আয় আর সেবা দিন, তারপর আয়কর নিন

সব দেশের মানুষই কর ফাঁকি দিতে চায়৷ তা সত্ত্বেও অনেক দেশ নাগরিকদের কাছ থেকে প্রাপ্যটা ঠিকই আদায় করে নেয়৷ এর পাশাপাশি সবার জন্য ন্যূনতম আয় এবং নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করে তারা৷ বাংলাদেশ সরকারেরও নেয়ার আগে দেয়া উচিত৷

জার্মানিতে কর না দিয়ে থাকা মুশকিল৷ কর দিতে সবাই একরকম বাধ্য৷ প্রতিমাসে বেতনের প্রায় প্রায় অর্ধেক টাকা কেটে বাকি টাকার একটা হিসেব ধরিয়ে দেয়া হয়৷ প্রায় চার বছর ধরে আমিও এই নিয়মের অধীন৷ ধরিয়ে দেয়া হিসেবে পরিষ্কার লেখা থাকে, প্রকৃত বেতন কত আর সব কাটাকুটির পরে পাবো কত৷ প্রথমে বেশ আফসোস হতো, ভাবতাম, ‘‘ইশ, এতগুলো টাকা কেটে নেয়!''

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

অবশ্য টাকাটা হঠাৎ কাটতে শুরু করেনি৷ নিয়োগপত্রেই বিষয়টির উল্লেখ ছিল৷ প্রতিমাসে কোন খাতে কত টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা থাকে৷ সেখানে স্বাস্থ্য বীমা, অবসর ভাতা, বেকার ভাতা, জার্মানির পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন কর-সহ সব খাতেরই উল্লেখ থাকে৷

এতগুলো টাকা যে কেটে নিচ্ছে, তা নিয়ে কি মনে কোনো অসন্তোষ আছে? এখন আর একদমই নেই৷ না থাকার একটাই কারণ – পারিশ্রমিক থেকে যে টাকা কেটে নেয়া হয়, সময়মতো সমানুপাতিক বা তার চেয়ে বেশি হারে তা ফিরিয়েও দেয় জার্মান সরকার৷

জার্মানি

আয়করকে মোট পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে জার্মানিতে৷ যাদের বাৎসরিক আয় ২৫ হাজার ৭৩১ ইউরোর বেশি, তাদের দিতে হয় সবচেয়ে বেশি ৪৫ ভাগ ট্যাক্স৷ যাদের বেতন বছরে ০ থেকে ৮,৩৫৪ ইউরো তাদের কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না৷ আর ৮,৩৫৫ থেকে ১৩,৪৬৯ ইউরো যাদের বেতন, সেই সব মানুষদের ট্যাক্স দিতে হয় আয়ের ১৪ থেকে ২৩.৯৭ শতাংশ৷

ফ্রান্স

ফ্রান্সেও আয়কর পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত৷ বাড়িতে ক’জন বসবাস করে তার উপর নির্ভর করে আয়কর৷ এছাড়া যাদের আয় বছরে ৫,৯৬৩ ইউরো পর্যন্ত, তাদের কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না৷ অন্যদিকে যাদের আয় ৭০,৮৩০ ইউরো বা তার বেশি তাদের সবচেয়ে বেশি, মোট আয়ের ৪১ শতাংশ কর হিসেবে দিতে হয়৷

নেদারল্যান্ডস

এই দেশে আয়করকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷ সবচেয়ে বেশি আয়কর বা ট্যাক্স দিতে হয় তাদের, যাদের আয় বছরে ৫৭,৫৮৫ ইউরো বা তার বেশি৷ এদের আয়ের ৫২ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়৷ যাদের বাৎসরিক আয় ০ থেকে ১৯,৮৮২ ইউরো তাদের আয়কর দিতে হয় ১.৮৫ ভাগ, যার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত নয়৷ সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা নিতে চাইলে ৩৩ ভাগ ট্যাক্স দিতে হয়৷

