আসুন গর্ভপাতকে ‘না’ বলি

গর্ভপাত এক চরম বিতর্কিত বিষয়৷ একদিকে, গর্ভপাত বিরোধী আন্দোলনের শেষ নেই, অন্যদিকে গর্ভপাতের পক্ষে নারীবাদীদের অভাব নেই৷ আমি বলতে চাই আমার নিজের কথা৷ চারপাশে যা দেখছি, সেকথা৷

তিনি তখন সবে তরুণী৷ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক যুবককে বিয়ে করেছেন ভালোবেসে, পরিবারের অমতে৷ লেখাপড়ার পাশাপাশি দু'জনে খেটেখুটে সংসার চালাতেন তখন৷ এরইমাঝে হঠাৎ গর্ভবতী হয়ে পড়েন তরুণী৷ ওদিকে সংসার তখনো গোছানো যায়নি৷ ভবিষ্যত অনিশ্চিত৷ এমন সময় বাচ্চা নেয়াটা কি ঠিক?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সমাজের, শুভানুধ্যায়ীদের চাপ ছিল৷ নবদম্পতি ভেবেছেন অনেক, তবে শেষমেষ গর্ভপাতের পথে যাননি৷ বরং নিয়তিকে মেনে নিয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন৷ অথচ এমন কঠোর পরিস্থিতিতে হয়ত অনেকেই গর্ভপাত ঘটাতেন৷ আমি আমারই এক বিদেশি সহকর্মীর কথা জানি, যার জন্মের আগে তাঁর মা সাতবার গর্ভপাত ঘটিয়েছিলেন৷ সন্তান চাইতেন তিনি৷ কিন্তু নিজের আর সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না৷ শেষ পর্যন্ত অবশ্য আমার সহকর্মীটি পৃথিবীতে আসতে সক্ষম হন৷ এখন একজন নামকরা সাংবাদিক তিনি৷ ঘুরে বেড়াচ্ছেন গোটা দুনিয়া৷ 

সমাজ

কোরানে উল্লেখ নেই, তবে...

কোরান শরিফে স্পষ্টভাবে গর্ভপাতের বিষয়ে কিছু বলা নেই৷ তবে কিছু নির্দেশনা আছে যেগুলো গর্ভপাতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে ইসলামি বিষয়ে পণ্ডিতরা মনে করেন৷

সমাজ

ভ্রুণই জীবন

সূরা আল-মায়দাহের ৩০তম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘যে বা যারা একটি আত্মার জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে, সে বা তারা যেন সব মানুষের জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে৷ যে বা যারা একটি আত্মাকে হত্যা করেছে, সে বা তারা যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করেছে৷’’ আর অধিকাংশ মুসলিম পণ্ডিত মনে করেন, গর্ভে থাকা ভ্রুণকেই ইসলাম জীবন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷

সমাজ

মায়ের জীবন রক্ষা

যদি মায়ের প্রাণ হুমকির মুখে থাকে তাহলে গর্ভপাত সমর্থন করে ইসলাম৷ মুসলিম আইন ‘দু’টি মন্দ জিনিসের মধ্যে যেটি কম মন্দ তাকে’ বেছে নেয়ার প্রতি সমর্থন জানায়৷ এক্ষেত্রে গর্ভপাতকেই ‘কম মন্দ’ মনে করা হয়৷ এর পক্ষে কয়েকটি যুক্তি হচ্ছে মা-ই ভ্রুণের ‘জন্মদাতা’, মায়ের জীবন আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত, মায়ের অন্যান্য দায়িত্ব আছে, মা একটি পরিবারের অংশ এবং মাকে মরতে দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভ্রুণও মরে যায়৷

সমাজ

দারিদ্র্যতার ভয়ে গর্ভপাত

কেউ যদি মনে করেন আগত শিশুকে লালনপালন করা তার পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না এবং সেই ভয়ে ভ্রুণকে মেরে ফেলেন, তাহলে সেটি মহাপাপ বলে বিবেচিত হবে৷ সুরা আর ইসরার ৩২ আয়াত বলছে, ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তানকে দারিদ্রতার ভয়ে হত্যা করো না৷ আমরা তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে দেখেশুনে রাখি৷ তাই তাদের হত্যা করে সত্যিকার অর্থেই একটি মহাপাপ৷’’

সমাজ

ত্রুটি ধরা পড়লে

গর্ভধারণের চার মাসের মধ্যে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভ্রুণ ত্রুটি নিয়ে বাড়ছে এবং এর সমাধান সম্ভব নয়, এবং এই সমস্যা পরবর্তীতে শিশুর জীবন দুর্বিসহ করে তুলতে পারে, তাহলে সেক্ষেত্রে গর্ভপাত সমর্থন করেন অনেক পণ্ডিত৷ এক্ষেত্রে অন্তত দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে৷ অবশ্য এক্ষেত্রেও গর্ভপাতের পক্ষে নন এমন পণ্ডিতও আছেন৷

সমাজ

চার মাস পর...

