উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় ভুগছেন প্রতিবন্ধীরা

২০০৯ সালে জাতিসংঘের প্রতিবন্ধীসংক্রান্ত কনভেনশনে সই করে জার্মানি৷ কিন্তু সেবাস্টিয়ান পামপুখের মতো যাঁরা ডক্টরেট করছেন, তাঁদের কোনো সুবিধা হয়নি৷ এক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ‘পিআরওএমআই’ বা ‘প্রমি’ উদ্যোগ৷

প্রতিবন্ধীবিষয়ক নীতিমালায় স্বাক্ষর দেওয়ার পর থেকে জার্মানিতে স্কুলের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে৷ অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাত শতাংশ শিক্ষার্থী কম-বেশি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পড়াশোনা করছেন৷ অনেকে ডক্টরেটও করছেন৷

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধকতা

৪০ বছর বয়সি সেবাস্টিয়ান সাবেক পূর্ব জার্মানিতে বসবাসকারী আফ্রিকানদের জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন৷ এক্ষেত্রে হামবুর্গের ‘জার্মান ইন্সটিটিউট অফ গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিস', সংক্ষেপে জিআইজিএ এক উপযুক্ত শিক্ষালয়৷

সেবাস্টিয়ান সাবেক পূর্ব জার্মানিতে বসবাসকারী আফ্রিকানদের জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন

মাস ছয়েক ধরে এই ইন্সটিটিউটে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কাজ করছেন তিনি৷ তাঁর গবেষণার জন্য এই লাইব্রেরি যেন এক রত্মভাণ্ডার৷

জার্মানি ইউরোপ | 25.05.2014

শিগগিরই বার্লিনের হুমবোল্ট ইউনিভার্সিটির ‘ইন্সটিটিউট ফর ইউরোপীয় এথনোলজিতে' ডক্টরেটের কাজ শুরু করবেন সেবাস্টিয়ান৷ সেখানে তিনি মাস্টার কোর্সও করেছেন৷ গুরুতর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় ঠিকমত চলাফেরা করতে পারেন না তিনি৷ অনেকদিন আগেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী পদের জন্য আবেদন করেছিলেন৷ কিন্তু সফল হননি৷ বৃত্তি পাওয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়৷ অবশেষে একটি ক্ষেত্রে সাফল্যের মুখ দেখা গেলো৷ প্রতিবন্ধী অ্যাকাডেমিকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ ‘প্রোমোশন ইনক্লুসিভ' – ‘পিআরওএমআই' বা ‘প্রমি'-র পক্ষ থেকে সহায়তা পাবেন সেবাস্টিয়ান৷

কয়েক গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে

সব মিলিয়ে ৪৫ জন গবেষককে সহায়তা দিচ্ছে ‘প্রমি'৷ প্রথম গ্রুপের ১৫ জনের মধ্যে সেবাস্টিয়ান একজন৷ এরপর অন্য দুই গ্রুপকে আনা হবে সাহায্যের আওতায়৷ তাঁরা সবাই তিন বছর ধরে গবেষণা সহকারী হিসাবে ১৪টি সহযোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটিতে কাজ করবেন৷

আসলে সেবাস্টিয়ান ২০০৯ সালে মাস্টার্স করার পর ডক্টরেট শুরু করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু খরচ চালাবার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল গবেষণা সহকারীর কাজ বা বৃত্তি৷ কিন্তু দুই বছর কেটে গেলেও কোনোটারই মুখ দেখতে পাননি তিনি৷

জার্মানির শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই কোনো বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন৷ এর মধ্যে কতজন ডক্টরেট করছেন তা বলা যায় না৷ কেননা এক্ষেত্রে কোনো পরিসংখ্যান নেই৷ বৃত্তিদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি মনে করে এ ব্যাপারে সবারই সমানাধিকার থাকা উচিত৷

সেবাস্টিয়ান মনে করেন, প্রতিবন্ধী অ্যাকাডেমিকদের সমস্যাগুলি নিয়ে তেমন মাথা ঘামানো হয় না৷ ফর্ম পূরণ করার সময় এমন কোনো ঘর পাননি তিনি, যেখানে ক্রস দেওয়া যায়৷ তিনি প্রতিবন্ধী হিসাবে ‘বোনাস' চান না৷ কিন্তু তাঁর বায়োডাটায় ফাঁকটার ব্যাখ্যা দিতে চান৷

১২ থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব মিলিয়ে দুই বছর হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তাঁকে৷ অল্পবয়সে অস্থির ক্যানসারে আক্রান্ত হন সেবাস্টিয়ান, যার চিহ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে৷

চলাফেরায় অসুবিধা

চলার সময় খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়৷ বসার সময় বা পা ভাজ করতে পারেন না৷ এই পায়েই টিউমারটা হয়েছিল৷ এক ধরনের বন্ধফলক বা স্প্লিন্ট দিয়ে পা-টির ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল

ঢাকার মিরপুরে ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে ব্রেইলে লিখছে এক শিক্ষার্থী৷ ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলে এখন শিক্ষা নিচ্ছে ৮০ জনেরও বেশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