স্পেন

স্পেনে আয়কর আটটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত৷ যাদের বছরে আয় ৫,১৫০ ইউরো, তাদের কোনো আয়কর দিতে হয় না৷ আর যাদের আয় বছরে ৩০ লাখ ইউরো বা তার বেশি, সরকারকে সর্বোচ্চ ৫২ ভাগ ট্যাক্স বা মোট বেতনের ৫২ শতাংশ কর বাবদ দিতে হয় তাদের৷

সুইজারল্যান্ড

সুইজারল্যান্ডে মোট আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ ভাগ ট্যাক্স হিসেবে দিতে হয়৷

সুইডেন, ডেনমার্ক ও নরওয়ে

স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে আয়কর অনেক বেশি৷ এই যেমন সুইডেন ও ডেনমার্কে সর্বোচ্চ ৫৬.৬ ভাগ আয়কর দিতে হয়৷ অন্যদিকে নরওয়েতে সর্বোচ্চ আয়কর দিতে হয় আয়ের ৪৬.৯ শতাংশ৷

ইটালি

ইটালিতে আয়কর পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত৷ বছরে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত যাদের আয়, তাদের ট্যাক্স দিতে হয় বেতনের ২৩ ভাগ অর্থ৷ আর যাদের আয় বছরে ৭৫ হাজার ইউরো বা তার বেশি তাদের সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়৷

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যে আয়কর চারটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত৷ যাদের আয় বছরে ১১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত, তাদের কোনো আয়কর দিতে হয় না৷ অন্যদিকে যাদের আয় বছরে দেড় লাখ পাউন্ড বা তার চেয়ে বেশি তাদের সর্বোচ্চ ৪৫ ভাগ আয়কর দিতে হয়৷

ব্যাপারটা বোঝাতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শুধু দু'টো উদাহরণ দেবো৷

২০১৪ সালে আমার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল৷ এমন বিপদ কখনো বলে-কয়ে আসে না৷ হঠাৎ ঝড়ের মতো এসে সব তছনছ করে দিয়ে যায়৷ কিন্তু হয়ত জার্মানিতে ছিলাম বলেই ঝড়টা শরীর টের পেলেও, মনের ওপর বা পরিবারে তার তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি৷ ডাক্তার রোগ নির্ণয়ের পরই অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিলেন৷ অ্যাম্বুলেন্সটাই ছিল মিনি হাসপাতাল৷ ছোট হাসপাতালে শুয়ে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাই এই বন শহরেরই একটি হাসপাতালে৷ দুপুরে অ্যাম্বুলেন্সে উঠলাম, বিকেল গড়ানোর আগেই অস্ত্রোপচার শেষ৷ কেউ একবার এসে বলেওনি, অপারেশনে কত টাকা লাগবে৷ বলার দরকারই পড়েনি৷ ডাক্তার শুধু দেখেছেন আমার হেল্থ ইনস্যুরেন্স কার্ড৷ ঐ কার্ডই আমার হয়ে কথা বলেছে, বলেছে, ‘‘এই রোগী জার্মানিতে আসার পর থেকে তাঁর কষ্টের উপার্জন দিয়ে এই দিনটির জন্য কিছু টাকা জমা করেছে৷ সুতরাং তাঁকে সারিয়ে তোলাই প্রথম ও শেষ দায়িত্ব৷ এর মাঝে কোনো কথা নেই৷ চিকিৎসার খরচ নিয়ে কোনো দরাদরির প্রশ্ন নেই৷ প্রশ্ন একটাই –রোগীকে কত তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলা যাবে?''

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

সারিয়ে তুলতে প্রথমে দরকার ছিল অপারেশন৷ তা তাঁরা কাল বিলম্ব না করেই করেছেন৷ তারপর দরকার ছিল বাকি জীবন নিজেকে সুস্থ রাখার বিষয়ে রোগীকে সচেতন করা, কিছু প্রশিক্ষণ দেয়া৷ তা-ও তাঁরা দিয়েছেন৷ জার্মান সরকার বা চিকিৎসাসেবকদের কাছ থেকে এর বেশি কী চাইতে পারি আমি?

