আফগান তরুণ ‘যথেষ্ট সমকামী নন'

সমকামীদের মতো ‘মিশুক' না হওয়ার কারণ দেখিয়ে এক আফগান তরুণের আশ্রয়ের আবেদন নাকচ করেছেন অস্ট্রিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তারা৷

১৮ বছরের ওই তরুণ নিজেকে সমকামী দাবি করে নিরাপত্তার খাতিরে তাঁকে অস্ট্রিয়ায় আশ্রয় দেওয়ার আবেদন করেছিলেন৷

সমাজ সংস্কৃতি | 11.03.2012

তবে তাঁর চাপা স্বভাব, কর্মকাণ্ড ও পোশাক সমকামীদের সঙ্গে মানানসই মনে না হওয়াকে কথা আবেদন নাকচের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অস্ট্রিয়ান সাময়িকী ফলটার বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে৷

অভিবাসন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়, ‘‘আপনার হাঁটা-চলা, কাজকর্ম ও পোশাক ন্যূনতম প্রমাণ দেয় না যে, আপনি সমকামী হতে পারেন৷''

এই কারণে আফগানিস্তানে ওই তরুণের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয়নি অস্ট্রিয়ান কর্মকর্তার৷

এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ওই তরুণ আপিল করবেন বলে জানিয়েছে ফলটার৷

মুসলিম প্রধান আফগানিস্তানে সমকামিতা নিষিদ্ধ৷ একে দেখা হয় অনৈতিক ও অপরাধ হিসেব৷ দেশটির শরিয়া আইন অনুযায়ী, এর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে৷

সামাজিকভাবেও সমকামিতাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়৷

এই আফগান তরুণ ২০১৬ সালে একাই অস্ট্রিয়ায় আসেন৷ তখন তাঁর ঠাঁই হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসওএস চিলড্রেন'স ভিলেজের শরণার্থী শিবিরে৷ আশ্রয় প্রার্থনার আবেদনে কারণ হিসেবে নিজেকে আফগানিস্তানে নিপীড়নের শিকার সংখ্যালঘু হাজারা সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন৷ পরে সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের বিষয়টি তুলে ধরে পুনরায় আবেদন করেন তিনি৷ তাঁর আইনজীবীরা বলছেন, প্রথমে বিষয়টি প্রকাশে ভয় পাচ্ছিলেন তিনি৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

লম্বা গলার জিরাফ

জিরাফদের সমলিঙ্গের মধ্যে ভালোবাসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়৷ এমনকি গবেষকরা বলছেন, জিরাফদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই সমলিঙ্গের সঙ্গীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

বোতলনাক ডলফিন

এই প্রজাতির স্ত্রী ও পুরুষ দুই ধরনের ডলফিনের মধ্যেই সমকামিতা দেখা যায়৷ মুখ এবং নাক দিয়ে স্পর্শ করে সঙ্গীকে আদর করে তারা৷ পুরুষ ডলফিনরা সাধারণত উভকামী৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

সিংহের আনুগত্য

পশু রাজ সিংহের মধ্যেও সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ দুই থেকে চারটি পুরুষ সিংহ একটি জোট গঠন করে, যাতে সিংহীরা তাদের কাছে আসতে না পারে৷ অন্য জোট থেকে বাঁচতে একে অপরের উপর ভীষণ নির্ভরশীল তারা৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

বাইসন

পুরুষ বাইসনদের মধ্যে সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ কেননা স্ত্রী বাইসনদের সঙ্গে বছরে একমাত্র একবার মিলন হয় তাদের৷ তাই প্রজনন মৌসুমে পুরুষ বাইসনরা একে অপরের সঙ্গে দিনে বহুবার মিলিত হয়৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

বানরদের ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’

ম্যাকাক প্রজাতির নারী ও পুরুষ বানর – উভয়ের মধ্যে এই প্রবণতা রয়েছে৷ যেখানে পুরুষরা মাত্র একরাতের জন্য সমলিঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়, সেখানে স্ত্রী বানররা নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তোলে এবং একে অপরের সঙ্গে থেকে যায়৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

অ্যালবাট্রসদের বন্ধন

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের লেসন অ্যালবাট্রসরা তাদের সমকামী বন্ধনের জন্য ভীষণভাবে পরিচিত৷ এরা এতটাই বন্ধনে জড়িয়ে যায় যে পুরো জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয়, যেন মনে হবে একটি সন্তান সহ স্বামী-স্ত্রীর সুখি পরিবার৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

