কর্তৃত্ববাদের বিস্তারে সংকুচিত মানবাধিকার

২০১৮ সালটি শুরু হয়েছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে৷ জানুয়ারিতে চিরবৈরী উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সম্প্রীতির আবহ তৈরি হয়৷ এই বন্ধুপ্রতিম প্রবণতা দেশ দুটি অব্যাহত রাখে সারা বছর৷

আর গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরে মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, যা ছিল বিশ্ববাসীর জন্য চমক৷ তবে একে অপরের চক্ষুশূল এই দুই দেশের মোলাকাত তেমন কোনো ফল বয়ে আনেনি৷ তা সত্ত্বেও এই বৈঠককে গত বছরের অন্যতম ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া চলে৷ এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চরম সংকট কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে৷

তবে মার্চের শুরুতে ইতালিতে উগ্র ডানপন্থিদের বিপুল বিজয় শরণার্থী-অভিবাসী সম্প্রদায়সহ মহাদেশীয় উদার গণতন্ত্রীদের মধ্যে আশঙ্কার জন্ম দেয়৷ রাশিয়ায় মার্চে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুটিন আরেক দফা নির্বাচিত হন৷ একই মাসে চীনের শি জিনপিং সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করে নেন৷

মে মাসের শুরুতে ট্রাম্প আরো বড় খবরের জন্ম দেন ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে৷ এটি ছিল তাঁর অ্যামেরিকা ফার্স্ট' নীতির প্রতিফলন৷ একই মাসে ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়া হয় জেরুসালেমে৷ এর ফলে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিরোধ আরো তীব্রতা পায় এবং ট্রাম্প যথারীতি সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখেন৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

বিধ্বংসী আগুন

জানুয়ারি মাসে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির কিজিজি বস্তিতে আগুন লাগে৷ ছয় হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহারা হন, মারা যান অনেকে৷বিধ্বংসী এ আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

অ্যামেরিকায় নাৎসি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শার্লটসভিলে বাড়ছে অতি-ডানপন্থি কার্যকলাপ৷ এমন প্রবণতাই ধরা পড়ে আগস্ট মাসে তোলা এই ছবিতে৷ সেখানকার নিও-নাৎসি সংগঠন ন্যাশনাল সোশালিস্ট মুভমেন্ট (এনএসএম)-এর সদস্যদের দেখা যাচ্ছে ওপরের ছবিতে৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

এত কাছে, তবু কত দূরে...

দুই কোরিয়ার সম্পর্ক আগের তুলনায় এখন অনেকটাই স্বাভাবিক৷ তবুও, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু গবেষণা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাব্যথার শেষ নেই৷ অসামরিক অঞ্চলের সীমান্তের দুই দিক থেকে একে অপরের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রনেতা কিম জং-উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি মুন জায়-ইন৷ ২০১৯-এ সম্পর্ক কি আরো উন্নত হবে?

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন!

২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার পর ফ্রান্স দলের উচ্ছ্বাসের একটি মুহূর্ত ধরা পড়েছে ওপরের ছবিতে৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

খরার কবলে জার্মানি

জার্মানিতে ২০১৮ সালের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘হাইস সাইট’, অর্থাৎ ‘উষ্ণ সময়’৷ এর কারণ হিসাবে বিজ্ঞানীরা বলছেন বাড়তে থাকা তাপমাত্রার কথা, যার ফলে জার্মানিতে একের পর এক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে৷ ওপরের ছবিটি রাইন নদীর একটি অংশের৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

স্বস্তির আলিঙ্গন

ডেনমার্কে প্রকাশ্যে নিকাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে নিকাব পরে পথে নামেন এক নারী৷ গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে আরেক নারী পুলিশকর্মী তাঁকে জড়িয়ে ধরেন৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

তিনি একা...

আঙ্গেলা ম্যার্কেল’কে বাদ দিলে এ বছর পশ্চিমা দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত নারী নেত্রী ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে৷ তাঁর নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে চলেছে যুক্তরাজ্য৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

সুনামিতে তছনছ

এ বছর সেপ্টেম্বরে ভয়ানক সুনামিতে আক্রান্ত হয় ইন্দোনেশিয়া৷ প্রাণ হারান অন্তত ২,০০০ মানুষ৷ সুনামিতে সব হারিয়ে ফেলা এক মহিলাকে দেখা যাচ্ছে ওপরের ছবিতে৷ তাঁর শেষ সম্বল শুধুই পুতুল আর এক বালতি কাপড়৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

