‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সত্য নয়’

বাংলাদেশে যত গুমের ঘটনা ঘটে এবং যতগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যোগসাজশ আছে বলে দাবি করা হয়, তার সব সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) আবদুর রশিদ৷

ডয়চে ভেলে: আমরা ইদানীং দেখছি, গুম, অপহরণ এবং কেউ হারিয়ে যাওয়া ও এরপর ফিরে না আসা – এ সব নিয়ে খুব কথা হচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে অনেক অভিযোগ আসছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ওপর৷ আপনি কি আমাকে বলবেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম' – একে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়?

আবদুর রশিদ: এটা কোনো সংজ্ঞায়নের মধ্যে পড়ে না৷ কারণ সংবিধানে এই ক্ষমতা কাউকে দেয়া হয়নি৷ তাই এ রকম যদি কোনো অভিযোগ আসে, তাহলে অভিযোগগুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখার অবকাশ আছে৷ তবে আমি দেশে আমি যা দেখি, তাতে যতগুলো অভিযোগ আসে তার মধ্যে কিছুর সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লেষ আছে৷ অনেক গুমই ইচ্ছাকৃত হওয়ার সংকেত পাওয়া যায়৷ আবার অনেকে আছে গুম করে সরকারের ভাবমূর্তির ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, যেটা সর্বশেষ ফরহাদ মজহারের গুমের ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট৷ তবে স্বভাবতই একটি গণতান্ত্রিক দেশের যে কোনো ব্যক্তির অধিকার সরকারকে রক্ষা  করতে হবে৷ সেটা রক্ষা করতে গিয়ে যদি কোনো ঘাটতি দেখা যায়, আমি মনে করি সেটি খুব দ্রুত পূরণ করতে হবে৷ তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যতগুলো গুমের ঘটনা ঘটে বা যতগুলোর পেছনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত আছে বলে বলা হয়, ততগুলা হয় বলে মনে হয় না৷ তবে সেটি একেবারে হয় না তাও ঠিক না৷ সেক্ষেত্রে কোনো কোনো ঘটনার তদন্তে তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে৷ শাস্তিও হয়েছে৷ এটিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না৷ মানুষকে আস্থায় রাখতে হলে এ ধরনের অভিযোগ অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে৷ এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় আছে৷

অডিও শুনুন 14:15
এখন লাইভ
14:15 মিনিট
সমাজ সংস্কৃতি | 21.07.2017

‘মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগগুলোই তুলে ধরছেন’

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷ ৮২ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে তারা বলছে, ২০১৬ সালেই কমপক্ষে ৯০ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন৷ যদিও গোপনে আটকে রাখার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করা হয়৷ আটক হওয়া ২১ জনকে পরে হত্যা করা হয়েছে৷ এ ধরনের আরো অনেক তথ্য রয়েছে৷ এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাইছি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আমি প্রথমে মনে করি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো যেসব সংগঠন রয়েছে তারা রাজনীতি বিবর্জিত না৷ আমরা দেখেছি যে কোনো দেশের একটি শাসনব্যবস্থা বা সরকারের ওপর নির্ভর করে তারা একটি দিক ঠিক করে৷ এরপর তাদের তথ্য সংগ্রহের উৎস হলো যেটা করে, যেমন বাংলাদেশে যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে তাদের থেকে পাঠানো ই-মেল বা বার্তা৷ এক্ষেত্রে এককভাবে তাদের নিজস্ব তদন্তসম্বলিত রিপোর্ট তারা প্রকাশ করে বলে আমি মনে করি না৷ অনেক শোনা কথা, অনেক রিপোর্টকে সত্য ধরে তারা তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করে৷ এটি শুধু আমাদের দেশে না, অনেক দেশেই করে যা ভূ-রাজনীতিমুক্ত না৷

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমেই হোক, বা কেউ স্বেচ্ছায় নিঁখোজ হয়ে যাক, এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে কেন বলে আপনার মনে হয়?

