কোনোভাবেই শরণার্থী নিতে রাজি নয় হাঙ্গেরি

জার্মানির ‘বিল্ড' পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান বলেছেন তাঁর দেশ ইইউ'র কোটা অনুযায়ী উদ্বাস্তু নিতে চায় না, কারণ, উদ্বাস্তুরা ‘মুসলিম হামলাকারী'৷

পপুলিস্ট নেতা অর্বান তাঁর কট্টর উদ্বাস্তুবিরোধী মনোভাবের জন্য পরিচিত৷ বিল্ড পত্রিকায় সোমবার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অর্বান বলেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি হাঙ্গেরির ‘সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক সত্তার' জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷

‘‘আমরা এসব মানুষকে মুসলিম উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করি না৷ আমরা ওদের মুসলিম হামলাকারী হিসেবে দেখি,'' বলেন অর্বান৷

সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন যে, সিরীয় উদ্বাস্তুরা প্রাণের আশঙ্কায় দেশত্যাগ করছেন না৷ হাজার হাজার অভিবাসী যে হাঙ্গেরির মতো অপেক্ষাকৃত কম সমৃদ্ধিশালী ‘কিন্তু স্থিতিশীল' দেশের মধ্য দিয়ে যাবার সময় জার্মানির মতো পশ্চিম ইউরোপের অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধিশালী দেশগুলিতে যাবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন – এ থেকে প্রমাণ হয় যে, তাদের উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করা চলে না, বরং তারা ‘‘অর্থনৈতিক অভিবাসী, যারা উন্নততর জীবনের খোঁজ করছেন৷''

মুসলিম-প্রধান দেশগুলি থেকে আগত মানুষদের তাঁর দেশে নেওয়া প্রসঙ্গে অর্বান বলেন যে, হাঙ্গেরি ‘বাধ্যতামূলকভাবে' তা করতে রাজি নয়৷

অবার্নের মতে, ‘‘বেশি মুসলিম এলে, তা অনিবার্যভাবে দ্বিবিধ সমাজ সৃষ্টি করবে বলে আমাদের ধারণা, কেননা, খ্রিষ্টান ও মুসলিম সমাজ কোনোদিন এক হতে পারবে না৷''

তিনি মনে করেন, ‘‘বহুসংস্কৃতি একটা ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়৷''

জার্মানি ‘অভিবাসীদের চেয়েছে'

যে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কোটা নিয়ে বুদাপেস্ট আর ব্রাসেলসের মধ্যে বিরোধ, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিস (ইসিজে)-তে সেই কোটা চ্যালেঞ্জ করে সম্প্রতি ব্যর্থ হয়েছে৷

জার্মানি যেখানে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু ও অভিবাসী নিচ্ছে, সেখানে হাঙ্গেরি কাউকে নিচ্ছে না, এটা ন্যায্য কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে অর্বান বলেন, ‘‘তফাৎটা হলো এই যে, তোমরা অভিবাসীদের চেয়েছিলে, আমরা নয়৷''

হাঙ্গেরীয় কর্মকর্তারা ইসিজে-র রায়কে ‘রাজনৈতিক' বলে প্রত্যাখ্যান করেন৷ এমনকি হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিজার্তো মন্তব্য করেন যে, ‘‘রাজনীতি ইউরোপীয় আইনকানুন ও মূল্যবোধকে ধর্ষণ করেছে৷''

হাঙ্গেরি যে ইইউ-এর একমাত্র দেশ, যার সমালোচনা করা হয়েছে, যদিও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কোটা ‘‘বিশটির বেশি দেশে কার্যকরি করা হয়নি,'' অর্বান তাকে ‘দু'মুখো বিচার' বলে অভিহিত করেন৷

ইউরোপীয় কমিশনের সর্বাধুনিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউ-এর মাত্র দু'টি সদস্যদেশ কোটা অনুযায়ী কোনো উদ্বাস্তু নিতে অস্বীকার করেছে – হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড৷ স্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র কোটা অনুসারে সামান্য কিছু উদ্বাস্তু নিয়েছে৷ তবে প্রতিটি দেশ কোটা অনুযায়ী যে পরিমাণ উদ্বাস্তু নেবার ‘আইনগত প্রতিশ্রুতি' দিয়েছে, মোট ২২টি দেশ তার চেয়ে কম উদ্বাস্তু নিয়েছে৷ এমনকি জার্মানিও তার কোটা পূরণ করতে পারেনি৷

