উদ্বাস্তু সংকট ইউরোপীয় আকার ধারণ করছে

ইউরোপীয় কমিশন ফ্রান্স এবং ব্রিটেনকে চ্যানেল টানেলে উদ্বাস্তু সংকটের মোকাবিলায় সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে৷ ফ্রান্সকে বিশ মিলিয়ন ইউরো দেওয়া হচ্ছে৷ ব্রিটেনকে পেয়েছে ২৭ মিলিয়ন৷

পুলিশ জানাচ্ছে, মঙ্গলবার রাত্রেও ক্যালের কাছে চ্যানেল টানেল সাইটে ৫০০ উদ্বাস্তুকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে৷ ইতিপূর্বে প্রায় ৬০০ উদ্বাস্তু সাইটে ঢোকার চেষ্টা করে৷ তাদের মধ্যে চারশ'কে রোখা সম্ভব হয়৷ বাকি দুশো'র মধ্যে ১৮০ জনকে সাইটের ভিতরে ধরে বহিষ্কার করা হয়৷ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়৷

ইউরোপীয় কমিশনের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্র কমিশনার দিমিত্রিস আভ্রামোপুলোস জানিয়েছেন, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের জন্য অভিবাসন সংক্রান্ত খাতে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল অবধি যে ২৬৬ মিলিয়ন, যথাক্রমে ৩৭০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করা আছে, এই আর্থিক সাহায্য তা থেকেই আসছে৷

উদ্বাস্তুদের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তির আবেদন পরীক্ষা করার কাজে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা ফ্রন্টেক্স সাহায্য করতে পারে, বলে ইউরোপীয় কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে৷ উদ্বাস্তুদের রেজিস্ট্রি করা, তারা যে সব দেশ থেকে আসছে এবং যে সব দেশ দিয়ে গেছে, সেই সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের পাসপোর্ট অথবা বিদেশযাত্রার অন্য কাগজপত্রের ব্যবস্থা করা, উদ্বাস্তুদের ফেরত পাঠানো, এ সব ক্ষেত্রে কমিশন আর্থিকভাবেও সাহায্য করতে প্রস্তুত, বলে ঘোষণা করেছেন আভ্রামোপুলোস৷

কাঁটাতারের বেড়া

ফ্রান্স টানেলের কাছে পুলিশ বাড়িয়েছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপর প্রান্তে চলতি উদ্বাস্তু সংকটের ইউরোপীয় মাত্রা আরো স্পষ্ট৷ প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার প্রধানত আফগান বা সিরীয় উদ্বাস্তু জঙ্গলের পথে সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করছে৷ পুলিশ তাদের নথিবদ্ধ করে আবার ছেড়ে দিচ্ছে, যাতে তারা কোনো অ্যাসাইলাম সেন্টারে গিয়ে নাম লেখাতে পারে৷ কিন্তু অধিকাংশ উদ্বাস্তুই একবার শেঙেন চুক্তি এলাকায় ঢুকে পড়ার পরে পশ্চিমের সমৃদ্ধ দেশগুলির দিকে যাত্রা করছে৷

উদ্বাস্তুদের কাছে হাঙ্গেরি একটা ট্রানজিট রুট ছাড়া কিছু নয়৷ তা সত্ত্বেও হাঙ্গেরি এ সপ্তাহে সার্বিয়ার সঙ্গে তার ১৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শুরু করেছে৷ এছাড়া রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তির নিয়মকানুন আরো কড়া করা হয়েছে, যাতে শীঘ্র বহিষ্কার করা সম্ভব হয়৷ অপরদিকে হাঙ্গেরি অপরাপর ইইউ দেশ থেকে উদ্বাস্তুদের ফেরৎ নিতেও অস্বীকার করছে, যদিও তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মাবলীর অঙ্গ৷

যদি হয় সুজন, তেঁতুলপাতায় ন'জন

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

প্রাণে বাঁচা

২০শে এপ্রিল, ২০১৫: একটি ছোট পালের নৌকা গ্রিসের রোডোস দ্বীপের কাছে চড়ায় আটকালে সীমান্তরক্ষী আর স্থানীয় মানুষেরা বেশ কিছু উদ্বাস্তুকে উদ্ধার করেন৷ তা সত্ত্বেও এই দুর্ঘটনায় তিনজন উদ্বাস্তু জলে ডুবে মারা যান৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

