উত্তরাখণ্ডে দাবানলের অভিঘাত পরিবেশের ওপর কতটা?

উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ বনভূমি বিধ্বংসী দাবানলের কবলে৷ সপ্তাহ দেড়েক পরেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি৷ দাবানল নিয়ত্রণে আনতে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী৷ এই দাবানলের কারণ যাই হোক না কেন, পরিবেশের ওপর এর অভিঘাত মারাত্মক৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ভারতের পশ্চিম হিমালয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডের বিরাট বনভূমিতে দাবানলের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত৷ প্রথমেই আঙুল উঠেছে কাঠ মাফিয়াদের দিকে৷ মনে করা হচ্ছে, এটা তাদের পরিকল্পিত চক্রান্ত৷ হিমালয়ের প্রায় ২,৩০০ হেক্টর সবুজ বনাঞ্চলের হাজার হাজার গাছপালা পুড়ে গেছে, মারা গেছে জনা সাতেক৷ পুড়ে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া গাছ রাজ্যের বন দপ্তরের বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই৷ আর জলের দরে তা কেনার জন্য মুখিয়ে আছে কাঠ মাফিয়ারা৷ গাছ কেটে নেবার পর খালি জায়গার দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়বে বিল্ডার-লবির৷ কেউ কেউ মনে করেন, এর পেছনে বনভূমির লাগোয়া গ্রামবাসীদের একাংশের হাত থাকা অসম্ভব নয়৷ খালি জায়গায় তারা চাষ করতে পারবে, বৃষ্টি বাদল হলে গবাদি পশুর খাদ্য জোগান দিতে পারবে আর গবাদি পশুর চারণভূমি হিসেবে বাড়ি জায়গাও পাবে৷

Karte Indien Uttarakhand Englisch

ভারতের মানচিত্রে উত্তরাখণ্ড

কিন্তু সবথেকে দুশ্চিন্তার কারণ পরিবেশের ওপর এর অভিঘাত৷ এই দাবানলে পরিবেশের কতটা ক্ষতি হতে পারে – সেবিষয়ে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. সুভাষ সাঁতরা ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘এই দাবানলে ক্ষতিটা দু'ভাবে হতে পারে৷ একটা স্বল্পমেয়াদি, অন্যটা দীর্ঘমেয়াদি৷ স্বল্পমেয়াদি ক্ষতির মধ্যে রয়েছে বনভূমি ধ্বংস হওয়া, বায়োম্যাস পুড়ে গ্যাস উদগীরণ, স্থানীয় লোকজনদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি৷ দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতের আবার দু'টো দিক আছে৷ একটা বাস্তব দিক যেমন, কতটা কার্বন-ডাই অক্সাইড বা গ্রিন হাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছে আর অন্যটা জৈবিক দিক, যেমন জৈব-বৈচিত্র্যের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে৷ বিরল প্রজাতির কীট-পতঙ্গ ও গাছপালা কতটা বিপন্ন হয়েছে৷ এই সবগুলি খুঁটিয়ে নিরুপণ করার পরই তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব৷ অবশ্য এ সবই দাবানলের পরিণাম হতে পারে৷

প্রশ্ন

পৃথিবী আসলে কতটা উষ্ণ হয়ে উঠেছে?

উত্তর

১৮৫০ সালে শিল্প-বিপ্লবের শুরু থেকে বিশ্বের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে৷ তাই গবেষকদের আশঙ্কা, ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বিফল হবে৷ জলবায়ু গবেষণার ভিত্তিতে বড়জোর দেড় ডিগ্রির সীমা ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন সমালোচকরা৷

প্রশ্ন

২১০০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি কী হতে পারে?

উত্তর

পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বেশি মাত্রায় বাড়লে উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বিপদে পড়তে পারেন৷ প্রায় ২০০ কোটি মানুষ জলের অভাবে সমস্যায় পড়বেন৷ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে৷

প্রশ্ন

গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবের উৎস কী?

