কৃষিজমির উর্বরতা ফেরাতে প্রয়োজন জৈব চাষ

ক্রমাগত রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ায় কমে যাচ্ছে কৃষিজমির উর্বরতা৷ এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অনেক অঞ্চলের মাটিতেই ন্যূনতম ৩.৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও সেখানে এর পরিমাণ এক শতাংশেরও নীচে৷

এর ফলে কৃষি জমি হারাচ্ছে জৈবিক গুণাবলী৷ ফসলের উৎপাদন আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কৃত্রিম সারের ওপর৷ এ সব তথ্যের প্রমাণ মিলল বছর কয়েক আগে যখন পেশাগত কাজে উত্তরাঞ্চলে গেলাম৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কি পড়েছে তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য মাঠ পর্যায়ের তথ্য দরকার ছিল৷ রংপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হলো৷ প্রতিবেদনের জন্য তাঁদের দেয়া প্রয়োজনীয় নানা তথ্যের মধ্যে দিন দিন কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাওয়ার কথাও জানালেন কৃষকেরা৷

নজির তাঁদেরই একজন৷ ২৫ কি ২৬ বছর বয়সি ছিপছিপে এই তরুণ কৃষক কাজ করছিলেন মাঠে৷ শীতের সবজির বীজ বোনার কিছুদিন পর ক্ষেত নিড়ান দিচ্ছিলেন৷

কথা বলতে গিয়ে জানা গেল, ছোটবেলায় নজিরের বাপ-চাচারা যেভাবে চাষ করতেন এখন সার ব্যবহার ও চাষ পদ্ধতিতে কিছুটা বদলেছে৷

এমনকি ক'বছর আগেও যতটা সার লাগত, এখন তার চেয়ে বেশি লাগছে৷ নতুন নতুন রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে৷ আর ফলনও সন্তোষজনক নয়৷ সব মিলিয়ে তাঁর খরচ বেড়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সার উৎপাদনে কেঁচো!

দেশজুড়ে যখন রাসায়নিক সার ও জিনগতভাবে পরিবর্তন করা বীজ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন স্রোতের উলটো দিকে যাচ্ছেন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের কিষানি কমলা বেগম৷ নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন জৈব খামার৷ কমলা বেগম কেঁচোকে ব্যবহার করেন জৈবসার উৎপাদনে৷ ইংরেজীতে এই পদ্ধতিতে উৎপন্ন সারকে বলা হয় ‘ভার্মি কম্পোস্ট’৷ এই পদ্ধতিতে গাছের পাতা, খড়, গোবর, লতাপাতা, পচনশীল আবর্জনা খেয়ে কেঁচো মল ত্যাগ করে৷ সেই মল থেকেই তৈরি হয় কেঁচো সার৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফলমূল, সবজি থেকে সার

বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবজি, ফলমূলের উচ্ছিষ্ট জোগাড় করেন কমলা৷ সব একসাথে মিশিয়ে জমানো হয় একটি পাত্রে৷ একসময় সেই সবজি-ফলমূল পঁচে তৈরি হয় জৈব কম্পোস্ট৷ এসব উপাদানে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে বলে তা জমির জন্য ক্ষতিকর হয় না৷

সমাজ-সংস্কৃতি

খোপ সার

স্থানীয়ভাবে ‘খোপ সার’ বলে পরিচিত হলেও দেশের অন্যান্য জায়গায় সাধারণভাবে এই সারকে গোবর সার হিসেবেই চেনেন কৃষকরা৷ গরুর গোবর, হাঁস-মুরগি ও ছাগলের বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি হয় এই সার৷ জমির উর্বরতা বাড়াতে বিশেষ খ্যাতি আছে এই সারের৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জৈব বীজ

যেসব বীজ প্রাকৃতিক উপায়ে গাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় জৈব বীজ৷ তবে এখন বিভিন্ন উপায়ে জিনগতভাবে পরিবর্তন করে বীজ ছাড়া হয় বাজারে৷ এসব বীজ থেকে জন্মানো গাছ আগাছাপ্রতিরোধী এবং বিভিন্ন রোগ থেকে ফসলকে দূরে রাখে৷ কিন্তু এই বীজে উৎপাদিত ফসল স্বাস্থ্য এবং জমির জন্য ক্ষতিকর বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়৷ কমলা বেগম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বীজ সংগ্রহ করে ফসল ফলান৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জৈব ক্ষেত

শুধু সার ও বীজ থাকলেই হবে না৷ এর সঠিক প্রয়োগও জানতে হবে৷ কমলা বেগম জৈব সারের প্রয়োগ যাতে ঠিকমতো হয়, তা-ও নিশ্চিত করেন৷ শুধু জৈব সার ব্যবহার করে প্রায় দুই একর জমিতে গড়ে তুলেছেন আখ খেত৷ এছাড়াও ঢেঁড়শ, লাউসহ নানা ধরনের সবজির চাষ করেন তিনি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কীটনাশকেও বিষ নেই

