এ ইউরোপ সে ইউরোপ নয়

গরিব দেশ থেকে যে সব মানুষ ধনি দেশে আসার চেষ্টা করেন, তারা মরিয়া৷ চরম হতাশার হাত থেকে তারা পালিয়ে বাঁচতে চান৷ কিন্তু যে স্বর্গে তারা পৌঁছাবেন বলে মনে করছেন, সেই স্বর্গ যদি ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকে?

১৯৭৯ সালে প্রথম জার্মানিতে আসি৷ তখন ভারতে খালিস্তান আন্দোলনের ফলে শিখ ধর্মালম্বীরা জার্মানিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে শুরু করেছেন৷ পরে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধের সময় তামিলরা আসতে শুরু করেন৷ তখনো পর্যন্ত যেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগটাই বেশি ছিল৷

আজ যদি বলি যে, রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির তাড়নাই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, তাহলে স্বভাবতই অনেকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা সোমালিয়ার মতো দেশের দৃষ্টান্ত দেবেন – এবং তাতে ভুলেরও কিছু নেই৷ ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যেতে পারে: রাজনীতির বিপত্তি এড়াতে মানুষ যখন অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবে, তখন সেই ভিনদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনেতিক সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা, সে কথাটাও তারা ভেবে দেখে বৈকি৷

উদ্বাস্তু সংকট, অভিবাসন, দেশ ছাড়া, এ সবের পিছনে হাজারটা মানবিক কাহিনি, সহস্র মানবিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে রয়েছে৷ আর রয়েছে মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি: নিজের এবং নিজের পরিবারের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর প্রচেষ্টা৷ ইউরোপের সব দেশই ভিয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী, ইউরোপের সব দেশেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা যায়৷ তবুও জার্মানি কিংবা সুইডেনে যেতে পারা একটা আলাদা ব্যাপার৷ 

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

তিন ধরনের সুরক্ষা

শরণার্থী, হিউম্যানিটারিয়ান ও সাবসিডিয়ারি – এই তিন ক্যাটাগরিতে আশ্রয় দেয়া হয়ে থাকে৷ যাঁরা শরণার্থী স্ট্যাটাসের যোগ্য নন, কিন্তু দেশে ফিরে গেলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের সাবসিডিয়ারি সুরক্ষা দেয়া হয়৷ আর অসুস্থতা ও অভিভাবকহীন শিশুদের মানবিক (হিউম্যানিটারিয়ান) বিবেচনায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৭

বাংলাদেশি নাগরিকদের পক্ষ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গতবছর ১৬,০৯৫টি আশ্রয়ের আবেদন পড়েছে৷ আর একই সময়ে বাংলাদেশিদের করা ২,৮৩৫টি আবেদন সফল হয়েছে৷ শতকরা হিসেবে সেটি ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ৷ জার্মানিতে আবেদন পড়েছে ২,৭২৫টি৷ সফল হয়েছে ৩১৫টি৷ এমনিভাবে অন্য কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান এরকম – যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,৬৩০; সফল ৬৫), ইটালি (আবেদন ৫,৭৭৫; সফল ১,৮৮৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৪,১১৫; সফল ৪৪০)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৬

বাংলাদেশিরা ১৪,০৮৫টি আবেদন করেছেন৷ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে ২,৩৬৫টি৷ অর্থাৎ সফলতার হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৬৬৫; সফল ১১০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,৪০৫; সফল ৮০), ইটালি (আবেদন ৬,২২৫; সফল ১,৬১০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৪,১১০; সফল ৪৪০)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৫

সেবছর সফলতার হার ছিল ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ৷ আবেদন পড়েছিল ১১,২৫০টি৷ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ১,৭৮৫টি৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ২৬৫; সফল ৩৫), যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,০১৫; সফল ১২০), ইটালি (আবেদন ৫,০১০; সফল ১,২২৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৫৬০; সফল ৩১৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৪

আবেদন ৭,৫৮০টি৷ সফল ৭৮৫৷ শতকরা হার ১০ দশমিক ৩৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪৬৫; সফল ৫০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৭০০; সফল ৭৫), ইটালি (আবেদন ৭৩৫; সফল ৩১৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৮৭০; সফল ২৬৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৩

সফলতার হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ৷ আবেদন ৮,৩৩৫৷ সফল ৫৯৫৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ২৫০; সফল ২০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৮৩০; সফল ৫৫), ইটালি (আবেদন ৫৯০; সফল ৩০০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৬১৫; সফল ১৪৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১২

সফলতার হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১৯০; সফল ১০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৮০০; সফল ৫০), ইটালি (আবেদন ১,৪১০; সফল ১,০৪৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৭৫৫; সফল ৮৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১১

সফলতার হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১১০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৪৮০; সফল ৪০), ইটালি (আবেদন ৮৬৫; সফল ৬৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৭৭০; সফল ৪৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১০

সফলতার হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১০৫; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৪৬০; সফল ৫৫), ইটালি (আবেদন ২১৫; সফল ৪০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ২,৪১০; সফল ২৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০০৯

সফলতার হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৩৭৫; সফল ৪৫), ইটালি (আবেদন ৮৮৫; সফল ৮৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ১,৭৮০; সফল ৩৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০০৮

সফলতার হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৩৯৫; সফল ৯৫), ইটালি (আবেদন ৯৫০; সফল ৫০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ১,৬৬০; সফল ৩৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

৩২ দেশের হিসাব

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ সদস্যরাষ্ট্র এবং ‘ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা ইএফটিএ-এর অন্তর্ভুক্ত আইসল্যান্ড, লিখটেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউরোস্ট্যাট৷ আরও পরিসংখ্যান জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

ইউরোপ চলো!

