আইএস উদ্বাস্তুদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে

তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট'-এর দখল করা এলাকা থেকে প্রতিদিন মানুষজন পালানোর চেষ্টা করেন, আইএস-এর পক্ষে যা একটা সমস্যা৷ কেউ যে তাদের খেলাফত ছেড়ে পালাতে আকুল, এটা হজম করা আইএস-এর পক্ষে শক্ত৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ছবি সারা পৃথিবীকে অভিভূত, বিমূঢ়, শোকগ্রস্ত করেছিল: সেটি ছিল বোদ্রুমের সৈকতে একটি উদ্বাস্তু শিশুর ভেজা বালিতে পাশ ফিরে শুয়ে থাকার দৃশ্য৷ ছেলেটির নাম আয়লান৷ দেখলে মনে হবে যেন ঘুমিয়ে আছে৷ আসলে আয়লান আর কোনোদিনই উঠবে না৷ সিরিয়া-ইরাক থেকে যে সব মানুষ মরীয়া হয়ে ইউরোপে আসার চেষ্টা করছেন, তাদের ট্র্যাজেডির প্রতীক হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে এই তিন বছরের মৃত শিশুটি৷

ইসলামিক স্টেটের ইংরেজি ভাষার প্রচারপত্রিকা ‘দাবিক'-এর ইন্টারনেট সংস্করণেও ছাপা হয়েছিল সেই ছবি, তবে তার ক্যাপশন ছিল: ‘ইসলামের রাজ্য ছাড়ার বিপদ'৷ সঙ্গের প্রতিবেদনে ধর্ম সংক্রান্ত নানা উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, সত্যিকারের মুসলমানদের ইসলামিক স্টেট ছেড়ে যেতে চাওয়া উচিত নয়৷ অপরদিকে এই লেখাই বস্তুত আইএস-এর স্বীকৃতি যে, অনেকে তাদের আদর্শ ‘ইসলামি রাষ্ট্র' ছেড়ে যেতে ব্যাকুল৷

নিজের দেশ যখন ‘দোজখ’

২০১১ সাল থেকে যুদ্ধ চলছে সিরিয়ায়৷ এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ মারা গেছে৷ সিরিয়া না ছাড়লে মৃতদের কাতারে কখন যে নাম লেখাতে হবে কে জানে! দেশ ছেড়ে কোথায় যাওয়া যায়? কোন জায়গাটা জীবন-জীবিকার জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ? ইউরোপ৷ তাই অনেকেই আসছেন ইউরোপে৷ ছবিতে দামেস্কের এক আবাসিক এলাকায় প্রেসিডেন্ট বাশারের অনুগত বাহিনীর হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মাঝে এখনো কেউ বেঁচে আছেন কিনা দেখছেন সিরীয়রা৷

প্রথম গন্তব্য তুরস্ক

ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে তুরস্কে যায় সিরীয়রা৷ ইজমিরের কোনো হোটেলে উঠেই তাঁরা শুরু করেন মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা৷ যাঁদের হোটেলে ওঠার সাধ্য নেই তাঁরা রাস্তার পাশে কিংবা পার্কে তাঁবু তৈরি করে দু-এক রাত কাটিয়ে নেন৷ ছবির এই মেয়েটির মতো ইউরোপে আসার আগে অনেক সিরীয়কেই ঘুমাতে হয় তুরস্কের রাস্তায়৷

গ্রিসের দিকে যাত্রা

তুরস্ক থেকে প্রায় সবাই ছোটেন গ্রিসের দিকে৷ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এই দেশটিতে শুধু ইউরোপে প্রবেশের জন্যই আসা৷ আসল লক্ষ্য পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলো৷ ছবিতে ডিঙ্গি নৌকায় তুরস্ক থেকে গ্রিসের কস দ্বীপের দিকে যাত্রা শুরু করা কয়েকজন সিরীয়৷

মানুষের নীচে মানুষ

কস দ্বীপ থেকে গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের দিকে যাচ্ছে একটি ফেরি৷ ১০ ঘণ্টার যাত্রাপথ৷ কোনো জায়গা না পেয়ে যাত্রীদের আসনের নিচেই ঘুমিয়ে নিচ্ছে এক সিরীয় কিশোরী৷