রাসায়ানিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া গেলেও, তাতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও থেকেই যায়৷ ফলে কমলা বেগমের মতো অনেকেই ঝুঁকছেন জৈব কীটনাশকের দিকে৷ বিভিন্ন রকম গাছের পাতা, ছাল এবং বুনো ফল দিয়ে তৈরি হয় এই কীটনাশক৷ এই কীটনাশক ব্যবহার করে বেশ ফলও পাচ্ছেন সিঙ্গাইরের কৃষকরা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফেরোমোন ফাঁদ

ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কৃষক এখন নিজেই তৈরি করতে পারছেন ফেরোমোন ফাঁদ৷ এই পদ্ধতিতে একটি কৌটায় ফেরোমোন নামের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়৷ এর গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পোকামাকড় এসে পড়ে কৌটার মধ্যে৷ জৈব পদ্ধতি না হলেও এতে ক্ষতি হয় একেবারেই কম৷ পুরো ক্ষেতে রাসায়নিক ছড়িয়ে না দিয়ে মাঝেমধ্যে শুধু ফেরোমোনের কৌটা পালটে দিলেই সম্ভব হয় পোকা দমন৷ এই পদ্ধতি এখন বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে৷

খরচ বাড়ার কথা জানিয়েছেন আরেক কৃষক আবিদ মিয়ারও৷ প্রৌঢ় এই কৃষক তাঁর সবজি ক্ষেতে কীটনাশক ছিটাচ্ছিলেন৷ তিনিও জানালেন, আগের চেয়ে কীটনাশক বেশি দিতে হয়৷ কারণ রোগ বালাই বেড়েছে৷

দু'জনই একটি বিষয়ে একমত যে, ভালো ফলনের জন্য আগে যতটা খরচ আর শ্রম দিতে হত, এখন তার চেয়ে বেশি দিতে হয়৷ অর্থাৎ সমৃদ্ধ ফলনের জন্য জমির প্রাকৃতিক সক্ষমতা কমছে৷ প্রশ্ন হলো, এর কারণ কী?

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ হেক্টর৷ আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ সাড়ে ৮৫ লাখ হেক্টর৷

প্রায় দেড় কোটি কৃষি পরিবার এই জমির প্রায় শতকরা ৮৮ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে৷ এদের অধিকাংশই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক৷

বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা বাঞ্ছনীয় হলেও এ দেশের বেশির ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১-১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম৷

এর মধ্যে ৩৭ লাখ হেক্টর জমিতে ফসফরাস, ২৭ দশমিক ২ লাখ হেক্টর জমিতে পটাশিয়াম, ৩৩ দশমিক ১ লাখ হেক্টর জমিতে গন্ধক, ২৭ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমিতে দস্তা, ২৪ দশমিক ৯ লাখ হেক্টর জমিতে বোরন, ৩৫ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর জমিতে অত্যাধিক থেকে অধিক অম্লের অভাব রয়েছে৷ এছাড়া অনেক জমিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব৷

কৃষিবিদদের মতে, বেশি ফলন পাবার আশায় বেশি বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন কৃষকেরা৷ এতে জমির জৈব পদার্থ কমে যায়৷ হারিয়ে যায় উর্বরা শক্তি৷

আরো কারণ আছে৷ বেশি লাভের আশায় একই জমিতে একই ফসল বারবার চাষ করেন অনেকেই৷ কিন্তু জমির উর্বরা শক্তি ঠিক রাখতে প্রয়োজন নানা ধরনের ফসল চাষ৷ উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষও জমির উর্বরতা কমার কারণ৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

এমনিতেই প্রতিদিন কমছে আবাদি জমির পরিমাণ৷ এক হিসেবে দেখা যায়, দিনে দুই হাজার বিঘা জমি কৃষি থেকে অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে৷ তামাক ও চিংড়ি চাষের ফলেও প্রতি বছর ২৪ হাজার বিঘা জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে৷

এছাড়া ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাস ও নগরায়নের প্রয়োজনে অবকাঠামো নিশ্চিত করতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষি জমি৷ হিসেব অনুযায়ী, গত ১১ বছরে ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ায় কমে গেছে ধান চাষ৷

এ অবস্থায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কৃষিজমির উৎকৃষ্ট ব্যবহার৷ সেক্ষেত্রে জৈব পদ্ধতিতে চাষ সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে৷

এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, এতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয় স্বল্পমাত্রায়৷ গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জৈব সার প্রয়োগ ও জৈব বালাইনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল ও সবজির উৎপাদন খরচ শতকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব৷

জৈব সার রাসায়নিক সারের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ খরচ কমায়৷ তবে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে যেহেতু হরমোন বা কৃত্রিম সার ব্যবহৃত হয় না, তাই আখেরে দাম একটু বেশিই পড়ে৷

এছাড়া ফরমালিন জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার না করায় সংরক্ষণ ব্যয়ও বেশি৷ তবে সব মিলিয়ে বাড়তি এ খরচ ১০ থেকে ২০ ভাগের বেশি নয়৷

সে হিসেবে অজৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত আলু দাম কেজি প্রতি ২০ টাকা হলে, জৈব পদ্ধতিতে ২২ থেকে ২৪ টাকা হবার কথা৷ এসব চাষে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক যে মাত্রার স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে তার তুলনায় বাড়তি এ দাম খুব বেশি কিছু কি?

এ সম্পর্কে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