উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পর মোদীর লক্ষ্য পূর্ব ভারত

উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড রাজ্যে বিপুল নির্বাচনি সাফল্যের পর মণিপুরেও সরকার গড়ল বিজেপি৷ কিন্তু শুধু মনিপুরেই সন্তুষ্ট নন নরেন্দ্র মোদী৷ তাঁর নজর এবার গোটা পূর্ব ভারতে৷

বিজেপি এবার নজর দেবে পূর্ব ভারতে৷ এবারের নির্বাচনি সাফল্যের পর ঘোষণা করেছেন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ৷ কারণ, নির্বাচনি সাফল্যের যে ফর্মুলা কাজ করেছে উত্তর ভারতে, একই ফর্মুলা পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতেও সাফল্য আনবে বলে বিজেপি নেতৃত্বের বিশ্বাস৷ আগ্রহজনক বিষয় হলো, দেশের একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকও একই কথা ভাবছেন৷ কী সেই ফর্মুলা?‌ এক, উন্নয়ন কর্মসূচিকেন্দ্রিক রাজনীতি, দুই, হিন্দু ভোট একজোট করা৷ এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু ভোট একত্র করার কাজটা ক্রমশ সহজ হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন ওই পর্যবেক্ষকরা৷

রাজনীতি | 14.03.2017

চা ওয়ালা

১৯৫০ সালে গুজরাটের নিম্নবিত্ত এক ঘাঞ্চি পরিবারে জন্ম নেয়া নরেন্দ্র মোদী কৈশরে বাবাকে সাহায্য করতে রেল ক্যান্টিনে চা বিক্রি করেছেন৷ ঘাঞ্চি সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী ১৭ বছর বয়সে যশোদাবেন নামের এক বালিকার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, যদিও বেশিদিন সংসার করা হয়নি৷ ছাত্র হিসেবে সাদামাটা হলেও মোদী বিতর্কে ছিলেন ওস্তাদ৷ ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রচারক হিসাবে রাজনীতির দরজায় পা রাখেন মোদী৷

গুজরাটের গদিধারী

১৯৮৫ সালে আরএসএস থেকে বিজেপিতে যোগ দেয়ার ১০ বছরের মাথায় দলের ন্যাশনাল সেক্রেটারির দায়িত্ব পান ১৯৯৫ সালে গুজরাটের নির্বাচনে চমক দেখানো মোদী৷ ১৯৯৮ সালে নেন দলের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব৷ ২০০১ সালে কেশুভাই প্যাটেলের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে দলের মনোনয়নে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হন নরেন্দ্র মোদী, যে দায়িত্ব তিনি এখনো পালন করে চলেছেন৷

দাঙ্গার কালিমা

মোদীকে নিয়ে আলোচনায় ২০০২ সালের দাঙ্গার প্রসঙ্গ আসে অবধারিতভাবে৷ স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গুজরাটে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হন৷ মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি দাঙ্গায় উসকানি দেন৷ তিনি এ অভিযোগ স্বীকার করেননি, আদালতও তাঁকে রেহাই দিয়েছে৷ তবে দাঙ্গার পক্ষে কার্যত সাফাই গেয়ে, হিন্দুত্ববাদের গান শুনিয়েই তিন দফা নির্বাচনে জয় পান মোদী৷

রূপান্তর

দাঙ্গার পর নিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর উদ্যোগ নেন নরেন্দ্র মোদী৷ একজন বিতর্কিত নেতার বদলে উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে শুরু হয় ‘গুজরাট মডেল’-এর প্রচার৷ ২০০৭ সালের পর নিজেকে একজন সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে তুলে ধরতে নতুন প্রচার শুরু করেন এই বিজেপি নেতা, প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্র্যান্ড মোদী’৷গুজরাটের উন্নয়নের চিত্র দেখিয়ে কলঙ্কিত ভাবমূর্তিকে তিনি পরিণত করেন ভারতের ত্রাতার চেহারায়৷

ভারতের পথে পথে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌঁড়ে নরেন্দ্র মোদী পাড়ি দিয়েছেন তিন লাখ কিলোমিটার পথ৷ সারা ভারতে পাঁচ হাজার ৮২৭টি জনসভায় তিনি অংশ নিয়েছেন, নয় মাসে মুখোমুখি হয়েছেন পাঁচ কোটি মানুষের৷ কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসাবে শুরু করলেও এবার তিনি হিন্দুত্ব নিয়ে প্রচার এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে, যদিও বাংলাদেশের মানুষ, ভূখণ্ড এবং ধর্ম নিয়ে নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতাদের বক্তব্য নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে৷

নতুন ইতিহাস

ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটই যে এবার ভারতে সরকারগঠন করতে যাচ্ছে, বুথফেরত জরিপ থেকে তা আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল৷ ৬৩ বছর বয়সি মোদীর নেতৃত্বে এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি৷ ৭ই এপ্রিল থেকে ১২ই মে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৮১ কোটি ৪০ লাখ৷ তাঁদের মধ্যে রেকর্ড ৬৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন৷

