একেই বলে শিক্ষা দেওয়া – নাকি শিক্ষা পাওয়া?

তিন কি চার বছরের একটি মেয়ে ইংরেজি ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর আওড়াতে গিয়ে মায়ের কাছে বকা ও শেষ পর্যন্ত চড় খাচ্ছে৷ এক মিনিট ন'সেকেন্ডের একটি খাঁটি উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি৷

হিন্দুস্থান টাইমস-এর খবর অনুযায়ী মেয়েটি নাকি গায়ক তোশি সাব্রির বোনঝি৷ সাব্রি অবশ্য বলেছেন, এই ভিডিও দেখে তাঁর বোনের সন্তান প্রতিপালনের ক্ষমতা সম্পর্কে কোনো ধারণা করা উচিত নয়৷

খাতা খুলে ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর আওড়াচ্ছে মেয়েটি – আর ভুল করছে৷ মায়ের গলায় ঠিক সেইরকম শাসানির সুর, যা আমরা সকলেই জানি ও চিনি৷ এর পরের পর্যায়ই হলো চড়চাপড় বা কানমোলা, গোটা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে যা অনন্তকাল ধরে চলে আসছে৷

আমার চেনা এক মা বলতেন, ‘‘পিঠ সুড় সুড় করছে?'' ইমেজটা ইন্টারেস্টিং, কেননা সংশ্লিষ্ট ছেলেটির সত্যিই পিঠ সুড় সুড় করত, যেন তার সারা শরীর বুঝতে পারত, এবার গুম করে কিলটি পড়বে...৷ কাজেই ছেলেটি আরো ভয় পেয়ে আরো বেশি ভুল করত, ভিডিও-র মেয়েটি যেমন করছে৷

আমাদের যা অবাক করা উচিত, তা এই মেয়েটির কান্না নয়, মার খাওয়া নয়, এমনকি তার রাগ পর্যন্ত নয়৷ আমাদের আশ্চর্য হওয়া উচিত, ঐটুকু মেয়ে কখনো হাত জোড় করে, কখনো দাঁত কিড়মিড় করে, কখনো রাগের সঙ্গে কান্না আর কান্নার সঙ্গে রাগ মিশিয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছে – এ দুনিয়া যে কঠিন ঠাঁই, সেটা যেন সে এই বয়সেই বুঝে ফেলেছে আর ছোটদের – বা বড়দের – যা কিছু অস্ত্র, সব ব্যবহার করে সে তার ছোট্ট সত্তাটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে৷

মনোযোগ বাড়াতে চান ?

‘‘যখন নিজেকে ক্লান্ত মনে হবে বা যথেষ্ট মনোযোগ নেই পড়াশোনায়, তখন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে তা মনে রাখা সহজ হয়৷’’ টেক্সাসের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ৩০০ ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে করা এক সমীক্ষার ফলাফল থেকে এই তথ্য জানা গেছে৷ যারা দাঁড়িয়ে পড়াশোনা করেছিলো, তাদের মনোযোগ ছিলো অনেক বেশি – যারা বসে পড়াশোনা করেছিলো তাদের তুলনায়৷ তাছাড়া বন্ধুদের সাথে পড়াশোনা বা আলোচনা করলেও বেশি মনে থাকে অনেকের৷

দায়িত্ববোধ

ছোটবেলা থেকেই যারা অস্থির প্রকৃতির হয়, পড়াশোনা বা অন্য কিছুতেও তেমন আগ্রহ নেই বা মন বসাতে পারেনা – তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছুটা ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে৷ অর্থাৎ শিশু বা ছাত্র-ছাত্রীকে কোনো পোষা প্রাণী কিনে দেয়া যেতে পারে৷ ছোট ভাই-বোনের খানিকটা দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে, যাতে করে ওরা কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারে, আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে৷ কারণ আত্মবিশ্বাসই পড়াশোনায় মনোযোগ এনে দেবে৷