হাঙ্গেরিতে আগামী এপ্রিল মাসে সাধারণ নির্বাচন৷ তার আগে অর্বান তাঁর অভিবাসনবিরোধী অবস্থান আরো জোরালোভাবে প্রচার করছেন৷ গত শুক্রবার তিনি বাভেরিয়ার খ্রিষ্টীয় সামাজিক ইউনিয়ন বা সিএসইউ দলের একটি সম্মেলনে আবির্ভূত হন৷ সিএসইউ দলকে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সিডিইউ দলের ‘সহোদরা' বলা হয়ে থাকে৷ সিএসইউ দল আপাতত তাদের নিজেদের অভিবাসন সংক্রান্ত মনোভাব প্রচার করতে সচেষ্ট৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

জার্মানির স্বস্তি

অনেক শরণার্থী এসেছে জার্মানিতে৷ অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশ শরণার্থী নিতে নারাজ৷ এ অবস্থায় ইইউ-র সব সদস্য দেশকে কোটা অনুযায়ী শরণার্থী নিতে হবে – এমন দাবি জানিয়েছিল জার্মানি৷ মঙ্গলবারের বৈঠকে দাবি পূরণ হয়েছে৷ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সিদ্ধান্ত হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার শরণার্থীকে ভাগ করে দেয়া হবে৷ জার্মানি নেবে ৩১ হাজার ৪৪৩ জন৷ বছর শেষে জার্মানিতে আগত মোট শরণার্থী ৮ লাখে হয়ে যেতে পারে৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

জার্মানির পরই ফ্রান্স

কোটা অনুযায়ী শরণার্থী বণ্টনের দাবিতে ফ্রান্সও ছিল জার্মানির সঙ্গে৷ মঙ্গলবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরণার্থীর চাপটা তাদের ওপরও খুব কম পড়বে না৷ এই দফায় ২৪ হাজার ৩১ জন শরণার্থী নেবে ফ্রান্স৷ছবিতে হাঙ্গেরি সীমান্তের এক শরণার্থী শিশু৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

চারটি দেশের ঘোর আপত্তি

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো শুরু থেকেই শরণার্থী নেয়ার বিপক্ষে৷ মঙ্গলবার হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া শরণার্থী নেয়ার বিপক্ষে ভোট দেয়৷ ভোটের পর চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী বহুস্লাভ সবটকা বলেন, ‘‘এটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত৷’’ সরাসরি আপত্তি জানালেও এখন রোমানিয়া ৪ হাজার ৬৪৬ জন, চেক প্রজাতন্ত্র ২ হাজার ৯৭৮ জন এবং স্লোভাকিয়া ১ হাজার ৫০২ জন শরণার্থী নেবে৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

দায়িত্ব মনে করে শরণার্থী নেবে লুক্সেমবুর্গ

৫ লক্ষ ৬২ হাজার জনসংখ্যার দেশ লুক্সেমবুর্গও শরণার্থী নেবে৷ ছোট দেশ তাই মাত্র ৪৪০ জন নেবে তারা৷ তবে দেশটির সরকার মনে করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ধরে রাখতে সব সদস্য দেশের শরণার্থী নেয়াটা এখন কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে৷ এমনিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ছোট দেশটির এখন বড় ভূমিকা পালন করাই স্বাভাবিক, কেননা, এ মুহূর্তে ইইউর সভাপতি দেশও লুক্সেমবুর্গ৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা

ইইউ অঞ্চলের আরেক ছোট দেশ মাল্টা৷ আয়তন মাত্র ৩১৬ বর্গ কিলোমিটার আর জনসংখ্যা ৪৪ হাজারের একটু বেশি৷ এমন ছোট দেশটিও ১৩৩ জন শরণার্থী নেবে৷

সবচেয়ে কম শরণার্থী নেবে মাল্টা, সবচেয়ে বেশি জার্মানি

আর যেসব দেশ শরণার্থী নেবে

ইইউ-র আরো কয়েকটি দেশও শরণার্থী নেবে৷ স্পেন নেবে ১৪ হাজার ৯৩১ জন, পোল্যান্ড ৯ হাজার ২৮৭ জন, নেদারল্যান্ডস ৭ হাজার ২১৪ জন, বেলজিয়াম ৪ হাজার ৫৬৪ জন, সুইডেন ৪ হাজার ৪৬৮ জন, অস্ট্রিয়া ৩ হাজার ৬৪০ জন, পর্তুগাল ৩ হাজার ৭৪ জন, ফিনল্যান্ড ২ হাজার ৩৮৮ জন, বুলগেরিয়া ১৬০০ জন, ক্রোয়েশিয়া ১ হাজার ৬৪ জন, লিথুয়ানিয়া ৭৮০ জন, স্লোভেনিয়া ৬৩১ জন, লাটভিয়া ৫২৬ জন, এস্তোনিয়া ৩৭৩ এবং সাইপ্রাস নেবে ২৭৪ জন শরণার্থী৷

রেবেকা স্টাউডেনমায়ার/এসি

আমাদের অনুসরণ করুন