শেষ হাসি

নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল – মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে, গুজরাটের আদলে তিনি ভারতকে বদলে দেবেন৷ অবশ্য সমালোচকরা বলছেন, ‘কলঙ্কিত ভাবমূর্তি’ ঢাকতে এসব মোদীর ফাঁপা বুলি৷ তাঁর স্বৈরাচারী মেজাজ, শিক্ষা ও অর্থনীতির জ্ঞান নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপ হয়েছে৷ বলা হচ্ছে, ভোটাররা টানা তৃতীয়বার কংগ্রেসকে চায়নি বলেই বিজেপি জয় পেয়েছে৷ যদিও শেষ হাসি দেখা যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর মুখেই৷

কারণ, ভারতে বিজেপির উত্থানের একটা ঐতিহাসিক কারণ যদি হয় তাদের কট্টর হিন্দুত্ববাদী নীতি, তাহলে অন্য কারণ অবশ্যই কংগ্রেস ও অন্যান্য তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মুসলিমতোষণ নীতি৷ স্বাধীনতার আগে থেকেই এই দ্বিচারিতা চলেছে, ক্রমশ যার সুযোগ নিয়ে নিজেদের সমর্থন বাড়িয়েছে বিজেপি৷ আর তাদের অন্য হাতে আছে সার্বিক উন্নয়নের নীতি যার সুবাদে নরেন্দ্র মোদীর মুখ্যমন্ত্রিত্বে গুজরাটে ভয়াবহ মুসলিমনিধন সত্ত্বেও বিজেপির ক্ষমতায় থাকা আটকানো যায়নি৷ আজকের পশ্চিমবঙ্গেও মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ উঠছে, যার প্রতিক্রিয়ায় রাজ্যজুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে৷

জনমতের এই হিন্দুয়ায়ন যারা আটকাতে পারত, সেই বামপন্থিরা পশ্চিমবঙ্গে এখন কার্যত ক্ষমতাহীন, জনমানসের সঙ্গে সম্পর্ক বিযুক্ত৷ ফলে সামাজিক স্তরে হিন্দুত্ববাদী, মুসলিমবিদ্বেষী ভাবনাচিন্তার প্রসার রুখে দেওয়ার কেউ নেই৷ অন্যদিকে সরকারি স্তরে যাই-ই করা হোক না কেন, প্রকারান্তরে সেটাকেও মুসলিমপ্রীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে৷ যেমন কিছুদিন আগেই রাজ্যে ১২৫টি স্কুলকে শিক্ষা দপ্তর নোটিস ধরিয়েছে, সেসব স্কুলে হিন্দু ভাবধারার প্রচার হচ্ছে, এই অভিযোগে৷ কিন্তু এই ধরনের সরকারি পদক্ষেপের উল্টো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে৷ এবং আরএসএসের মতো কট্টরবাদী সংগঠন সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আরও ইন্ধন জোগাচ্ছে৷

Porträt - Sirsho Bandopadhyay

শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা প্রতিনিধি

সদ্য শেষ হওয়া উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়কে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই সুনামির সঙ্গে তুলনা করছেন৷ এক বিরাট, ব্যাপক জলোচ্ছ্বাস, যা ভারতের সবথেকে জনবহুল রাজ্যটিতে অন্য সবকটি রাজনৈতিক দলকে কার্যত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে৷ মুলায়ম সিং-অখিলেশ সিংয়ের সমাজবাদী পার্টি, মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির মতো জোরদার রাজনৈতিক সংগঠন, কংগ্রেসের মতো দেশের সবথেকে পুরনো, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিয়েছে৷ এবং সংবাদমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছে যে এই বিরাট জয় যতটা না বিজেপির, তার থেকে অনেক বেশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগ্রাসী নীতির এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ-র সাংগঠনিক দক্ষতার৷ নরেন্দ্র মোদী মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন বিধানসভা এবং লোকসভার আসনসংখ্যার হিসেবে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যটির নির্বাচনের আগে বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে৷

৫০০ এবং ১০০০ টাকার পুরনো নোট বাতিলের ওই সিদ্ধান্ত, ব্যাঙ্ক লেনদেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিধি-নিষেধের কারণে সাধারণ মানুষের বিস্তর অসুবিধে হয়েছে৷ বিশেষত খুচরো ব্যবসায়ীদের৷ তা সত্ত্বেও তাঁরা ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে৷ এই ঘটনা ঘটেছে উত্তর প্রদেশে, এবং মুম্বইয়ের সাম্প্রতিক পুরভোটে৷ কিন্তু এখানেই শেষ নয়৷ উত্তর প্রদেশে মুসলিম ভোটও পেয়েছেন মোদী৷ এই প্রথম সে রাজ্যের মুসলিম-প্রধান এলাকায় একজনও মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করায়নি বিজেপি এবং তার পরেও ভোট পেয়েছে৷ সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর উন্নয়নের কর্মসূচি ভোট টেনেছে, যে ঘটনা ঘটেছে দলিত ভোটের ক্ষেত্রেও৷ মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির ভোটব্যাংকে এভাবেই ধস নামিয়েছে বিজেপি এবং কার্যত আঞ্চলিক দলগুলিকে উন্নয়নের প্রশ্নে গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন৷

এই পরিপ্রেক্ষিতে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিমুদ্রায়ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন৷ মমতা ব্যানার্জি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ চড়া সুর অনেকটাই নরম করে বলেছেন, গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা বলে৷ আশা করা যায় কেন্দ্র এবং রাজ্যের সমীকরণ ঠিক থাকবে!‌