‘এখন লোকজ গানের আরও আধুনিক কম্পোজিশন করা হচ্ছে’

লালনের গান গেয়ে ‘ক্লোজআপ ওয়ান-’এর মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন সালমা৷ এখন লালনের গানের পাশাপাশি আরও অনেক ধরনের গানই করছেন৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে লোকসংগীতের বর্তমান-ভবিষ্যতের বাইরেও অনেক বিষয় উঠে এসেছে তাঁর কথায়৷

ডয়চে ভেলে: সালমা, এই মূহুর্তে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন? আপনার গান কেমন চলছে?

সালমা: অনেক কাজই করছি৷ শাহ আব্দুল করিমের গান করলাম সম্প্রতি৷ মাত্র এক মাসে ১২ লাখ দর্শক শ্রোতা ইউটিউবে গানটি শুনেছেন৷ এর বাইরে এখনকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু হিপহপ গান করেছি৷ অনেকে ডিজে পছন্দ করে, সেটিও করেছি৷ আর ফোক গান তো আছেই৷ আধুনিক ফোক৷ পাশাপাশি স্টেজ শো, টেলিভিশনে লাইভ গানের অনুষ্ঠান করছি৷ আগামী মাসে ইংল্যাণ্ড যাচ্ছি, চারটি স্টেজ শো করতে৷ এই তো, এইসব নিয়ে আছি৷

আমরা যদি একটু শুরুর দিকে যাই, ক্লোজআপ ওয়ান আপনাকে প্রথম পরিচিতি এনে দেয়৷ সেসময় লালনের গান করে আপনি মাতিয়ে দিয়েছিলেন৷ লালনের গান আপনি কেন বেছে নিলেন?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

যেহেতু আমি লালনের দেশ কুষ্টিয়ার মেয়ে, কাজেই তাঁর গান শুনেছি ছোট থেকেই৷ আর সাঁইজির গান তো অন্য রকম৷ তাঁর কোনো একটি বানীও যদি সাধারণ কেউ দিনে একবার পড়েন, তাহলে তার পক্ষে কোনো অন্যায় করা সম্ভব হবে না৷

যে গানের মাধ্যমে আমি নিজে শান্তি পাই, একটু হলেও মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন আনা যায় বা পরপারের কথা ভাবা যায়, সেই গান করতে পারাটা ভাগ্যের বিষয়৷ আর আমি যেহেতু দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছি, এটি তারই অংশ বলতে পারেন৷ 

লোকজ গান তাহলে আপনার প্রধান আকর্ষণের জায়গা ৷এর বাইরে অন্যান্য গানও চালিয়ে যেতে চান?

গান যেহেতু গাইতে পারি, আমার ভিত যেহেতু মজবুত এবং আমার ওস্তাদ যেসব জিনিস শিখিয়েছেন, সেগুলো যেহেতু আমার ভেতরে আছে, সেজন্য আমি সব গান গাইতে পারি৷ কিন্তু আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি লালনের গানে৷

গানের চর্চা আগে যেভাবে করার সুযোগ পেতেন ,এখনও কী পান?

এখন তো অনেক বেশি করতে হয়, অনেক দায়িত্ব এখন৷ নিজের বাচ্চা আছে৷ আগে তো নিজেই বাচ্চা ছিলাম৷ স্কুলে যাওয়া আর রেওয়াজ করা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না৷ এখন তা নয়৷ তারপরও প্রতিদিনের জন্য যতটুকু চর্চা দরকার, আমি চেষ্টা করি করতে৷

কেবল লোকজ গানে স্থির না থেকে অন্য গানও করার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

