1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বাড়ছে অসহিষ্ণুতা: কোন দিকে এগোচ্ছে ভারত?‌

রাজীব চক্রবর্তী নতুন দিল্লি
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গো-‌রক্ষার নামে অনেক মানুষকে খুন করা হয়েছে৷ মত পছন্দ না হলেই হুমকি৷ কোপ পড়েছে পাঠ্যপুস্তকে৷ বাদ দেওয়ার সুপারিশ রবীন্দ্রনাথ থেকে মির্জা গালিবদের৷ লেখক, সাংবাদিকদের কলম স্তব্ধ করছে বুলেট৷ সব মিলিয়ে কোন দিকে এগোচ্ছে ভারত?

https://p.dw.com/p/2kNEp
ছবি: Reuters/S. Andrade

একদিকে দেশের বিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে ইংরেজি, উর্দু, আরবি শব্দ, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের উদ্ধৃতি, মির্জা গালিবের রচনা সবই বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘‌শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস'‌৷ সেইসঙ্গে গুজরাট আর শিখ দাঙ্গার বিষয়গুলিও ছেঁটে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে৷ ওসব পড়লে নাকি ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র ‘‌খারাপ’ হয়ে যেতে পারে!‌ এখানেই থেমে নেই৷ ‘‌বন্দে মাতরম’ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক৷ হিন্দি পাঠ্যবই থেকে ভাইস চ্যান্সেলর, ওয়ার্কার, ব্যাকবোন, রয়্যাল অ্যাকাডেমি, বেতরিব, তাকৎ, ঈমান, মেহমান-নওয়াজি ও ইলাকার মতো বেশ কিছু অ-হিন্দি শব্দ সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে৷ পরিবর্তে ইতিহাস বইগুলিতে ছত্রপতি শিবাজীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷ কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন এন সি আর টি-র কাছে পাঠানো তাদের সুপারিশে এ-‌ও বলা হয়েছিল যে, ‘‘‌যেভাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনা উদ্ধৃত করে জাতীয়তাবাদ ও মানবতাকে দু'টি পরস্পরবিরোধী মত বলে দেখানো হয়েছে, সেটা অনুচিত৷’’

 সুপারিশগুলো সামনে আসার সঙ্গেসঙ্গে প্রবল সমালোচনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশজুড়ে৷

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অনন্য সৃষ্টি তাজমহল৷ উত্তরপ্রদেশে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক থেকে তাজমহলও বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে৷ বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এমন অসংখ্য প্রচেষ্টা সামনে এসেছে৷ মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরের বক্তব্য দাবি করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়৷

সব মিলিয়ে ভুরি ভুরি অভিযোগ৷ ভারতে ইদানিং প্রায়শই হিংসার শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘুরা৷ তা সে গো-‌মাংস খাওয়া হোক বা গো-‌রক্ষার বাহানা, উত্তরপ্রদেশের দাদরি হোক বা গুরাটের উনা, সর্বত্র একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের ওপর নেমে আসছে আক্রমণ৷ এর পেছনে কি অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি দায়ী?‌ নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?‌ প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করছে ভারতের সর্বত্র৷ দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতির‌ কথায়, ‘‌‘‌নাহ, অসহিষ্ণুতা নয়৷ বরং তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু৷ ‌২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘুদের মনে ভয় ছিলই৷ এখন সেই ভয় আরও কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে৷ তার কারণ, উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে যোগী আদিত্যনাথকে৷ এর পেছনে স্পষ্ট হাত রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির ‘মেন্টর’ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের৷ মনে রাখতে হবে, শাসক দলে নরেন্দ্র মোদীই একমাত্র মুখ৷ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে এখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী৷ তাঁকে প্রগতি-‌পুরুষ হিসেবে তুলে ধরার জন্য শিল্পপতিদের ধন্যবাদ৷ মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটে চলা হিংসাত্মক অপরাধ রুখতে মুখ খোলারও সাহস হবে না তাঁর৷’’ কথাগুলো যিনি বলছিলেন তিনি আর কেউ নন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রাজিন্দর সাচার৷ যাঁর নেতৃত্বাধীন ‘‌সাচার কমিটি’ ভারতে মুসলমানদের আর্থ-‌সামাজিক এবং শিক্ষাগত অবস্থানের ওপর সমীক্ষা করে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল৷ সাচার কমিটির রিপোর্টের এক দশক পরে বিজেপি ‌সরকার এখন নতুন করে মুসলিমদের আর্থ-‌সামাজিক ও শিক্ষাগত অবস্থান জানতে নতুন কমিটি গড়ার কথা ভাবছে৷

