অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কি ফ্রান্সের ‘জঙ্গল' ছাড়তেই হবে?

ফ্রান্সের ক্যালে শহরের অদূরে চরম শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে তাঁদের ভাগ্য৷ রায় বিপক্ষে গেলে ক্যালের শরণার্থী শিবির ছাড়তে হতে পারে তাঁদের৷

ক্যালের বহুল আলোচিত শরণার্থী শিবির স্থানীয় ফরাসি নাগরিক এবং সংবাদমাধ্যমের কাছে অবশ্য ‘দ্য জাঙ্গল' নামেই পরিচিত৷ এমন নামকরণের কারণ শিবিরের সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা৷ স্থানীয় প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী সেখানে ৮০০ থেকে ১ হাজারের মতো অভিবাসনপ্রত্যাশীর অবস্থান৷ তবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে এমন কিছু সংগঠন জানিয়েছে, তথাকথিত ‘জঙ্গল'-এ এই মুহূর্তে অন্তত ৩ হাজার ৪৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী বাস করছেন৷

স্থানীয় প্রশাসন ‘জঙ্গল' থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তাদের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে৷ মামলার বাদি ২৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী এবং অভিবাসীদের কিছু অধিকার সংস্থা৷ মঙ্গলবারই মামলার রায় হওয়ার কথা৷

পুনর্বাসন প্রচেষ্টা

নিরপেক্ষ স্বেচ্ছাসেবীরা ক্যালের ‘জঙ্গল মহলের’ বাসিন্দাদের তাদের ঝোপড়ি সরিয়ে নিতে সাহায্য করছেন, কেননা রিফিউজিদের ক্যাম্পের পাশ দিয়েই চলে গেছে ইউরোটানেল মুখী একটি হাইওয়ে৷ সেই হাইওয়ে আর ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত ১০০ মিটার এলাকা ফাঁকা রাখতে চায় পুলিশ৷

২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারা

নীচে ক্যাম্প, ওপরে হাইওয়ে৷ হাইওয়ে ধরে ইউরোটানেল অভিমুখে যাওয়া ট্রাকগুলোয় ওঠার চেষ্টা করে ক্যাম্পের অধিবাসীরা, যাদের একমাত্র স্বপ্ন হলো কোনোমতে ব্রিটেনে পৌঁছনো৷ চতুর্দিকে পুলিশ, অনেকে ধরাও পড়ে, তা সত্ত্বেও তারা নাছোড়বান্দা৷ ২১ বছর বয়সি সিরীয় মোহাম্মেদ শাখ বলেন, ‘হয় ট্রাকে করে ইংল্যান্ডে যাব; নয়ত ট্রেনে করে ইংল্যান্ড যাব; নয় বোটে করে ইংল্যান্ড যাব৷’

যে করে হোক

বাফার জোন যে ঠিক কবে তৈরি হবে, তা জানা নেই৷ ইতিমধ্যেই একাধিক নোটিশ পার হয়ে গিয়েছে৷ স্বেচ্ছাসেবীরা যে কোনো উপায়ে ঝোপড়িগুলোকে খুলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন – নয়ত নাকি বুলডোজার দিয়ে সেগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে!

ঝোপেঝাড়ে

কেয়ারফরক্যালে স্বেচছাসেবক গোষ্ঠীর সদস্যরা ঝোপঝাড়, আবর্জনা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মলমূত্র পরিষ্কার করে উদ্বাস্তুদের জন্য নতুন বসতি তৈরি করার চেষ্টা করছেন৷ ফরাসি মহিলা রুথ বলেন, ‘‘আমি যখন আফগানিস্তানে ছিলাম, তখন আমি ওদের কাছ থেকে যতটা আতিথেয়তা পেয়েছি, আজ আমি ঠিক সেইরকম সম্মান ও আতিথেয়তা ফিরিয়ে দিতে চাই৷’’

হাল ছেড়ো না

যে এলাকাটা খালি করা হবে, কিছু কিছু উদ্বাস্তু এখনও সেখানে বাস করছেন৷ নতুন বাফার জোন তৈরি হলে দেড় হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার উদ্বাস্তু উৎখাত হবেন৷ সাইফুল্লা বারাতি গত চার মাস ধরে ক্যালেতে আছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি নড়ছি না৷ পুলিশ যদি বাড়ি ভেঙে দেয় তা দিক৷ আমি তাদের সঙ্গে লড়ব না৷’’

