ইহুদি সম্প্রদায়কে ‘উপহার' বললেন জার্মান প্রেসিডেন্ট

ইহুদিদের আলোর উৎসব উদযাপনে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট স্টাইনমায়ার জার্মানিতে ইহুদি বিদ্বেষের কালো অধ্যায়কে স্মরণ করেন৷ আবারো কোনো কোনো পর্যায়ে এই বিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে বলে এর নিন্দাও জানান তিনি৷

ইহুদিদের আলোর উৎসব হানুক্কাহ শুরু হয়েছে রোববার৷ সেদিন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার ও বার্লিনে ইহুদি সম্প্রদায়ের মেয়র রাব্বি ইয়েহুদা টাইশটাল ইউরোপের সবচেয়ে বড় মেনোরাহের মোমবাতিতে আগুন জ্বালিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন৷ এই মেনোরাহটি ৩৩ ফুট উঁচু৷

ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে এই অনুষ্ঠানে স্টাইনমায়ার এ সময় ৮০ বছর আগেকার গণহত্যার কথা স্মরণ করেন৷

তিনি জার্মানির ইহুদি সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘‘এটা আমাদের জন্য একটা উপহার যে আপনারা ইতিহাসের ফাটল মেরামতে আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন৷''

হানুক্কাহ অর্থ উৎসর্গ করা৷ মেনোরাহ হলো এক রকমের মন্দির, যার মোমবাতিগুলো সবসময় জ্বলে৷ বার্লিনে প্রতিবছর আটদিনব্যাপী হানুক্কাহ উৎসব হয়৷ এ বছর এ আলোর উৎসবটি হচ্ছে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটে৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

দেশের জন্য নিবেদন

অনেক জার্মান সিন্টিই দেশের জন্য অস্ত্র হাতে লড়েছেন৷ শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই নয়, ১৯৩৯ সাল থেকেই তারা এ দেশের সশ্বস্ত্র বাহিনীতে ভূমিকা রেখেছেন৷ ১৯৪১ সালে জার্মান হাইকমান্ড ‘জাতিগত ও রাজনৈতিক’ কারণ দেখিয়ে সব ‘জিপসি ও তাদের ঔরসদের’ সক্রিয় সামরিক বাহিনী থেকে বের করে দেয়৷ আলফনস ল্যামপের্ট ও তার স্ত্রী এলসাকে বন্দি শিবির আউশভিৎসে পাঠানো হয় এবং পরে সেখানে তাদের হত্যা করা হয়৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

তালিকা তৈরি

সিন্টি ও রোমাদের আস্থা অর্জনের জন্য রোমানি ভাষা শিখেছিলেন এভা জাস্টিন নামের একজন নার্স ও নৃতাত্ত্বিক৷ কথিত সায়েন্টিফিক রেসিজম স্পেশালিস্ট হিসেবে তিনি এই দুই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সম্পর্কে ধারণা পেতে জার্মানিজুড়ে ঘোরেন এবং জিপসি ও জিপসি বাবা বা মায়ের সন্তানদের তালিকা তৈরি করেন৷ সেই তালিকা ধরেই গণহত্যা চালিয়েছিল নাৎসিরা৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বন্দিত্ব

তিরিশের দশকে বিভিন্ন জায়গা থেকে সিন্টি ও রোমাদের জোর করে ধরে এনে শহরের বাইরের শিবিরগুলোতে রাখা হয়৷ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এ সব শিবিরের বাইরে পাহারা বসানো হতো কেউ যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে৷ তেমনই একটি বন্দি শিবির জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেভেনসবুর্গ৷ শিবিরের বাসিন্দাদের গৃহপালিত সব পশু মেরে ফেলা হয়েছিল৷ দাসের মতো করে তাদের দিয়ে কাজ করানো হত৷ অনেককে জোর করে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছিল৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

প্রকাশ্য দিবালোকে দেশান্তর

১৯৪০ সালের মে মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জার্মানির এরপার্জ শহরের রাস্তা ধরে বহু সিন্টি ও রোমা পরিবারকে নিয়ে যাওয়া হতa ট্রেন স্টেশনে এবং সেখান থেকে তাদের সরাসরি নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হত৷ ‘‘ঝামেলা ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে তাদের পাঠানো সম্পন্ন হয়েছে,’’ বলা হয় একটি পুলিশ প্রতিবেদনে৷ এভাবে দেশান্তরিতদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয় তাদের কাজের জায়গা ও ইহুদি ঘাঁটিগুলোতে৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

স্কুল থেকে আউশভিৎসে

১৯৩০ দশকের শেষের দিকে কার্লসরুয়ে শহরের একটি ক্লাসরুমের ছবিতে দেখা যায় কার্ল ক্লিংকে৷ ১৯৪৩ সালের বসন্তে স্কুল থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়৷ এরপর তাকে পাঠানো হয় আউশভিৎস-বিরকেনাউয়ের ‘জিপসি ক্যাম্পে’৷ সেখানেই গণহত্যার বলি হয় শিশুটি৷ সেখান থেকে যারা প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন তাদের ভাষ্য মতে, সেখানে পাঠানোর আগেই তাদের আলাদা করে ফেলা হয়, রাখা হয় চাপের মধ্যে, কখনও কখনও ক্লাসেও অংশ নিতে দেওয়া হতো না৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