ছাত্র-ছাত্রীদের চাই ভিটামিন ফুড

পড়ুয়াদের যে যথেষ্ট ভিটামিন দরকার সে কথা আর কে না জানে? তবে শুধু জানা নয়, তা কার্যে পরিণত করতে হবে৷ তাই ছাত্র-ছাত্রীদের চাই যথেষ্ট ভিটামিন, মিনারেল এবং পানীয় – অর্থাৎ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার৷ প্রধান খাবারের ফাঁকে ফাঁকে আপেল খাওয়া যেতে পারে, যাতে মিনারেল, আয়রন এবং প্রচুর ভিটামিন রয়েছে৷ জার্মানরা প্রচুর আপেল খায়, মনোযোগ ঠিক রাখতে জার্মানির কোন কোনো স্কুলের টিফিনে আপেল খেতে দেয়া হয়৷

ব্রেনের খাবার

বিভিন্ন বাদাম – বিশেষ করে আখরোট, সামুদ্রিক মাছ, শাক-সবজি, ফল, গ্রিন- টিসহ বিভিন্ন চা৷ যা শরীর এবং মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী৷ পড়াশোনার মাঝে পাকা টমেটো বা টমেটোর জুসও খাওয়া যেতে পারে৷ কারণ মাত্র ১০০ গ্রাম টমেটোতে আছে ২৫ গ্রাম ভিটামিন ‘সি’ এবং পটাশিয়াম৷ কাজেই পান করতে পারেন ছাত্র-ছাত্রীরা টমেটোর জুস বা অন্য কোন ফল বা সবজির রসও৷

ফাস্টফুড!

ফাস্টফুডে ব্যবহার করা হয় নানা রকম রাসায়নিক উপাদান, যা অনেকের ক্ষেত্রেই অ্যালার্জির কারণ হয়ে থাকে এবং যা মনোযোগ এবং শরীরে তার প্রভাব ফেলে৷ জার্মানির খাদ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়ুর্গেন শ্লুইটারের মতে, ‘‘দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে ভুক্তভোগী অনেকেই সেকথা জানতে বা বুঝতে পারে না৷’’ আজকের তরুণদের প্রিয় খাবার ফাস্টফুড এবং মিষ্টি পানীয় হলেও শরীর ও মস্তিষ্কের কথা মনে রেখে সে সব থেকে কিছুটা সাবধান হওয়া উচিত৷

ব্রেনের বিশ্রাম

আজকাল দেখা যায় অনেকে পড়ার ফাঁকে একটু বিশ্রামের জন্য ফেসবুকে ঢোকেন বা গেম খেলেন, যাতে আসলে মোটেই বিশ্রাম হয় না৷ তার চেয়ে বরং কর্মক্ষমতা বাড়ায় সেরকম ছোট এক টুকরো ডার্ক চকলেট মুখে দিয়ে পছন্দের গান শুনতে পারেন৷ অথবা বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেন৷ সোজা কথা মনোযোগটাকে কিছুক্ষণের জন্য অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া৷ এতে করে মাথাটা খালি তো হবেই এবং পড়াশোনায়ও মনোযোগ ফিরে আসবে৷

খেলাধুলা বা ব্যায়াম

গবেষকরা মনে করেন, শারীরিক পরিশ্রম অর্থাৎ খেলাধুলা বা ব্যায়াম যে কোনো মানুষকে যে কোনো চাপ থেকে সহজে মুক্তি দিতে সাহায্য করে৷ ব্যায়াম বা খেলাধুলা করার ফলে শরীরে হরমোনের প্রকাশ ঘটে কিছুটা অন্যভাবে৷ আর স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়ে মনোযোগেও৷

এই অসহায়তার সঙ্গে জুটেছে এক চাপা প্রতিরোধ, যা আর কোনো পথ না পেলে ব্যঙ্গ হয়ে ফুটে বেরোয়: তাই চার বছরের মেয়ে বার বার একটা সংখ্যা নিয়ে ভুল করলে, মা যখন ক্রমেই আরো বেশি রেগে যাচ্ছেন, তখন সে বলছে ওটা থ্রি, নাকি ফোর? সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হুঙ্কার, তাই বেচারি একবার বলছে ফাইভ – মা আবার ফুঁসে উঠলে বলছে, ‘কুছ ভি নহি হ্যায়', ওটা কিছু নয়, ওটা কোনো সংখ্যাই নয়৷