কনটেইনার ক্যাম্প

ফরাসি সরকার আপাতত ক্যালের কাছে একটি ক্যাম্প তৈরি করছেন৷ এই ক্যাম্পে প্রায় দু’হাজার মানুষ থাকতে পারবে৷ কিন্তু বহু উদ্বাস্তুরা বলেছেন যে তারা সেখানে যাবেন না, কেননা সেখানে যেতে হলে কর্তৃপক্ষের কাছে আঙুলের ছাপ দিতে হবে – যার ফলে তাদের ফ্রান্সে থাকতে হবে ও ব্রিটেনে যাবার আশা নাকচ হবে৷

‘দেখা যাক, ফ্রান্স কি করে’

মোহাম্মেদ শাখ তাঁর ঝোপড়ির ভিতর থেকে বলছেন, ‘‘ওরা ভাবছে আমরা বোকা, নতুন ক্যাম্পে থাকার জন্য আমাদের আঙুলের ছাপ দেবো৷ ওটা তো একটা জেলের মতো৷ একবার ঢুকলে আর বেরোতে দেবে না; আর আমি তো এ দেশে থাকতে চাই না৷’’

উত্তেজনা বাড়ছে

‘জঙ্গল মহল’ পরিত্যাগ করতে বলার নোটিশ আর পুলিশি নজরদারি বাড়ার ফলে ক্যাম্পের ভেতরে সহিংসতা বেড়েছে, বলে জানিয়েছেন ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্স-এর মদ ল্য ক্যাঁত্রেক৷ খোসপাঁচড়ার পরেই নাকি রিফিউজিরা নিজেদের মধ্যে মারামারি আর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন চোট নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে৷

সমস্যা ছড়াচ্ছে

‘‘লোকজন বুঝতে শুরু করেছে যে, সরকার ক্যালের ‘জঙ্গলের’ আকার ছোট করে ফেলতে পারেন৷ তাই তারা অন্যত্র ‘জঙ্গল’ তৈরি করতে শুরু করেছে’’, বলেন ল্য ক্যাঁত্রেক৷ ক্যালের ১২০ জন বাসিন্দা নাকি সম্প্রতি বেলজিয়ামে একটি নতুন ক্যাম্পে গিয়ে বাসা গেড়েছেন৷ ‘‘মোট কথা, কিছু মানুষ ক্যালে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন৷ কাজেই সমস্যা অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে৷’’

অবশ্য রায় প্রদানের আগে মঙ্গলবারই ক্যালে শহরের কথিত ‘জঙ্গল' শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করছেন মামলার বিচারক৷ শিবিরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্যই সেখানে যাচ্ছেন তিনি৷

ক্যালের এই ‘জঙ্গল'-এর অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ব্রিটেনে প্রবেশ করতে চান৷ এ ‘স্বপ্ন' পূরণের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ক্যালের ওই এলাকায় দুর্বিষহ কষ্টের জীবনযাপন করছেন৷ সংবাদমাধ্যমের খবর এবং অভিবাসনপ্রত্যাশী ও অভিবাসী অধিকার সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যালের ওই শিবিরের সুযোগ-সুবিধা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছিও নয়৷ সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের৷

ক্যালের স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ‘জঙ্গল' থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সরিয়ে নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০০টি শিবির প্রস্তুত করা হয়েছে৷ জানা গেছে, পরিত্যক্ত জাহাজের কিছু কন্টেইনারকেও শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহার করা হবে৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীরা জানিয়েছেন, ওই আশ্রয়শিবিরগুলোও মোটেই সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযুক্ত নয়৷

শীত মৌসুমে আবাসনের সুব্যবস্থা না করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগকে ‘ভয়ংকর পদক্ষেপ' মনে করছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ সংস্থাগুলো৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি সাহায্য সংস্থার প্রধান ক্রিস্টিয়ান সালোমে মনে করেন, ‘‘এ উদ্যোগ আসলে ভয়ংকর এক পশ্চাদযাত্রা৷''

এসিবি/ডিজি (এএফপি)

অভিবাসীর মৃত্যু

হাঙ্গেরি থেকে ভিয়েনাগামী মোটরওয়েতে বৃহস্পতিবার ফেলে রাখা অবস্থায় যে রেফ্রিজারেটেড ট্রাকটি পাওয়া যায়, তা থেকে ৭০টির বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, বলে ভিয়েনার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে৷