ভয়ানক মিথ্যা দিয়ে অভ্যর্থনা

১৯৪৩ সালে পরিবারের সঙ্গে পশুবাহী গাড়িতে করে আউশভিৎসে পৌঁছানোর সময় নয় বছরের হুগো হ্যোলেনরাইনার মনে মনে বলছিল, আমি কাজ করতে পারি৷ সেখানে গিয়ে ফটকের উপরে ‘কাজ তোমাকে মুক্তি দেবে’ লেখা দেখেই এই ভাবনা এসেছিল শিশুটির মনে৷ সে তার বাবার কাজে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল৷ ওই মৃত্যুকূপে যাদের নেওয়া হয় তাদের প্রতি ১০ জনে একজন ফিরে আসতে পেরেছিল, তাদেরই একজন হ্যোলেনরাইনার৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

‘মৃত্যুদূত’ থেকে নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা

আউশভিৎসে নিয়োজিত ছিলেন কুখ্যাত এসএস ড. জোসেফ মেঙ্গেলে৷ তিনি ও তার সহকর্মীরা অসংখ্য বন্দিকে নির্যাতন করেন৷ তারা শিশুদের বিকলাঙ্গ করতেন, তাদের শরীরে ঢুকিয়ে দিতেন জীবাণু, যমজদের নিয়ে বর্বরোচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন৷ বন্দিদের চোখ ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে বার্লিনে পাঠাতেন৷ ১৯৪৪ সালের জুন মাসে ১২ বছরের একটি শিশুর মাথা পাঠিয়েছিলেন তিনি৷ বিশ্বযুদ্ধের পর আর বিচারের মুখোমুখি হননি তিনি৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বিলম্বে মুক্তি

১৯৪৫ সালের ২৭ জানুয়ারি যখন আউসভিৎসে রাশিয়ার লালফৌজ এলো তখন বন্দিদের মধ্যে শিশুরাও ছিল৷ কিন্তু সিন্টি ও রোমাদের জন্য মুক্তি এসেছিল দেরিতে৷ ১৯৪৪ সালের ২-৩ আগস্ট রাতে আউসভিৎশের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ‘জিপসি ক্যাম্পের’ জীবিতদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন৷ পরদিন সকালে কাঁদতে কাঁদতে ব্যারাকের বাইরে আসা দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

জাতিগত বিদ্বেষের ক্ষত

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলো মুক্ত হওয়ার পর জার্মান কর্তৃপক্ষ সেখানকার জীবিতদের জাতিগত নিপীড়নের শিকার ও বন্দিত্ববরণের সনদ দেয়৷ পরে অনেকে বলতে শুরু করে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্যই তাদের সাজা ভোগ করতে হয়৷ ক্ষতিপূরণ চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হয় তারা৷ আউশভিৎসে শিশু তিন মেয়েকে হারিয়েছিলেন হিল্ডগার্ড রাইনহার্ডট৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন

সিন্টি ও রোমা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা আশির দশকের শুরুর দিকে ডাকাউ কনেসনট্রেশন ক্যাম্পের ফটকে অনশন করেন৷ জাতিগত বিদ্বেষের প্রতিবাদ এবং নাৎসি নিপীড়নের স্বীকৃতি দাবি করেন তারা৷ ১৯৮২ সালে তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট স্মিড্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্টি ও রোমাদের নাৎসি গণহত্যার শিকার হওয়ার স্বীকৃতি দেন৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বার্লিনে স্মৃতিসৌধ

সিন্টি ও রোমাদের ওপর নাৎসি গণহত্যার স্মরণে ২০১২ সালে বার্লিনের বুন্দেসটাগের কাছে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়৷ বিশ্বজুড়ে এই দুই সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই স্মৃতিসৌধ৷

উৎসবে স্টাইনমায়ার বলেন,নাৎসিদের ইহুদি নিধনের ইতিহাসের কারণে জার্মানদের এর দায়িত্ব নিতে হবে৷ ‘‘এই দায়িত্ব কখনো শেষ হবে না,'' বলেন তিনি৷

সম্প্রতি জার্মানির অতি ডানপন্থি দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-র কয়েকজন সদস্য হলোকস্ট ও নাৎসিদের অপরাধের ব্যাপারে দেশটির সাধারণের প্রায়শ্চিত্তমূলক মানসিকতার সমালোচনা করেন৷

জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায়, রাস্তায়, স্কুলে ও অনলাইনে ইহুদিবিদ্বেষী নানা বক্তব্য সম্প্রতি দেখা গেছে৷ স্টাইনমায়ার এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান৷

এ বছর হানুক্কাহ চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত৷

জেডএ/এসিবি (এএফপি, কেএনএ)

আমাদের অনুসরণ করুন