আশ্রয় খুঁজছে, তবে কেবল ইউরোপেই নয়

জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার খোঁজে দলে দলে মানুষ ছুটছে নিজ দেশ ছেড়ে৷ এখনকার মতো এত বেশি মানুষ আর কখনো নিজ বাস্তুভিটা ছেড়ে পথে নামেনি৷ এদের একটা বড় অংশ ইউরোপে পাড়ি জমালেও অন্যান্য দেশেও ঠাঁই করে নিচ্ছে মানুষ৷

কখনও উন্নত জীবনের সন্ধানে, কখনও আবার অনিশ্চয়তা, নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে বাঁচতে আগের চাইতে অনেক বেশি মানুষ আজ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে৷ সময়ের সাথে সাথে এ সংখ্যা বাড়ছে৷ জাতিসংঘের হিসাব মতে, সারা পৃথিবীতে প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন মানুষ নানা কারণে তাদের মাতৃভূমিতে আর থাকে না৷ পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫৩ মিলিয়ন৷ ধরে নেয়া যায়, সময়ের সাথে সাথে এ সংখ্যা আরো বাড়বে৷ অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর করা ১৬০টি দেশের তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ২৩ মিলিয়ন মানুষ দেশান্তরিত হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ 

সমাজ সংস্কৃতি | 16.05.2013
যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

যুক্তরাষ্ট্র আর প্রথম পছন্দ নয়

মেক্সিকোর গুয়াতেমালা সীমান্তের কাছে টেনোসিক এ আশ্রয় কেন্দ্রের শরণার্থী এই ব্যক্তি, যিনি হন্ডুরাস থেকে এসেছেন৷ তিনি জানালেন তার পরিকল্পনা ছিল পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়া৷ কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সব বদলে গেছে৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

মেক্সিকোতে দীর্ঘ সময় থাকা

গুয়াতেমালার কনসেপসিওন বাওতিস্তা তার নবজাতক সন্তানকে নিয়ে একই আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন৷ তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তারা বর্তমানে মেক্সিকোতে থাকার কথাই ভাবছেন৷ কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর অভিবাসন নীতি কীভাবে কাজ করে সেটা দেখার অপেক্ষায় আছেন তারা৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

মেক্সিকো: যা একসময় ট্রানজিট দেশ ছিল

...তবে সময় যাওয়ার সাথে সাথে তিনি বুঝতে পেরেছে মেক্সিকোতে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে৷ মেক্সিকোর টেনোসিক আশ্রয়প্রার্থীদের তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে এদের মধ্যে খুব কম মানুষই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী৷ অনেকে তাদের দরিদ্র, সহিংসতার দেশে ফিরে যাচ্ছে৷ আর বেশিরভাগই মেক্সিকোতে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে৷ মেক্সিকো আসলে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট দেশ৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

কঠোর অভিবাসন নীতি

ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে৷ ক্যালিফোর্নিয়ায় কৃষকরা মূলত মেক্সিকো থেকে কর্মী আনত চাষবাসের সময় এবং ফসল তোলার সময়৷ কিন্তু এই নীতির কারণে মেক্সিকোর অনেক মানুষ নিজের দেশেই কাজ যোগাড় করছে৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

২০১৭ সালে মেক্সিকোতে রেকর্ড ২২,৫০০ আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন জমা পড়েছে

টেনোসিকের শরণার্থী কেন্দ্রে মধ্য অ্যামেরিকা থেকে আসা শরণার্থীরা ফুটবল খেলছে৷ ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পর মেক্সিকোতে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের সংখ্যা ১৫০ ভাগ বেড়েছে৷ তারা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়ার চেয়ে ক্যানাডায় যেতে আগ্রহী হচ্ছে৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

মানবপাচারকারীদের অর্থ চাহিদা বাড়ছে

গুয়াতেমালা সীমান্তের কাছে প্রত্যন্ত একটি এলাকায় দুই অভিবাসন প্রত্যাসী অভিবাসন কর্মকর্তাকে ফাঁকি দিয়ে অ্যামেরিকায় পালানোর চেষ্টা করছিলো৷ গুয়াতেমালার এক ব্যক্তি জানিয়েছে, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর মানবপাচারকারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দাবি করছে৷ কয়েক বছর আগে যেখানে একজনকে পাঠাতে ৬ হাজার মার্কিন ডলার নিতো, বর্তমানে সেখানে ১০ হাজার ডলার নিচ্ছে৷

