আমাদের চলচ্চিত্রচর্চার হকিকত

চলচ্চিত্র স্বপ্নের মতো, সঙ্গীতের মতো৷ আর কোনো শিল্পই চলচ্চিত্রের মতো করে আমাদের চেতনার বাড়িতে হানা দিতে পারে না৷ চলচ্চিত্র আমাদের অনুভূতিতে, আমাদের আত্মার আঁধার কুঠুরিতে ঠিকই সরাসরি ঢুকে পড়ে৷

কথাগুলো বলেছিলেন সুইডিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ইঙমার ব্যার্গমান৷ একই রকম কথা পরে আমরা স্লোভেনিয়ার দার্শনিক স্লাভয় জিজেকের মুখেও শুনেছি৷ তিনি বলছেন, চলচ্চিত্র এমন এক বস্তু যা আপনার সামনে বাসনার বস্তুকে হাজির করে না, বরং কী করে বাসনা করতে হয় সেটা শেখায়৷ যাঁরা ‘দ্য পারভার্ট'স গাইড টু সিনেমা' দেখেছেন, তাঁরা জিজেকের এসব কথা শুনেছেন৷ কাজেই বোঝা যাচ্ছে, চলচ্চিত্র বেশ জরুরি শিল্প৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

যেহেতু এই শিল্পের ক্ষমতা আছে মানুষের মনের সবচেয়ে গভীর অংশে ঢুকে পড়ার, তাই এই শিল্প নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের উচিত একে সঠিকভাবে ব্যবহার করা বা ব্যবহার করতে শেখা৷ চলচ্চিত্র নির্মাণ শুধু পরিচালকের একার দায় নয়, দায়িত্ব বর্তায় যাঁরা চিত্রনাট্য রচনা করেন, যিনি সম্পাদনা করেন, এমনকি যে লোকটি মেকআপ করে দেন তাঁর কাঁধেও৷ একা একা চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রায় অসম্ভব কর্ম৷

বাংলাদেশে ইদানিং চলচ্চিত্র নির্মাণের নানা কলাকৌশল নিয়ে তরুণরা আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে৷ এই আগ্রহের ফল মিলছে হাতেনাতেই৷ তাঁদের কাজ দেশের বাইরে বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে, প্রশংসিত হচ্ছে, পুরস্কৃত হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

এখনো আছে মধুমিতা

ঢাকার প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো সিনেমা হল ‘মধুমিতা’ টিকে আছে এখনো৷ প্রায় ৬০ বছর আগে ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের পথচলা শুরু হয়েছিল৷ মাঝে অনেকটা সোনালি সময় পার করেছে এই চলচ্চিত্র৷ কিন্তু পাঁচ যুগ পরে এসে এখন তা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বিপর্যয়

১৯৯৯ সাল থেকে এ দেশে ব্যাপক হারে অশ্লীলতানির্ভর নিম্নমানের ছবি নির্মাণ শুরু হয়৷ সাধারণ দর্শক তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেরকম ছবি দেখার কথা ভাবতেই পারেনি৷ এছাড়া সিনেমা হলে মৌলবাদীদের হামলার ঘটনাও চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বিপর্যয়ের আরেক কারণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

এক হলে ১৩ জন দর্শক!

হাটখোলা এলাকায় ঢাকার আরেকটি পুরনো সিনেমা হল ‘অভিসার’৷ এ ছবি তোলার সময় সেখানে প্রদর্শনী চলছিল প্রায় এক হাজার আসনের এ সিনেমা হলে এ প্রদর্শনীতে সর্বমোট দর্শক সংখ্যা ছিলেন মাত্র ১৩ জন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

দুরবস্থার কারণ

২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার অভিসার সিনেমা হল পরিচালনায় যুক্ত কবির হোসেন৷ চলচ্চিত্রের এ দুর্দশার জন্য তিনি সিনেমার মান আর বিভিন্ন সহজলভ্য স্যাটেলাইট টেলিভিশনকেই দায়ী করেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভালো ছবির কদর

ঢাকার আরেকটি সিনেমা হলের পরিচালক মতিন মিয়া৷ ঢাকার ‘গীত সঙ্গীত’ সিনেমা হল পরিচালনা করছেন তিনি গত প্রায় আঠারো বছর ধরে৷ তাঁর মতে ভালো নির্মাতা, নায়ক-নায়িকার অভাবই চলচ্চিত্রের দুর্দশার মূল কারণ৷ কেননা, এখনো দু-একটি ভালো সিনেমা এলে হল ভর্তি দর্শক দেখা যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ব্যবসা কোথায়?