রুদ্ধ সীমান্ত

কস দ্বীপ থেকে মেসিডোনিয়া হয়ে ইডোমেনি শহরে যান অনেকে৷ ‘বলকান রুট’ ব্যবহার করে অনেকে বাধ্য হয়ে সার্বিয়ার দিকেও যান৷ গত মাসে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে শরণার্থীদের ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোরও ঘোষণা দেয় মেসিডোনিয়া৷ সহজে সীমান্ত পার হওয়া যাবে ভেবে শুরু হয় সার্বিয়ার দিকে যাত্রা৷ ছবির এই ট্রেনের মতো অনেক ট্রেনই গিয়েছে এমন মানুষবোঝাই হয়ে৷

বেলগ্রেডে বিশ্রাম

ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড যেন শুধুই বিশ্রামাগার৷ এ শহরে বিশ্রাম নিয়েই সবাই পা বাড়ান প্রকৃত গন্তব্যের দিকে৷ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের প্রথম ৬ মাসে সিরিয়া থেকে অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ গিয়েছেন বেলগ্রেডে৷ এখানে বেলগ্রেডের এক পার্কে বিশ্রাম নিচ্ছেন কয়েকজন সিরীয় শরণার্থী৷

হাঙ্গেরিতে মানুষের ঢল

সার্বিয়া থেকে শরণার্থীরা যাচ্ছেন হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে৷ বুদাপেস্টও ‘বিশ্রামালয়’৷ তবে হাঙ্গেরি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে৷হাঙ্গেরি সরকার চায় যাঁরা এসেছেন তাঁরা সেখানেই নাম নথিভূক্ত করাক৷ তা করলে হাঙ্গেরিতেই থাকতে হবে৷ কিন্তু অভিবাসন প্রত্যাশীরা চান জার্মানি যেতে৷ ছবিতে এক কিশোরীর হাতে জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ছবি৷

উষ্ণ অভ্যর্থনা

হাঙ্গেরি থেকে কয়েক হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী চলে এসেছেন অস্ট্রিয়া এবং জার্মানিতে৷ নতুন ঠিকানায় এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন অনেকেই৷ অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থি দলের শাসনাধীন দেশ হাঙ্গেরি থেকে বেরিয়ে আসতে পারাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি৷ জার্মানিতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যরকম৷ মিউনিখে শরণার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বরণ করে নিয়েছেন জার্মানরা!

তারপর.....?

মিউনিখের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশনে এক সিরীয় নারী অভিবাসনপ্রত্যাশীর কোলে সন্তানকে তুলে দিচ্ছেন এক জার্মান পুলিশ৷ সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বরণ করে নিয়েছে৷ কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়ে গেছে অভিবাসন ইস্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা৷ এত বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর আগমন অনেক ধরণের সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা৷

‘ভুল দিকে পালানো?'

জার্মানির জনপ্রিয় লেখক ও প্রাক্তন সিডিইউ সাংসদ ইয়ুর্গেন টোডেনহ্যোফার গতবছর ইসলামিক স্টেটে দশদিন কাটান ও পরে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লেখেন৷ তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো: ‘‘সিরিয়ায় আসাদ প্রশাসনের এলাকা থেকে কেউ খেলাফতের এলাকায় পালাচ্ছে না৷ পালানোটা সবসময়েই উল্টোদিকে: খেলাফতের এলাকা থেকে সরকারি এলাকায়৷'' অথচ ‘দাবিক'-এ রয়েছে: ‘‘ইসলামের রাজ্য স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করা একটা বিপজ্জনক ও বৃহৎ পাপ৷''

কতজন মানুষ যে এ পর্যন্ত আইএস-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পালিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়৷ ইউএনএইচসিআর-এর বিবৃতি অনুযায়ী শুধুমাত্র সিরিয়ার অভ্যন্তরে ৮০ লাখ মানুষ গৃহছাড়া – দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়েছেন আরো ৪০ লাখ৷ সিরিয়া ছেড়ে বিদেশে পালানোটা আইএস-এর ভাবমূর্তির পক্ষে আরো হানিকর, কেননা তাদের ইসলামি রাষ্ট্রের সারা বিশ্বের মুসলমানদের টানার কথা৷ যেমন সিরিয়া, তেমনই ইরাক থেকে উদ্বাস্তুদের পলায়ন আইএস-এর পক্ষে ‘‘লেজিটিমেশন'', অর্থাৎ তাদের ইসলামি রাষ্ট্রের বৈধতা ও যৌক্তিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলে টোডেনহ্যোফার-এর ধারণা৷

উত্তর ইরাকের মোসুল শহরে আগে ২০ লাখের অনেক বেশি মানুষ থাকতেন৷ ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মোসুল ছেড়েছেন; তাদের মধ্যে যেমন খ্রিষ্টান, তেমনই সুন্নি মুসলমানরাও আছেন৷ টোডেনহ্যোফার-এর মতে এটা আইএস-এর পক্ষে ‘‘লজ্জাকর''৷ কেন এত মানুষ তাদের এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছে, সে বিষয়ে ‘দাবিক'-এর প্রতিবেদনে কোনো উচ্চবাচ্য নেই৷ যা আছে, তা হলো সমস্যাটির পরোক্ষ স্বীকৃতি৷

আইএস-এর ইসলামি রাষ্ট্রের সারা বিশ্বের মুসলমানদের টানার কথা – এ কথা কি আপনি বিশ্বাস করেন? জানান নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

ইসলামিক স্টেট বা আইএস আসলে কী?