‘পলিটিক্যাল করেক্টনেস' মাথায় রেখে যদি ভাই-বেরাদারদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, তাহলে বলতে হয় যে, ইউরোপে আসব বললেই তো আর ইউরোপে আসা যায় না৷ অমুক ভাই বাড়িঘর, জমিজেরাত বেচে, কোন এক দালালকে টাকা দিয়ে, তুর্কি হয়ে, রাবারের ডিঙিতে সাগর পেরিয়ে গ্রিসের লেসবসে পৌঁছে – সেখানেই ফেঁসে গেছেন – বা গিয়েছিলেন৷ এবার নাকি তাকে ডাঙার রাস্তা ধরে উত্তরে নিয়ে যাচ্ছে আরেক সম্বন্ধি, তিনিও কিছু কম নেন না৷

তমুক ভাই তো গ্রিসের পথ না ধরে, মিশর হয়ে লিবিয়া গিয়ে, সেখান থেকে ইটালিতে পৌঁছেছেন৷ সেখানকার ভাইরা জার্মানের খবর জানেন – তারা বলছেন, এহানেই থাইক্যা যান৷ জার্মানি তো আর সে জার্মানি নাই, ইউরোপও আর সে ইউরোপ নাই৷ যেখানে কাজকর্ম আছে, মাথা গোঁজার জায়গা আছে, সেখানে যাহোক করে দিন কাটিয়ে দেন৷ দেখবেন ইটালিতে আমাগো দ্যাশের লোক আফ্রিকার মানুষজনের চেয়ে বেশি কদর পায়, তাড়াতাড়ি কাম পায়, কি দোকানপাট কিছু একটা খুলে বসে৷ এ দেশে আইন কিছুটা ঢিলেঢালা৷ জার্মানিতে অ্যাসাইলামদের দেয় বেশি, তবে নজরও রাখে বেশি৷ আর শুনেছেন তো, অদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি এবার সেন্টার খুইল্যা সেখানে ডিপোর্টেশনের কেসগুলিকে রাখব৷ কাগজ না থাকলে নাকি যে দেশের লোক, সে দেশের কাছে কাগজ তলব করব, কাগজ না দিলে উন্নয়ন সাহায্য কমাইয়া দিব৷

এ সব কিছুর খানিকটা শোনা, খানিকটা জানা, বাকিটা কল্পনা – কিন্তু পুরোটাই কেমন যেন সত্য৷ উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসীদের চেয়ে বাস্তববাদী আর কেউ নেই৷ দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতেই যেখানে বুকের পাটা লাগে, সেখানে রবাহুত, অনাহুত হিসেবে বিদেশে যাওয়া, ভিসা ছাড়া পরের দেশে ঢোকা, ধৈর্য্যে বুক বেঁধে সুদিনের অপেক্ষা করার জন্য কতোটা বুকের পাটা লাগে, একবার ভেবে দেখুন৷

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

স্বর্গ হতে বিদায়

তাই আমার এই সাহসী ভাইদের আমি শুধু বিচার করে দেখতে বলব: ইউরোপে হাওয়া যে বদলাচ্ছে, খোদ ইউরোপ যে বদলাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ ব্রেক্সিট, গোটা ইউরোপ জুড়ে দক্ষিণপন্থি, জাতীয়তাবাদী পপুলিস্টদের পালে হাওয়া, এ সব ভালো লক্ষণ নয় – কিন্তু স্বাভাবিক, যেমন জোয়ারের পর ভাটা৷ আমার মন বলছে, ইউরোপ এবার ঘরে আগল দেবে; ইউরোপ আর আগের মতো বিদেশি-বহিরাগতদের সাদরে, সস্নেহে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করবে, ইউরোপের মনে যেন কোথায় শঙ্কা ঢুকে গেছে৷

বদান্যতা কোনো মানুষ কিংবা জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, তা আসে অবস্থা ও পরিস্থিতি থেকে৷ ঔপনিবেশিক ইউরোপের মতোই উদার ইউরোপ, দরাজ ইউরোপের দিন যেতে বসেছে৷ এ অবস্থায় যারা দেশঘর ছেড়ে এ মুলুকে আসবেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এককালে ইউরোপ আসাটা ছিল বুড়ি ছোঁয়ার মতো, একবার পৌঁছতে পারলেই নিশ্চিন্দি৷ এখন কিন্তু জার্মানিতে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি হলো ‘ব়্যুকফ্যুহরুং', যার অর্থ প্রত্যাবর্তন বা ফেরত পাঠানো৷

স্বর্গে আসা খুবই কষ্টের, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে আসতে হয়৷ তবে তার চেয়েও বেশি কষ্ট কীসে জানেন? স্বর্গ থেকে বিদায় নেওয়া৷ ঈশ্বর করুন তা যেন কারো ভাগ্যে না জোটে৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন