আদিবাসী, নাকি উপজাতি?

প্রশ্নটা যে আমিই প্রথম তুললাম, তা নয়৷ বাংলাদেশের পার্বত‍্য অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বলা উচিত? নাকি তারা উপজাতি? এ প্রশ্ন বহুদিনের, অথচ জনমত আর সংবিধান এক্ষেত্রে কার্যত বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে৷

আজকাল যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার এক ভালো মাধ‍্যম ফেসবুক৷ সেখানে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘‘বাংলাদেশে উপজাতিরা সরকারের কাছ থেকে কি বিশেষ কোনো সুযোগ সুবিধা পান? পেলে সেগুলো কী কী?'' আমার কয়েকজন ফেসবুক বন্ধু প্রশ্নটি ঠিক পছন্দ করেননি৷ তাঁদের আপত্তি উপজাতি শব্দটি নিয়ে৷ তাঁদের কথা হচ্ছে, উপজাতি নয়, কথাটা হবে আদিবাসী৷''

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আমার সুযোগ-সুবিধার হিসেব ছেড়ে আলোচনাটা তাই চলে গেল আদিবাসী নাকি উপজাতি – সেই দিকে৷ উপায়ান্তর না দেখে আমি যোগাযোগ করি একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে৷ তিনি আমাকে বোঝালেন এই বিতর্কের উৎস নিয়ে৷ ২০০৯ সালেও আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করেছে৷ কিন্তু তারপরই বদলে গেছে বিষয়টি৷ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সেই বিশেষজ্ঞ জানান, অনেকে মনে করেন আদিবাসী মানে আদি বাসিন্দা৷ আর বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা হতে হবে বাঙালিদের৷ তাই তারা আদিবাসী নন, উপজাতি৷

সমাজ

ধান চাষ

চাকমাদের জীবিকা প্রধানত কৃষি কাজ৷ পার্বত্য চট্টগ্রামের সমতল অংশে স্বাভাবিক সেচ পদ্ধতিতে মৌসুমী কৃষি কাজ, এবং পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষের মাধ্যমে চাকমা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও রবিশস্য উৎপাদন করে থাকে৷

সমাজ

পুরুষ-নারী সমানে সমান

আদিবাসী নারীরা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে৷ এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে নারী পুরুষ একসাথে ধানের জমিতে কাজ করছে৷

সমাজ

বাঁশের অঙ্কুর সংগ্রহ

তিন চাকমা নারী বাঁশের অঙ্কুর নিয়ে নৌকায় করে যাচ্ছেন৷

সমাজ

হলুদ সংগ্রহ

এক চাকমা পুরুষ হলুদ সংগ্রহ করে ঝর্ণার পানিতে সেগুলো ধুয়ে নিচ্ছেন৷

সমাজ

স্কুলে যাওয়া

একটি আদিবাসী কিশোরী স্কুলে যাচ্ছে৷

সমাজ

চিংড়ি মাছ সংগ্রহ

দুইটি আদিবাসী বালক-বালিকা ঝিরি (ছোট ঝর্ণা) থেকে চিংড়ি মাছ সংগ্রহ করছে৷

সমাজ

ঐতিহ্যবাহী কম্বল বোনা

এক চাকমা নারী তাদের ঐতিহ্যবাহী কম্বল বুনছেন৷

সমাজ

জাল দিয়ে মাছ ধরা

জাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন আদিবাসী নারী-পুরুষ৷

সমাজ

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

বৈসাবি উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনা৷

সমাজ

ধর্ষণের শিকার

২১ আগস্ট ২০১২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সি এই ত্রিপুরা মেয়েটি খাগড়াছড়িতে এক পুলিশ কনস্টেবলের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল৷ (ছবি: সুমিত চাকমা)

সমাজ

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভ

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রাঙামাটিতে পাহাড়িদের উপর জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বাঙালিদের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ৷ (ছবি: পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ)

সমাজ

ধর্ষণের প্রতিবাদ

২০১২ সালে রাঙামাটির সুজাতা নামে এক ১২ বছরের চাকমা কিশোরীকে ধর্ষণ করে হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিল আদিবাসী শিক্ষার্থীরা৷ (ছবি: সুমাইয়া সাঈদ)

সমাজ

কল্পনা চাকমা

১৯৯৬ সালের ১২ জুন কল্পনা চাকমাকে তুলে নিয়ে যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা৷ তার খোঁজ আজও মেলেনি৷ এই ছবিটি এঁকেছেন প্রজ্ঞান চাকমা৷

