আফগানিস্তানে নারী অধিকার আবার কি হোঁচট খাচ্ছে?

বহু সমস্যা সত্ত্বেও গত বছরগুলিতে আফগানিস্তানের মেয়েরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পেরেছেন৷ প্রশ্ন উঠতে পারে, ২০১৪ সালেও কি এই প্রবণতা বজায় থাকবে?

২০০১ সালে তালিবানদের পতনের পর আফগানিস্তানে নারী অধিকারের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে৷ সংবিধানে নারী পুরুষের সমানাধিকার সংরক্ষিত হয়েছে৷ ২.৮ মিলিয়নের বেশি মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে৷ জাতীয় সংসদে প্রায় ৩০ শতাংশ সাংসদ নারী৷

কারজাই সরকার লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে৷ ২০০৯ সালে নারী নির্যাতন রোধক একটি আইন পাস হয়েছে৷ এই আইনে শুধু ধর্ষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধেই শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়নি৷ বাল্যবিবাহ, জোর করে বিয়ে দেওয়া, নারী ব্যবসা ইত্যাদিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়৷ কিন্তু আইন থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ৷

আফগানিস্তানে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদের ছবি

আইনকানুনের শ্লথ গতি

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনর নাভি পিল্লাই সমালোচনা করে বলেন, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধক আইনকানুন খুব শ্লথ গতিতে অগ্রসর হচ্ছে৷ পুলিশ, সরকারি প্রসিকিউটর, আদালত মেয়েদের রক্ষা করার জন্য সরকারি হাতিয়ারগুলি কাজে লাগানোর ব্যাপারে গড়িমসি করছে৷ অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তির চেয়ে সমঝোতার মাধ্যমে মিটমাট বা মীমাংসা করতে আগ্রহী আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ৷ বলেন ‘আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্ক'-এর সারি কুভো৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘সঠিক সংযোগ ও টেলিফোন নম্বর থাকলে অপরাধীরা সেই ‘ন্যায়বিচারই' পায়, যা তারা নিজেরা সঠিক বলে মনে করে৷''

সমাজ সংস্কৃতি | 04.02.2014

দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা

বিশেষজ্ঞরা একে রাজনীতি প্রভাবিত দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা বলে অভিহিত করেন৷ সম্প্রতি সংসদে একটি আইনের খসড়া পেশ করা হয়, যাতে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আদালতে হাজির আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়৷ আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে আইনের এই খসড়ায় পরিবর্তন আনা হয়৷

তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানে নারী অধিকার সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা হয়েছিল৷ কিন্তু আজও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ঘেরাটোপেই রয়ে গেছে দেশটি – বলেন সারি কুভো৷ তাঁর কথায়, ‘‘মেয়েদের যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে বাবা কিংবা স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হয়৷''

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

খেলনা!

কাবুলে যু্দ্ধাহতদের জন্য তৈরি একটা নকল হাত নিয়ে খেলছে দুই কিশোরী৷ এমন কিছু ছবিই তেহরানের মাজিদ সাঈদিকে এনে দিয়েছে বেশ কিছু পুরস্কার৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

ছবিই বলে হাজার কথা

১৬ বছর বয়স থেকে ছবি তুলছেন মাজিদ৷ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের দিকেই তাঁর সমস্ত মনযোগ৷ জার্মানির ডেয়ার স্পিগেল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসের মতো ম্যাগাজিন এবং আন্তর্জাতিক পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর তোলা ছবি৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

আফগানিস্তানের শিশুরা

ডিডাব্লিউকে সরবরাহ করা মাজিদের ছবির অনেকগুলোতেই ফুটে উঠেছে আফগান শিশুদের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব৷ এ ছবিটি যুদ্ধের কারণে হাত হারানো এক আফগান শিশুর৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

মাদকের অভিশাপ

আফগানিস্তানের খুব বড় এক সমস্যা মাদক৷ বলা হয়ে থাকে বিশ্বের শতকরা ৯০ ভাগ মাদকদ্রব্যই নাকি উৎপন্ন হয় আফগানিস্তানে৷ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আফিম হয় দেশটিতে৷ দেশের অনেক নাগরিক আফিমসেবী৷ জাতিসংঘের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানের অন্তত তিন লক্ষ শিশু নিয়মিত আফিম সেবন করে৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

