অবশেষে ওবামা জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিলেন

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নতুন নিয়ম-কানুন কোনো জাদুকাঠি নয়৷ অ্যামেরিকাও রাতারাতি পরিবেশ সচেতন অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে না৷ তা সত্ত্বেও দেশে-বিদেশে এর গুরুত্ব কম নয় বলে ধারণা মিশায়েল ক্নিগের৷
বিশ্ব | 21.07.2015

শুরু থেকেই বারাক ওবামার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল – যদিও কার্যক্ষেত্রে তিনি এতদিন বিশেষ কিছু করে দেখাতে পারেননি৷ ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তিনি এটিকে মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন৷ নির্বাচনে জিতলে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিবেশের ক্ষেত্রে আবার নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷ কিন্তু হোয়াইট হাউসে আসার পর প্রথমে তিনি ২০০৯ সালের ঐতিহাসিক কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলন বানচাল করে দেন এবং প্রথম কার্যকালে এক্ষেত্রে তিনি কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি৷

প্যারিসে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনকে অনেকেই আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন৷ আর ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কার্যকালের শেষ পর্যায়ে সাত বছর আগের প্রতিশ্রুতি পালনের চেষ্টা করছেন৷

প্যাম ঘূর্ণিঝড়ে ভানুয়াটু বিপর্যস্ত

ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার অবধি গতির ঝোড়ো বাতাস রাজধানী পোর্ট ভিলার বাড়িঘরের টিনের ছাদ উড়িয়ে দিয়েছিল এবং উপড়ে ফেলেছিল গাছ৷ প্যাম নামের ক্যাটেগরি ফাইভ সাইক্লোনটি এক সপ্তাহ আগে ভানুয়াটুর উপর আছড়ে পড়ে৷ দ্বীপরাজ্যের প্রেসিডেন্ট বল্ডউইন লন্সডেল-এর মতে, এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যোগ আছে: ‘‘আমরা দেখছি, সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাচ্ছে৷’’

‘উন্নয়ন নিশ্চিহ্ন’

প্যাম ঘূর্ণিঝড় ছিল একটি ‘‘দানব’’, যা তাঁর দেশকে ধ্বংস করেছে – বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট লন্সডেল৷ ‘‘এটা ভানুয়াটুর সরকার ও জনসাধারণের জন্য একটি বিপর্যয়৷ এত সব উন্নয়ন ঘটার পর, তার সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়েছে’’, বলেন লন্সডেল৷ রাজধানীর ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে৷ নিহতের সংখ্যা এ যাবৎ, সরকারিভাবে – ছয়, আহত ত্রিশের বেশি৷

প্যামের আঘাত

প্যাম ঘূর্ণিঝড় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশকে বিধ্বস্ত করেছে৷ জাতিসংঘের বিবৃতি অনুযায়ী, কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে আছে ভানুয়াটু, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি, ফিজি, তুভালু এবং পাপুয়া নিউ গিনি৷

শিশুরাই শিকার

অন্তত ৬০ হাজার শিশু এই ঘূর্ণিঝড়ে নিরাশ্রয় অথবা উদ্বাস্তু হয়েছে বলে ইউনিসেফ-এর ধারণা৷ পোর্ট ভিলায় যখন প্যাম এসে আঘাত হানে, ‘‘তখন যেন প্রলয় এসেছে বলে মনে হচ্ছিল’’, বলেছেন ইউনিসেফ-এর অ্যালিস ক্লিমেন্টস, যিনি সেই সময় অকুস্থলে ছিলেন৷

অশনি সংকেত?

বহু বছর ধরে (যেমন এই ছবিতে) কিরিবাতি-র মতো ছোট দ্বীপরাজ্যগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুঝছে৷ সেশেল-এর প্রেসিডেন্ট জেমস মিশেল প্যাম ঘূর্ণিঝড়কে ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট আভাস’’ বলে বর্ণনা করেন এবং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমাজকে উষ্ণায়ন সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে বলেন৷

জমি বাঁচানোর আকুল প্রচেষ্টা

সবচেয়ে বিপন্ন দ্বীপরাজ্যগুলির বাসিন্দারা উপকূলবর্তী এলাকাগুলিকে রক্ষা করার চেষ্টা করে আসছে, যা-তে জোয়ারে তীরের মাটি ধুয়ে না যায়৷ এই সব স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে কিছু কাজ হলেও, ক্ষয়ের মূল কারণ – সাগরের পানির উচ্চতা বাড়া – থেকেই যাচ্ছে৷

‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিধ্বংসিতা বেড়েছে’

