আর্দ্রতা মাপার বিশেষ স্যাটেলাইট কক্ষপথে

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার একটি বিশেষ স্যাটেলাইট প্রায় ৩ বছর ধরে ভূ-পৃষ্ঠে আর্দ্রতার সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে৷

আগামী ডিসেম্বর মাসে কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে৷ কিয়োটো প্রোটোকলের উত্তরসুরি চুক্তি সম্পর্কে ঐক্যমত সৃষ্টি করার লক্ষ্যে জোরালো প্রস্তুতি চলছে৷ কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক মহলে প্রবল বিতর্ক দেখা যায়, তা হল জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা৷

প্রেক্ষাপট

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএ সোমবার এসএমওএস নামের একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে, যার মূল কাজ পৃথিবীর বুকে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট চিহ্ন খুঁজে বার করা৷ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৬০ কিলোমিটার উপরে কক্ষপথ থেকে এসএমওএস এই কাজ করবে৷ সোমবার ২রা নভেম্বর রাশিয়ার একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ঐ স্যাটেলাইট যাত্রা শুরু করেছে৷

ইউরোপের একাধিক দেশের বিজ্ঞানীরা প্রায় ৩১ কোটি ৫০ লক্ষ ইউরো মূল্যের এই স্যাটেলাইট তৈরি করেছেন৷ তাঁরা এমন ধরনের পরিমাপের যন্ত্র গড়ে তুলেছেন, যা এর আগে কখনো ব্যবহার হয় নি৷ যেমন ‘মিরাস’ নামের এক যন্ত্রের সাহায্যে এক অভিনব পন্থায় মাটির আর্দ্রতা ও সমুদ্রের জলে লবণের পরিমাণ মাপা হবে৷ ভূ-পৃষ্ঠের উপর মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গের প্রতিফলনের ভিত্তিতে এই সূক্ষ্ম পরিমাপ করা হবে৷ শুকনো বা ভিজে মাটি এবং লবণাক্ত বা মিষ্টি জলের ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক চরিত্র আলাদা হওয়ার কারণে এটা সম্ভব হবে৷

Weltall Erde Klima Planet Raumfahrt Klimaschutz Apollo 8 Mission Blauer Planet Ozon Ozonloch Treibhausgas

এত বড় আকারে এখনো পৃথিবীর আর্দ্রতার পরিমাপ হয় নি

স্যাটেলাইটের গুণাগুণ

এসএমওএস স্যাটেলাইটের মধ্যে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির বেশ কয়েকটি যন্ত্র রয়েছে৷ তার সাহায্যে সমুদ্রের জলে লবণের মাত্রা পরিমাপ করা হবে৷ সেইসঙ্গে মাটির আর্দ্রতাও মেপে দেখা হবে৷ মাটির মধ্যে যে জল থাকে, তার পরিমাণ বেশী না হলেও জলের পরিবর্তন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই আর্দ্রতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ পৃথিবীর বুকে যে পরিমাপ চালানো হয়, তার সঙ্গে স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো তথ্য তুলনা করে দেখা হবে৷ এই বিপুল তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে জলের পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখা সম্ভব হবে৷ আবহাওয়াবিদদের কাছে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ সমুদ্র কোন স্থির জলাধার নয় – নানা ধরনের স্রোতের ফলে জলের ক্রমাগত প্রবাহ ঘটতে থাকে৷ যেসব বিষয় এই স্রোতের প্রবাহের গতি-প্রকৃতি স্থির করে, তার মধ্যে লবণ অন্যতম৷ বিশ্বের বিভিন্ন সাগর ও মহাসাগরের মধ্যে স্রোতের আদান-প্রদান ঘটে উষ্ণতার তারতম্যের কারণে, যার অন্যতম সূত্র হল লবণ৷

Klima Meeresspiegel Anstieg

সমুদ্রের লবণাক্ত জলের ঘনত্ব স্রোতের গতি-প্রকৃতির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে

লবণের ঘনত্বের তারতম্য ঘটলে স্রোতের গতিও বদলে যায়৷ পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ার উপর সার্বিক নজর রাখতে বিজ্ঞানীরা বহুকাল ধরে অপেক্ষা করে রয়েছেন৷ এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা এবং সেইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করার আশা করছেন৷ এই জ্ঞানের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাষ দিতে পারবেন তাঁরা৷

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে এসএমওএস স্যাটেলাইট দিনে ১৪ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করবে৷ এভাবে ধাপে ধাপে ভূ-পৃষ্ঠের সম্পূর্ণ এলাকাই মেপে দেখা হবে৷ আগামী বছরের শুরুতেই প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করা হবে৷ প্রায় ৩ বছর ধরে এই স্যাটেলাইট কাজ চালিয়ে যাবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷ জার্মানি সহ একাধিক দেশের গবেষণা কেন্দ্রে স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে৷

প্রতিবেদন: সঞ্জীব বর্মন, সম্পাদনা: আবদুস সাত্তার

সংশ্লিষ্ট বিষয়