আল কায়েদা থেকে তৈরি হওয়া সুন্নি মুসলমানদের জঙ্গি সংগঠন আইএস৷ সাদ্দাম পরবর্তী সময়ে ইরাকে এবং বাশার আল আসাদের আমলে সিরিয়ায় সুন্নিদের হতাশা থেকেই জন্ম সংগঠনটির৷ আইএস-এর পতাকায় লেখা থাকে, ‘মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নবী’ এবং ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই৷’

আইএস কোথায় সক্রিয়?

শরিয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে এমন রাষ্ট্র, বা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায় আইএস৷ সিরিয়া এবং ইরাকেই প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় তারা৷ দুটি দেশেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে বেশ বড় অঞ্চল দখল করে নিয়েছে আইএস৷

আইএস কেন আলাদা?

মূলত নিষ্ঠুরতার জন্য৷ শত্রুপক্ষ এবং নিরীহ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াতে তারা এমন বর্বরতা এবং নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে যা আগে কেউ করেনি৷ জবাই করে ভিডিও প্রচার, পুড়িয়ে মারা, বাবার সামনে মেয়েকে জবাই করা এবং তার তার ভিডিও প্রচার, মেয়েদের যৌনদাসী বানানো আর পণ্যের মতো বিক্রি করা – এসব নিয়মিতভাবেই করছে আইএস৷ কোনো অঞ্চল দখলে নেয়ার পর সেখানে শাসন প্রতিষ্ঠায় মন দেয় আইএস৷

অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক

আইএস যদিও শুধু সিরিয়া এবং ইরাকেই সক্রিয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়৷ নাইজেরিয়ার জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম কয়েকদিন আগেই জানিয়েছে, আইএস-কে তারা সমর্থন করে৷ দুটি সংগঠনের মধ্যে একটি জায়গায় মিলও আছে৷ আইএস-এর মতো বোকো হারামও নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতার প্রতিভূ হয়ে উঠেছে৷ অন্য ধর্মের নারীদের প্রতি দুটি সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণই মধ্যযুগীয়৷

আইএস-এর অনুসারী কারা?

অনুসারী সংগ্রহের সাফল্যেও আইএস অন্য সব জঙ্গি সংগঠনের চেয়ে আলাদা৷ এ পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার বিদেশী যোদ্ধা আইএস-এ যোগ দিয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৪ হাজারই পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর অ্যামেরিকার৷

আইএস-কে রুখতে অন্য দেশগুলো কী করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বেশ কিছু পশ্চিমা এবং আরব দেশ সিরিয়া ও ইরাকে আইএস ঘাঁটির ওপর বিমান থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে৷ বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিরিয়ায় ১৪২২ এবং ইরাকে ২২৪২ বার হামলা হয়েছে৷ কোনো কোনো সরকার দেশের অভ্যন্তরেও কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে৷ সিরিয়া ফেরত অন্তত ৩০ জন সন্দেহভাজন জঙ্গির বিচার শুরু করবে জার্মানি৷ গত মাসে সৌদি পুলিশও ৯৩ জন সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে৷

গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ছবি সারা পৃথিবীকে অভিভূত, বিমূঢ়, শোকগ্রস্ত করেছিল: সেটি ছিল বোদ্রুমের সৈকতে একটি উদ্বাস্তু শিশুর ভেজা বালিতে পাশ ফিরে শুয়ে থাকার দৃশ্য৷ ছেলেটির নাম আয়লান৷ দেখলে মনে হবে যেন ঘুমিয়ে আছে৷ আসলে আয়লান আর কোনোদিনই উঠবে না৷ সিরিয়া-ইরাক থেকে যে সব মানুষ মরীয়া হয়ে ইউরোপে আসার চেষ্টা করছেন, তাদের ট্র্যাজেডির প্রতীক হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে এই তিন বছরের মৃত শিশুটি৷