ভালোবাসার জায়গাটা কোনো ক্ষেত্রেই আমি মিস করতে চাই না৷ যারা সাঁইজির গান পছন্দ করেন না, তারা কিন্তু আমাকে পছন্দ করবেন না৷ একটা বাড়ি করতে যেমন মজবুত ভিত লাগে, আমার সেই ভিত আছে৷ কাজেই আমি সবই করতে পারি৷ ছোট থাকতে আমার ওস্তাদ আমাকে দিয়ে রবীন্দ্র, নজরুল, লালন সবই চেষ্টা করেছেন৷ এরপর যখন আধুনিক গান করলাম ‘তুমি আসবে নাকি' শিরোনামে, সেটিও শ্রোতারা ভালোভাবেই নিল৷ আমার ঘর থাকবে৷ আমি ফোকের বাইরে ওভাবে যাব না৷ কিন্তু আমাকে তো দুনিয়া দেখতে হবে৷ শ্রোতাদের কথা ভেবে ও নিজের সন্তুষ্টির জন্য সব কিছুই করতে চাই৷ এই কণ্ঠও তো আমার সব সময় থাকবে না৷

লোকজ গান করার আগ্রহ তরুণদের মধ্যে কেমন দেখেন?

একটা সময় ছিল যখন এদেশে প্রচুর হিন্দি গান বাজতো৷ ওপার বাংলার গান বাজতো৷ এখন তা নয়৷ এ দেশের গান এখন সবাই অনেক শোনে৷ পাশের দেশে যখন কোনো অনুষ্ঠান করতে যাই, তখন দেখি কেবল অন্যের গান গাইলে দশর্ক খুশি হয় না৷ নিজের কিছু লাগে৷ একটা ফোক গান ধরলে মানুষ অনেক পছন্দ করে৷ দেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে আমার নিজের সত্ত্বা দিয়ে সৃষ্টি কিছু দিতেই হবে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভাটিয়ালী

বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের জনপ্রিয় গান ভাটিয়ালী৷ নদ-নদীতে পূর্ণ ময়মনসিংহ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর-পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলোতেই ভাটিয়ালী গানের মূল সৃষ্টি, চর্চাস্থল৷ ভাটিয়ালী গানের মূল বৈশিষ্টা হলো, এ গান রচিত হয় মূলত মাঝি, নৌকা, দাঁড়, গুন বিষয়ে৷ নদীতে কারও সাথে যোগাযোগে লম্বা টান দিয়ে দিয়ে কথা বলতে হয়৷ এই গানেও তাই এ ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে’ একটি বিখ্যাত ভাটিয়ালী গান৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভাওয়াইয়া

উত্তরবঙ্গের লোকগীতি ভাওয়াইয়া৷ উত্তরবঙ্গে নদী-নালা অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম থাকায় যাতায়াতের মূল বাহন ছিল গরুর গাড়ি৷ দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি কাটাতে গাড়োয়ানদের ভরসা ছিল বিশেষ ঢংয়ের এই গান৷ উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তায় চলার সময় গাড়িয়ালের গলায় যে ভাঁজ পড়তো, তা এখন এই গানের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’, ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই ইত্যাদি এই ধারার বিখ্যাত গান৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাউল গান

ধারণা করা হয়, সতেরো শতকে বাউল সম্প্রদায়ের সাথেই বাউল গানের জন্ম৷ কিন্তু এই ধারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে লালন সাঁইয়ের মাধ্যমে, উনিশ শতক থেকে৷ ধারণা করা হয়, লালন প্রায় দু'হাজারের মতcf গান রচনা করেছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বাউল গান দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গম্ভীরা

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে, বিশেষকরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গম্ভীরার প্রচলন রয়েছে৷ ধারণা করা হয় যে, গম্ভীরার প্রচলন হয়েছে শিবপূজাকে কেন্দ্র করে৷ তবে পরবর্তীতে গম্ভীরা সর্বস্তরের মানুষের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে৷ এখন এই গানে সামাজিক নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে সমাধানও দেওয়া হয়৷ গম্ভীরার মুখ্য চরিত্র হিসেবে নানা-নাতি খুবই জনপ্রিয়৷ আঞ্চলিক ভাষায় নানা ও নাতির সংলাপ ও গানের মধ্য দিয়ে এই গান পরিবেশন করা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যাত্রাপালা