উত্তর

কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস৷ জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ঘরবাড়ি গরম রাখা, পরিবহণ ব্যবস্থা চালানো এবং শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয় এবং বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে৷ গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৬৫ শতাংশই কার্বন-ডাই-অক্সাইড৷ এছাড়া মিথেন, লাফিং গ্যাস ও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন এর জন্য দায়ী৷

প্রশ্ন

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে কোন দেশগুলি গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

উত্তর

সার্বিয়া, আফগানিস্তান এবং বসনিয়া-হ্যারৎসোগোভিনা ২০১৫ সালে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ প্যারিস-ভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ‘জার্মানওয়াচ’ প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকির তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে৷ তবে ১৯৯৫ সাল থেকে হন্ডুরাস, মিয়ানমার, হাইতি ও ফিলিপাইন্সের মতো দক্ষিণ গোলার্ধের দরিদ্র দেশগুলি বন্যা, বিধ্বংসী ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷

প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র কেন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়?

উত্তর

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমুদ্রের পানির মধ্যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে৷ এই প্রক্রিয়ায় জলের ‘পিএইচ ভ্যালু’ কমে যায়৷ অ্যালজির মতো ক্ষুদ্র প্রাণী ও প্রবাল প্রাচীরের উপর তার প্রভাব পড়ে৷ জলে অম্লের মাত্রা যত বাড়ে, ক্যালশিয়াম বাইকার্বোনেট তত পাতলা হয়ে যায়৷ তখন প্রবালের মৃত্যু হয়৷ ফলে সমুদ্রের গোটা ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

প্রশ্ন

বার্লিন থেকে প্যারিস যেতে হলে গাড়ি, বিমান অথবা ট্রেন – পরিবহণের কোন মাধ্যম পরিবেশের সবচেয়ে ক্ষতি করে?

উত্তর

এই দূরত্ব অতিক্রম করতে এয়ারবাস এথ্রিটুজিরো বিমানে যাত্রীপিছু ২৪৮ কিলোগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয়৷ ফলক্সভাগেন কোম্পানির গল্ফ মডেলের নতুন গাড়িতে চড়ে গেলে নির্গমনের পরিমাণটা দাঁড়ায় ১৭৯ কিলো৷ অন্যদিকে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব বাহন হলো ট্রেন৷ সে ক্ষেত্রে নির্গমনের পরিমাণ প্রায় ১১ কিলো৷

উত্তরাখণ্ড হিমালয়ের কোলে৷ তাই এই দাবানলের অভিঘাত কি হিমালয়ের হিমবাহের ওপরও পড়তে পারে? উত্তরে পরিবেশ বিজ্ঞানী সাঁতরা বললেন, দাবানল যদি স্থানীয় মাত্রায় সীমিত থাকে, তাহলে ক্ষতি নাও হতে পারে৷ তবে উত্তাপ যদি অত্যধিক হয়, হিমালয় সন্নিহিত ব্যাপক অঞ্চলে ছড়িয়ে গিয়ে পারিপাশ্বিক উষ্ণতা খুব বাড়িয়ে তোলে, তাহলে হিমবাহের ক্ষতির আশঙ্কা আছে৷ সেক্ষেত্রে আবার দেখতে হবে হাওয়া কোনদিকে বইছে আর দাবানল এলাকা থেকে আকাসপথে হিমবাহে দূরত্ব যদি ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার হয়, তাহলে হিমবাহ গলে যাবার আশঙ্কা খুবই কম৷

কিছু কিছু সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে দাবানল রুখতে বন-পঞ্চায়েতকে সজাগ ও সচেতন করা জরুরি৷ জ্বালানি হিসেবে শুকনো পাতা বা কাঠের বিকল্প হিসেবে গ্রামবাসীদের রান্নার গ্যাস সরবরাহ করার ওপর জোর দিতে হবে সরকারকে৷ অন্যথায়, ইকো-সিস্টেমের মৃত্যু ঘণ্টা বাজতে আর দেরি নেই৷ পোড়া বনভূমিতে আগামী বর্ষায় যথেষ্ট বৃষ্টি না হলে এল-নিনোর আশঙ্কাও অমূলক নয়৷ মাটি তার আদ্র্রতা হারাবে, ভূমি উত্তাপ বাড়বে, বনভূমি তার শ্যামলিমা হারিয়ে হয়ে যাবে রুক্ষ৷

একটা দাবানল যে পরিবেশের এত বড় ক্ষতি করতে পারে, সেটা কি আপনি ভাবতে পারেন?