প্রথমত আমরা যেটি মনে করি, বাংলাদেশের যে অল্প জায়গা, সেখানে যে জনসংখ্যা তার তুলনায় অপরাধ যে খুব একটা বেড়েছে সেটি আমি বলব না, কিন্তু সেটি একই রকম ‘লেভেলে' আছে৷ জনসংখ্যার তুলনায় যে কয়টি গুম হচ্ছে, সেটি এ ধরনের অপরাধ যেসব দেশে হয়, তার তুলনায় কম৷ কিন্তু এটি একেবারে শূন্যে রাখতে হবে৷ বিষয়টি নীতিগত৷ আমরা যে জায়গাটি দেখতে চাচ্ছি যে সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা আছে কিনা, এরকম গুম খুন করার ব্যাপারে, এবং কারো বিরুদ্ধে এ সব অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে কিনা৷ রাজনৈতিক প্রত্যয়ের অভাব আছে কিনা৷

সমাজ

তথ্য গ্রহণ ও প্রেরণ

বিভিন্ন দেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া গুম সংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে পাঠিয়ে থাকে জাতিসংঘের সংস্থা ডাব্লিউজিইআইডি৷ এসব ঘটনা নিয়ে সরকারগুলোকে তদন্ত করারও অনুরোধ জানিয়ে থাকে তারা৷ একটি নির্দিষ্ট সময় পর সেসব ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য নিয়ে থাকে ডাব্লিউজিইআইডি৷

সমাজ

বার্ষিক প্রতিবেদন

ডাব্লিউজিইআইডি-র কাছে ১৯৮০ সাল থেকে তথ্য আছে৷ প্রতিবছর হালনাগাদ তথ্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি৷ ২০১৬ সালের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, ১৯৮০ সাল থেকে গত বছরের ১৮ মে পর্যন্ত ১০৭টি দেশের সরকারের কাছে ৫৫,২৭৩টি গুম সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে৷ এখনও ৪৪ হাজার ১৫৯টি গুমের ঘটনা নিয়ে কাজ করছে তারা৷

সমাজ

শীর্ষে ইরাক

জাতিসংঘের সংস্থাটি ইরাক সরকারের কাছে এখন পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ৫৬০টি গুম সম্পর্কে জানতে চেয়েছে৷ এর মধ্যে ১৯৮৮ সালেই মোট ১১ হাজার ৫৪৬টি গুমের তথ্য পেয়েছে ডাব্লিউজিইআইডি৷

সমাজ

এরপরে শ্রীলংকা

১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে যথাক্রমে ৪,৭০০ ও ৪,৬২৪ জনের ব্যাপারে শ্রীলংকার সরকারের কাছে তথ্য জানতে চায় ডাব্লিউজিইআইডি৷ সব মিলিয়ে সংস্থাটির কাছে সে দেশ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৩৪৯টি গুমের খবর পৌঁছেছে৷

সমাজ

অন্যান্য দেশ

সংখ্যার বিচারে ইরাক আর শ্রীলংকার পরের কয়েকটি দেশ হচ্ছে আর্জেন্টিনা (৩,৪৪৬), আলজেরিয়া (৩,১৬৮), গুয়াতেমালা (৩,১৫৪) ও পেরু (৩,০০৬)৷

সমাজ

বাংলাদেশ

২০০৯ সাল থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ‘গুম’ হয়েছেন ৪৩২ জন৷ ফিরে আসা ব্যক্তিরা অপহরণকারীদের ব্যাপারে মুখ খোলেননি৷ অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে চিকিৎসাধীন৷

সেক্ষেত্রে আমি দেখছি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যেসব অভিযোগ এসেছে তারা তার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করেছে৷ ঠিক তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি যা প্রমাণ করে, এ ধরনের গুমের পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রত্যয় বা নির্দেশনা কাজ করেছে৷ কিন্তু সংখ্যা বাড়ছে বা কমছে, তার জন্য অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলীয় কোন্দল বা জমিজমার কোন্দল – এগুলোকে কিন্তু আমরা বাদ দিতে পারব না৷ শুধু এটি রাজনৈতিক কারণে হচ্ছে সেটি আমি কখনো বলব না৷ আপনি যদি দেখেন গুম খুনের মধ্যে এমন অনেকের নাম আছে, যারা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি অগুরুত্বপূর্ণ৷ এটি দৃশ্যমান না যে সে একটি রাজনৈতিক দলের একজন অ্যাকটিভ কর্মী বা নেতা৷ কিছু কিছু এ রকম ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ব্যক্তিগত আক্রোশ, ব্যবসা বিরোধ, ব্যক্তিগত, জমি বিরোধ এসব কারণকে আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে৷