ছবিটি ঢাকার ‘গীত’ সিনেমা হলের৷ প্রায় দর্শকশূন্য হল৷ প্রায় ১১০০ আসনের এ হলে সেদিন দর্শক ছিল মাত্র ৩৪ জন৷ হলমালিকরা এ পরিস্থিতি নিয়ে প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন৷ তাঁদের প্রশ্ন – এমন চলতে থাকলে ব্যবসা চালানো কিভাবে সম্ভব?

সমাজ-সংস্কৃতি

দুর্দশার আরেকটি চিত্র

ঢাকার আরেক সিনেমা হল ‘সঙ্গীত’-এরও একই অবস্থা৷ এ হলেও প্রায় সব আসন ফাঁকা রেখে শো চালানো প্রায় নিয়মিত ঘটনা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বন্ধ হলো ‘গীত’ ও ‘সঙ্গীত’

ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকায় ‘গীত’ ও ‘সঙ্গীত’ সিনেমা হল৷ গত প্রায় দশ বছর ধরে ধুকে ধুকে চলার পর এ বছর রোজার আগেই বন্ধ করা হচ্ছে হল দুটি৷ এক সময় সারা দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল এক হাজার ২০০ টি৷ বন্ধ হতে হতে এখন সারা দেশে সিনেমা হল টিকে আছে ২০০টির মতো৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সিনেমা হলের জায়গায় মার্কেট কমপ্লেক্স

বাংলাদেশে সিনেমা হল বন্ধের হিড়িক শুরু হয় মূলত ২০০১ সাল থেকে৷ ঢাকার ‘গুলিস্তান’ ও ‘নাজ’ সিনেমা হল ভেঙে নির্মাণ করা হয় মার্কেট কমপ্লেক্স৷ একইভাবে পুরনো ঢাকার ‘মুন’ ও ‘স্টার’ সিনেমা হল ভেঙেও করা হয়েছে বিশাল মার্কেট৷ এভাবে পুরনো ঢাকার ‘শাবিস্তান’, পোস্তগোলার ‘পদ্মা’, ‘মেঘনা’, ‘যমুনা’ ইত্যাদি সিনেমা হলও একে একে বন্ধ হয়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

হল ভেঙে নতুন হল

ঢাকার ‘শ্যামলী’ সিনেমা হল ভেঙে মার্কেট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলেও সেখানে আধুনিক একটি সিনেমা হল রাখা হয়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

দর্শক অশ্লীলতাবিমুখ

ঢাকার মিরপুরের ‘সনি’ সিনেমা হলে ৩২ বছর ধরে কাজ করছেন সামাদ মিয়া৷ তাঁর হলে একসময় অনেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে আসতেন৷ কিন্তু এখন আর সে দৃশ্য তিনি দেখেন না৷ সেজন্য সিনেমার অশ্লীলতাকে দায়ী করেন তিনি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

টিকে থাকার কৌশল

ঢাকায় যে ক’টি হল টিকে আছে, তার মধ্যে মিরপুরের ‘সনি’ সিনেমা হল একটি৷ দীর্ঘ দিন লোকসান দিয়ে হলটি টিকিয়ে রেখেছেন এক সময়ের চলচ্চিত্র পরিচালক মোহামম্দ হোসেন৷ এই কমপ্লেক্সে কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকায় লোকসান দিয়েও চালানো সম্ভব হচ্ছে হলটির কার্যক্রম৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ঢাকায় হল কমে প্রায় অর্ধেক

ঢাকার দারুসসালাম এলাকায় আরেকটি পুরনো সিনেমা হল ‘এশিয়া’৷ গাবতলী বাস স্টেশনের কাছাকাছি হওয়ায় এ সিনেমা হলটির দর্শক ঢাকার অন্যান্য হলের তুলনায় কিছুটা বেশি৷ আশির দশকে ঢাকা শহরে ছিল ৪৪টি সিনেমা হল৷ বর্তমানে কমতে কমতে সংখ্যাটি পঁচিশেরও নীচে নেমে এসেছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সাধারণ দর্শক যা মনে করেন

ঢাকার সাধারণ হলগুলোতে নিয়মিত সিনেমা দেখেন রুবেল৷ তাঁর মতে, আগে সিনেমাগুলো অনেক কাহিনিনির্ভর ছিল, কিন্তু বর্তমানের সিনেমাগুলোর কাহিনি থেকে শুরু করে নির্মাণ কৌশল সবকিছুই খারাপ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পরোক্ষে মৌলবাদ

অনেকেই মনে করেন, বাংলা চলচ্চিত্র থেকে দর্শকদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অন্যতম কারণ অশ্লীলতা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

অপর্যাপ্ত আধুনিকায়ন

চলচ্চিত্রে সংকটময় এই পরিস্থিতির জন্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্টরা৷ চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রযুক্তির ব্যবহারও খুব বেশি বাড়েনি৷ বিগত বছরগুলোতে বিএফডিসির কোনো আধুনিকায়নই হয়নি৷ সাভারের কবিরপুরে ফিল্ম সিটি গড়ে তোলার জন্য ১০৫ একর জমি বরাদ্দ হলেও আজ পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয়নি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পর্নো ছবি

ঢাকার কিছু সিনেমা হলে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে বিদেশি সিনেমা৷ ‘এক টিকেটে ২ ছবি’-র এসব প্রদর্শনীতে মূলত দেখানো হয় পর্নো সিনেমা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মাল্টিপ্লেক্সই ভরসা?