যুক্তরাষ্ট্র নয়, মেক্সিকোতে যাচ্ছেন মধ্য অ্যামেরিকার অভিবাসীরা

মেক্সিকোর সব অভিবাসীরা বাড়ি ফিরতে চায় না

মেক্সিকোর অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে মধ্য অ্যামেরিকা থেকে আসা শরণার্থীরা প্রায়ই প্রত্যন্ত এলাকা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে এবং ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে৷ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গত ডিসেম্বরে ফেরত পাঠানো হয়েছে এমন এক ব্যক্তি জানালেন, আমরা অনেকবার উত্তর অ্যামেরিকায় গিয়েছি, প্রত্যেকবারই যাওয়াটা ভীষণ কষ্টকর ছিল৷

পূর্ব আফ্রিকা

বহুল প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কেবল ইউরোপের দিকে ছুটছে এ জনস্রোত৷ কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়৷ জার্মান সংস্থা ‘ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড'-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ ভাগ শরণার্থী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাস করছে, বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবস্থান নিয়েছে তারা৷ এদের বেশিরভাগই নিজেদের দেশের ভিতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে৷ অনেকেই আবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছে পাশের দেশে৷ এর বেশি পথ যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের নেই৷

এই যেমন অভিবাসীর সংখ্যা বিবেচনায় ইথিওপিয়া অবস্থান পঞ্চম৷ পাশের দেশ সোমালিয়ায় ১৯৯০ সাল থেকে চলমান যুদ্ধের সুবাদে সেখানকার অনেক মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইথিওপিয়ায় অবস্থান নিয়েছে৷ জাতিসংঘের হিসাব মতে, সোমালিয়ার প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ ইথিওপিয়া ও কেনিয়াতে বসবাস করছে৷ যেখানে ইথিওপিয়ার প্রায় সাত মিলিয়ন মানুষ মানবিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল৷ অন্তত আট লাখ মানুষ এখানে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে৷ কেনিয়াতে রয়েছে বিশ্বের সবচেযে বড় শরণার্থী শিবির৷

এছাড়াও পূর্ব আফ্রিকার আরেক দেশ উগান্ডাও শরণার্থীদের ব্যাপারে উদারহস্ত৷ ফলে কঙ্গো বা দক্ষিণ সুদানের বাসিন্দাদের অনেকেই নিজ দেশের অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে পাড়ি জমান উগান্ডায়৷ এখানে শরণার্থীদের চাষাবাদের জন্য জমি দেয়া হয়৷ তবে দক্ষিণ সুদান থেকে উগান্ডায় পৌঁছানোর পথে রয়েছে ভয়াবহ বিপদের সম্ভাবনা৷ রাতেরবেলা সৈন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখানকার মানুষ উগান্ডায় প্রবেশ করেন৷ আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কেয়ার' গত জুলাইয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে এক সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ সুদান থেকে পালাতে চাওয়া এক নারীর বলেন, ‘‘প্রতি রাতে আমরা প্রার্থনা করি যাতে আমরা জীবিত অবস্থায় উগান্ডায় পৌঁছাতে পারি৷''

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি

জার্মানির অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থা বিএএমএফ এর সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল মাসে মোট ৫৯,৬৮০টি আবেদন পড়েছে৷ মার্চ মাসে সংখ্যাটি ছিল ৫৮,৩১৫, অর্থাৎ ১,৩৬৫টি কম৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

শীর্ষে সিরিয়া

সবচেয়ে বেশি আবেদন করেছেন সিরিয়ার নাগরিকরা৷ ২৫,৭৯১ জন৷ অবশ্য মার্চ মাসে সংখ্যাটি ছিল সাড়ে সাত শতাংশ বেশি৷ ২৭,৮৭৮ জন৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

প্রথম চার মাসেও শীর্ষে সিরিয়া

২০১৬ সালের প্রথম চার মাসে এক লক্ষ ১৬ হাজার ৮২৬ জন সিরীয় নাগরিক জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷ আর সব দেশ মিলিয়ে আবেদনের সংখ্যা দুই লক্ষ ৪৬ হাজার ৩৯৩ জন৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

ইরাকিদের সংখ্যা বেড়েছে

মোট হিসেবে সিরিয়ার পরেই আছে ইরাক৷ তবে সিরিয়ার ক্ষেত্রে আবেদনের সংখ্যা এপ্রিলের চেয়ে মার্চে বেশি হলেও ইরাকের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো৷ অর্থাৎ মার্চের চেয়ে এপ্রিলেই বেশি ইরাকি আবেদন করেছেন৷ ৯,৫০৫ জন৷ মার্চে ছিল ৮,৯৮২ জন৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