ফিলিস্তিন সরগরম

ইজরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব কোনো নতুন ঘটনা নয়৷ কিন্তু পশ্চিম তীরের পাশে নাবলুসের একটি স্কুল বন্ধ করে দেবার ফলে এ বছর নতুন করে দানা বাধে সংঘর্ষ৷ সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনতার পারস্পরিক ক্ষোভের একটি মুহূর্ত বন্দি করেছে ওপরের ছবিটি৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

গন্তব্য অ্যামেরিকা

এ বছরের অন্যতম আলোচিত খবর ছিল মধ্য আমেরিকা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া লাখো শরণার্থীর ভিড়৷ স্থলপথে শুধু নয়, গুয়াতেমালা ও মেক্সিকো হয়ে বয়া সুচিয়াতে নদী দিয়েও শরণার্থীরা এসেছেন মার্কিন সীমান্তে৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

ট্রাম্প ও সংবাদমাধ্যম

নভেম্বর মাসের ছয় তারিখ খবরের শিরোনামে উঠে আসেন মার্কিন সংবাদসংস্থা সিএনএন-এর সাংবাদিক জিম আকোস্টা৷ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বাকবিতণ্ডার ফলে সাময়িকভাবে আকোস্টার ‘হোয়াইট হাউস পাস’ বাতিল হলেও পরে তা আবার চালু করা হয়৷ এই প্রেক্ষিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে বর্তমান অ্যামেরিকায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

স্বর্গে হুলস্থুল!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বংসী দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় গোটা প্যারাডাইস শহর৷ ভয়াবহ এই দাবানলের কোপে ব্যাপক সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারান ৮৫জন৷

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

ইয়েমেনে বিপন্ন মানবতা

২০১৪ সাল থেকেই ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে৷ কিন্তু ২০১৮ সালে এই যুদ্ধের ফলে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ৷ গবেষণায় জানা গেছে, বর্তমানে ইয়েমেনে প্রতি দশ মিনিটে ক্ষুধার কারণে মারা যায় একটি শিশু৷ নতুন বছরে কি আদৌ এই সমস্যার সমাধান সম্ভব?

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

সব শেষ?

দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তাঁর দল খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী পার্টি, অর্থাৎ সিডিইউ’র ভার সামলেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ ২০১৮ সালে এসে এদায়িত্ব তুলে দিতে হলো আনেগ্রেট ক্রাম্প-কারেনবাওয়ারের হাতে৷ তবে কি আগামী দিনে রাষ্ট্রের ভারও নতুন হাতে যাবে?

ক্যামেরার চোখে ২০১৮

রাজপথে ইউরোপের জনতা

২০১৮ সালে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ঘটেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের মতো ঘটনা৷ কিন্তু ইউরোপে এসব না ঘটলেও জনতার মধ্যে রয়েছে বেতনবৃদ্ধি, মূল্যবৃদ্ধি ও কমতে থাকা পেনশন ইত্যাদি বিষয়ে ক্ষোভ৷ এই দাবিগুলি ঘিরেই এ বছর একাধিকবার পথে নেমেছেন জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের নাগরিকেরা৷ ইউরোপের রাজপথের চিত্র, তা এখনই বলা যাচ্ছে না৷

বছরভর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যবিরোধ জিইয়ে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি নুতন করে ঝুঁকির মুখে পড়ে৷একুশ শতকের শুরুতেই বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান অর্থনীতি হিসেবে চীনের উত্থান ঘটলেও বিদায়ী বছরে দেশটি হয়ে উঠল যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর প্রতিপক্ষ৷ট্রাম্পের ভাষায়, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাশিয়ার চেয়েও বড় শত্রু চীন৷'' যদিও রুশ-মার্কিন বৈরিতা ব্রিটেনে রুশ নাগরিক সের্গেই স্ক্রিপালের নার্ভ গ্যাস হামলার শিকার হওয়ার জেরে আরো প্রকট হয়৷ সের্গেই যুক্তরাজ্যে নিজের দেশের তথ্য পাচার করতেন বলে অভিযোগ৷ তাঁকে হত্যাচেষ্টার পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়৷ সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে যেভাবে বিদ্যমান অবস্থার বিপরীতে নিয়ে গেছেন, তাতে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে৷ জাতীয় স্বার্থের কথা বলে জাতিসংঘের ‘জলবায়ু চুক্তি' থেকে এরই মধ্যে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র৷ অথচ বলা হচ্ছে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে ব্যর্থ হলে বিপদ থেকে রেহাই পাবে না কেউই৷ এরই মধ্যে গত বছর ইউরোপের খরা থেকে শুরু করে অ্যামেরিকার দাবানল, এশিয়ার প্রবল বৃষ্টিপাত ইত্যাদি চরম আবহাওয়ার জোরালো আলামত দিয়ে গেছে৷ জাতিসংঘের ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-র বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে না পারলে বিপর্যয় অনিবার্য৷