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যখন সিনেমা হল বন্ধের মহোৎসব চলছে, সে সময়ে কিছুটা হলেও দর্শক নিয়ে আসছে ঢাকার মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলগুলো৷ সংখ্যায় খুবই কম হলেও ভালো পরিবেশের কারণে এসব মাল্টিপ্লেক্স হলে দর্শকরা আসছেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মাল্টিপ্লেক্সে বেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র

বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে প্রতিদিনই দর্শকরা ভিড় জমান বিভিন্ন সিনেমা দেখতে। তবে এসব সিনেমা হলে প্রদর্শিত সিনেমার অধিকাংশই বিদেশি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পরিবারের সবার বিনোদনের স্থান

ঢাকার বসুন্ধরা সিটিতে স্টার সিনেপ্লেক্স মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলের একটি৷ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে দর্শকরা আসেন সিনেমা দেখতে৷

তবে তাঁদের এসব কাজের বাইরেও বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের আরেকটি বড় জগত রয়েছে৷ এই জগতে বিরাজ করেন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা৷ তাঁদের ছবি বাইরের দেশে উৎসবে যায় না৷ দেশের প্রেক্ষাগৃহই তাঁদের একমাত্র ভরসা৷ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো মানুষ৷ এই মানুষগুলো বিভিন্ন সমিতিও গঠন করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বা বিএফডিসির ভেতরে৷ প্রযোজক, পরিচালক, সহকারী পরিচালক ও শিল্পীদের এসব সমিতি যেহেতু ‘উন্নয়নের চত্বরে গঠিত হয়েছে, তাই ধরে নেয়া যায় চলচ্চিত্রের উন্নয়নই হওয়া উচিত তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য৷ পরিতাপের বিষয়, আমরা জানতে পারি, তাঁরা ফি বছর শুধু নির্বাচন, আলোচনা সভা ও বনভোজনেই সীমাবদ্ধ থাকেন৷ 

সম্প্রতি আবার তাঁরা নিজেদের মধ্যে হামলা-মামলা নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন৷ মাঝে সমিতিগুলো কয়েকদিন ভারতীয় ছবি ঠেকানোর আন্দোলন করলেও, পরে শীর্ষ শিল্পীদের বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনার ছবিতে সুযোগ দেয়া হয়, তখন থেকে সেই আন্দোলনও স্তিমিত হয়ে আসে৷ আর বাংলাদেশ সরকারের নীতি নিয়ে না হয় কিছু না-ই বললাম৷ শুধু দুটি প্রশ্ন করি, কোন বিবেচনায় ভারতীয় ছবি দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হলো? কেনইবা দেশি চলচ্চিত্রকে অসম একটি প্রতিযোগিতার ভেতর ফেলে দেয়া হচ্ছে?

প্রশ্ন থেকে পূর্বের আলাপে ফিরে যাই৷ এফডিসিতে দেখা যাচ্ছে দুই তিনটি কাজ বাদে চলচ্চিত্রের উন্নয়নে তেমন কোনো কাজ সমিতিগুলো করছে না৷ উন্নয়ন বলতে তাহলে কী বোঝায়? আমি অন্তত বুঝি—কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও দেশব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনী, নিজেদের জন্য, দর্শকদের জন্য৷ বাংলাদেশে যে হারে ভারতীয় শিল্পী আনা হচ্ছে, সেটার সিকিভাগও যদি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক বা পণ্ডিত আনা হতো, চলচ্চিত্রের নানা বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের ব্যবস্থা করা হতো, যা অনেক সময় ছোট ছোট চলচ্চিত্র সংসদগুলো করে থাকে, তাহলে আমার অন্তত মনে হয়, চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ঘটতো৷ এই কথায় প্রশ্ন উঠতে পারে, চলচ্চিত্রে কি তাহলে উন্নয়ন ঘটছে না? জবাবে বলবো, ঘটছে, তবে তা উল্লেখ করার মতো নয়৷ দেশের মানুষ এখন ‘আয়নাবাজি'র সিনেমাটোগ্রাফি, ‘আন্ডার কন্সট্রাকশন'-এর বহুস্তর বিশিষ্ট গল্প, ‘বাপজানের বায়স্কোপ'-এর মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী, বা ‘অজ্ঞাতনামা'র বক্তব্য বড় পর্দায় দেখতে পাচ্ছেন৷ উন্নতি আছে, একেবারে হচ্ছে না, তা বলা যাবে না৷ কিন্তু এই উন্নতি এফডিসির সমান্তরালে গড়ে ওঠা একদল চলচ্চিত্রকর্মীর হাত ধরে এগুচ্ছে৷ তাহলে এফডিসিকেন্দ্রিক, অর্থাৎ এফডিসিতে যাদের সমিতি আছে, তাঁদের নির্মিত চলচ্চিত্র এখনো কেন নায়ক আর খলনায়কে আটকে থাকছে? কেন এখনো গরিব নায়ক আর ধনী নায়িকার ফাঁদ থেকে বেরুচ্ছে না এসব ছবি? কেন এফডিসির ভিন্ন ছবি মানেই গ্রামীণ পরিবেশে প্রেম দেখাতে হবে? ষোলো সতেরো কোটি মানুষের দেশে গল্পের কি এতই আকাল? 

