তৈরি করে৷’’

শিক্ষা, শিক্ষকতা ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে শিক্ষাঙ্গন ও বাইরের প্রভাব নিয়ে ২০২২ সালের একটি ছবিঘর: