অরিত্রীর আত্মহত্যা ও প্রশ্নবিদ্ধ চলমান শিক্ষা ব্যবস্থা

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যা করেছেন৷ এই নিয়ে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার গণমাধ্যম৷

অরিত্রীর পরিবারের দাবি – পরীক্ষার সময় সঙ্গে মোবাইল পাওয়ায় মেয়েটির বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ তোলা হয়৷ পরে অভিবাবকদের ডেকে অপদস্তও করে স্কুল কর্তৃপক্ষ৷ আর বাবা-মায়ের অসম্মান সইতে না পেরেই আত্মঘাতী হয় অরিত্রী৷

বিষয়টি ইতোমধ্যে হাইকোর্টের নজরে এসেছে৷ এই আত্মহত্যার ঘটনাকে হৃদয় বিদারক বলে মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট৷ এছাড়া মেয়ের সামনে বাবা-মা-কে অপমান করাকে ‘বাজে ঘটনার দৃষ্টান্ত' বলে অভিহিত করেছে আদালত৷ অরিত্রী আত্মহত্যা করেন রবি বার৷ তবে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হয় মঙ্গলবার (৪ ডিসেম্বর)৷ এরপর বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন৷

এদিকে সোমবারের এই আত্মহ্ত্যার ঘটনায় দুটি পৃ্থক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ তদন্ত কমিটি দুটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ৷ কমিটি দুটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে৷

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

জীবন-মৃত্যুর প্রান্তে

সামনে শূন্যতা৷ ঝাঁপ দিলেই সব শেষ৷ মত বদলের কোনো অবকাশ নেই৷ কিন্তু মনের কোণে সামান্য সংশয় তো থেকেই যায়৷ বেঁচে না থাকলে সেই সংশয় যাচাই করার কোনো উপায় আছে কি?

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

আবেগ নয়, চাই যুক্তি

পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও সেটি দ্রুত কার্যকর না করাই বুদ্ধিমানের কাজ৷ নেতিবাচক আবেগের কালো মেঘ কেটে গিয়ে যুক্তির খুঁটি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মন থেকে দূর করতে পারে৷

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

চরম কষ্টের তাড়না

আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে চরম বেদনা, হতাশা বা গ্লানি৷ সেই কষ্ট সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়৷ দিশাহারা অবস্থায় মনে হয়, সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷ অথচ সেই কষ্ট কম করা, তা নিয়ে চলতে পারাও কিন্তু সম্ভব৷

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

‘এই জগতে আমাদের ঠাঁই নেই’

একা নয়, প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে পার্থিব জগত ছেড়ে চলে যাবার কঠিন সিদ্ধান্তও নেন কেউ কেউ৷ সমাজ, ধর্ম, সম্প্রদায় বা রাষ্ট্র তাদের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় কোণঠাসা হয়ে মৃত্যুই একমাত্র পথ বলে মনে হয়৷ অথচ বিকল্প কি একেবারেই থাকে না?

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ

জগতটা শুধু নিজেকে নিয়ে নয়৷ নিজের দুঃখ, কষ্ট, কঠিন সমস্যার গণ্ডির বাইরেও আছে এক বৃহত্তর পৃথিবী৷ অন্যরাও সেখানে পুরোপুরি সুখি নয়৷ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্ভব হলে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে নিজের মনও শান্ত হতে পারে৷ অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজের জগত দেখলে নতুন উপলব্ধি জাগতে পারে৷

আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত

নিঃসঙ্গতা থেকে আত্মহত্যার হাতছানি

নিঃসঙ্গতা, চরম একাকিত্ববোধ থেকেও আত্মহত্যার চিন্তা মনে আসে৷ অথচ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বদলে চারিদিকে তাকালে কাউকে না কাউকে ঠিকই পাওয়া যাবে৷ পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী বা অন্য কোনো বৃত্তের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে নেওয়া সম্ভব, যে দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে প্রস্তুত৷ মন হালকা হলে আত্মহত্যার হাতছানিও উধাও হয়ে যাবে৷