Bidhan Rebeiro Filmexperte aus Bangladesch

বিধান রিবেরু: লেখক ও চলচ্চিত্র গবেষক

এসব প্রশ্নের উত্তর হলো, এই মানুষগুলো যদি নিয়মিত শুধু ভারতীয় ‘কমার্শিয়াল' ছবি না দেখে, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের ছবিও দেখতেন, সেসব নিয়ে নিয়মিত আনুষ্ঠানিক আলোচনা করতেন, ছবির নন্দনতত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করতেন, তাহলে আমার মনে হয়, এফডিসি যে বাজেটে শাকিব খানদের নিয়ে ছবি বানায়, ধরি দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা, সেই বাজেটের অর্ধেক দিয়েই আন্তর্জাতিক মানের ছবি বানানো সম্ভব হতো৷ দর্শক কী ‘খাবে', শুধু এটা চিন্তা করে ছবি বানালে চলবে কেন?

দর্শকের রুচি পরিবর্তনের দায়িত্বও তো এই প্রযোজক ও পরিচালকদের রয়েছে৷ জানি না এই বোধোদয় কবে ঘটবে! সহসা ঘটবে বলে মনে হয় না, কারণ, এফডিসিতে অবস্থিত পাঠাগারটি এখন শুনেছি চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির দখলে৷ সেখানে দুই-চারটি বই যা আছে, সেগুলো শুধু সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য৷ কেউ সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখার জন্যও নাকি ধরেন না৷ ধরবেন কিভাবে, সারা দেশেই পড়ালেখার প্রতি অনীহা রয়েছে৷ এ কারণেই চলচ্চিত্র বিষয়ক সাহিত্য যেমন অবহেলিত, তেমনি উপেক্ষিত যারা চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করেন৷ তবে সরকারিভাবে এই চলচ্চিত্র সাহিত্যকে গুরুত্ব দিলে আমার মনে হয় মানুষের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়বে৷

তাছাড়া, লিখিত সাহিত্য ব্যাপারটি ছাড়া আসলে কোনো শাখাতেই জ্ঞানচর্চা করা সম্ভব নয়৷ বাংলাদেশে যে হারে চলচ্চিত্রের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে, সে হারে না হলেও, ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখালেখি বাড়ছে৷ প্রতি বছরই চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক একাধিক বই, জার্নাল ও ছোটকাগজ প্রকাশ হচ্ছে৷ এই ধারাকে আরো উৎসাহ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে চলচ্চিত্রচর্চার প্রসার ঘটে৷ উৎসাহ দেয়ার একটি অন্যতম উপায় হতে পারে চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখালেখিকে স্বীকৃতি দেয়া৷ ভারতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে একটি বিভাগ আছে— ‘চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখালেখি' নামে৷ এই বিভাগে দুটি পুরস্কার দেয়া হয়, একটি হলো শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের বই, অন্যটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র সমালোচক পুরস্কার৷ এই উদাহরণটি বাংলাদেশেও গৃহীত হতে পারে৷ কারণ, চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি কিন্তু মোটেও ছোট কোনো বিষয় নয়৷ বরং লেখা তৈরি করা, চলচ্চিত্র নির্মাণের মতোই কঠিন কাজ—এই সত্যটি কবুল করেছেন ফরাসি নির্মাতা গদার৷

শেষ কথা এটাই বলবো, স্রেফ মুনাফা আর সুনাম কামাইয়ের লোভে কেউ যেন চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে পা না বাড়ান৷ মাথায় রাখতে হবে, চলচ্চিত্র শিল্পও বটে, এই শক্তিশালী ‘অস্ত্র'কে কিভাবে, কোন উপায়ে কাজে লাগাবেন সেটা জানা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি এই বিষয়ের উপর পাঠাভ্যাস৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