‘এসপিডি দলের ৫০ বছর পূর্তি পালন’

জার্মানির সামাজিক গণতন্ত্রী দলের ১৫০ বছর পূর্তির ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদনটি ছিল খুবই তথ্যপূর্ণ৷ এই ১৫০তম বছরটি এস পি ডি দলের কাছে আরও তাত্পর্যপূর্ণ৷

কারণ এই বছরের সাধারণ নির্বাচনে পেয়ার স্টাইনব্রুকের নেতৃত্বে দলটির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে৷

শ্রমিকের দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে যে দল আজ জনগণের দল বলে পরিচিত, ২০১৩ এর জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে সেই দল কতটা সফল হবে তা শুধু সময়ের অপেক্ষা৷

‘পাখির চোখে বার্লিন' এবং বার্লিনের আনন্দমেলা- কার্নেভাল অব কালচার এর উপর তথ্য সহ সুন্দর ছবির উপস্থাপনা দেখে ভালো লাগলো৷ পাখির চোখে বার্লিন পরিবেশনে ‘ব্রান্ডেনবুর্গ গেট', বার্লিন প্রাচীর', ঐতিহাসিক রাইখস্ট্যাগ ভবন, ‘আলেকজান্ডারপ্লাতস্', হলোকাস্ট মেমোরিয়াল সহ আরও উল্লেখযোগ্য স্থানের সংযোজন করা হলে ছবিঘরটি পূর্ণতা পেত৷

ভালো লেগেছে জার্মানির কোলন শহরের একটি অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী কয়েকজন ইতিবাচক চিন্তার ধারক প্রবীণের জীবনযাত্রা নিয়ে তৈরি গল্প গাঁথা৷ জানতে পারলাম জার্মানির প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবন- যাত্রা সম্পর্কে৷ নতুন দিল্লি থেকে পাঠক বন্ধু সুভাষ চক্রবর্তী পাঠানো কেকটি ই-মেল থেকে আজ দুটো ই-মেল এখানে তুলে দেয়া হলো৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

স্বাস্থ্য সচেতন ও ইতিবাচক চিন্তার মানুষ

প্রতিদিনের নাস্তায় অবশ্যই থাকে তাজা ফলের রস, রুটি, কফি ইত্যাদি৷ জো প্রতিদিন বাজারে যায়, লক্ষ্য তাজা ফল, সালাদ কেনা ছাড়াও বাড়ির বাইরে বের হওয়া এবং আশেপাশের লোকজনের খোঁজখবর রাখা৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

রিটা এবং জো

আসল নাম মার্গারিটা৷ তবে আদর করে সবাই তাঁকে ডাকে রিটা নামে৷ আর তাঁর স্বামী ইউসেফকে ডাকে জো৷ এই দম্পতি অবসর জীবনেও থাকেন হাসিখুশি আর নানা কাজ নিয়ে ব্যস্ত৷ তরুণ বয়সে ইংল্যান্ড, অ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়াতে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছেন৷ কোলন শহরের নামি দামি এলাকায় বহু বছর ছিল তাঁদের গহনার দোকান৷ আজকের এই অবস্থানে আসতে দু’জনে মিলে প্রচুর খেটেছেন৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

হ্যাপি আওয়ার

জো এর বয়স ৮০৷ নিজ হাতে তৈরি করা বাড়ির সামনের সাজানো বাগানে গরমকালে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বসেন৷ আর অপেক্ষায় থাকেন তাদেরই মতো আরো কয়েকজনের জন্য৷ এঁরা মনে করেন, শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য শুধু ভালো খাবার আর নিয়মিত চেকআপই যথেষ্ট নয়, চাই ভালো বন্ধুবান্ধব আর হাসিতামাশা৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