শিক্ষকরাও কেউ কেউ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণি৷ প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত এ স্কুলের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠদান চলে৷ এ স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যেও কেউ কেউ আছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

ব্রেইল পড়া

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের এক শিক্ষার্থী ব্রেইলে পড়ছেন৷ বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ হাজারের মতো৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

ব্রেইল বইয়ের অভাব

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের দুই শিক্ষার্থী মিলে একটি একটি ব্রেইল বই পড়ছেন৷ বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে বইয়ের অভাব অনেক বেশি৷ সহজলভ্য না হওয়ায় বেশিরভাগ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা তাই বইয়ের সংকটে থাকেন৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

সবাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমায়রা মিম (বাঁ থেকে চতুর্থ)৷ তার ক্লাসের সব বন্ধুরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী৷ এ স্কুলে সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম থাকায় স্বাভাবিক দৃষ্টি সম্পন্ন মিম পড়াশুনা করছে এখানে৷ ক্লাসের সব বন্ধরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও ওদের সঙ্গে পড়াশুনা করতে ভালোই লাগে তার৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া নমিতা

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের শিক্ষিকা নমিতা৷ স্বাভাবিক চোখ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি৷ স্কুলে পড়ার সময় বখাটেদের ছোঁড়া অ্যাসিডে ঝলসে যায় মুখ, হারান চোখও৷ এরপরেও থামেনি তার পথ চলা৷ লেখাপড়া শেষ করে এখন তিনি শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মাঝে৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

শেখানো হয় হাতের কাজও

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি শেখানো হয় হাতের কাজও৷ শিক্ষার্থীরা অনেক আগ্রহ নিয়ে এসব কাজ শেখেন৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

ফিজিওথেরাপি

ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক শিক্ষার্থীকে ফিজিওথেরাপি দিচ্ছেন এক চিকিৎসক৷ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেকেরই শারীরিক কিছু সমস্যা থাকে, যেগুলো এই ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

হোস্টেলে ফিরছে শিক্ষার্থীরা

স্কুল শেষে হোস্টেলে ফিরছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা৷ ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই আবাসিক৷ স্কুলের অ্যাকাডেমিক ভবনের পাশেই লাগোয়া একটি ভবনে থাকার জায়গা এই সব শিক্ষার্থীদের৷

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন

ডয়চে ভেলের দ্য বব্স অ্যাওয়ার্ড

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি অনলাইন প্রকল্প ‘বাংলা ব্রেইল’ চলতি বছর দ্য বব্স অ্যাওয়ার্ড জয় করেছে৷ ফেসবুকভিত্তিক এই প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য অডিও বুক এবং ব্রেইল বইয়ের ইউনিকোড সংস্করণ তৈরির কাজ চলছে৷

বেশিক্ষণ বসে থাকতেও অসুবিধা হয় তাঁর৷ কিন্তু এরপরেও থিসিসে মনোযোগ কমেনি এই অধ্যাবসায়ীর৷ আর তাই তো চাকরি ও বৃত্তির আবেদন নাকোচ হয়ে যাওয়ার পর জিআইজিএ-র গ্রন্থাগারে খণ্ডকালীন চাকরি শুরু করেন সেবাস্টিয়ান৷ পাশাপাশি চালিয়ে যান গবেষণার কাজ৷

অন্যদিকে হুমবোল্ট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা শুরু করার আগে বেশ কিছু কাজ সারতে হচ্ছে তাঁর প্রফেসর বেয়াটে বিন্ডারকে৷ কাজের জায়গাটি সেবাস্টিয়ানের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দিকে লক্ষ্য রেখে ঠিকঠাক করা হচ্ছে৷ উঁচু বা নীচু করা যায় এমন একটি টেবিলের অর্ডার দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যেই৷ প্রফেসর বিন্ডার জানান, ‘ইন্সটিটিউট ফর ইউরোপীয়ান এথনোলজি'-কে ২০ শতাংশ খরচ বহন করতে হয়৷ ‘‘এটা একটা অতিরিক্ত চাপ৷ কিন্তু তা আমরা সামলাতে পারব৷''

একটি শুভ উদ্যোগ

প্রতিবন্ধী অ্যাকাডেমিকদের জন্য বিশেষ এই প্রকল্পকে খুব ভালো বলে মনে করেন তিনি এবং এতে সহায়তা দিতেও আগ্রহী৷ তবে মাঝে মাঝে বাধার সম্মুখীনও হতে হয়৷ আরেক ডক্টরেটের ছাত্রীর শ্রবণযন্ত্র কেনার ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে৷ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে বলা হচ্ছে, ‘‘থিসিস লেখার জন্য তো শোনার প্রয়োজন নেই৷''

‘প্রমি'-র কাজটি পাওয়ায় সেবাস্টিয়ান এখন স্বস্তি পেয়েছেন৷ পাঁচ বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পর পাওয়া গেল আর্থিক নিরাপত্তা৷ এখন পুরোপুরি থিসিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন এই গবেষক৷

আমাদের অনুসরণ করুন