তৃতীয় স্থানে আফগানিস্থান

সিরিয়া ও ইরাকের পর তালিকায় তিন নম্বরে আছে আফগানিস্তান৷ এপ্রিলে ৮,৪৫৮ জন আফগান রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷ মার্চ মাসের চেয়ে সংখ্যাটি ১১.৮ শতাংশ বেশি৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

জাতীয়তা জানা নেই

জাতীয়তা ‘অস্পষ্ট’ এমন আবেদনের সংখ্যা এপ্রিলে ছিল ১,২৯৯ জন৷ সংখ্যাটি মার্চ মাসে ছিল আরও বেশি৷ ১,৮৬৯ জন৷

জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে

পাঁচ নম্বরে ইরান

১,৯৮১ আবেদন নিয়ে তালিকায় ইরানের নাম আছে পাঁচ নম্বরে৷ ছয়-এ আছে আলবেনিয়া (১,১৮৮ জন)৷ পাকিস্তানি আবেদনের সংখ্যা ১,০৩৮; আর ইরিত্রিয়ার ১,১৫২৷

মধ্য অ্যামেরিকা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার প্রস্তাবের সূত্র ধরে মধ্য অ্যামেরিকায় শরণার্থী প্রবেশের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে৷ যদিও এটা নিশ্চিত নয় যে প্রতিদিন কত মানুষ সীমান্ত পাড়ি দেয়, তবে মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট-এর হিসাব মতে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই অ্যামেরিকায় প্রায় ১১ মিলিয়ন মানুষ বাস করে, যার মধ্যে অর্ধেকই মেক্সিকো থেকে এসেছে৷

অনেকেই এল সালভাদর, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের অনেক বাসিন্দা মেক্সিকোকে বেছে নেয় ট্রানজিট হিসেবে৷ ২০১০ সাল পর্যন্ত  তরুণরা মুলত দেশ ছাড়লেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরো পরিবার নিয়েই মানুষ দেশান্তরিত হচ্ছে৷

এ যাত্রাপথে দালালদের পর্যাপ্ত টাকা দিতে না পারলে তাদের মুখোমুখি হতে হয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের৷ অনেকক্ষেত্রেই সীমান্ত তীরবর্তি নদীর পাড়ে এ সব মানুষদের নৃশংসভাবে খুন করে অপরাধীরা৷ এ পর্যন্ত এমন ভয়াবহ মৃত্যুর শিকার হয়েছে কতজন মানুষ তা জানা না গেলেও কিছু দিন পর পর কাছাকাছি এলাকায় গণকবর খুঁজে পাওয়া যাওয়ায় ধারণা করা যায়, এ সংখ্যা কম নয়৷

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসার মতে, এ বছরই ৩৪০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছে এ সীমান্ত এলাকায়৷ এছাড়াও অনেকে পানিতে ডুবে, অনেকে আবার সাপ বা বিষাক্ত পোকার কামড়ে, অনেকে প্রচণ্ড গরমে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় নিরাপদ জীবনের খোঁজে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে৷ অ্যারিজোনার বন্ধ্যা পাহাড়ে প্রায়ই খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের দেহাবশেষ ৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

একবছরের শিশু

মনকে নাড়া দেয়া ব্যান্ডেজে মোড়ানো তুলতুলে ছোট্ট এই দু’টি পা শহিদের৷ বয়স মাত্র এক বছর৷ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হামলা থেকে বাঁচতে দাদি তাহেরা যখন পালাচ্ছিলেন, তখন তাঁর কোল থেকে পড়ে যায় ছোট্ট শহিদ৷ ছবিটি কক্সবাজারে রেডক্রসের এক হাসপাতালে ২৮ অক্টোবর তোলা৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

কালাবারো, ৫০

রাখাইনের মংদুতে তাঁদের গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয় সেনা সদস্যরা৷ এতে স্বামী, মেয়ে ও এক ছেলেকে হারান কালাবারো৷ তাঁর ডান পায়ে আঘাত করা হয়৷ যেখানে পড়ে গিয়েছিলেন সেখানেই কয়েক ঘণ্টা মারা যাওয়ার ভান করে ছিলেন তিনি৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