যে জাতীয় স্বার্থের জিগির তুলে ট্রাম্প বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন বিশ্বকে, তার পালে জাতীয়তাবাদী হাওয়া, কেন্দ্রে অভিবাসনবিরোধী প্রবণতা৷ আর এই জাতীয়তাবাদী প্রবণতার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ৷ ট্রাম্প তো বলেও দিয়েছেন, অভিবাসনে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু আফ্রিকা বা ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে কাউকে চান না৷ তাঁর পছন্দ নরওয়ের মতো দেশ, যেখানকার ৯৪ শতাংশ মানুষ শ্বেতাঙ্গ৷ আফ্রিকার কয়েকটি দেশকে ট্রাম্পের ‘শিটহোল কান্ট্রিজ' বলার বিষয়টি কেউ বিস্মৃত হয়নি৷

হাসান ইমাম, লেখক ও সাংবাদিক

ইউরোপেও বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে পড়েছে৷ যুক্তরাজ্য অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে৷ যদিও গত ৭ জুলাই ঘোষিত ‘ব্রেক্সিট' পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে৷

অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, এমনকি ‘উদারনৈতিক' সুইডেনেও বর্ণবাদী প্রবণতা মাথা চাড়া দিচ্ছে৷ বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদের সমান্তরালে উত্থান ঘটছে কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বেরও৷ কেবল ইউরোপ বা উত্তর অ্যামেরিকা নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসকদের কবলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন অ্যামেরিকার অনেক দেশও৷ ইউরোপে বর্ণবাদ রাজনীতির ‘ট্রাম্পকার্ড' হলে বাদবাকি বিশ্বে ক্ষমতা দখলের ‘হাতিয়ার' হলো ধর্ম, ধর্মের নামে বিভক্তি৷ মিয়ানমারেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভক্তি, যার পরিণতি রোহিঙ্গা সংকট৷ এক অর্থে, গত বছর কর্তৃত্ববাদের বিস্তারে দেশে দেশে গণতন্ত্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে৷ তবে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের পতন, মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে হটানোও সম্ভব হয়েছে জনতার সম্মিলিত আন্দোলনে৷

গত অক্টোবরে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসের ভেতর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাংবাদিক জামাল খাশোগজি৷ প্রথমদিকে সৌদি সরকার এ কথা অস্বীকার করলেও পরে কবুল করতে বাধ্য হয়৷ তবে দেশটি এখনো পরিষ্কার করেনি কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড৷

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে)-এর হিসাবে, ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে খাশগজির মতো ৯৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে৷ ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮২৷

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে বাংলাদেশে গত বছর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চার শতাধিক মানুষ৷ এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ‘গুজব' ছড়ানোর অভিযোগে আটক হন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলম৷ ১০৮ দিন পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া শহিদুলকে টাইম সাময়িকী ২০১৮ সালের আলোচিত চরিত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড দ্য ওয়ার অন ট্রুথ' তালিকায় স্থান দিয়েছে৷

গত বছর মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হলেও ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশ'-এর তালিকায়ও ঢুকে পড়ে বাংলাদেশ৷ বিশ্বের ১২৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে গবেষণা করে জার্মান গবেষণা সংস্থা ব্যার্টেল্সমান ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে ৫৮টি দেশকে স্বৈরতন্ত্রের অধীন এবং ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছে৷ প্রতিষ্ঠানটির মতে, ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স ২০১৮' সূচকে নীচে নেমে যাওয়া ১৩টি দেশের মধ্যে ৫টি দেশ আর গণতন্ত্রের নূন্যতম বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে না৷ তাদের মতে, ওই ৫টি দেশ হলো বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা৷

গবেষণা সংস্থাটির এই মূল্যায়নের ভিত্তি ১২৯টি দেশের গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি এবং সুশাসনের অবস্থা নিয়ে করা সমীক্ষা৷ এই সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি করা সূচকে বাংলাদেশের সঙ্গে ৮০ নম্বরে অবস্থান করছে রাশিয়াও৷

রিপোর্টার উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) গত বছরের গোড়ায় বলেছিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে মাত্র ৯ শতাংশ দেশের অবস্থা ‘ভালো' এবং ‘মোটামুটি ভালো' ১৭ শতাংশ দেশ৷ অর্থাৎ বাকি ৭৪ শতাংশ দেশের অবস্থা খারাপ, এর মধ্যে ১২ শতাংশ দেশের পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ'

দেশে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দিকে নজর রাখা ফ্রিডম হাউস হিসাব কষে বলছে, বিশ্বের মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ‘মুক্ত গণমাধ্যমের' দেশে বাস করে৷ আর গণমাধ্যম ‘মুক্ত নয়' এমন দেশে বসবাসকারী মানুষ ৪৫ শতাংশ৷