সমাজ

চাকমাদের উপর বাঙালিদের হামলা

২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রাঙামাটির বোগাচারিতে তিনটি আদিবাসী গ্রামে হামলা চালায় বাঙালিরা৷ (ছবি: হিমেল চাকমা)

সমাজ

৫৭ টি বাড়ি পোড়ানো হয়

চাকমাদের ৫৭টি বাড়ি পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেয়৷ নিঃস্ব হয়ে যায় অনেক পরিবার৷

সমাজ

খাসিয়া উচ্ছেদ

২০১৬ সালের জুন মাসে সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জিবাসী খাসিয়াদের উচ্ছেদের নোটিশ জারি করে জেলা প্রশাসন৷ (ছবি: খোকন সিং)

সমাজ

৭০০ মানুষ বাস্তুহারার আশঙ্কা

উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী আদিবাসী গ্রাম নাহার-১ পান পুঞ্জির ৭০০ মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়েছে৷ বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ পাওয়া মানুষদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধই বেশি৷

সমাজ

সাঁওতালদের উপর হামলা

২০১৬ সালে ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকলের বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ও সাঁওতালদের সংঘর্ষ থামাতে গুলি চালায় পুলিশ৷ এতে তিন সাঁওতাল নিহত হন, আহত হন অনেকে৷

সমাজ

জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিরোধ

সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রামের ১ হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি ১৯৬২ সালে অধিগ্রহণ করে চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তুলেছিল৷ চিনিকলের জন‌্য অধিগ্রহণ করা ওই জমিতে কয়েকশ’ ঘর তুলে সাঁওতালরা বসবাস করে আসছিল কয়েক বছর ধরে৷ চিনিকল কর্তৃপক্ষ ওই জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে৷

বাংলাদেশের সংবিধানের একটি ধারাও ইন্টারনেটে পেলাম যেখানে লেখা হয়েছে, ‘২৩ক. রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷' খেয়াল করলে দেখবেন এখানে পরিষ্কারভাবে আদিবাসী শব্দটি ব‍্যবহার করা হয়নি৷

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তারা আরো অনেক অধিকার পাবেন৷ ২০০৭ সালে পাস হওয়া ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অফ দ‍্য ইন্ডিজিনিয়াস পিপলস' বা ইউএনডিআরআইপি অনুযায়ী, আদিবাসীদের নিজেদের উন্নয়নের ধারা নিজেদের নির্ধারণ, এবং আত্মনিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অধিকার তাদের প্রাপ‍্য হয়ে উঠবে৷ বাংলাদেশ সরকার সেটা দিতে রাজি নয়, পার্বত‍্য অঞ্চলও বেসামরিকীকরণের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই৷ তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে উপজাতি হিসেবে বিবেচনাই নিরাপদ৷ ফলে সেই ডিক্লারেশনে স্বাক্ষরও করেনি বাংলাদেশ৷

দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী শব্দটির গুরুত্ব অনেক৷ আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো চান তাদের সে নামেই অবিহিত করা হোক৷ ফেসবুক ঘেঁটে যেটা বুঝলাম, সাধারণ মানুষেরও তাতে বিশেষ আপত্তি নেই৷ যদিও মার্কিন নির্বাচনের পর ফেসবুক আর বাস্তব দুনিয়ার ফাঁরাক যে কতটা, তা বোঝা গেছে৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ‍্যমে যাকে দিনের পর দিন নাস্তানাবুদ করা হয়েছে, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট৷ বোঝাই যায়, ফেসবুকে যতটা উদারতা অনেকে দেখান, বাস্তবে আসলে তাঁরা ততটা উদার নন৷

DW Bengali Arafatul Islam

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

যাহোক, আদিবাসী, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী – যেটাই বলা হোক না কেন, এ সব গোষ্ঠীকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি অধিকার সুনির্দিষ্টভাবেই দিচ্ছে৷ এঁরা সরকারি বিশ্ববিদ‍্যালয়ে এবং সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা পান৷ এই সুবিধা তাঁদের উন্নতির পথে সহায়তা করছে৷ তবে তা পর্যাপ্ত নয়৷ বরং শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত‍্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অন‍্যান‍্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের জীবন আরো শান্তিপূর্ণ হবে বলে আমি মনে করি৷

আপনার কি এ বিষয়ে কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব‍্যের ঘরে৷