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক মো. ইউসুফকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে৷ মাউশির ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন এবং ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদকে কমিটিতে রাখা হয়েছে৷

অন্যদিকে ভিকারুননিসার কমিটির নেতৃত্ব দেবেন স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আতাউর রহমান (অভিভাবক প্রতিনিধি)৷ এছাড়া খুরশীদ জাহান (নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদের অভিভাবক প্রতিনিধি) এবং ভিকারুননিসার শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম৷

তবে অভিবাবকরা এসব কমিটির কোনো আশ্বাস মানছেন না৷ মঙ্গলবার সকাল থেকে স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষুব্ধ অভিবাবকেরা৷ অধ্যক্ষ অপসারণসহ এই আত্মহত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ করছেন৷

থেমে নেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাও৷ নানাবিধ স্ট্যাটাস ও টুইটে প্রকাশ পাচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ৷ তাঁদের কথায় শিক্ষাব্যবস্থা, শিশুদের মনোবিকাশ থেকে শুরু করে নানা আলোচনা উঠে এসেছে৷

শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক আহমদ মোস্তফা কামাল বিচারের দাবি জানিয়েছেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে৷ তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই দায়ী মনে করে তাদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান৷

জনপ্রিয় অভিনেত্রী বন্যা মির্জা লিখেছেন, আমিও ভাবি কেন আর কী কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে !! কী বেদনা তাকে সারাক্ষণ কষ্ট দেয়! আহা রে !

উন্নয়নকর্মী কাওসার শাকিল তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন৷ তিনি তাঁর লেখায় গত এক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আত্মহত্যার হার তুলে ধরেন৷

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উম্মে ফারহানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান অপমানের ধারা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফেসবুকে৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘শুধু ভিকারুন্নেসায় নয়, বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলির সরকারি স্কুলগুলিতেও বাচ্চাদের অপমান করা হয়৷ আমরা যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, কোনো এক দিন অ্যাসেম্বলিতে না যাবার অপরাধে শারীরিক শিক্ষা ম্যাডাম বললেন যে, আমরা নাকি পড়ালেখা কিছু করি না, স্কুলে যাই খালি গল্প করতে আর টিফিন খাইতে…''

তরুণ কবি ও ফার্মাসিস্ট মৃদুল মাহবুব তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘পমান‌বোধ একটা খারাপ ধারণা, সন্মান‌বোধও৷ অপমান‌বোধ মানুষ‌কে আত্মঘাতী ক‌রে, মে‌রে ফে‌লে স্বেচ্ছায়৷ ফ‌লে, সামা‌জিকভা‌বে অপমান‌বোধ‌কে আগে ধ্বংস কর‌তে হ‌বে৷আমা‌দের সামা‌জিক শিক্ষ‌া হ‌লো অপমা‌নিত হওয়া বা অপমা‌নিত করা৷ দুটোই সমস্যাযুক্ত যেমন সন্মা‌নিত হওয়া বা করাও একই বিষয়৷''

অরিত্রীর এই ঘটনাকে একদমই ভিন্নভাবে দেখছেন ব্লগার লুৎফর রহমান পাশা৷ তিনি শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া ইগো-কে নেতিবাচক ও আত্মহত্যার প্রভাবক হিসেবে দেখছেন৷

সাম্প্রতিক সময়ে চলমান সোশ্যাল মিডিয়া-সর্বস্ব আন্দোলন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে৷ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী নূর মিশু এমনটাই বলেছেন

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া অরিত্রীর আত্মহত্যাকে ‘হত্যাকাণ্ড' দাবি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায় নেওযার দাবি জানান৷ অপর এক স্ট্যাটাসে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক কাউন্সেলিং করানোর দাবি তোলেন৷

সংকলন: ফাতেমা আবেদীন নাজলা

সম্পাদনা: আশীষ  চক্রবর্ত্তী

আমাদের অনুসরণ করুন