মিলে মিশে থাকা

এই এলাকার প্রায় ৫০টি বাংলো বাড়ির কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর মালিক কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন৷ অর্থাৎ তাদের বয়স ৬৫’র ওপর৷ এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিয়মিত এই আড্ডায় যোগ দেন, করেন খানিকটা মদ্যপান৷ এই অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকোশলী ও চাকরিজীবীদের আলোচনার বিষয় পারিবারিক সুখ-দুঃখ থেকে বিশ্বের চলমান রাজনীতি পর্যন্ত৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

রিটার দিন শুরু

দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে তাঁর বয়স ৭৫৷ সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে তাঁর দিনের শুরু৷ সবসময়ই ফিটফাট থাকেন৷ কি করে সম্ভব জানতে চাইলে বলেন, পুরনো অভ্যাস৷ একসময় তিনি নিজেদের ব্যবসা, দুটো সন্তান মানুষ করা এবং সংসারের সমস্ত কাজসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতেন৷ এই দম্পতির মতে জীবনে ‘ডিসিপ্লিন’ খুব বড় ব্যাপার৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

সকালের নাস্তা

প্রতিদিনের নাস্তায় অবশ্যই থাকে তাজা ফলের রস, রুটি, কফি ইত্যাদি৷ জো প্রতিদিন বাজারে যায়, লক্ষ্য তাজা ফল, সালাদ কেনা ছাড়াও বাড়ির বাইরে বের হওয়া এবং আশেপাশের লোকজনের খোঁজখবর রাখা৷ কোন প্রতিবেশীর কি দরকার, কে ছুটিতে গেছে বা কোনো নতুন প্রতিবেশী এসেছে কিনা সব খবরই থাকে জো’র কাছে – যার দিনের অনেকটা সময় কাটে বাগান করে৷ আর হ্যাঁ, সপ্তাহে দু’দিন নিয়ম করে স্ত্রীর জন্য ফুল কিনতে ভুল হয়না তাঁর৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

হাসিখুশি মারিয়ানা

পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক৷ স্বামী মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে৷ নিজের গাছের যত্ন ছাড়াও প্রতিবেশীদেরও প্রয়োজনে নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ শীতকালে এই প্রবীণ গ্রুপের ‘হ্যাপি আওয়ার’ আড্ডা বন্ধ থাকে বলে তখন বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, কোনো থিয়েটার বা কনসার্টে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন মারিয়ানা৷ উদ্দেশ্য একসাথে আনন্দ করা৷ তাঁর মতে সুস্থ থাকতে চাইলে ভাবের আদান-প্রদান খুবই জরুরি৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

চাই মুক্ত বাতাস আর হাঁটাহাঁটি

শরীর ঠিক রাখতে হাঁটাহাঁটি আর ফুসফুস ঠিক রাখতে মুক্ত বাতাস সেবন করেন প্রবীণরা৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানদের আজকের এই অবস্থানে আসতে কত কষ্ট করতে হয়েছে তাঁরা তা খুব ভালোভাবেই জানেন৷ তাঁদের অনেকেরই তখন ঠিকমতো খাবার বা থাকার জায়গা ছিল না৷ অথচ এসব কথা এই প্রজন্মের জার্মানরা বুঝতে বা জানতে চায়না – একথা মাঝেমধ্যেই দুঃখ করে বলেন প্রবীণরা৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

বয়স কোনো বাধা নয়

এঁদের বয়স ৬৫ থেকে ৮৩ পর্যন্ত৷ সবাই নিজে গাড়ি চালান এবং পছন্দ করেন চালাতে৷ প্রায় সবাই কম্পিউটার চালাতে অভ্যস্ত৷ ছেলে-মেয়ে বা নাতি-নাতনির সাথে ইমেল বা ফেসবুকেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন৷ তাঁরা বলেন, ‘সময়ের সাথে কিছুটা তাল মিলিয়ে চলা মানেই ব্রেনের সেলগুলোকে সজাগ রাখা৷’