যৌন-বিকারগ্রস্ত বনোবো

পিগমি শিম্পাঞ্জী বা বনোবোকে বলা হয় মানবজাতির সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ প্রাণী৷ তারা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মিলিত হতে থাকে, এমনকি সমলিঙ্গের সঙ্গে৷ নিজেদের আনন্দের জন্যই এটা করে তারা৷ তবে এটা ঠিক তারা এটাকে নিজেদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করা এবং দুশ্চিন্তা দূর করার উপায় হিসেবেও মনে করে৷ স্ত্রীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

প্রতি ৫টির মধ্যে একটি রাজহাঁস সমকামী

অনেক পাখিদের মতো রাজহাঁসরাও একগামী এবং বছরের পর বছর ধরে তারা এক সঙ্গীর সঙ্গে কাটিয়ে দেয়৷ এদের মধ্যে অনেকেই সঙ্গী হিসেবে সমলিঙ্গের হাঁসকে বেছে নেয়৷ শতকরা ২০ ভাগ রাজহাঁস সমকামী এবং তারা প্রায়ই পরিবার গঠন করে৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

সিন্ধুঘোটক

পুরুষ সিন্ধুঘোটক চার বছর বয়সের আগে যৌনসক্ষমতা লাভ করে না৷ এর আগ পর্যন্ত তাদের প্রায় সবাই সমকামী থাকে৷ যখন তাদের চার বছর হয় তখন হয় তারা উভগামী হয়, না হলে কেবল প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী সিন্ধুঘোটকদের সঙ্গে মিলিত হয়৷

সমকামিতা যে প্রাকৃতিক, তার প্রমাণ এই প্রাণীরা

ভেড়াদের পছন্দ

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পুরুষ ভেড়ার পালের ৮ ভাগ ভেড়াই সঙ্গী হিসেবে পুরুষদের পছন্দ করে, এমনকি প্রজননের সময়ও৷

অভিবাসন কর্মকর্তা ওই আফগান তরুণের ‘আচরণগত সমস্যার' বিষয়টিও আমলে নিয়েছেন৷ শরণার্থী শিবিরে মারামারি করেছিলেন ওই তরুণ৷ এ বিষয়ে অস্ট্রিয়ান কর্মকর্তা লিখেছেন, তাঁর আক্রমণাত্মক স্বভাব রয়েছে যা একজন সমকামীর কাছ থেকে আশা করা হয়নি৷

আপত্তির অন্য একটি কারণের কথা বলা হয়েছে: এই তরুণের বেশি বন্ধু ছিল না এবং তিনি একা বা অল্প কয়েকজনের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করেন৷

‘‘সমকামীরা কি আরো বেশি সামাজিক নন?''

আফগান তরুণ বলেছেন, আগে সমকামীদের চুমু খেয়েছেন তিনি৷

তার এই বক্তব্যেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অভিবাসন কর্মকর্তা৷ কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এটা সত্য হলে তাকে পেটানো হত৷

সমকামিতার বিষয়টি কখন বুঝতে পেরেছেন, প্রশ্ন করা হলে ওই তরুণ বলেন, ১২ বছর বয়সেই বিষয়টি তাঁর উপলব্ধিতে আসে

এটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অস্ট্রিয়ান কর্মকর্তা৷ যুক্তি দিয়েছেন, এই বয়সে তাঁর এটা বুঝতে পারার কথা নয়, আফগানিস্তান এমন একটি দেশ যেখানে ফ্যাশন ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগণের যৌন উদ্দীপনা জাগানো হয় না৷

সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন নিয়ে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন নাকচ হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়৷ এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সমকামিতা প্রমাণের জন্য পরীক্ষা করানোও আইনসিদ্ধ নয়৷

হাঙ্গেরিতে আশ্রয় পেতে একজন নাইজেরিয়ানকে নিজেকে ‘গে' প্রমাণের জন্য মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা দিতে হওয়ায় সম্প্রতি দেশটির বিরুদ্ধে রুল জারি করে ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস (ইসিজে৷

এ ধরনের পরীক্ষাকে আশ্রয় প্রার্থনাকারীর ব্যক্তিগত জীবনে ‘অযাচিত' হস্তক্ষেপের শামিল বলেছে ইসিজে৷

এএইচ/এসিবি (এএফপি, ইএফই)

আমাদের অনুসরণ করুন