তবুও আমস্টারডাম ডুবে যাবে!

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা নিয়ে আসন্ন প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা হবে৷ সেক্ষেত্রে সবাই একমত হলেও সমুদ্রের পানির উচ্চতা এক মিটারের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ আর সেটা হলে ডুবে যাবে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহর ৷

কোরাল রিফ

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে স্নরকেলিং করতে নেমে নিমো-র সঙ্গে সেলফি তুলতে চান? তাহলে এখনই যেতে হবে৷ কারণ তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে প্রবালপ্রাচীর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে৷ এখনই পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে প্রবালপ্রাচীর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে৷

স্কি আর নয়?

ওইসিডি-র হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তুষারের স্তর কমে যাওয়ায় আল্পসে স্কি করার জায়গা কমে যাচ্ছে৷ ফলে ইতিমধ্যে স্কি এলাকার অনেক রিসোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে৷ অন্যরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গরমের সময় হিমবাহগুলো ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করে৷

ভেনিস সহ আরও যেসব শহর

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব শহর হুমকির মুখে রয়েছে তার মধ্যে ইটালির ভেনিস একটি৷ আরও আছে ঢাকা, মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক, ব্যাংকক, হং কং, হো চি মিন সিটি, টোকিও, মুম্বই ইত্যাদি৷

নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ

একসময় এই রুট পাড়ি দেয়া ছিল অভিযাত্রীদের স্বপ্ন৷ এটা করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে৷ তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে যাওয়ায় প্রমোদতরী কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে৷

ঘুরে বেড়ানোর এখনই সময়

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায়ই খরা দেখা দিচ্ছে৷ গত তিন বছর সেখানে রেকর্ড পরিমাণ উচ্চ তাপমাত্রা ছিল৷ ফলে আপনি যদি ক্যালিফোর্নিয়ার কাঠবাদামের গাছের নীচে কিংবা ব্রাজিলের কফি ও ভিয়েতনামের ধানক্ষেতে ঘুরে বেড়াতে চান তাহলে এখনই করে ফেলা ঠিক হবে৷

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক

১৯ শতকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের মনটানা রাজ্যের ‘গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক’ এ প্রায় দেড়শোটির মতো হিমবাহ ছিল৷ কিন্তু ২০১০ সালের হিসেবে সেখানে এখন হিমবাহের সংখ্যা মাত্র ২৪৷ ২০৩০ সাল নাগাদ সংখ্যাটা শূন্যের কোটায় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে৷

ভারতের পশ্চিম হিমালয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডের বিরাট বনভূমিতে দাবানলের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত৷ প্রথমেই আঙুল উঠেছে কাঠ মাফিয়াদের দিকে৷ মনে করা হচ্ছে, এটা তাদের পরিকল্পিত চক্রান্ত৷ হিমালয়ের প্রায় ২,৩০০ হেক্টর সবুজ বনাঞ্চলের হাজার হাজার গাছপালা পুড়ে গেছে, মারা গেছে জনা সাতেক৷ পুড়ে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া গাছ রাজ্যের বন দপ্তরের বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই৷ আর জলের দরে তা কেনার জন্য মুখিয়ে আছে কাঠ মাফিয়ারা৷ গাছ কেটে নেবার পর খালি জায়গার দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়বে বিল্ডার-লবির৷ কেউ কেউ মনে করেন, এর পেছনে বনভূমির লাগোয়া গ্রামবাসীদের একাংশের হাত থাকা অসম্ভব নয়৷ খালি জায়গায় তারা চাষ করতে পারবে, বৃষ্টি বাদল হলে গবাদি পশুর খাদ্য জোগান দিতে পারবে আর গবাদি পশুর চারণভূমি হিসেবে বাড়ি জায়গাও পাবে৷