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

অসুখকে গুরুত্ব দিলেও মন খারাপ করেন না

বয়সের সাথে অসুখের সম্পর্ক নিবিড়, যা খুবই স্বাভাবিক৷ তাই বলে মন খারাপ নয়৷ অসুখের সময়ও এই প্রবীণ দল একে অন্যের দেখাশোনা করেন৷ ৭৮ বয়সি হান্সের ডায়াবেটিস খুব বেশি৷ কদিন আগে তিনি বাড়ির কাছেই তাঁর অত্যাধুনিক মডেলের ‘আউডি’ গাড়িটি অন্য একটি গাড়ির সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছিলেন৷ তাই এখন মেয়ে বলে দিয়েছে যে, তাঁর ‘গাড়ি চালানো বন্ধ’ – এ কথাই সেদিন হান্স ছলছল চোখে প্রবীণ বন্ধুদের বলছিলেন৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

গান বাজনা

হস্ট অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার৷ শখ অ্যাকোর্ডিয়ান বাজানো আর ছবি আঁকা৷ প্রতিবেশীদের জন্মদিন বা কোনো উপলক্ষ্য হলেই হাতে তুলে নেন অ্যাকোর্ডিয়ান আর তালে তালে নেচে ওঠেন অন্যরাও৷ মজার ব্যাপার হলো, জন্মদিনের দাওয়াত দেবার সময় এঁরা বলে দেন, ‘‘কোনো উপহার নয়, আনন্দ ফুর্তি করার জন্য ‘মন’ নিয়ে এসো৷’’

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

আনন্দ আর ধরেনা

এরকম হালকা আনন্দই বেচে থাকার প্রেরণা যোগায়

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

পোশাককর্মীদের নিয়ে চিন্তা

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব খবরই তাঁরা রাখেন৷ সম্প্রতি বাংলাদেশের পোশাক কারখানা রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার খবরে তারা খুবই বিচলিত৷ পোশাক কর্মীদের বেতন অবশ্যই বাড়ানো উচিত বলে তাঁরা মনে করেন৷ তাঁদের মতে পোশাক প্রতি ১ ইউরো বেশি দেওয়া জার্মানদের পক্ষে মোটেই কঠিন নয়৷ তাই তাঁরা এর আশু সমাধান কামনা করছেন৷

জার্মানির কোলন শহরে প্রবীণদের জীবনযাত্রা

তরুণদের প্রতি পরামর্শ

তরুণ বয়সই কাজ করার উপযুক্ত সময়, তাই নিজের বুদ্ধি আর শক্তিকে কাজে লাগাও৷ নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলো এবং ইতিবাচক চিন্তা করো৷ ছোট বড় সবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাখো, প্রয়োজনে সাহায্য করো৷ জীবনে সমস্যা আসবেই, মোকাবেলা করো৷ সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগাও, সাফল্য আসবেই আসবে৷ তরুণ বয়সে খাটলেই কেবল প্রবীণ বয়সে ভালো থাকা সম্ভব৷

ইউরোপে চরম বেকারত্ব ও মন্দা – কথাটা শুনতেই যেন কেমন লাগে৷ এই চিত্র যদি ইউরোপের মতন উন্নতশীল অঞ্চলে দেখা যায়, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলির কী অবস্থা হতে পারে? ইউরোপের দেশগুলিতে এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে কি?

সুন্দর ছবিতে সাজানো বার্লিনের আনন্দমেলা দেখে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো৷ কী আনন্দই না পেতাম, যদি এক বার এই রঙীন কার্নিভাল স্বচক্ষে দেখতে পেতাম! না, এ জীবনে যে তা হবার

নয়৷ ডয়চে ভেলেই একমাত্র ভরসা আমার কাছে৷ যেটুকু আগে জানা ছিলো না, তবু তাও তো এখন জানতে পারছি, তাই বা কম কী? প্রণাম নেবেন, ইতি দীনেশ কুমার, গুলমোহর পার্ক, নতুন দিল্লি থেকে৷

-ধন্যবাদ দু'জনকে৷ অন্য বন্ধুরাও লিখবেন, কেমন৷

সংকলন: নুরুননাহার সাত্তার

সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন

আমাদের অনুসরণ করুন