সংস্কৃতি

বৈসাবি উৎসব

ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বৈসুক’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’ – এই তিন উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর থেকে ‘বৈসাবি’ উৎসবের নাম এসেছে৷ তিনটিই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান৷ ফলে পার্বত্য এলাকার আদিবাসীরা সবাই মিলে বৈসাবি উৎসবে অংশ নেয়ার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়৷ উপরের ছবিটি সাংগ্রাই উৎসবের৷

সংস্কৃতি

চাকমাদের বিজু

বাংলা বছরের শেষ দু’দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এই উৎসব হয়৷ অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’ নামে পরিচিত৷ এই দিন ভোরে পানিতে ফুল ভাসানো হয়৷ তরুণ-তরুণীরা পাড়ার বৃদ্ধদের গোসল করিয়ে দেয়৷ তবে বিজু উৎসবের মূল দিন নববর্ষের প্রথম দিন৷ চাকমা ভাষায় এই দিনটির নাম গজ্জ্যেপজ্জ্যে, অর্থাৎ গড়াগড়ি খাওয়ার দিন৷ এই দিন ভালো খাবার রান্না করা হয়৷ কারণ মনে করা হয়, বছরের প্রথম দিন ভালো রান্না করলে বছরজুড়ে অভাব থাকবে না৷

সংস্কৃতি

মারমাদের সাংগ্রাই

পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী মারমারা পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন করলেও বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে না৷ তারা বর্মীপঞ্জি, অর্থাৎ বার্মা মিয়ানমারের ক্যালেন্ডার মেনে চলে৷ সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘রিলং পোয়েহ্’৷ এটি পানি ছো়ড়াছুড়ির খেলা৷ মারমা তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেয়৷ তাঁদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে অতীতের সকল দুঃখ-গ্লানি ও পাপ ধুয়ে-মুছে যায়৷

সংস্কৃতি

ত্রিপুরাদের বৈসুক

চাকমাদের বিজুর মতো এই উৎসবও তিনদিনের৷ নববর্ষের প্রথম দিন বয়স্করা ছোটদের আশীর্বাদ করেন৷ আর কিশোরীরা কলসি কাঁখে নিয়ে বয়স্কদের খুঁজে খুঁজে গোসল করায়৷ তরুণ-তরুণীরা রং খেলায় মেতে ওঠে৷ একজন আরেকজনকে রং ছিটিয়ে রঙিন করে দিয়ে গোসল করে আবারো আনন্দে মেতে ওঠে৷

সংস্কৃতি

তঞ্চঙ্গ্যাদের বৈসুক

তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবরণ অনেকটা চাকমাদের মতোই৷ উৎসবের প্রথম দিন মেয়েরা ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়৷ পরদিন সবাই গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে আনন্দ-ফূর্তি করে৷ ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার আর পিঠার আয়োজন করা হয়৷ রাতে ‘ঘিলা’ নামের এক খেলায় মেতে ওঠে সবাই৷ আর নববর্ষের দিন তরুণ-তরুণীরা বয়স্কদের গোসল করায়৷

সংস্কৃতি

মুরংদের চাংক্রান

মূল উৎসবের দিন মুরংরা বাঁশি বাজিয়ে ‘পুষ্প নৃত্য’ করতে করতে মন্দির প্রদক্ষিণ করে৷ ম্রো সমাজে লাঠি খেলা খুবই জনপ্রিয়৷ তাই চাংক্রানের মূল দিনে তারা এই খেলা খেলে থাকে৷

সংস্কৃতি

কারাম উৎসব

সমতলের আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কারাম উৎসব’ বা ‘ডাল পূজা’৷ ওঁরাও, সাঁওতাল, মালো, মুন্ডা, মাহাতো, ভুইমালি, মাহলীসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে৷ এই আদিবাসীরা ‘কারাম’ নামক একটি গাছের ডালকে পূজা করেন বলে এই উৎসবের আরেক নাম ‘ডাল পূজা’৷

সংস্কৃতি

সাঁওতালদের সহরায় উৎসব

আদিবাসী সাঁওতালদের কাছে গৃহপালিত গরু, মহিষের গুরুত্ব অনেক৷ সহরায় উৎসবে এসব প্রাণীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়৷ উৎসবকে ঘিরে বিবাহিত মেয়েরা তাদের বাবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান৷ কারণ উৎসবে তাদের আমন্ত্রণ জানানো একটি রেওয়াজ৷ এই পরবের নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ নেই৷ গ্রামের মোড়লদের নিয়ে সভা করে উৎসবের দিন ঠিক করা হয়৷