সাজেদুল ইসলাম সুমন নামে এক বিএনপি কর্মীর কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, একজন জ্যেষ্ঠ ব়্যাব কর্মকর্তা পরে পরিবারের কাছে স্বীকার করেন যে সুমনসহ ছয়জন তাঁর হেফাজতে ছিল৷ কিন্তু তাদের হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় পরে তাঁর কাছ থেকে তাদের সরিয়ে নেয়া হয়৷ এ ধরনের ঘটনা কি রাজনৈতিক বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়? 

আমি দু'টো দিক দেখছি৷ যেটা আপনি বললেন যে একজন কর্মকর্তার নাম ধরে বলা হচ্ছে, সেখানে আমি বিশ্বাসযোগ্যতার কিছুটা ঘাটতি দেখছি৷ যার কথা বলা হচ্ছে তিনি একজন জাতীয় মানের নেতা নন৷ একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার হেফাজতে যদি তিনি থাকেন এবং সেই কর্মকর্তা যদি তাকে রক্ষা করতে চান, তাহলে সেটা না পারার কোনো কারণ দেখি না৷ তাই এক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব দেখছি৷ এর আগেও আমি ফাঁস হওয়া ফোনে কথাবার্তা শুনেছি৷ কিন্তু কেউ যদি জড়িত থাকে, তাহলে সে কেন ফাঁস করবে? পদ্ধতিগতভাবে এগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে৷ রাজনৈতিকভাবে এগুলোকে ব্যবহার করার প্রবণতা আছে৷ তবে এ ধরনের ঘটনা একেবারে ঘটছে না সেটাও আমি বলছি না৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যকে ব্যবহার করে হয়ত কোনো কোনো ঘটনা ঘটিয়েছে৷ কিন্তু আমি যে জায়গাটিতে গুরুত্ব দিতে চাই তা হলো, এ সব ঘটনা যখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে যাচ্ছে তারা সেটিকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন কিনা, কিংবা এর পেছনে কোনো দলগত রাজনৈতিক নির্দেশনা আছে কিনা৷ এখন পর্যন্ত সে রকম কিছু আমাদের চোখে পড়েনি৷ বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় এ ধরনের ঘটনা সংখ্যানুপাতে যতটা, তা আমার মতে কম৷ কিন্তু সংগঠনগুলো যেভাবে এগুলো তুলে ধরছে, তা ভূ-রাজনীতিমুক্ত নয়৷

‘এলিট ফোর্স’

বাংলাদেশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব নামক ‘এলিট ফোর্স’-এর যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে৷ এই বাহিনীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘‘পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার একটি এলিট ফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করে৷’’ তবে এই বাহিনী এখন তুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন মহল৷

সমন্বিত বাহিনী

বাংলাদেশ পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে র‌্যাব গঠন করা হয়৷ এই বাহিনীর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাস প্রতিরোধ, মাদক চোরাচালান রোধ, দ্রুত অভিযান পরিচালনা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমে নিরাপত্তা প্রদান৷

জঙ্গি তৎপরতা দমন

শুরুর দিকের ব়্যাবের কার্যক্রম অবশ্য বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল৷ বিশেষ করে ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা উগ্র ইসলামি জঙ্গি তৎপরতা দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে র‌্যাব৷

জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার

বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় ২০০৫ সালে একসঙ্গে বোমা ফাটিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা জেএমবির শীর্ষ নেতাদের আটক ব়্যাবের উল্লেখযোগ্য সাফল্য৷ ২০০৬ সালের ২ মার্চ শায়খ আব্দুর রহমান (ছবিতে) এবং ৬ মার্চ সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় ব়্যাব৷ একাজে অবশ্য পুলিশ বাহিনীও তাদের সহায়তা করেছে৷