সীমান্তরক্ষীদের ডিঙিতে

১৩ই এপ্রিল, ২০১৫: উদ্বাস্তুরা কোস্ট গার্ডের ইনফ্ল্যাটেবল বোটে চড়ে সিসিলি-র একটি বন্দরে পৌঁছচ্ছে৷ সীমান্তরক্ষীরা লিবিয়ার উপকূলে একটি ডোবা নৌকা দেখতে পেয়ে ১৪৪ জন উদ্বাস্তুকে উদ্ধার করেন – এবং যুগপৎ ন’টি মৃতদেহকে সাগরের জলে ভাসতে দেখেন৷ আবহাওয়া ভালো থাকায় এপ্রিলের শুরু থেকে উদ্বাস্তুরা আরো বেশি সংখ্যায় আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইউরোপে আসার চেষ্টা করছে৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

বাহন

১২ই এপ্রিল, ২০১৫: ওপিয়েলক অফশোর ক্যারিয়ার কোম্পানির ‘জাগুয়ার’ নামধারী মালবাহী জাহাজের অতি কাছে ডুবে যায় একটি উদ্বাস্তু বোট৷ এই কোম্পানির জাহাজগুলি গত ডিসেম্বর মাস যাবৎ দেড় হাজারের বেশি উদ্বাস্তুকে সমুদ্রবক্ষ থেকে উদ্ধার করেছে৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

হাঁটাপথে

২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫: পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা উদ্বাস্তুরা ম্যাসিডোনিয়া সীমান্তের দিকে হেঁটে চলেছেন৷ আশা, এইভাবে ‘খিড়কির দরজা’ দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ – যদিও সে প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

ব্রিটেন যাওয়ার শেষ পন্থা

১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৪: ফ্রান্সের ক্যালে বন্দর-শহরের কাছের হাইওয়েতে ব্রিটেনগামী লরিতে ওঠার সুযোগের অপেক্ষায় উদ্বাস্তুরা৷ সে আমলে ক্যালে-র পাঁচ-পাঁচটি বেআইনি ক্যাম্পে প্লাস্টিকের ঝুপড়িতে বাস করছিল তিন থেকে পাঁচ হাজার উদ্বাস্তু, শুধুমাত্র ইংল্যান্ড যাবার আশায়৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

‘সেভ আওয়ার সোলস’

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪: ভূমধ্যসাগরে সাইপ্রাসের কাছে একটি শরণার্থী নৌকা বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর পর সাগরে ভাসতে থাকে – ৩০০ উদ্বাস্তু নিয়ে৷

প্রাণের মায়া না করে ইউরোপে আসার প্রচেষ্টা

যারা কোনো বাধা মানে না

১৭ই মে, ২০১৪: আফ্রিকান উদ্বাস্তুরা মরক্কোর উপকূলে স্পেনের এক্সক্লেভ মেলিলা-র চারপাশের উঁচু তারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করছে৷ প্রায় ৫০০ মানুষ সীমান্ত পার হবার চেষ্টা করে, তাদের মধ্যে জনা ত্রিশেক সফলও হয়, কিন্তু পরে তাদের আবার মরক্কোয় ফেরৎ পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷

জার্মানিতে ইতিমধ্যেই আগত উদ্বাস্তুদের জন্য আবাসের স্থান একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে পৌর প্রশাসনগুলির জন্য৷ কাজেই যে সব উদ্বাস্তুর রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম – যেমন বলকান দেশগুলি থেকে আগত মানুষজন – তাদের আলাদা করে রেখে দু'সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অ্যাসাইলাম অ্যাপ্লিকেশনগুলির নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব উঠেছে, যেমন স্যাক্সনি ও বাভারিয়া রাজ্যে৷

বিভিন্ন ছোট-বড় জার্মান শহরের পৌর কর্তৃপক্ষ উদ্বাস্তু ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী সংক্রান্ত বিভিন্ন শিবির তথা কার্যালয়ের জন্য কর্মী নিয়োগ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন৷ প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজকর্মী, এমনকি চিকিৎসক, স্বল্প সময়ের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পাওয়া অথবা তাদের নিয়োগ দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়৷ সেই সঙ্গে থাকছে অর্থসংস্থানের প্রশ্ন

অপরদিকে ফেডারাল গুপ্তচর বিভাগ উদ্বাস্তু শিবির ও আবাসনগুলির উপর আক্রমণের ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলায় চিন্তিত৷ ২০১৪ সালে এই ধরনের আগুন লাগানো থেকে শুরু করে ভাঙচুর বা পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ২০১৩'র তুলনায় তিনগুণ বাড়ে৷ ২০১৫ সালে নাকি তাও ছাড়িয়ে যাবে৷

এসি/এসবি (রয়টার্স, এএফপি)

আমাদের অনুসরণ করুন