ইরানের উপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

পেট্রোলিয়ামের পর ইরান থেকে ধাতু আমদানির উপরেও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন৷ ইরান পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘন না করেও নতুন কার্যকলাপ শুরু করছে৷ ইউরোপ দোটানায় পড়েছে৷

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজের পরমাণু চুক্তি বাতিল করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প৷ এক বছর আগে তিনি একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল করেন৷ তবে বাকি স্বাক্ষরকারী দেশগুলি চুক্তিটিকে চালু রাখার অঙ্গীকার করায় তিনি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য গোটা বিশ্বের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন৷

তারই আওতায় ইরানের পেট্রোলিয়াম রপ্তানি ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন৷ যে ৮টি দেশ এ ক্ষেত্রে কিছুদিনের ছাড় পেয়েছিল, সম্প্রতি তার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে৷ ফলে ইরানের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বন্ধ হয়ে গেছে৷ বুধবার ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সে দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস বন্ধ করতে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে৷ এর আওতায় ৯০ দিন পর থেকে ইরানের কাছ থেকে এই সব পণ্য কিনলে যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে ওয়াশিংটন৷ ফলে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত ধাতু রপ্তানির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ সেইসঙ্গে মার্কিন প্রশাসন আরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে৷

ওয়াশিংটন থেকে প্রবল চাপের মুখে ইরান পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক সমাজের সহায়তা চাইছে৷ বাকি দেশগুলি ইরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের রোষ থেকে রক্ষা না করলে সে দেশকে বাধ্য হয়ে অন্য পথে হাঁটতে হবে – এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান৷ এই মুহূর্তে পরমাণু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন না করলেও ইরান পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা করেছে৷ ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, আজই পরমাণু চুক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে না৷ তবে তিনি জানিয়েছেন, ৬০ দিনের মধ্যে ইরান নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া আবার শুরু করবে৷ সাধারণত পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এমন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়৷ এই পদক্ষেপও চুক্তির আওতায় পড়ে৷

ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাত শুধু নিষেধাজ্ঞা ও মতবিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না৷ গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা করেছে৷ ইরান পারস্য উপসাগরে হোরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়েছে৷ উল্লেখ্য, গোটা বিশ্বে সমুদ্রপথে পেট্রোলিয়াম রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে৷ সেই এলাকা ইরানের বৈধ জলসীমার মধ্যে পড়ে৷

এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপ উভয় সংকটে পড়েছে৷ ইরান এ পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘন না করায় জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন চুক্তির শর্ত মেনে চলার পক্ষে সওয়াল করে এসেছে৷ কিন্তু ওয়াশিংটনের চাপে ইউরোপের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ছে৷ তবে তথাকথিত ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল' কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ইরানের সঙ্গে ডলারে লেনদেন ছাড়াই বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে৷ ফ্রান্স ও জার্মানি পরমাণু চুক্তি চালু রাখার অঙ্গীকার করেছে৷ তবে ইরানকে পরমাণু চুক্তি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে দুই দেশ৷ রাশিয়া ও চীনও পরমাণু চুক্তি কার্যকর করার পক্ষে সওয়াল করেছে৷ এই দুই দেশ ইউরোপের উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য চাপ দিচ্ছে৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ?

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ইরান শুধু পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাতে পারবে না৷ তবে আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি চালু রাখার অধিকার সে দেশের রয়েছে৷ অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসার মতো ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ

চুক্তির প্রথম আট বছরে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা মেনে চলতে রাজি হয়েছিল৷ সেইসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত গবেষণাও বন্ধ থাকবে৷ আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থা আইএইএ ইরানের কার্যকলাপের উপর নজর রেখে চলেছে৷ জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, চীন ও রাশিয়া এক্ষেত্রে আইএইএ-র মূল্যায়নকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

পরমাণু ভাণ্ডারের ভবিষ্যৎ

চুক্তির আওতায় ইরান ৩,৬৭ শতাংশ সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর অঙ্গীকার করেছিল৷ অর্থাৎ ১৫ বছরের জন্য ৩০০ কিলোগ্রামের বেশি এমন মানের ইউরেনিয়াম ইরানের হাতে থাকার কথা নয়৷ ফলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ আপাতত বন্ধ থাকছে৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

নিষেধাজ্ঞা শিথিল

ইরান শর্ত পূরণ করার পরিবর্তে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সে দেশের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷ ফলে ইরান আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম বিক্রি ও আন্তর্জাতিক অর্থ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল৷ অ্যামেরিকার চাপের মুখে সেই সুবিধা হাতছাড়া করতে চায় না ইরান৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

চুক্তিভঙ্গের পরিণতি

পরমাণু কর্মসূচির উপর আন্তর্জাতিক নজরদারির ফলে একটি পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করতে ইরানের কমপক্ষে এক বছর লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন৷ সে রকম প্রচেষ্টা চালালে আবার সে দেশের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর বিধান মেনে নিয়েছে ইরান৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

চুক্তির মেয়াদ শেষের অবস্থা

সমালোচকরা বার বার চুক্তির ‘সানসেট ক্লজ’ বা মেয়াদ শেষের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন৷ তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও ইরান চুক্তির মেয়াদ শেষে আবার অস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করবে৷ তবে চুক্তির প্রবক্তারা মনে করিয়ে দেন, যে বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপের উপর ১০, ১৫, ২০ বা ২৫ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকবে৷

ইরান পরমাণু চুক্তি কী ও কেন?

ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকরা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বাড়বাড়ন্ত ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সে দেশের প্রভাব প্রতিপত্তির কড়া সমালোচনা করেন৷ ইউরোপসহ অন্যান্য অনেক দেশও বিষয়ে একমত৷ তবে ‘সফল’ পরমাণু চুক্তি বাতিল করার বদলে তা কাজে লাগিয়ে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় তারা৷

এসবি/এসিবি (রয়টার্স, এএফপি)

আমাদের অনুসরণ করুন