শাসক দলের একাধিক নেতা, এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের মতো মন্ত্রীও মুসলমানদের সংখ্যালঘু তালিকা থেকে বাদ দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন৷ তাঁরা সরব সংখ্যালঘু তকমা কেড়ে নেওয়ার দাবিতে৷ বলা হচ্ছে, ‘‌‘‌এ দেশে মুসলিমদের জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে৷ ফলে তারা আর সংখ্যালঘু নয়৷’’ অথচ সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ৷ সেখানে হিন্দুদের সংখ্যা ৮০ শতাংশ৷ আরও একটি তথ্য হলো, গত এক দশকে ভারতে হিন্দু-সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা হলেও কম৷

তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ‌রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী মনে করছেন, ‌আগামী নির্বাচনে বিজেপি আর একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে না৷ ফলে, হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার প্রশ্ন নেহাতই অমূলক৷ তিনি মনে করেন, ভারতে এখনো একনায়কতন্ত্রের কোনও স্থান নেই৷ সবাইকে নিয়ে চলতেই হবে৷ তাই আরএসএসের যতই চাপ থাক না কেন, দেশ শাসন করতে হলে মধ্যপন্থা বেছে নিতে বাধ্য হবেন প্রধানমন্ত্রী৷ ‘‌‘‌রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের মতো বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলির নির্বাচনে বিজেপি মোটেই ভালো ফল করবে না৷ তাই প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর দলের নেতারা বাইরে যতই কর্তৃত্ব দেখাক না কেন, রাজনৈতিকভাবে সেই কর্তৃত্ব থাকবে কিনা সন্দেহ আছে৷ তাছাড়া ভারতের ইতিহাস বলছে, এই দেশ কখনোই কোনো বিষয়ে চরমপন্থী বা আগ্রাসীদের গ্রহন করেনি৷ ফলে, চিন্তা-‌ভাবনা পর্যন্ত ঠিক আছে৷ উদ্যোগী হলেই বাধা পেতে হবে৷ এতকিছুর পরেও বলা বাহুল্য, হিন্দুরাষ্ট্র করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিজেপি৷ নরেন্দ্র মোদী তো রামমন্দির, সংবিধানের ৩৭০ ধারা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়েও একটিও কথা বলেননি৷ বরং একাধিক জনসভায় তিনি গো-‌রক্ষকদের কড়া বার্তাই দিয়েছেন৷’’

‌‌আগামী নির্বাচনে বিজেপি আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে না: বিশ্বনাথ চক্রবর্তী

তাহলে কি মুসলমান, সংখ্যালঘুদের নামে রাজনীতি চলছে দেশে?‌ হবে না-‌ই বা কেন?‌ হিন্দুত্ববাদীর মুখোশে যদি বেশি ভোট আসে, তাহলে সহজেই সেই রাস্তা ধরবেন রাজনীতিকরা৷ আরএসএসের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বহুদিনের৷ তোড়জোড়ও পুরনো৷ কিন্তু, আজও দেশের বেশিরভাগ হিন্দু সেটা চান না৷ অনেকেই বলছেন, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল জনপ্রিয়তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মনোবল কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে৷ এখন তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশ চালাচ্ছে৷ ফলে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে এলেও ভয় পেতে নারাজ তারা৷