সেতারা বেগম, ১২

নয় ভাই-বোনের মধ্যে একজন সে৷ সেনারা যখন তাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন বাকি আটজন বের হয়ে যেতে পারলেও সে আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে গিয়েছিল৷ পরে তাকে উদ্ধার করা হয়৷ তবে পা পুড়ে যায়৷ এই অবস্থায় বাংলাদেশে পৌঁছেছে সে৷ বাংলাদেশেই তার চিকিৎসা করা হয়৷ এখন তার দুই পা থাকলেও নেই কোনো আঙুল৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

নূর কামাল, ১৭

নিজের ঘরে লুকিয়ে ছিল সে৷ সেখান থেকে সৈন্যরা তাকে খুঁজে বের করে প্রথমে রাইফেলের বাট, পরে ছুরি দিয়ে মাথায় আঘাত করে৷ ছবিতে সেটিই দেখা যাচ্ছে৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

আনোয়ারা বেগম, ৩৬

ঘরে আগুনের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুম থেকে উঠে পালাতে গিয়েছিলেন তিনি৷ তবে এর মধ্যেই পুড়ে যাওয়া ছাদ তাঁর মাথায় ভেঙে পড়ে৷ ফলে শরীরে থাকা নাইলনের কাপড় গলে হাত পুড়িয়ে দেয়৷ ‘‘আমি মনে করেছিলাম, মরে যাব৷ তবে আমার সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি,’’ রয়টার্সকে বলেন তিনি৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

মমতাজ বেগম, ৩০

সেনারা তাঁর বাড়িতে ঢুকে মূল্যবান জিনিসপত্র দিতে বলেছিল৷ তখন মমতাজ তাঁদের দারিদ্র্যের কথা জানালে সৈন্যরা বলেছিল, ‘‘যদি তোমার কোনো অর্থ না থাকে, তাহলে আমরা তোমাকে হত্যা করব৷’’ এই বলে, সৈন্যরা তাঁকে ঘরে বন্দি করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল৷ কোনোরকমে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে বের হয়ে দেখেন তাঁর তিন ছেলে মৃত, আর মেয়েকে প্রহার করা হয়েছে, তার রক্ত ঝরছে৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

ইমাম হোসেন, ৪২

মাদ্রাসায় পড়িয়ে ফেরার পথে তিন ব্যক্তি ছুরি নিয়ে তাঁর উপর হামলা করেছিল৷ পরের দিনই তিনি তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে গ্রামের অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন৷ এরপর তিনিও কক্সবাজারে পৌঁছান৷

রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার চিত্র

মোহাম্মদ জাবাইর, ২১

গ্রামের বাড়িতে এক বিস্ফোরণে তার শরীরের এই অবস্থা৷ ‘‘আমি কয়েক সপ্তাহ অন্ধ ছিলাম৷ কক্সবাজারের এক সরকারি হাসপাতালে ২৩ দিন চিকিৎসাধীন ছিলাম,’’ বলেছে সে৷

দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া

অভিবাসনপ্রত্যাশীরা কেবল ভূমধ্য সাগরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দেয়, এমন নয়৷ অনেক মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে বিপন্ন করে তোলে নিজেদের জীবন৷ মিয়ানমার এবং বাংলাদেশথেকে অসংখ্য মানুষ থাইল্যান্ড, মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাড়ি জমায়৷ মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হলে এ বছরের মাঝামাঝি থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করে৷ অনেকেই বিভিন্ন সীমান্তে বাধাগ্রস্থ হয়ে সমুদ্রে কাটায় দিনের পর দিন৷ অনেকেরই মৃত্যু হয় সাগরে নৌকাডুবিতে৷

বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে চাওয়া শরণার্থীরা অনেক সময় পাচারকারীদের সাহায্য নিয়ে পৌঁছাতে চায় নিরাপদ গন্তব্যে৷ জার্মান দাতব্য সংস্থা স্টিফটুং আসিয়ানহাউস-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সব মানব পাচারকারীরা মুক্তিপণের আশায় শরণার্থীদের দিনের পর দিন জঙ্গলে আটকে রাখে কিংবা মাঝসমুদ্রেই অত্যাচার শুরু করে৷ অনেকেই এ ধরনের নৃশংসতার শিকার হয়ে মারা যায়৷ থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ার সীমান্তের কাছে এর মধ্যে ২০০'রও বেশি গণকবর খুঁজে পাওয়া গেছে৷ তবে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যত ঝুঁকিই থাক, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় খোলা ছিল না৷ ডক্টরস উইদআউট বর্ডার-এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমারে ৬৭০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল শিশু৷

স্টিফেনি হ্যোপনার/আরএন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আমাদের অনুসরণ করুন