রোল কল

কাবুলের এক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ শুরুর আগে ক্যাডেটদের রোল কল চলছে৷ জার্মান সেনাবাহিনী ‘বুন্ডেসভেয়ার’ আফগান নিরাপত্তাকর্মীদের অনেক আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল৷ প্রশিক্ষণের লক্ষ্য, আফগান সেনাবাহিনী এবং পুলিশকে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মনির্ভরশীল করে তোলা৷ ২০১৪ সালের শেষেই অবশ্য আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে জার্মানি৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

ভয়ংকর শৈশব

স্কুলে লেখাপড়া করতে যাওয়ার সুযোগ শিশুদের কমই মেলে৷ স্কুলে গেলে নগণ্য কারণেও হতে হয় শিক্ষকের কঠোর শাসনের শিকার৷ তা সহ্য করেও পুরো সময় থাকা হয়না, পরিবারের জন্য টাকা রোজগার করতে আগেভাগেই স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়তে হয় তাদের৷ আফগানিস্তানে শিক্ষার হার খুবই কম৷ ২০১১ সালে জার্মান সরকারের উদ্যোগে একটি তথ্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়েছিল৷ তখন আফগানিস্তানের শতকরা ৭২ ভাগ পুরুষ আর ৯৩ ভাগ নারীই ছিল নিরক্ষর৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

বোরখা এবং পুতুল

আফগান নারীরা পুতুল বানাতে শেখার ক্লাসে৷ মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি সংস্থার অর্থায়নে এখানে পুতুল বানাতে শেখানো হয় তাঁদের৷ আফগান নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্যই এ উদ্যোগ৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

তালেবানের প্রতিশোধ

২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পরই আফগানিস্তানে হামলা চালায় তালেবান৷ প্রতিশোধমূলক সে হামলায় প্রাণ যায় চারজনের, আহত হয়েছিলেন ৩৬ জন৷ ছবিতে দু’জন আহতকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

খেলাধুলা

হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে একটু বিশ্রাম৷ আফগানিস্তানে শরীর চর্চা খুব জনপ্রিয়৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

যুদ্ধের আবাদ

গত ৩০টি বছর ভীষণ প্রভাব ফেলেছে আফগানদের জীবনে৷ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় যুদ্ধের প্রভাব৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

মাদ্রাসা

কান্দাহারের মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিশুরা৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

হত্যার প্রশিক্ষণ

কুকুরের লড়াইও আফগানিস্তানে খুব জনপ্রিয়৷ কুকুরদের এমনভাবে লড়াই করতে শেখানো হয় যাতে তারা প্রতিপক্ষকে একেবারে মেরে ফেলে৷ কুকুরের জীবনেও যুদ্ধের প্রভাব!

জাতিসংঘের নারী সংস্থা ‘ইউএন উইমেন'এর নির্বাহী পরিচালক ফুমজিলে ম্লামবো এনচুকা-ও মনে করেন, আফগানিস্তানের নারীরা শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছেন৷ বৈষম্যমূলক সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এর মূল কারণ৷ তাঁর মতে, ৯০ শতাংশ আফগান নারী সহিংসতার শিকার৷ সহিংসতা বলতে শারীরিক, মানসিক, যৌন, অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক ক্ষেত্রে সব ধরনের দমনমূলক কর্মকাণ্ডই বোঝায়৷ ইদানীং উচ্চপদস্থ নারী-সরকারি কর্মচারীদের হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে৷

অগ্রগতি বিনষ্ট হতে পারে

আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘‘গত কয়েক বছরের অগ্রগতি আইনকানুন ও রাজনীতির ফাঁকফোকরে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে৷'' বলেন সারি কুভো৷ আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহার করা হলে এই সম্ভাবনা আরো বেড়ে যেতে পারে৷ সেনাবাহিনীর একটা অংশ ছোট আকারে প্রশিক্ষণকারী হিসাবে থাকবে কিনা, উন্নয়ন সাহায্যই বা কী ভাবে চলবে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়৷

কারজাই পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তালিবান তাদের হামলা আরো তীব্র করবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়৷ নারী অধিকারের বিষয়টিতে নতুন সরকারের ভূমিকা কীরকম হবে, সেটাও অস্পষ্ট৷

সারি কুভো মনে করেন, আন্তর্জাতিক মহলের উচিত হবে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে আফগানিস্তানের নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা৷

আমাদের অনুসরণ করুন