‘‘জলবায়ুর পরিবর্তন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার মাত্রা ও তীব্রতা বাড়িয়েছে, বিভিন্ন দেশের মানুষদের উপর যার প্রভাব পড়ছে’’, বলেন কিরিবাতি দ্বীপরাজ্যের প্রেসিডেন্ট আনোটে টং৷ বিজ্ঞানীরা অবশ্য বলেন যে, প্যাম ঘূর্ণিঝড়ের মতো একক প্রাকৃতিক ঘটনাকে পুরোপুরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলশ্রুতি বলা চলে না৷

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কর্মসূচি

‘‘আমাদের বিশেষ করে সবচেয়ে দরিদ্র, বিপন্ন মানুষদের সাহায্য করতে হবে’’, প্যাম ঘূর্ণিঝড়ের পর এ কথা বলেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন৷ প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ করাটা গোটা বিশ্বের কর্তব্য – তাই এ বছর একটি নতুন জলবায়ু চুক্তি সম্পাদিত হতে চলেছে৷

ওবামার ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান' গত বছরই ঘোষণা করা হয়েছিল৷ এর আওতায় এই প্রথম কার্বন ডাই অক্সাইডকে দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং গোটা দেশের সব রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির কার্বন নির্গমনের জন্য জাতীয় বিধিনিয়ম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে৷ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির নির্গমনের মাত্রা ২০০৫ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রার ফলে কয়লা-ভিত্তিক কেন্দ্রগুলি ধাপে ধাপে বন্ধ করার পথ সুগম হয়ে যাবে৷ অ্যামেরিকায় নির্গমনের অন্যতম প্রধান উৎসই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি৷

ধাঁধার মূল অংশ

একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে ফ্র্যাকিং বেড়ে চলার ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম কমে গেছে৷ ফলে অ্যামেরিকার অনেক রাজ্য নতুন আইন ছাড়াই নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার পথে এগোচ্ছে৷ অন্য রাজ্যগুলির পরিস্থিতি অবশ্য আলাদা৷ এটাও ঠিক যে, ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান' এককভাবে অ্যামেরিকার কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বড় পার্থক্য আনতে পারবে না৷

এ কারণে ওবামা প্রশাসন কয়েক সপ্তাহ আগে বড় আকারে ট্রাক, ট্র্যাক্টর ও ট্রেলারের জন্য আরও কড়া জ্বালানির মান স্থির করার প্রস্তাব পেশ করেছে৷ এছাড়া ‘হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস' অর্থাৎ ওভেন বা ডিশওয়াশারের মতো বাড়িতে ব্যবহারের যন্ত্রপাতি ও ডিভাইসের জন্যও আরও কড়া মানদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে৷ ওবামার ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান'-কে তাই এক বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তন ধাঁধার খেলার অংশ হিসেবে দেখতে হবে৷ বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এর মধ্যে কোনো উদ্যোগই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে না৷ কিন্তু সার্বিকভাবে এগুলি অ্যামেরিকার কার্বন নির্গমন মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটাতে পারে৷

Michael Knigge Kommentarbild App

মিশায়েল ক্নিগে, ডয়চে ভেলে

প্রতীকী গুরুত্ব

‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান' সম্ভবত কার্বন নির্গমন তেমন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু তার প্রতীকী গুরুত্ব খাটো করে দেখলে চলবে না৷

প্রথমত, নতুন লক্ষ্যমাত্রার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে যাদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, সেই ইউটিলিটি কোম্পানিগুলি তাদের কৌশল ও উৎপাদন সম্পর্কে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করতে বাধ্য হবে৷ দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার অংশ হয়ে উঠবে৷ ফলে সব প্রার্থীরা এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান খোলসা করতে বাধ্য হবেন – বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রার্থীদেরও এই প্রশ্নে ভোটারদের মুখোমুখি হতে হবে৷ তৃতীয়ত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন দূষণকারী দেশ ঠিক প্যারিস শীর্ষ সম্মেলনের আগে অন্যদের উপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে৷ চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এবার নড়েচড়ে বসতে হবে৷

শুরু থেকেই বারাক ওবামার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল – যদিও কার্যক্ষেত্রে তিনি এতদিন বিশেষ কিছু করে দেখাতে পারেননি৷ ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তিনি এটিকে মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন৷ নির্বাচনে জিতলে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিবেশের ক্ষেত্রে আবার নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷ কিন্তু হোয়াইট হাউসে আসার পর প্রথমে তিনি ২০০৯ সালের ঐতিহাসিক কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলন বানচাল করে দেন এবং প্রথম কার্যকালে এক্ষেত্রে তিনি কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি৷