সলিলসমাধি

লিবিয়ার উপকূল থেকে ইটালি পৌঁছনোর প্রচেষ্টায় আরো একটি উদ্বাস্তু বোট ডুবে যায় বৃহস্পতিবার৷ বোটটি পশ্চিম লিবিয়ার জুওয়ারা বন্দর থেকে যাত্রা করছিল৷ লিবিয়ার উপকূলরক্ষীরা দু’শোর বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন, কিন্তু আরো দু’শতাধিক যাত্রী জাহাজের খোলে আটকা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে৷ বোটটিতে প্রধানত সাব-সাহারান আফ্রিকা, পাকিস্তান, সিরিয়া, মরক্কো ও বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা ছিলেন৷

যাত্রী বোঝাই

লিবিয়ার উপকূলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্ধারকার্যের দায়িত্বে রয়েছে ইটালির উপকূলরক্ষী বাহিনী৷ তাদের বিবৃতি অনুযায়ী শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারেই প্রায় ১,৪৩০ জন মানুষকে বিভিন্ন নৌ-অভিযানে উদ্ধার করা হয়৷ লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনীর সামর্থ্য সীমিত, কেননা তাদের কাছে ছোট ছোট রবারের বোট, টাগবোট কিংবা মাছ ধরার নৌকা ছাড়া অন্য কোনো জলযান নেই৷

কাঁটাতারের বেড়া

পাকানো কাঁটাতার ফেলে রেখে আর বিপুল সংখ্যায় পুলিশ পাঠিয়ে বুদাপেস্ট সরকার উদ্বাস্তুর স্রোত সামাল দেবার চেষ্টা করছেন৷ সার্বিয়ার সঙ্গে ১৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে একটি চার মিটার উঁচু তারের বেড়া তৈরির কাজ আগামী সোমবার শেষ হবার কথা৷ তার আগে উদ্বাস্তুরা কাঁটাতার পেরিয়ে অভীপ্স পশ্চিম ইউরোপ অভিমুখে আরো এক ধাপ অগ্রসর হবার চেষ্টা করছেন৷

সীমান্তের পর সীমান্ত

বিশেষ করে সিরীয় উদ্বাস্তুরা গ্রিস থেকে ম্যাসিডোনিয়া হয়ে পশ্চিম ইউরোপ যাবার চেষ্টা করছেন৷ শুধুমাত্র বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার অবধি ১,২৮৮ জন উদ্বাস্তু এ ভাবে ম্যাসিডোনিয়ায় আসেন বলে স্কোপিয়ে সরকার জানিয়েছেন৷ উদ্বাস্তুদের নথিভুক্ত করে তিন দিন সময় দেওয়া হচ্ছে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন পেশ করার কিংবা দেশ ছাড়ার জন্য৷

হাঁটাপথে

সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরি-তে ঢোকার আর কোনো পথ খোলা না থাকুক, রেলপথ তো রয়েছে! সেই পথেই পায়ে হেঁটে স্বপ্নের ইউরোপের দিকে চলেছেন উদ্বাস্তুরা৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘‘ব্যর্থতা’’

বৃহস্পতিবার ভিয়েনায় পশ্চিম বলকান সংক্রান্ত সম্মেলনে নেতারা ট্রাকে উদ্বাস্তুদের লাশ পাবার ঘটনা শুনে স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হয়ে যান৷ ‘‘আমাদের ইউরোপীয় মনোবৃত্তি, অর্থাৎ সংহতির মনোভাব নিয়ে শীঘ্র এই অভিবাসন প্রশ্নের সমাধান করতে হবে’’, বলেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল (বাম থেকে দ্বিতীয়)৷

ক্যালের বহুল আলোচিত শরণার্থী শিবির স্থানীয় ফরাসি নাগরিক এবং সংবাদমাধ্যমের কাছে অবশ্য ‘দ্য জাঙ্গল' নামেই পরিচিত৷ এমন নামকরণের কারণ শিবিরের সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা৷ স্থানীয় প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী সেখানে ৮০০ থেকে ১ হাজারের মতো অভিবাসনপ্রত্যাশীর অবস্থান৷ তবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে এমন কিছু সংগঠন জানিয়েছে, তথাকথিত ‘জঙ্গল'-এ এই মুহূর্তে অন্তত ৩ হাজার ৪৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী বাস করছেন৷