ভুক্তভোগী লিমন

২০১১ সালে লিমন হোসেন নামক এক ১৬ বছর বয়সি কিশোরের পায়ে গুলি করে এক ব়্যাব সদস্য৷ গুলিতে গুরুতর আহত লিমনের বাম পা উরুর নীচ থেকে কেটে ফেলতে হয়৷ এই ঘটনায় ব়্যাবের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদের ঝড় ওঠে৷ তবে এখনো সুবিচার পায়নি লিমন৷ উল্টো বেশ কিছুদিন কারাভোগ করেছেন তিনি৷

‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’

জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য দেখালেও ক্রসফায়ারের নামে অসংখ্য ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব়্যাবের বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমশ বাড়তে থাকে৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ব়্যাবের বিলুপ্তি দাবি করে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বাহিনী ‘সিসটেমেটিক’ উপায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে৷

‘ক্রসফায়ার’

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ব়্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ২৪ জন৷ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দাবি অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে কমপক্ষে সাতশো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ব়্যাব জড়িত ছিল৷

আলোচিত সাত খুন

২০১৪ সালের মে মাসে ব়্যাবের বিরুদ্ধে ৬ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে সাত ব্যক্তিকে অপহরণ এবং খুনের অভিযোগ ওঠে৷ নারায়ণগঞ্জে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিন ব়্যাব কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ৷ এই ঘটনার পর ব়্যাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আবারো বিতর্ক শুরু হয়েছে৷

প্রতিষ্ঠাতাই করছেন বিলুপ্তির দাবি

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, ব়্যাবের বিলুপ্তি দাবি করেছেন৷ অথচ তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ‘এলিট ফোর্স’৷

বিলুপ্তির দাবি নাকচ

বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক স্তর থেকে ব়্যাবকে বিলুপ্তির দাবি উঠলেও বর্তমান সরকার সেধরনের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না৷ বরং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ব়্যাব বিলুপ্তির দাবি নাকচ করে দিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘র‌্যাবের কোনো সদস্য আইন ভঙ্গ করলে তাদের চিহ্নিত করে বিচারিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়৷’’

তাহলে যারা গুম করছে পরবর্তীতে তাদের ধরা হচ্ছে না, এমন অভিযোগও আছে৷ সেক্ষেত্রে অভিযোগের আঙ্গুল কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই আসে৷ শুধু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনই নয়, দেশীয় সংগঠনগুলোও তাই বলছে৷

তা তো আসছেই৷ তারা তাই করছেন৷ কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে৷ তারা যতটা এ সব রিপোর্ট প্রকাশ করতে আগ্রহী, ততটা আগ্রহ এগুলো দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করায় দেখা যায় না৷ তারা দেন দরবার করে এগুলো আইনের আওতায় আনতে আগ্রহী নন৷ রিপোর্ট প্রকাশ করতে বেশি আগ্রহী৷

এই যে গণমাধ্যমে, সামাজিক গণমাধ্যমে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে এসব কারণে যে আঙুল তুলছে, তাতে নিশ্চয়ই তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে৷ এই ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে তাদের কী করা উচিত? সেক্ষেত্রে সরকারেরই বা কী করা উচিত বলে আপনার মনে হয়?

প্রতিবছর আইন রক্ষা করতে বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া এবং আইন অপব্যবহারের কারণে অনেক সংখ্যক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়, যা যতদূর আমি জানি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়৷ কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগগুলোই তুলে ধরছেন৷ কিন্তু তার জন্য যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা প্রকাশ করছেন না৷ ব়্যাব-এও এ সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে৷ কিন্তু সবাইকে বিষয়গুলোকে আরো পাবলিক করতে হবে৷ নৈতিকভাবে আমি মনে করি, এ ধরনের অভিযোগ এলে তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত৷ আর রাজনৈতিকভাবে আমি মনে করি, যদি এমন অভিযোগ আসে, তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেন তা ঢেকে ফেলতে না পারেন সরকারের পক্ষ থেকে তেমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