হার্ট অ্যাটাকের পরেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রবাসে আর একা থাকা নয়৷ তা পরিবার যদি নিয়ে আসি, চলব কীভাবে? বেতন থেকে যে এতগুলো টাকা কেটে নেয়, বাকি টাকায় সংসার চালানো যাবে? সহকর্মীরা বললেন, ‘‘সে চিন্তা সরকারের৷ পরিবার এলে এত টাকা কাটবে না৷ কম কাটবে৷ ফলে আয় বেড়ে যাবে৷''

সত্যিই তাই৷ পরিবারের সদস্যদের নাম এখানে নথিভুক্ত হওয়ার পরই মাস শেষে একটু বেশি টাকা ব্যাংকে জমা হতে লাগল৷ কিছুদিন পর টাকার অঙ্কটা আরেকটু বাড়ল৷ কেন জানেন? আমার সন্তান যে স্কুলে যায়! তার একটা খরচ আছে না? সেই খরচের একটা অংশ দেয়ার দায়িত্ব আপনাআপনিই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে জার্মান সরকার৷ আমি শুধু নিয়ম মেনে জানিয়েছিলাম, সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, লেখাপড়া করছে৷

কর সব দেশের সব উপার্জনক্ষম নাগরিকেরই দেয়া উচিত৷ তবে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের ন্যূনতম সামর্থ্য না থাকলে মানুষ কর দেবে কী করে? তাই সেদিকটা মাথায় রাখতে হবে৷ আর কর নেয়ার আগে যথেষ্ট নাগরিক সেবার নিশ্চয়তা দিতে হবে সরকারকে৷

বন্ধু, আশিষ চক্রবর্ত্তীর এই ব্লগ পোস্টটা আপনার কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

সরকারি চাকুরেদের জন্য ভালো বেতন

যাঁরা সরকারি চাকরি করেন তাঁদের বেতন যদি খুব কম হয়, তাহলে আয় বাড়াতে তাঁরা ‘অনানুষ্ঠানিক’ পথ অবলম্বন করতে পারেন৷ বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে সরকারি চাকুরেদের কম বেতন ও দুর্নীতির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে৷

অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা

যে সমস্ত দেশের নাগরিকদের সরকারি কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার সুযোগ আছে সেসব দেশে দুর্নীতি কম হয়৷ অর্থাৎ যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, শিক্ষিতের হার বেশি এবং সক্রিয় সুশীল সমাজ রয়েছে সেখানে দুর্নীতির হার কম৷ কেননা এর ফলে বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, সরকারের নীতি নিয়ে আলোচনা করা যায়৷

লাল ফিতার দৌরাত্ম কমানো

বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদন বলছে, যে সব দেশে ব্যবসা শুরু করতে, সম্পত্তি নিবন্ধন করতে, আন্তর্জাতিক ব্যবসায় জড়িত হতে নানা ধরনের সার্টিফিকেট, আইন, লাইসেন্স ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সে’সব দেশে দুর্নীতি বেশি হয়৷ তাই বিশ্বব্যাংকের এক গবেষক দুর্নীতির জন্ম দিতে পারে এমন আইনকানুন বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

ভর্তুকি নয়

জ্বালানি খাতে ভর্তুকির নানা সমস্যা আছে৷ প্রায়ই এর সুবিধাভোগী হন ধনীরা৷ এছাড়া ভর্তুকি মূল্যে কেনা জ্বালানি চোরাচালানের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হন অনেকে৷ তাই ভর্তুকির মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতির চেয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষদের অর্থ সহায়তা দেয়া যেতে পারে৷

স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার

সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি যোগাযোগ যত কমানো যাবে, দুর্নীতি কমানো ততই সম্ভব হবে৷ এক্ষেত্রে বিভিন্নক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সহায়তা নেয়া যেতে পারে৷ সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনলাইনে টেন্ডার আহ্বানের মতো বিষয়াদি চালু করলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

সংশ্লিষ্ট বিষয়