সমস্ত ‌বিষয়টিকে একেবারে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুগত হাজরা৷ তিনি বলছেন, ‘‌‘‌হিন্দুত্ব তো কোনো অপরাধ নয়৷ বার বার বলা হচ্ছে, সরকার নাকি এরএসএসের হাতের পুতুল!‌ দেখুন, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামণরা কেউই আরএসএস করেননি৷ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও আরএরএসএসের নয়৷ তাহলে এইসব প্রচারের অর্থ কি? গরুচুরি ঠেকাতে গিয়ে অভিযুক্তদের হাতেনাতে ধরা হলে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার কিছু ঘটনা ঘটেছে৷ যদিও তেমনটা ঠিক নয়৷ তবে, মনে রাখতে হবে, উত্তর ভারতের বহু রাজ্যে গরুচুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে৷‌ কর্ণাটকে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ দুর্ভাগ্যজনক ভাবে খুন হলেন৷ তারপরেই দু-‌একজন বুদ্ধিজীবী কোনো তথ্য-‌প্রমান ছাড়াই লিখে দিলেন, আরএসএসের হাতেই খুন হয়েছেন গৌরী!‌ এটা ঠিক নয়৷ ভারতের মতো বহু ধর্ম, বহু ভাষার একটা দেশকে জোর করে হিন্দুরাষ্ট্র করা হবে বলে মনে হয় না৷ সেটা মুর্খামি হবে৷ এমনটা করে ভারতে রাজত্ব করা সম্ভব নয়৷ তেমনটা করার চেষ্টা হলে, সেটা বিজেপি-র জন্য আত্মহত্যার সামিল হবে৷’’

হিন্দুত্ব তো কোনও অপরাধ নয়: সুগত হাজরা

‌অনেকেই মনে করছেন, ২০১৯-‌এর লোকসভা নির্বাচনের দু-‌বছর আগে দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে যোগী আদিত্যনাথকে বসিয়ে দেওয়া কোনো ছোট ঘটনা নয়৷ এর পেছনেও রয়েছে আরএসএস ও বিজেপি-‌র পরিকল্পনা৷

বিজেপি ২০১৯-‌এর নির্বাচন জয় করতে পারলেই ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার পথে আর কোনও বাধা থাকবে না৷ দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানের ক্ষেত্রে যা হবে আত্মহননের পথ৷ সংসদীয় গণতন্ত্রে সক্রিয় ও শক্ত বিরোধী থাকা অত্যন্ত জরুরি৷ এই অবস্থায় বিপদের আগাম আঁচ করতে না পারা বিরোধীদের ঘুম ভাঙাবে কে?‌ জাতীয় স্তরে বিজেপি‌বিরোধী জোট গড়তে হবে বিরোধীদের৷ তা না পারলে ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ জনতার কাছে চূড়ান্ত অসৎ ও ধান্দাবাজ বলে প্রমানিত হবে বিরোধীরা৷ একে অপরের বিরোধিতা করে আখেরে শাসক দলের সুবিধা করে দেওয়া এদেশে অবশ্য নতুন কিছু নয়৷

আর এস এস-‌ই বিজেপি-‌র পথ প্রদর্শক: রাজাগোপাল ধরচৌধুরি

‌রাজনৈতিক বিশ্লেষক ‌রাজাগোপাল ধরচৌধুরি বলছেন, ‘‌‘আমরা জানি, আরএসএস-‌ই বিজেপির পথ প্রদর্শক৷ দেশের সংবিধান যেহেতু সর্বধর্মের ভিত্তিতে তৈরি, তাই সবাইকে নিয়ে যে চলতে হবে, প্রধানমন্ত্রী‌সহ অন্যান্য নেতা ভালো করেই সেটা জানেন৷ তবে, আরএসএসের অন্দরে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা সুযোগ পেলেই রামমন্দির, হিন্দুরাষ্ট্র, গো-‌রক্ষার মতো বিষয়গুলি হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন৷ রাজনৈতিক নেতারা হিন্দুত্বের মুখোশ পরে ময়দানে নামেন মাত্র৷’’​​​​​​​

‌প্রশ্ন উঠেছে, বিরোধীদের ওকজোট হওয়া নিয়ে৷ বিরোধীদের প্রধান মুখ বলতে এই মুহুর্তে কংগ্রেস সহ‌সভাপতি রাহুল গান্ধী৷ কিন্তু মোদি ম্যাজিকের কাছে সত্যিই পাত্তা পাচ্ছেন না তিনি৷ তাঁর বক্তৃতায় ধার-‌ভার কিছুই খুঁজে পান না শ্রোতারা৷ পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম ও তৃণমূল উভয়েই বিজেপিবিরোধী৷ উত্তরপ্রদেশে দু'টি বড় দল সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি উভয়েই বিজেপি‌বিরোধী৷ একই ছবি অন্যান্য রাজ্যেও৷ কংগ্রেস, আরজেডি, বিজেডি, এনসিপি, ডিএমকে‌র মতো দলগুলো ছন্নছাড়া৷ এক ছাতার তলায় আসতে হোঁচট খাবেন নেতারা৷