যাত্রা এক ধরনের লোকনাট্য ধারা৷ সাধারণত নানা ধরনের ইতিহাসধর্মী গল্পের আশ্রয় নিয়ে দীর্ঘ এই নাটক উপস্থাপন করা হয় দর্শকদের সামনে৷ তবে উপস্থাপনা, মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা, সংলাপ, সবকিছু মিলিয়ে মঞ্চনাটকের চেয়ে একেবারেই আলাদা যাত্রাপালা৷ যাত্রা পালার বিবেকের গান, বা অন্যান্য গানও উপস্থাপনভঙ্গী এবং সুর-কথা মিলিয়ে বাংলা সংস্কৃতিতে করে নিয়েছে আলাদা স্থান৷

নিজস্ব গানের চর্চা থেকে কী ইদানিং একটু সরে গেছেন আপনি?

না৷ আমি একদম সরে যাইনি৷ এই গানগুলো করার আগে আমি সাঁইজির অ্যালবাম করেছি ‘অনুরাগের ঘরে'৷ এর মাঝখানে আমি বিচ্ছেদ, মডার্ণ ফোকসহ আরও কিছু গান করি৷ তারপর আমি শ্রোতাদের সামনে ভিন্ন কিছু গান নিয়ে আসি৷ আমি যদি ওই ট্র্যাক থেকে একেবারেই বের হয়ে আলাদা হয়ে যেতাম, তাহরে এই অভিযোগ করা যেতো৷ আমি মনে করি, আমি আমার জায়গা ঠিক রেখে এসব করছি৷ 

আপনি তরুণদের জন্য হিপহপ করছেন, আবার লোকজও করছেন, কেবল শ্রোতাদের কথা ভেবে তাহলে?

দুটিই মাথায় থাকে৷ একজন শিল্পী বেঁচে থাকে স্টেজ শো করে, কার,ণ আয়-রোজগারের বিষয় আছে৷ স্টেজে যদি শুধু অন্যের গান গাইলে হবে না৷ আবার সব ধরনের করলেই মানুষ বেশি পছন্দও করবে

রোজগারের কথা যেহেতু এলো,কাজেই অ্যালবাম করার ক্ষেত্রে বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে কী  প্রয়োজকদের ওপর নির্ভন করতে হয় যে তারা যা চাইবেন সেটিই গাইতে হবে অথবা লালনের গান গাইতে নিরুৎসাহিত করা হয়, এমন কিছু?

না৷ এখন আমরা অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করি৷ শুরুর দিকে খানিকটা নির্ভর করতে হতো৷ এখন ডিজিটাল যুগে আমি নিজের গান প্রচারের পর দেখতে পাই কত দর্শক তা পছন্দ করলো৷ কাজেই আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছি৷ 

লোকজ গান হারিয়ে যাচ্ছে -এই কথার সাথে আপনি কতটা একমত?

আমার এটা মনে হয় না৷ এখন আরও ভালোভাবে আধুনিক কম্পোজিশন করা হচ্ছে৷ আসলে আমরা বলার জন্য অনেক কিছু বলে ফেলি৷ কিন্তু কাজের কাজটা করি না৷

আমাদের লোকজ সঙ্গীতকে ধরে রাখতে কী কী করা দরকার বলে মনে করেন?

এই ইন্ডাস্ট্রিতে যারা আছেন, সবাই একসাথে কাজ করছি৷ আমাদের সিনিয়রদের কাছ থেকে আমরা শিখেছি৷ মাথায় যদি চলে আসে আমি হিট হতে চাই, আমি অনেক কিছু পারি, তখনই কিন্তু সেই জায়গা থেকে আমরা সরে যাই৷ নিজের জায়গা, গানটাকে ভালোবাসতে হবে৷ আমি সালমা একা পারব না৷ পুরো ইণ্ডাস্ট্রিকে চেষ্টা করতে হবে৷ আমাকে যেহেতু ফোক শিল্পী হিসেবে ধরা হয়, কাজেই আমার দায়িত্বটুকু আমি অবশ্যই পালনের চেষ্টা করব৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