1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

কেন বদলাচ্ছে শহরের ‘মুসলিম' নাম?

১৩ নভেম্বর ২০১৮

সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিবাদ আসলেও ক্ষমতাসীন জনতা পার্টি বা বিজেপির দৌলতে বদলাচ্ছে ভারতে একাধিক শহরের নাম৷ শহরের মুসলিম নাম বদলে ‘হিন্দু'-করণের ফলে ক্ষতি হচ্ছে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির৷ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা৷

https://p.dw.com/p/388kk
Indien Amtseid Yogi Adityanath, Staat Pradesh
ছবি: Reuters/P. Kumar

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও আদিত্যনাথের দল, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরের নাম বদল করছে৷ গত সপ্তাহে, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এলাহাবাদের নাম বদলে ‘প্রয়াগরাজ' ও ফৈজাবাদকে বদলে ‘অযোধ্যা' করার ঘোষণা করেন৷ এর কারণ হিসাবে তাঁরা দেখিয়েছেন ইতিহাসকে৷

বিজেপির মতে, ব্রিটিশ দখলের আগেই, এই শহরগুলির মূল হিন্দু নাম বদলে মুসলিম নাম করা হয়৷ ১৮৫৭ সালের পর থেকে সেই নামগুলি বদলে ইংরেজি নাম রাখে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার৷ এই ইতিহাসের চাকা উলটো ঘোরাতে চেয়েই নাম বদলে ব্যস্ত বর্তমান বিজেপি সরকার৷

কিন্তু নাম বদলের এই হিড়িক শুধু উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নেই৷ অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও শুরু করে দিয়েছেন রাস্তা, এয়ারপোর্ট বা শহরের নাম বদল করা৷ গুজরাটে আহমেদাবাদের নাম বদলে হয়েছে কর্ণাবতী৷ এদিকে, দক্ষিণের রাজ্য তেলেঙ্গানার বিজেপি সাংসদ রাজা সিং ইতিমধ্যে হায়দ্রাবাদের নতুন নাম হিসাবে প্রস্তাব করেছেন ‘ভাগ্যনগর'৷ এমনকি তাজ মহলের জন্য বিশ্বখ্যাত শহর আগ্রার নাম পরিবর্তন করে ‘অগ্রভান' বা ‘অগ্রওয়াল' করারও কথা শোনা যাচ্ছে৷ মুজফফরনগরকে লক্ষ্মীনগর করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে এর মধ্যে৷

এখানে লক্ষণীয়, যে শহরগুলির নাম পরিবর্তন করার দাবি উঠছে, সেই প্রত্যেকটি নামেরই রয়েছে মুসলিম শিকড়৷

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

ফৈজাবাদের নাম ‘অযোধ্যা' ঘোষণা করার পর আদিত্যনাথ বলেন, ‘‘অযোধ্যা আমাদের কাছে সম্মান, গর্ব ও মর্যাদার প্রতীক৷''

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই নামবদলের পেছনে রয়েছে আসন্ন ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরিকল্পনা৷ এই নামবদল আসলে ভারতের গোঁড়া হিন্দু ভোটকে সংগঠিত করার উপায়৷ শহরের নামবদল বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সাধারণ ঘটনা হলেও, ভারতের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দেশের ‘হিন্দুকরণ'-এর প্রক্রিয়া৷

 

সমাজতাত্ত্বিক সঞ্জয় শ্রীবাস্তব ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এই নামবদল আসলে দেশের বহুমুখী সত্ত্বার বিরোধী৷ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি দেশের গোঁড়া হিন্দু ভোটারদের তোয়াজ করতেই এমন কাজ করছে৷ কিন্তু এসবের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে যে বার্তা পৌঁছাচ্ছে, তা সমস্যাজনক৷''

প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর মূল লক্ষ্য ভারতকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু-মুক্ত একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্রে' পরিণত করা৷ সমালোচকেরা মনে করেন, এই ধারণা দেশের সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে বৈরি মনোভাব সৃষ্টি করে, যা নামবদলের রাজনীতির মধ্যেও সমানভাবে বিরাজমান৷

নতুন দিল্লীর অর্থনীতিবিদ পরীক্ষিৎ ঘোষের মতে, এই নামবদল আসলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা সরকারের গত চার বছরের ব্যর্থতা থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরানোর কৌশল৷

শুধু যে গবেষকেরা এমন মনে করছেন, তা নয়৷ অনেক রাজনীতিকরাও এই পদক্ষেপের বিরোধী৷

লোকতান্ত্রিক জনতা দলের নেতা, শারদ যাদবের ধারণা, বিজেপির এই কাজ ভারতের বহুত্বকে ক্ষুণ্ণ করে৷ যে বহুত্ব স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট হয়ে এসেছে, তার চরম বিরোধী বিজেপির এই মুসলিম নাম বদলের কার্যকলাপ, বলে জানান তিনি৷

বহুত্বের সাথে আপোষ

নামবদলের কাজ ভারতে বেশ অনেক বছর ধরেই চলছে৷ স্বাধীনতার পর, ব্রিটিশ প্রভাব থেকে বেরোনোর জন্য অনেক শহরের নাম বদলানো হয়৷ ইংরেজি নামের বদলে জায়গা করে নেয় বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী দ্বারা অনুপ্রাণিত নাম৷

এ বিষয়ে শ্রীবাস্তব বলেন, ‘‘গত ৫০ বছরে অনেক বার নাম বদল করা হলেও এবার তা করা হচ্ছে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে৷''

কিন্তু, সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা৷

আরএসএস সদস্য, রাঘব আওয়াস্থির মতে, ‘‘আমাদের জাতীয়তাবাদ প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির একতা ও অখণ্ডতার পক্ষে৷হিন্দু রাজা ‘ভরত'-এর আদর্শ মেনে দেশের সাংস্কৃতিকঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখাই আমাদের উদ্দেশ্য৷''

হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কৈফিয়ত দেওয়া সত্ত্বেও ভারতের একাংশে এই নামবদলের সমালোচনা থেকে যাচ্ছে৷ এর কারণ হতে পারে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশে বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সহিংসতা৷ ২০১৪ সাল থেকে একাধারে বেড়েছে ‘গো-রক্ষা'র নামে সংখ্যালঘু মুসলমান হত্যার ঘটনা৷

এভাবেই,অতি-ডান চরমপন্থিদের উত্থানের ফলে দেশে বাড়ছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গুরুত্ব৷

মুরলি কৃষ্ণন/এসএস