এরকম অ্যাবসার্ড ড্রামা বেকেট লিখতে পারতেন কিনা সন্দেহ৷ আমি এই মেয়েটির অস্তিত্ববাদী, কিম্ভুত রসবোধ দেখে মুগ্ধ৷ বিরাট কোহলি থেকে শুরু করে যুবরাজ সিং-এর মতো ক্রিকেটাররা সোশ্যাল মিডিয়াতোলপাড় করছেন এই কচি কমিক প্রতিভাটির দুর্দশা নিয়ে: আমি তাদের নিশ্চিন্ত থাকতে বলব৷

এ মেয়ে ইংরেজিতে আঁক কষতে পারুক আর নাই পারুক, এ হলো আসল ডেস্টিনিজ চাইল্ড, এ হলো আসল সার্ভাইভার – এ আমাদের উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিকে গুলে খেয়েছে, রোমিলা থাপারের মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা উচিত৷

এসি/এসিবি

ফিরিয়ে দাও শৈশব

দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মূলমন্ত্র হলো প্রতিযোগিতা৷ একেবারে ছোট বয়স থেকেই তাই চাপের শেষ নেই৷ পড়াশোনা, নাচগান, আঁকা, শরীরচর্চা, খেলাধুলা – সব কিছুতেই সেরা হয়ে ওঠার জন্য শিশুদের উপর চাপ দেওয়া হয়৷ এর পরিণাম কি ভালো হতে পারে?

সন্তান পালনে পেশাদারি সাহায্য

অন্য সব বিষয়ের মতো সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও পুরানো অনেক ধ্যানধারণা আজ অচল হয়ে পড়েছে৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীরা জার্মানিতে বাবা-মায়েদের এই কাজে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেন৷ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তিতে তারা সন্তান পালন সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দেন৷ স্বাস্থ্য বিমা সংস্থাই ধাত্রীর পারিশ্রমিক দেয়৷

বাবা-মা একটু সময় দিলে

জন্মের পর শিশুর জন্য বাবা-মায়ের স্পর্শ, তাদের আদর-ভালোবাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু তাদের অত সময় আছে কি? জার্মানিতে নানা মডেলের আওতায় বাবা-মা প্রথম বছরে সন্তানের সঙ্গে অনেক সময় কাটানোর সুযোগ পান৷ রাষ্ট্র ও কর্মদাতা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য সেই ব্যবস্থা করে দেয়৷

পুঁথিগত শিক্ষার প্রস্তুতি

এক থেকে দুই বছর বয়সের মধ্যে জার্মানির শিশুরা সাধারণত কিন্ডারগার্টেনে যাবার সুযোগ পায়৷ কিন্তু সেখানে পুঁথিগত শিক্ষা নিষিদ্ধ৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের কাছ থেকে খেলাচ্ছলে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নানারকম শিক্ষা পায় কচিকাচারা৷ স্কুলে যাবার আগে এই প্রস্তুতি তাদের খুব কাজে লাগে৷

প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মবোধ

ঢাকা-কলকাতার মতো শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে অনেক শিশু সহজে মাটির সংস্পর্শে আসতে পারে না৷ জার্মানিতে শিশুদের প্রকৃতির কোলে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়৷ এমনকি কিছু এলাকায় জঙ্গলের মধ্যেই কিন্ডারগার্টেন রয়েছে৷ গাছপালা ও নানা প্রাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হয় তাদের৷

স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক

সাধারণত ৬ বছর বয়সে স্কুলে যায় জার্মানির বাচ্চারা৷ তখনই পড়াশোনা শুরু হয়৷ প্রাথমিক স্কুলশিক্ষা বাধ্যতামূলক৷ স্কুলে আলাদা ইউনিফর্ম নেই৷ প্রথম দিনে কচিকাচাদের উপহারে ভরা এক বিশেষ ঠোঙা দেওয়ার রেওয়াজ আছে৷

পড়ার চাপ

স্কুলের পড়াশোনা স্কুলেই শেখানোর চেষ্টা করা হয়৷ বাড়িতে ফিরে কিছু হোমওয়ার্ক করলেই চলে৷ সাধারণত গৃহশিক্ষক বা কোচিং ক্লাসের প্রয়োজন পড়ে না৷ তবে কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা দূর করতে বাড়তি সাহায্যের ব্যবস্থা রয়েছে৷ শিক্ষা রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের আওতায় পড়ে বলে জার্মানিতে অনেক সংস্কার আটকে আছে বলে নানা মহলে অভিযোগ ওঠে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়