একটু খাবারের জন্য আবর্জনা ঘাঁটছে সিরিয়ার গৃহহীন শিশুরা

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি শরণার্থী শিবিরের শিশুরা খাবারের জন্য আবর্জনার স্তূপ ঘাঁটছে৷ উদ্দেশ্য– বিক্রি করার মতো কোনো জিনিস পেলে তা বেচে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার কেনা৷

এমনই এক কিশোর সাবা আল জসিম প্রতিদিন একটা ছিপ নিয়ে আবর্জনার স্তূপে যায়৷ ছিপের আগায় লোহার টুকরো লাগানো থাকে৷ সেটা দিয়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বাছাই করে৷ এগুলো বিক্রি করে কয়েক ডলার পায়৷ আর তা দিয়েই ১১ সদস্যের পরিবারের খাওয়া জোটে৷

সংবাদ সংস্থা এএফপিকে সে জানায়, ‘‘আমি আমার পরিবারকে সহায়তা করার জন্য এই কাজ করি৷ প্রতিদিন দুই ব্যাগ প্লাস্টিক সংগ্রহের চেষ্টা করি৷'' সিরিয়ায় ৮ বছর ধরে চলে আসা গৃহযুদ্ধের ফলে সাবা'র মতো অনেক শিশুই গৃহহীন৷ তারা স্কুলে যেতে পারে না৷ সাবা'র বাবা ভীষণ অসুস্থ৷ মা-ও চলাফেরা করতে অক্ষম৷ বড় ভাই পঙ্গু৷ ফলে বাকি ভাই-বোনরা এই আবর্জনা ঘেঁটেই সংসার চালায়৷

ওদের কী অপরাধ?

যুদ্ধের খেসারত

তথাকথিত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে ইরাকের সামরিক বাহিনীর টানা যুদ্ধের পর মোসুলের অনেকাংশই জঙ্গিদের হাতছাড়া হয়েছে৷ কিন্তু যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে সেখানকার শিশুরা৷ বিশেষ করে যুদ্ধ চলাকালে যাদের জন্ম, তাদের অধিকাংশই তীব্র অপুষ্টির শিকার৷ ছবিতে ছয়মাস বয়সি মেয়ে শিশু নওরশ রাইদের হাত ধরে আছেন ‘মেডেসিন্স স্যান ফ্রন্টিয়াস’ (এমএসএফ)-এর এক নার্স৷

ওদের কী অপরাধ?

চাচির কোলে নাওয়াফ

আট বছর বয়সি দুয়া নাওয়াফকে এমএসএফ-এর হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন তাঁর চাচি৷ গতমাসে মোসুলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় নাওয়াফের বাবামাসহ একশ’রও বেশি মানুষ নিহত হন৷ তার মাথা ও হাত পুড়ে গেছে সেই হামলায়৷ নাওয়াফের মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ বিশেষ করে রাতের বেলা প্রচণ্ড আতঙ্কে ভোগে সে৷

ওদের কী অপরাধ?

ওজন কম

ইরাকের কাউজারায় এমএসএফ পরিচালিত এক হাসপাতালে ইরাকি এক শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন এক চিকিৎসক৷ হাসপাতালের অধিকাংশ শিশুই অপুষ্টির শিকার এবং তাদের ওজন বয়স অনুপাতে অনেক কম৷ ইরাকে মায়েরা সাধারণত শিশুদের বুকের দুধ পান করান না৷ বরং ফর্মুলা মিল্ক পান করান তারা৷ এখন যুদ্ধের কারণে সেই দুধের সংকট তীব্র৷ আর মায়েরা চাইলেও সন্তানদের দুধ পান করাতে পারছেন না, কেননা, তারা নিজেরাও খাদ্য সঙ্কটে ভুগছেন৷

ওদের কী অপরাধ?

বোনের সঙ্গে খেলা

পাঁচ বছর বয়সি আয়হাম আহমেদ৷ সে কিছুদিন আগে মোসুলে এক বিস্ফোরণে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে আহত হয়েছিল৷ এখন সে হাসপাতালে বোনের সঙ্গে খেলছে৷ এমএসএফ-এর হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৫ বছরের নীচে৷ আর সেখানকার শিশু পরিচর্যা ইউনিটে ভিড় এত বেশি যে, প্রতি বিছানায় দু’জন করে রোগী রাখতে হচ্ছে৷ সংশ্লিষ্ট এলাকায় শিশু বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে৷

ওদের কী অপরাধ?

‘ইরাকে এটা নতুন’

হাসপাতালে এক শিশু কাঁদছে৷ সে অপুষ্টির কারণে এত দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে গেছে৷ এমএসএফ-এর প্রকল্প সমন্বয়ক ইসাবেলা লিগাল বলেন, ‘‘ইরাকের শিশুদের এমন অবস্থা নতুন৷ ইরাকের অধিকাংশ চিকিৎসকই অতীতে এতটা অপুষ্টির শিকার শিশু দেখেনি৷’’

ওদের কী অপরাধ?

আইএস-এর কারণে

হাসপাতালে আসা এক মা অভিযোগ করে বলেন, আইএস-এর কারণে তাদের এত করুণ অবস্থা হয়েছে যে, শিশুদের চিনিমিশ্রিত পানি, দই বা পানিতে মেশানো ময়দা ছাড়া আর কিছু খাওয়াতে পারছেন না৷ ইরাকি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে শহরটি খাবার পরিবহণ অনেক কমে গেছে৷

ওদের কী অপরাধ?

আর কতদিন?

এমএসএফ-এর হাসপাতালে এক শিশুকে পরীক্ষা করছেন চিকিৎসক৷ সেখানে ভর্তি হওয়া শিশুদের অনেকের শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়ার সমস্যা রয়েছে৷ এছাড়া নানা ভাইরাসেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা৷ প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধের কারণে তাদের এমন ভোগান্তি আর কতদিন চলবে?

সিরিয়ার ইদলিবের এই অংশে অন্তত ৩০ লাখ মানুষের বাস৷ তাদের মধ্যে অর্ধেকই গৃহযুদ্ধের কারণে ঘর ছেড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে৷ বেশিরভাগ মানুষই ত্রাণের উপর নির্ভরশীল৷ কিন্তু কাফর লাসিনে সাবা'র মতো ৫০টি পরিবার যেখানে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানে ত্রাণ পৌঁছে না৷ ফলে এসব পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই আবর্জনা বিক্রি করে সংসার চালায়৷

তাদের একজন জানালো, প্লাস্টিকের আবর্জনা বিক্রি করে দিনে এক হাজার সিরিয়ান পাউন্ড বা ২ মার্কিন ডলার আয় হয়৷ এই অর্থ দিয়ে রুটি, আলু, সবজি কেনা গেলেও মাংস জোটে না তাদের কপালে৷

সাবা'র বাবা জানালেন, ‘‘যখন সন্তানরা আবর্জনার খোঁজে যায়, তখন নিজেকে খুব ছোট আর অসহায় লাগে৷ কিন্তু ওরা যদি এই কাজটা না করে তবে, আমাদের না খেয়ে মরতে হবে৷''

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, ‘‘সিরিয়ার ৬৫ লাখ মানুষ খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে না৷'' ৮ বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে৷ গৃহহীন হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ৷

এপিবি/এসিবি (এপি, এএফপি)

আমাদের অনুসরণ করুন