গর্ভধারণের সময় ১২০ দিন পেরিয়ে গেলে গর্ভপাত সমর্থন না করার পক্ষে মোটামুটি পণ্ডিতদের মধ্যে মিল রয়েছে৷ তবে এক্ষেত্রে যদি ভ্রুণের ত্রুটি মায়ের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেয় তাহলে অন্য কথা৷

সমাজ

মুসলিম দেশের জরিপে বাংলাদেশ শীর্ষে

২০১৩ সালে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মুসলিম নাগরিক নৈতিক বিবেচনায় গর্ভপাত সমর্থন করেন৷ অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি মুসলমানের মধ্যে একজন গর্ভপাতের পক্ষে৷ ৩৭টি দেশের মসুলমানদের উপর পরিচালিত এই জরিপে বাংলাদেশেই গর্ভপাতের পক্ষে সবচেয়ে বেশি মানুষ পাওয়া গেছে৷ আরও জানতে উপরের ‘+’ চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

ভ্রুণ কি ব্যথা পায়?

২০০৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রুণের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে ব্যথা, এমনকি তার আশেপাশে কী ঘটছে, তা বোঝার মতো নার্ভাস সিস্টেম গড়ে ওঠে না৷ আরেক গবেষণা বলছে, ব্যথা পাওয়ার জন্য যে ‘নিউরো-অ্যানাটোমিকাল অ্যাপারেটাস’ প্রয়োজন তা গড়ে ওঠার কাজ গর্ভধারণের ২৬ সপ্তাহ আগে সম্পূর্ণ হয় না৷ অবশ্য এই বিষয়ে বিতর্ক এখনও থেমে নেই৷ দু’টি গবেষণা সম্পর্কে আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

বলছি না গর্ভপাত কেউ মনের আনন্দে করান৷ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েই গর্ভপাতের পথে পা বাড়ান অনেকে৷ তবে সেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার একমাত্র পন্থা যেন গর্ভপাত না হয় সেটাই আমার দাবি৷ আমার কাছে মনে হয় গর্ভপাত করানোটাও এক ধরনের হত্যাকাণ্ড৷ একজন বাবা বা মায়ের উচিত নয়, নিজের অনাগত সন্তানকে হত্যার দায় নেয়া৷ আইনিভাবে সেটা হয়ত বৈধ, নৈতিকভাবে নয়৷ 

জার্মানির ক্যাথলিক হাসপাতালগুলোতে গর্ভপাত করানো হয় না৷ শুধু তাই নয়, কেউ অনিরাপদ যৌনমিলনের পর জরুরি গর্ভনিরোধক পিল খেতে চাইলে তার ব্যবস্থাপত্রও ক্যাথলিক হাসপাতালগুলো থেকে দেয়া হয় না৷ একটি জীবন নষ্ট করার ব্যবস্থায় সায় নেই তাদের৷ আমার কাছে এই পদ্ধতি মন্দ মনে হয় না৷

অন্বেষণ | 25.07.2014

আরো একটি ব্যবস্থা আছে জার্মানিতে৷ বিভিন্ন শহরে রয়েছে সদ্য জন্ম নেয়া সন্তান রেখে যাওয়ার বাক্স৷ কোনো মা বা দম্পতি যদি সন্তান জন্ম দেয়ার পর তাকে রাখতে না চান, তাহলে বিশেষভাবে তৈরি সেসব বাক্সে নিজেদের নাম পরিচয় গোপন করে সন্তান রেখে যেতে পারেন৷ বাক্সগুলো এমনভাবে তৈরি যে বাচ্চা রাখার পর সেটি নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যায়৷ এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত চলে যায় নির্দিষ্ট জায়গায়৷ আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নিরাপদ গন্তব্যে৷ তারপর তার বাকি দায়িত্ব রাষ্ট্রের৷

এতসব ব্যবস্থা করা হচ্ছে শুধুমাত্র একটা জীবন বাঁচাতে৷ যে জীবন আমরা দিতে পারি না, সেটা কেড়ে নেয়ার অধিকারও আমাদের থাকা উচিত নয়৷ তাই যারা এক্ষুণি সন্তান চান না তাদের নিরাপদ যৌনজীবন বেছে নিতে বলবো আমি৷ এ জন্য প্রয়োজনে আরো জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে৷ অধিকতর নিরাপদ গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা সহজলভ্য করা যেতে পারে যাতে অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ রোধ করা যায়৷

Arafatul Islam Kommentarbild App

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

এতটুকু পড়েই ভেবে নেবেন না সব ধরনের গর্ভপাতের বিরুদ্ধে আমি৷ দু'টো ক্ষেত্রে গর্ভপাত করা যেতে পারে:

প্রথমত, কোনো ধর্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা হলে সেই বাচ্চা তিনি না চাইলে গর্ভপাত করাতে পারেন৷ এটা নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই৷

দ্বিতীয়ত, গর্ভবতী নারীর জীবন বাঁচাতে জরুরি হলে গর্ভপাত করা যেতে পারে৷

ও হ্যাঁ, শুরুতে যার জন্মের কথা বললাম তাঁকে চিনতে পারছেন? সেদিন গর্ভধারিণী গর্ভপাত করাননি বলে আজ এত কথা লিখতে পারছেন তিনি, পারছেন দুনিয়াটা উপভোগ করতে৷ প্রত্যেক সন্তানকেই এই সুযোগটা দেয়া উচিত৷

আপনার কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