ইইউ-র সঙ্গে শরণার্থী চুক্তি বাতিলের হুমকি দিল তুরস্ক

জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায় বুধবার এই হুমকি দেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভল্যুট চাভুশোলু৷ চুক্তির এক বছর পূর্তির কয়েকদিন আগে এই হুমকি দিল তুরস্ক৷

গত বছরের মার্চ মাসের ২০ তারিখ থেকে কার্যকর হওয়া চুক্তির আওতায় গ্রিসে থাকা অবৈধ শরণার্থীদের তুরস্কে ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তুরস্ক থেকে সিরীয় শরণার্থীদের ইইউতে প্রবেশ করতে দেয়ার কথা৷ ‘‘কিন্তু এই মুহূর্তে এটি কার্যকর অবস্থায় নেই এবং এই চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে', বলে জানান তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী চাভুশোলু৷ বুধবার তুরস্কের টিভি চ্যানেল ‘২৪'-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ইইউ তুর্কি নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্তভাবে ইউরোপে প্রবেশের ব্যবস্থা না করায় আলোচিত চুক্তিটি বাতিলও করা হতে পারে৷

সমাজ

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

সমাজ

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

সমাজ

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

সমাজ

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

সমাজ

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

সমাজ

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

সমাজ

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

সমাজ

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷

উল্লেখ্য, এপ্রিলে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় গণভোটের জন্য সেই দেশের মন্ত্রীসহ রাজনৈতিক নেতাদের জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে প্রচারণা চালানোর অনুমতি না দেয়ায় তুরস্কের সঙ্গে ঐ দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে৷ ঐ গণভোটের মাধ্যমে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ানের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে৷ জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ তুর্কি ভোটারের মাঝে প্রচারণা চালাতে আগ্রহী এর্দোয়ান সরকার৷

সবশেষ নেদারল্যান্ডসের রটারডামে জনসভা করতে না দেয়ায় নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতকে তুরস্কে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে৷

এদিকে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপের সমালোচনা করা এর্দোয়ান বলেছেন, দুই দেশই নাৎসিদের মতো ব্যবহার করছে৷

জেডএইচ/এসিবি (রয়টার্স, ডিপিএ, এএফপি)

সংশ্লিষ্ট বিষয়