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈশ্বিকভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথা বাকস্বাধীনতা হরণের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন এবং সেগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার৷ এ পটভূমিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আচরণকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যেতে পারে৷ তাঁর ভাষায়, ‘গণশত্রু' গণমাধ্যম ‘ফেক নিউজ' প্রচার করে৷ ট্রাম্পের মতো একই মানসিকতার শাসকের অভাব নেই বিশ্বে৷ রাশিয়ার পুটিন, তুরস্কের এর্দোয়ান, ফিলিপাইন্সের দুতার্তে, মিসরের জেনারেল সিসি, চেক প্রজাতন্ত্রের জিমান প্রমুখ ‘উজ্জ্বল' উদাহরণ৷

অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটছে বিশ্বে৷ তুরস্ক থেকে রাশিয়া, ভিয়েতনাম থেকে বলিভিয়া— যেখানেই জনগণের কণ্ঠরোধী শাসনের বিস্তার ঘটছে, সেখানেই ক্ষমতাসীনরা সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে, ভিন্নমতের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত৷

গত ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৭০ বছর পূর্ণ হলো৷ অথচ ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তার বিষয়টি এখনো হুমকির মুখে৷ দেশে দেশে চলছে গণহত্যা, জাতিগত নিধনযজ্ঞ৷ মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধ অধিবাসীদের অভিযান এর চরমতম দৃষ্টান্ত৷ মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে ধুঁকছে মানবতা৷ দুর্ভিক্ষের কবলে লাখ লাখ মানুষ৷ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ভূমির অধিকার৷ একই ভাগ্য বরণ করছে ভারতের কাশ্মীরের অধিবাসীরাও৷ সম্প্রতি এ তালিকায় যোগ হয়েছে চীনের উইঘুর জাতিগোষ্ঠী৷

টাইম ম্যাগাজিনের ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ সাংবাদিকরা

জামাল খাশগজি

যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশগজি মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবের রাজনীতি বিষয়ে ওয়াশিংটনে পোস্টে নিয়মিত কলাম লিখতেন৷ পাশাপাশি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন তিনি৷ অক্টোবরে ইস্তান্বুলেন সৌদি দূতাবাসে গেলে সেখানেই নিহত হন তিনি৷ তুরস্ক তাঁকে পরিকল্পিতভাবে খুন করার অভিযোগ করলেও, সৌদি আরব তা অস্বীকার করে আসছে৷

টাইম ম্যাগাজিনের ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ সাংবাদিকরা

ক্যাপিটাল গেজেট

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যের পত্রিকা ক্যাপিটাল গেজেটকেও ‘পারসন অফ দ্য ইয়ারের’ স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে৷ জুন মাসে পত্রিকাটির অফিসে একটি বন্দুক হামলায় পাঁচ সাংবাদিক নিহত হন৷ কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি পত্রিকাটি৷ বরং এরপর থেকে আরো বেশি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জোর দিয়েছে৷

টাইম ম্যাগাজিনের ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ সাংবাদিকরা

রয়টার্স সাংবাদিক

মিয়ানমারে সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছে রয়টার্সের দুই সাংবাদিক কিয়াও সোয়ে উ এবং ওয়া লোনের৷ রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে তাঁদের ওপর ক্ষিপ্ত হয় দেশটির সরকার৷ ১০ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যার তথ্য উন্মোচনের দায়ে তাঁদের আটক করা হয়, অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচারের৷ তারা এখন কারাবন্দি৷

টাইম ম্যাগাজিনের ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ সাংবাদিকরা

মারিয়া রেসা

ফিলিপাইন্সের ৫৫ বছর বয়সি নারী মারিয়া রেসা ব়্যাপলার নামে একটি অনলাইন নিউজ সাইটের প্রতিষ্ঠাতা৷ দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র একজন কঠোর সমালোচক তিনি৷ এই ‘তথাকথিত যুদ্ধে’ ১২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানুয়ারিতে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ৷ সম্প্রতি ব়্যাপলারের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে৷ এর ফলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে তাঁর৷

টাইম ম্যাগাজিনের ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ সাংবাদিকরা

বাংলাদেশের শহীদুল আলম

বাংলাদেশের শহীদুল আলমের কথাও উঠে এসেছে টাইমের ঘোষণায়৷ এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করায় ‘মিথ্যা’ এবং ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্য করার অভিযোগ এনে তাঁকে ১০০ দিনের বেশি সময় কারারুদ্ধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে৷

হাসান ইমামের লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য চাই৷ তাই লিখুন নীচের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন