উৎসব আসছে, তাই উদ্বিগ্ন ও সতর্ক জার্মানি

অভিবাসীদের ঘিরে উদ্বেগ ও সতর্কতার বাতাবরণ৷ কার্নিভাল শুরুর আগে এমনই ইঙ্গিত৷ ডানপন্থি এক নেত্রী মনে করেন, সীমান্তে প্রয়োজনে পুলিশকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ওপর গুলি চালানোর অনুমতিও দিতে হবে৷ এ নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক৷

৩১ ডিসেম্বর রাতের ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি৷ এক হাজারের মতো নারীর যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার রহস্যের কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ৷ অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করার কাজে অগ্রগতিও খুব উল্লেখযোগ্য নয়৷ এমন এক অবস্থাতেই আবার বড় এক গণজমায়েতের প্রস্তুতি নিচ্ছে কোলন৷

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে কার্নিভাল৷ এ উৎসবে সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্বে এবার থাকছে আড়াই হাজার পুলিশ৷ সংখ্যাটি গত বছরের তিনগুণ৷ নিরাপত্তা বাজেটও এবার বাড়িয়ে ৩ লক্ষ ৬০ হাজার ইউরো করা হয়েছে৷

কার্নিভালে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসন প্রত্যাশীদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে৷ জার্মানরা কীভাবে এ উৎসব উদযাপন করে, বিয়ার বা অন্য ধরনের অ্যালকোহল পান যে এ উৎসবের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, উৎসবের সময় নারীর অনুমতি সাপেক্ষে পুরুষ যে ঘনিষ্ঠ হয়েও শুভেচ্ছা জানাতে পারে, জোর করে ঘনিষ্ঠ হতে যাওয়া যে যৌন হয়রানির শামিল – এ সব বোঝানোর জন্য নেয়া হচ্ছে নানান উদ্যোগ৷

জার্মানি মনে করে, এখানকার শিক্ষা, সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের মূল ধারার জার্মানদের সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়াটা খুব জরুরি৷

জার্মানির শ্রম মন্ত্রী বলেছেন, অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিজেদের স্বার্থেও জার্মানদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার জন্য ভাষা শেখা, সংস্কৃতিকে জেনে তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো – এ সব চেষ্টা করা উচিত৷ তিনি বলেছেন, অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে যাঁরা জার্মান সমাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো নিতে অনীহা প্রকাশ করবেন, তাঁদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কমানোর কথা ভেবে দেখা হবে৷

জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, সিরিয়া এবং ইরাকে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় যাঁরা জার্মানিতে এসেছেন, তাঁদের জার্মানিতে স্থায়ী না হওয়াই ভালো৷ ম্যার্কেল আশা করছেন, যুদ্ধ শেষ হলে সিরীয় এবং ইরাকিরা নিজেদের দেশে ফিরে যাবেন৷

শরণার্থী সংকট সমাধানে ম্যার্কেলের উদারনীতি বহির্বিশ্বে খুব প্রশংসিত হলেও, জার্মানিতে পরিস্থিতি অনেকটা উল্টো৷ এই ইস্যুতে এ মুহূর্তে চাপের মুখেই আছেন ম্যার্কেল৷ অন্যদিকে অভিবাসীবিরোধী ডানপন্থিদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে৷ এক জরিপে দেখা গেছে, এ মুহূর্তে কমপক্ষে ১৩ শতাংশ জার্মান ডানপন্থি দল এএফডি-কে সমর্থন করছে৷ অলটারনেটিভ ফর জার্মানি, সংক্ষেপে এএফডি নামের দলটি অভিবাসন ইস্যুতে খুবই কট্টর৷ সম্প্রতি দলটির নেত্রী ফ্রাউকে পেট্রি বলেছেন, জোর করে কেউ সীমান্ত অতিক্রম করতে চাইলে তাকে গুলি করার অনুমতি পুলিশকে দেয়া উচিত৷ দলের অন্যান্য নেতারা তাঁকে সমর্থন করলেও জার্মানির অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং পুলিশ এর বিরোধিতা করেছে৷ এক বিবৃতিতে জার্মান পুলিশ ইউনিয়ন জানিয়েছে, ‘পুলিশ অভিবানস প্রত্যাশীদের ওপর গুলি চালাতে প্রস্তুত নয়৷'

সব মিলিয়ে অভিবাসন ইস্যু নিয়ে এক ধরণের সংকটকালই পার করছে জার্মানি৷ বিষয়টি নিয়ে ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদক আলেক্সান্ডার কুডাশেফও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন৷ তাঁর মতে, অভিবাস ইস্যুতে এখন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি জার্মান সমাজ৷

সংকলন: আশীষ চক্রবর্ত্তী

সম্পাদনা: দেবারতি গুহ

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

‘বিশ্বাসঘাতক’ ম্যার্কেল

জার্মানির ইসলাম ও অভিবাসী বিরোধী গোষ্ঠী পেগিডার হাজার হাজার সমর্থক সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে৷ শরণার্থীদের প্রতি নরম মনোভাবের কারণ তারা ম্যার্কেলের বিরুদ্ধে ‘উচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘জার্মানির মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীদের নিয়ে কটূক্তি

পেগিডার (প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ান অ্যাগেনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অফ দ্য অক্সিডেন্ট) প্রতিষ্ঠাতা লুটৎস বাখমান সম্প্রতি শরণার্থীদের ‘পশু’, ‘আবর্জনা’ ও ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ বলে আখ্যায়িত করেন৷ এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

সমাজে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়

সোমবার বিক্ষোভের সময় বাখমান বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা দেড় কিংবা দুই মিলিয়নেই থেমে থাকবে না৷ এরপর আসবে তাদের স্ত্রী; আসবে এক, দুই কিংবা তিন সন্তান৷ ফলে এতগুলো লোকের জার্মান সমাজে অন্তর্ভুক্তির কাজ অসম্ভব হয়ে পড়বে৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

জার্মান সরকারের অস্বীকার

জার্মানির জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বিল্ড’ সরকারের গোপন ডকুমেন্টের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছর জার্মানিতে প্রায় দেড় মিলিয়ন শরণার্থী আসবে বলে মনে করছে সরকার৷ যদিও প্রকাশ্যে সরকার বলছে সংখ্যাটা এক মিলিয়ন হতে পারে৷ তবে জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র এ ধরনের কোনো গোপন ডকুমেন্টের কথা তিনি জানেন না বলে সাংবাদিকদের বলেছেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীর মৃত্যু

জার্মানির পূর্বাঞ্চলের এক শরণার্থীদের বাসস্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইরিত্রিয়া থেকে আসা ২৯ বছরের এক শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে৷ অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি৷ এদিকে, জার্মান সরকারের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর শরণার্থী ও তাদের বাসস্থানের উপর হামলার সংখ্যা বেড়েছে৷ এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরকম ২০২টি ঘটনা ঘটেছে বলে সরকার জানিয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ১৯৮৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

বিপদে ম্যার্কেল

শরণার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণের কারণে নিজ দল সহ অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদদের তোপের মুখে পড়েছেন ম্যার্কেল৷ তাঁরা জার্মানির শরণার্থী নীতি ও শরণার্থীদের আগমনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চ্যান্সেলরকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

আমাদের অনুসরণ করুন